বৃহস্পতিবার ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

চ্যাম্পিয়ন মেয়েকে দেখতে ইচ্ছে করছে: কৃষ্ণার মা

খেলা ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২   |   প্রিন্ট   |   ৬১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

চ্যাম্পিয়ন মেয়েকে দেখতে ইচ্ছে করছে: কৃষ্ণার মা

সংগৃহিত ছবি

আজকের এই দিনের জন্য পরিবারের সবাই অপেক্ষো করছিলেন। তারা জানতেন কৃষ্ণা একদিন দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবেন। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথুলিয়া গ্রামে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কৃষ্ণা রাণী সরকারের। পৃথিবীর আলো দেখার পর কখনোই সুখের মুখ যিনি দেখেননি। যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছেন, সেদিন থেকেই দেখেছেন বাবাকে কষ্ট করতে।

দর্জির কাজ করে কোনো রকমে সংসারের খরচ চালাতেন বাবা। রান্নার চুলায় গিয়ে দেখতেন কান্নারত মায়ের মুখ। অভাবের সংসার। দুই ভাই-বোনের মুখে প্রায়ই দুবেলা ভাত জোটেনি। অর্ধাহার-অনাহারে দিনানিপাত করেছেন। সেই কৃষ্ণা আজ দারিদ্রতাকে পেছনে ফেলে অদম্য পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও একগ্রতা দিয়ে সাফল্যের উচ্চ শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়েছেন।

গত সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে ৩-১ গোলের ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশকে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দেন মেয়েরা। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে বাংলাদেশ ভাসছে আনন্দের জোয়ারে। সেখানে কৃষ্ণা রাণী সরকারের জোড়া গোলে হিমালয় কন্যাদের পরাজিত করে বাংলাদেশ। তাই সারাদেশের সাথে টাঙ্গাইলের গোপালপুর ভাসছে আনন্দে।

কৃষ্ণার ফুটবলার হয়ে বেড়ে ওঠার পথটি সহজ ছিল না। অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে আজকের এখানে তাকে আসতে হয়েছে। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে পরিবার, সবই বৈরী। কিন্তু কোনো বাঁধাই দমাতে পারেনি তাকে। অদম্য ইচ্ছেশক্তি তার লক্ষ্য থেকে তাকে টলাতে পারেনি চুল পরিমাণও। ছোট বেলা থেকেই কৃষ্ণা ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় ছেলেদের সাথে কৃষ্ণাও ফুটবল খেলত। এ নিয়ে পাড়ার লোকজন বাজে মন্তব্য করত। তার মা-বাবাকে কথা শোনাতে ছাড়ত না। মা মাঝেমধ্যেই বকাঝকা করত। কৃষ্ণার খেলা প্রতি আগ্রহ দেখে তার চাচা নিতাই চন্দ্র একদিন তিন নম্বর ডিআর বল কিনে দেন। সেই বলে দিয়ে কৃষ্ণা পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলা শুরু করে।

মানুষের কটূ কথা সহ্য করতে না পেরে তার মা এক দিন বটি দিয়ে তার ফুটবল কেটে ফেলেন। তবু থামেনি কৃষ্ণা। ১৬ কোটি মানুষের তাজ হবে যে, তাকে কি থামিয়ে রাখা যায়? প্রাইমারি স্কুল থেকে বঙ্গমাতা ফুটবল খেলে নজরে পড়ে সূতি ভিএম পাইলট স্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের। তিনি একটি নারী ফুটবল দল গঠন করেন। ওই দলে রাখেন কৃষ্ণাকে । কৃষ্ণাদের বাড়ি থেকে সূতি ভিএম স্কুলের দূরত্ব সাত কিলোমিটার। এত দূরে গিয়ে কিভাবে প্র্যাকটিস করবে? তখন কেউ রাজি হননি। বরং মা-বাবা বাধা দিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় এগিয়ে আসেন তার চাচা নিতাই চন্দ্র সরকার। তিনি সাহস যোগাতে থাকেন। ভাতিজিকে কোনো দিন সাইকেলে, কোনোদিন ভ্যানে, কোনোদিন হেঁটে প্র্যাকটিস করতে নিয়ে যান। কৃষ্ণা স্কুল দলের হয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিতে থাকে।

২০১৩ সালে বাফুফে তৃণমূল পর্যায় থেকে মহিলা ফুটবলার তুলে আনার কর্মসূচি হাতে নেয়। দেশের ৪০টি ভেন্যুতে এক সাথে এ প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি পালন করে। টাঙ্গাইল জেলা থেকে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয় কৃষ্ণা। এরপর রাজশাহী ভেন্যুতে এক মাসের একটি ক্যাম্প হয়। ওই ক্যাম্পে কোচ হিসেবে গোলাম রায়হান বাপনের ভাই গোলাম রব্বানী ছোটনকে কোচ হিসেবে পায়। তার পরের গল্পটা শুধু সামনের দিকে এগোনোর।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে কৃষ্ণাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অনেকেই তাদের বাড়িতে এসেছেন। সবাই কৃষ্ণার উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পাড়ার মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত। অভিনন্দন জানাচ্ছেন তার বাবা-মাকে। বাবা বাসুদেব চন্দ্র সরকার আগে দর্জির কাজ করতেন। এখন কৃষ্ণা আয়ের টাকায় জমি কিনে চাষবাস করেন। বাড়িতে আগে ছোট একটি টিনের ঘর ছিল। এখন একতলা বিল্ডিং হয়েছে। একমাত্র ছোট ভাই পলাশ চন্দ্র সরকার বেসরকারি একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করছে।

প্রতিবেশী বিউটি রানি সরকার বলেন, ‘আমাদের সামনেই বড় হয়েছে কৃষ্ণা। ফুটবলের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মনের ভেতর অনেক জেদ ছিল। কারো কটু কথা কোনো দিন পাত্তা দিত না। তার এই সাফল্যে আমরা খুব খুশি।’

আরেক প্রতিবেশী সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটা দেশের জন্য এত বড় অর্জন এনে দিয়েছে। এতে গোপালপুরের সবাই আনন্দিত।’

কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব সরকার বলেন, ‘মেয়ের সাফল্যে খুব খুশি হয়েছি। এলাকার মানুষও শুভেচ্ছা জানাতে আসছে। কৃষ্ণা যেন দেশের জন্য আরও গৌরব বয়ে আনতে পারে সেই আশীর্বাদ চাই।’

কৃষ্ণার মা নমিতা রানী সরকার বলেন, ‘মেয়েটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। ভালো একটি ফোন না থাকায় মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারি না। আমি কৃষ্ণাসহ ওদের দলের সবার জন্য দেশবাসীর কাছে আশীর্বাদ কামনা করি।’

গোপালপুর সূতি ভিএম পাইলট স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন বলেন, ‘ওর খেলায় নৈপুণ্য রয়েছে। রয়েছে ভাল করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বল নিয়ে দৌড়ানোর তীব্র গতি। আমি প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলাম ও ভালো কিছু করবে। ওর সাফল্যে আমরা তথা টাঙ্গাইলবাসী গর্বিত। সমাজ বদলাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনোভাবও। এখন ক্রীড়াক্ষেত্রে মেয়েদের সাফল্যও মানুষ ভীষণ উপভোগ করে। তাই গোপালপুর তথা সারা বাংলাদেশের মেয়েদের কাছে কৃষ্ণা এখন অনুপ্রেরণা ও আইডল।’

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি বলেন, ‘নারী ফুটবলে তার এই সাফল্যে টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশ গর্বিত। আমরা এই কৃতি ফুটবলারকে টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেব।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office