| বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১ | প্রিন্ট | ১৫৮৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
একটি প্রবাদ পড়েছিলাম লাল ফিতার দৌড়াত্ব। যার অর্থ হচ্ছে লাল ফিতার মধ্যে আটকে থাকা
দাপ্তরিক সকল কাজকর্মকে রূপক অর্থে বোঝায়। তবে কেন কোর্ট প্রাঙ্গনে লাল টাই কিংবা ফিতার
আর্বিভাব। বলছিলাম শিক্ষানবিশ আইনজীবিদের কথা। একজন শিক্ষানবিশকে প্রতিদিন লাল টাই পরিধান
করে কোর্ট প্রাঙ্গণে হাজির হতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে এ নিয়ম প্রচলিত। কিন্তু কেন এই লাল ফিতার
বিধান। এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি? সহজ কথা বৈষম্য তৈরী করা ছাড়া কিছুই না।এক সময় তো লাল টাই পড়তে
হতো না। অন্যান্য আইনজীবিদের মতোই একজন শিক্ষানবিশের জন্য কালো টাইয়ের বিধান ছিল। তাহলে কেন
লাল ফিতা দিয়ে টানাটানি। স্পষ্ট করেই ইহা আগামীর আইনজীবির মনে একটা বৈষম্যের রেখা টেনে দিল ।
কথা হলো কারা টানল কেনই বা টানল । ইহা আদৌ কি বাস্তব সম্মত সিদ্বান্ত কি না। বার এসোসিয়েসন এর
প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই বলতে চাই। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এরকম ব্যবস্থা আছে কিনা জানা নেই।
তবে এরকমটা কোন দেশে নেই অন্ততঃ এটা্ই সত্য । তবে কেন আমাদের দেশে আইনের নামে আগামীর
আইনজীবীর প্রতি এই অমানিবক আচরণ। কোর্ট প্রাঙ্গনে কে দালাল , কে সঠিক তা বের করার অনেক
সহজ পদ্ধতি আছে। সে জন্য তো আইডি কার্ড এর ব্যবস্থা আছে এবং,তাহলে কেন এই অপদস্থ । আসলে
ব্যাপার টা এক্কেবারেই উল্টো । আচ্ছা ,কারো মাথা ব্যাথা হলে আমরা কি মাথা কেটে ফেলে দিই, না সারানো
চেষ্টা করি। অবশ্যই সারাতে হবে। একজন আইনজীবি যা পারবেন বা পারেন ,একজন শিক্ষানবিশ তা কখনই
পারবেন না । কারণ আইন তা সমর্তন করে না। ইদানিং বিভিন্ন বার এসোসিয়েসন শিক্ষানবিশদের নোটিশ
দিয়ে দিচ্ছে যাতে বারে প্রবেশ করতে না পারে। এ কোন ধরনের ব্যবস্থা , তা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে হাজারো
শিক্ষানবশিদের মনে। এ যেন জীবন শুরু করার আগেই দুর্বৃত্তায়নের শিকার । ইতিমধ্যে আইনজীবি
তালিকাভুক্তির পরীক্ষা প্রায় চার বছর ধরে আটকে আছে। একটা খুড়া অজুহাত দিয়ে বার কাউন্সিল কতৃপক্ষ
বলেছেন, তারা আইনজীবী তালিকাভুক্তির মান বাড়াতে চান। খুব ভাল কথা, তাহলে কি পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়ে।
নিতান্তই তামাশা ছাড়া কিছুই না। প্রতিবছর পরীক্ষা নিয়েই মান যাচাই করা যায় বরং পরীক্ষা না নিয়ে না ।
কারো জীবন থেকে সময় কেড়ে নেওয়ার অধিকার তারা রাখেন না । কিন্তু তা করে চলেছেন ক্ষমতার
আষ্টেপৃষ্টে থেকে। আর এ অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষানবিশ। এর দায় কি
বার কাউনিসল এরাতে পারবে। এত কেচ্ছা কাহিনী বলতে গেলে লঙকা কান্ডকে ও হার মানাবে।
কথা হলো, কেমন আছেন তারা আইনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে। স্বাধীন দেশে আগামীর আইনজীবিদের জীবন
আজ সত্যি অসহায়। লাল টাই পড়ে কোর্ট আঙ্গিনায় যাদের বিচরন, সত্যিকার অর্থে তাদের জীবন যাত্রার
মান কেমন। লাল টাই পরহিতদের কেমন চোঁখে দেখা হয়, কেবল তারাই বুঝে যারা ইহা পরিধান করে। । কবে
যে এর অবসান হবে কেউ জানেন না । কারণ পরীক্ষা যে হচ্ছে না। জামাল (ছদ্মনাম) কুমিল্লা জেলাার কোন
এক গ্রাম থেকে এসেছিল সবার অপ্রিয় এই ঢাকা শহুরে। কথা হলো এই শহুর কিংবা রাষ্ট্র তাকে কি দিল।
বয়স তখন ছিল মাত্র আট সে তার বাবাকে হারিয়েছে। তিন বোনের সবার আদরের ছোট জামাল । মা এবং
