সারাদেশ ডেস্ক | মঙ্গলবার, ১৪ জুন ২০২২ | প্রিন্ট | ৯৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহিত ছবি
সকাল ৭টা। পুবের আকাশে সূর্য আলো দিচ্ছে। কাজের সন্ধানে জড়ো হচ্ছেন মানুষ। কাজ পেলে উনুন জ্বলবে, জুটবে ভাত। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শ্রমিকের সংখ্যাও। কিন্তু শ্রমিক নিতে আসা মালিকের দেখা মেলা ভার। মাঝে মাঝে কেউ এলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সব শ্রমিক।
বেলা শেষে কেউ কাজ পেয়ে আনন্দে কাজে যোগ দেন, কেউ বিষণ্ন মনে খালিহাতে ফিরে যান বাড়িতে। অথচ ওই শ্রমিকদের দিনভর কাজ শেষে চাল-ডাল নিয়ে বাড়িতে যাবার কথা ছিলো। আনন্দ-বিষণ্নতার এমন চিত্রের দেখা মেলে ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়ের ‘কামলার’ হাটে।
মঙ্গলবার সকাল সাতটা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কামলার হাটে অবস্থান করে দেখা গেছে শ্রম বিক্রি করতে আসা মানুষের হাপিত্যেশের চিত্র। বর্তমান বাজার দর নিম্নআয়ের এসব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এক দিনের কামলা যাওয়ার জন্য কতো যে ব্যাকুলতা সেখানে না দাঁড়ালে উপলব্ধি করা যাবে না।
একে তো বর্ষার মৌসুম হওয়ায় কমে গেছে কাজ। নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে কাজ করছেন না। চরপাড়া কামলার হাটে মূলত নির্মাণকাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া যায়। এখানের শ্রমিকরা ইট, বালু, ঢালাই, বাসাবাড়ির গাছগাছালি পরিষ্কার— এসব কাজ করেন। বর্তমানে কাজ কম থাকায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে শ্রম বিক্রি করছেন হাটে আসা শ্রমিকরা।
কাজ না পেলে কারো ঘরে তিন বেলা ভাত জুটবে না; সে কারণে কাজের জন্য শ্রমিকদের ব্যাকুলতার শেষ নেই। তবুও কেউ কাজ পান, আবার অধিকাংশই কাজ না পেয়ে ফিরে যান বাড়ি। প্রতিদিন এই হাটে অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ শ্রমিক আসেন। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৮০ জন কাজ পেলেও বাকিরা ফিরে যান।
মঙ্গলবার খুব ভোরে নগরীর চুরখাই জামতলা এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আবদুল বারেক শ্রম বিক্রির জন্য হাটে আসেন। সমকালের সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি জানান, ত্রিশ বছর ধরে কামলা দিচ্ছেন। আগে নিজের বাবার কিছু জমি ছিলো, অভাবের কারণে সে গুলো বিক্রি করে শেষ করে দিয়েছেন। কামলা দিয়ে এক ছেলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াচ্ছেন। ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন তিনি। যেদিন যে কাজ পান সে কাজই করেন। একদিন কাজ না পেলে ভাতে জোটে না তার ঘরে।
তিনি আক্ষেপ করে জানান, বয়সের কারণে কাজ করতে কষ্ট হয়। মানুষও তাকে কাজে নিতে চায় না বয়স দেখে। বয়স্কভাতার জন্য গেলেও বয়স এখনও না হওয়ায় সরকারিভাতা পান না। তিনি কাজে না আসলে চুলায় আগুন জ্বলে না। দিনে যে টাকা মজুরি পান তা থেকে ১০০ টাকা চা-বিড়ি ও দুপুরের খাওয়া এবং যাতায়াত ভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকায় খুব কষ্টে দিন চলছে। ২২০ টাকা লিটার সয়াবিন তেল কিনতে হয়। ৪০ টাকা কেজি মোটা চাল কিনে খেতে হয়। সব জিনিসের দামই বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মঙ্গলবার তার শ্রম বিক্রির জন্য কেউ নেয়নি। তাই বাড়ি ফিরতে হয় খালি হাতে।
বর্তমান বাজার দরে প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে জীবন কেমন চলছে বারেকের সঙ্গে যখন কথা চলছিলো তখন পাশ থেকে মো. হামিদ নামের এক শ্রমিক বলছিলেন- ‘গরিবের গরিবানা, লবণ দিয়া পিঠা বানা। কাজ নাই তো, ভাত নাই।’ তার কথার সমর্থন যোগান আশপাশের আরও অন্তত পাঁচজন শ্রমিক। হামিদের বাড়িও চুরখাই এলাকায়। দেড় বছর ধরে এই কামলার হাটে আসেন হামিদ। তার মতো প্রায় দুই শ শ্রমিক আসেন এই হাটে যোগ করেন হামিদ।
তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে এসে বসে থাকে কেউ এসে তাদেরকে কাজের জন্য নিয়ে যাবে। কোনোদিন কাজ পান কোনো দিন কাজ না পেয়ে বাড়ি যেতে হয়। বর্তমানে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে কিন্তু তাদের শ্রমের মজুরি বাড়েনি, বরং কাজ কমেছে কামলা বেড়েছে। সপ্তাহে দুই-তিনদিন কাজ পান। সেই উপার্জন দিয়েই খুব কষ্টে দিন কেটে যাচ্ছে তার।
দাপুনিয়া বাজারের নজরুল ইসলামের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। অভাবের কারণে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে গেছে জামালপুরে নানার বাড়িতে। স্ত্রীকে নিয়ে একাই থাকেন বাড়িতে। কামলা দিয়ে কোনো মতন জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
তারাকান্দা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের সুরুজ আলীর ছেলে বাবুল মিয়া। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। নিজেও এক ছেলের জনক। গত এক বছর ধরে রাজমিস্ত্রি জোগালি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। সে জন্য কামলার হাটে আসেন। কোনোদিন কাজ পান, কোনোদিন পান না। আগে এলাকায় কাজ করলেও শহরে মজুরি একটু বেশি বলে এখানে কাজ করতে আসেন। কিন্তু বর্তমানে জিনিসের দামের সঙ্গে মজুরি সঙ্গতি হচ্ছে না। ৯০ টাকার পাঙ্গাস মাছ ১৫০ টাকায়, চাল ৪০ থেকে ৬০ টাকায় কিনতে হয়। সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। আগে দুপুরে হোটেলে ভাত খেলে ৪০ টাকায় হয়ে যেতো এখন ডিম দিয়ে খেলেও ৬০ টাকা চলে যায়।
৮ মাস আগে বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন মেহেদী হাসান। আগে গাজীপুরে ডাইং কারখানায় কাজ করতেন। কিন্তু বাবা-মা অসুস্থ থাকায় এবং বিয়ে করায় এখন এলাকায় থাকেন। খুব ভোরে তারাকান্দা থেকে শহরে চলে যান কামলা দিতে। যে টাকা পান তা দিয়ে প্রতিদিন সংসারের জন্য কিছু না কিছু নিতে হয়। তিনি বলেন, দুপুরে বাইরে খেলে ১০০ টাকার মতো চলে যায়। তাই বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে আসি, যেনো হোটেল খরচ বেঁচে যায়।
নগরীর সুতিয়াখালীর আবদুস সাবদুস মঙ্গলবার কাজ পাননি। গত চার মাস ধরে হাটে আসেন কাজের সন্ধানে। আগে ঢাকায় একটি সোয়েটার কোম্পানিতে কাজ করতেন তিনি। তিনি বলেন, ‘কাজ নাই তো খাওন নাই। সব জিনিসের দাম বেড়েছে। গরিব খেয়ে বাঁচবে এই উপায় নেই। দিনদিন উপায় হারা হয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের দিকে নজর দেওয়ার কেউ নাই।’
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফজলুল হক উজ্জল জানান, ২০ বছর ধরে শ্রমিকের হাটে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। আগে সংখ্যা কম ছিলো। এখন কাজ কমে গেছে। যে টাকা শ্রমিকরা পায় তা দিয়ে বর্তমান বাজারমূল্যে জীবন চালানো কঠিন। এখানে আসা ২০০ শ্রমিকের মধ্যে ৬০ জন কাজ পেলে ১৪০ জনকে ঘুরে যেতে হয়। প্রতি সপ্তাহেই কাজ না পেয়ে অসহায় শ্রমিক তার কাছে গেছে আর্থিক সহায়তার চেষ্টা করেন।