বোনেরা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করিয়েছে তাকে। রাষ্টবিজ্ঞানে স্না্তক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর্
সম্পন্ন করে ২০১২ সালে । রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পড়তেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল রাষ্ট্রের
গুরুত্বপূর্ণ তিন অঙ্গের একটি জুডিশিয়ারীতে কাজ করবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবে । আর সেই স্বপ্ন
দেখেই সামনে চলতে চেয়েছিল সে । অনেক কষ্টে ধার দেনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০১২ সালে
ল’ স্নাতক কোর্সে ভর্তি হলো। এখানে দুই বছরের কোর্স প্রায় চার বছর লাগল ফলাফল হাতে পেতে।
অর্থাৎ ২০১৭ সালে পাহাড় সমান স্বপ্ন নিয়ে কোর্ট প্রাঙ্গনে হাজির হয় সে । একজন সিনিয়র আইনজীবির
অধীনে কাজ করতে শুরু করে। গায়ে সাদা পোষাক, চোখে রঙ্গিন স্বপ্ন এগিয়ে চলে সে। উদ্যমী তরুন বয়স ছিল
সাতাশ (বর্তমানে একত্রিশ) । নিয়মিত কোর্টে যাওয়াই তার ধ্যান জ্ঞান ছিল । এভাবেই লাল ফিতার বাধনে
কেটে গেল চার বছর, অ্যাডভোকেট আর হতে পারল না, স্বপ্ন অধরা থেকেই গেল। ইতিমধ্যে রেজিষ্ট্রশন
কার্ডের মেয়াদ প্রায় শেষ। যার মেয়াদ লেখা থাকে পাচঁ বছর । কিন্তু যা দিয়ে একবারমাত্র পরীক্ষায়
অংশগ্রহন করছে। শুধু জামাল(ছদ্মনাম) নয় এরকম হাজারো তরুনের জীবন আজ বার কাউনিসেলর নৈরাজ্যের
শিকার। অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। বৃটিশ গেল , শৈবা গেল, আদৌ কি গণমানুষর অধিকার প্রতিষ্ঠিত
হলো, প্রশ্ন থেকেই যায়। না কেবল শাসক পরিবর্তন হলো , শোসন রয়েই গেল।
ইতোমধ্যে শিক্ষানবিশরা দীর্ঘদিন ধরে করোনা মহামারি বিবেচনা করে লিখিত পরিক্ষা মওকুফের দাবীতে
প্রেসক্লাবে ও শাহবাগে নানা কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করে আসছে। তার মূল কারণ হলো , জীবন
থেকে চলে গেছে এতগুলো বছর। এমনকি আইনমন্ত্রীর বাসার সামনে অবস্থান করেও নানাজনের দৃষ্টি
অকর্ষণ হলেও , কতৃপক্ষের ঘুম ভাঙ্গার কোন লক্ষণ নেই। যা সত্যি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য
অশুভ সংকেত। এ যেন লাল ফিতার দৌড়াত্বে আটকে থাকা গতিময় জীবন। অধিকার থেকে বঞ্চিত করার
কিংবা শোসন করার এর চাইতে জ্বলন্ত উদাহরণ কি হতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে কোন পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতার কথা
বলা আছে— “ আইনের দ্বারা আরোপিত বাধা নিষেধ –সাপেক্ষে কোন পেশা বা বৃত্তি গ্রহনের কিংবা কারবার
বা ব্যবসা—পরিচালনার জন্য আইনের দ্বারা কোন যোগ্যতা নির্ধারিত হইয়া থাকিলে অনুরূপ
যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন আইনসঙ্গত পেশা বা বৃত্তি গ্রহনের এবং যে কোন
আইনসঙ্গত কারবার বা ব্যবসার পরিচালনার অধিকার থাকিবে।”
এক্ষেত্রে কথা হলো , আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা না নিয়ে কতৃপক্ষ তাদের কতটুকু সাংবিধানিক
দায়িত্ব পালন করেছেন । এমনকি মহামান্য আপীল বিভাগে ও রায় আছে বছরে দুইটি করে পরীক্ষার আয়োজন
করা। ইতিমধ্যে যদি ও বার কাউন্সিল আইনজীবী তালিকাভুক্তির লিখিত নিয়েছে কিন্তু তা অনেক প্রশ্নের
জন্ম দিয়েছে । আদালতে মানুষ আসেন ন্যায় বিচার পাবার আশায়, এর যদি ব্যত্যয় ঘটে খোদ আগামীর
আইনজীবীর সাথে। তাহলে মানুষ কোথায় যাবে সেটাই বড় প্রশ্ন । এ যেন সরষের ভেতরেই ভূত।এ ভূত তাড়াতে
না পারলে, একটি লাল ফিতার মধ্যেই আটকে থাকবে হাজারো তরুনের আত্মকাহিনী।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষক।