| মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল ২০২১ | প্রিন্ট | ৩৪৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
“একদিকে কানাডায় বেগম পাড়া
অন্যদিকে রাস্তায় সর্বহারা
মাঝখানে মধ্যবিত্ত দিশেহারা
সব মিলিয়ে আজ আমরা । ”
সবার কথা বলছি না, বলছি করোনা- মহামারীতে ছিন্নমুল মানুষেরা কেমন আছেন? ছিন্নমুল বলতে আমরা সাধারণত বুজি প্রচলিত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন একদল মানুষ যারা মুল স্রোতের বাহিরে, যাদের একমাত্র আশ্রয় ফুটপাত, ওদের হিসাব নিকাশ কেউ তেমন একটা রাখে না, যখন থখন পুলিশ এর নির্যাতন যাদের নিত্যসঙ্গী। রাজধানি ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের ছোট বড় শহরের প্রায় সব জায়গায় ছিন্নমুল মানুষদের দেখা যায়। লোকজন খাবার দিলে হয়ত খায় আর না হলে না খেয়েই থাকতে হয়। আসলে এরা কারা? কেনইবা এদের ফুটপাতে আশ্রয় হল ? রাষ্ট্র এদের কতটুক খোঁজ নেয়? এদের সংখ্যা বা কত হবে? এর সঠিক পরিসংখান পাওয়া বেশ কঠিন। যদিও কিছু এনজিও কিংবা ব্যাক্তি উদ্যাগে ছিন্নম‚ল মানুষ দের জন্য খাবার এবং কাপড় চোপর দেওয়া হয় তা একবারেই অপ্রতুল। আজ অবদি ওদের জন্য কোন স্থায়ী সমাধান চোখে পরেনি। মহামারী এই করোনার সময় যখন বলা হচ্ছে ঘরের বাইরে না যেতে , সামাজিক দ‚রত্ব মেনে চলতে। টিক এই সময়ে, এই মানুষ দের নিয়ে রাষ্ট্রের কোন পরিকল্পনা নেই বললেই চলে কিংবা কোন কালে ছিল কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সরকারী ভাবে কোন সহযোগিতা ওদের হাতে পৌছায় কিনা তা জানা নেই। সমগ্র দেশব্যাপী যখন প্রায় সবকিছুই বন্ধ , এরা অনেকটাই না খেয়েই দিনাতিপাত করছে।
একদিকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তি পালন করেছি, অন্যদিকে এই মানুষেরা না খেয়ে মারা যাচ্ছে ,আশ্রয় তো দুরের কথা । আত্মতৃপ্তির সাথেই আমরা বলছি দেশ এগিয়ে চলেছে । ভাল কথা, দেশ যতটা এগিয়েছে , ঠিক ততটাই বৈষম্য বেড়েছে । গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ তে বলা আছে- রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈথিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবর্ধন এবং জনগনের জীবন যাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতি গত মানের দঢ় উন্নতি সাধন যাহাতে নিম্নলিখিত বিষয় সমুহ নিশ্চিত করা যায় ঃ
ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরনের ব্যবস্থা ;
খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুন ও পরিমান বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্ব জনিত কিংবা বৈধব্য , মাতাপিত্হীনতা বা বার্ধক্য জনিত কিংবা অনুরপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।
ছিন্নমুল মানুষদের বেলায় তা অন্তঃসারশ‚ন্য বৈ কিছুই নয়। যা শুধু কিতাবে আছে বাস্তবে নেই। ছিন্নমুল মানুষদের মানবেতর জীবন যাপন হাজারো প্রশ্নের জন্ম দেয় । এরা যাবে কোথায়? রাষ্ট্রের কি কোন দায় নেই? এদের মধ্যে কেউ, শিশু ও নারী , আবার একদল যুবা বয়সের যাদের অধিকাংশই নেশাগ্রস্ত, এবং বয়স্ক নারী ও পুরুষ আছেন । এদের মধ্যে সবচাইতে সমস্যায় থাকে শিশু, নারী ও বয়স্ক শ্রেণির লোকজন।
মুলত ঢাকা শহরের গুলিস্তান, সদরঘাট , কমলাপুর রেলস্টেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও সারা দেশের রেল স্টেশন গুলোতে ছিন্নমুল মানুষদের বসবাস । রাস্তার পাশে পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছোট ঝুফরির মধ্যেই অথবা ওভারব্রিজের উপরে রাত্রি যাপন করেন এই মানুষেরা। দিনের বেলায় সারা ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়ায় অন্ন সংস্থানের আশায়। কেউ পায় আবার কেউ খালি হাতে ফিরে আবার আনেক সময় শ্রীঘরে যেতে হয় । বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষ শুধু ঢাকা শহরে ফুটপাতে থাকে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে এক মা তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন এবং ফ্যাল ফ্যাল চোখে থাকিয়ে আছেন পথচারীদের দিকে কেউ যদি কিছু দেয়। জিজ্ঞেস করলাম নাম কি। জাকিয়া (৩৫), এক কথায় উত্তর দিলেন। বললাম বাড়ি কোথায়? তা দিয়া আপনি কি করবেন? অনেকটাই বিরক্ত হলেন। তার যে টাকা দরকার , কথার দরকার নেই। কিছু খাইছেন? না । বাচ্চাটাকে নিয়ে বিপদে আছি স্যার। কোন কাজে ও যেতে পারি না। কেউ ত আর এমনি এমনি খাওন দেয়না । নিজের আনমনেই বলতে লাগলেন, ভালই ছিলাম গ্রামে পেট পুড়ে খেতে পারতাম , ক্যান যে এই মরার ঢাকা আইলাম। কেন আসলেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন ।বাড়ি ফরিদপুর, আমার স্বামী নিয়া আইছে, কইছে ঢাকা থাকলে খাওনের অভাব পরব না, হে তো নেশা করে , আবার বিয়া কইরা লইছে, আমারে বাইর কইরা দিছে। কামরাঙ্গিরচর বস্তিতে থাকতাম, ঘর ভাড়া দিতে পারি না বাইর কইরা দিছে। মাইয়ারে নিয়া আছি বিপদে , রাইতে হালার পুতেরা খালি ডিস্টার্ব করে, কোন টেকা পয়সা দেয় না। কোন রকম মাইনশের কাছে চাইয়া যা পাই, তাই দিয়া কোন রকম দিন চালাই আর হেনেই শুইয়া থাকি। এতো গেল জাকিয়ার গল্প, পাশেই শুয়ে আছেন একজন বয়স্ক লোক, নাম অনুকুল(৬০), সিরাজগঞ্জ এর কোন এলাকায়। নদী ভাঙ্গনে বাড়ি ঘর সব গেছে । ঢাকায় আইসা ছুট পুলাফাইন লইয়া, ওদের বড় করছেন, মানুষ করছেন। ওরা বিয়া সাদি করছে , সংসার হইছে, অতঃপর বউরা বের কইরা দিছে। শেষ আশ্রয় ফুটপাত। এরকম অসংখ্য কারনে মানুষ ফুটপাতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। ওদের অনেকেই একসময় হয়তো ভালই ছিলেন আজ নিয়তি টেনে এনেছে রাস্তায়।
সামাজিক ম‚ল্যবোধের অবক্ষয় , অর্থনৈতিক সংকট, নদী ভাঙ্গন, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও শহরে ভাল কাজের আশায় দেশের আনাচে কানাচে শহরের অলিতে গলিতে ছিন্নম‚ল মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। নগরায়নের ফলে গত কয়েক দশকে শহরের লোকসংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুন। ঢাকা শহর দেখলে বুঝা যায় , এ চিত্র কতখানি করুন।
পথ শিশুদের চিত্র আর ও ভয়াবহ । ২০০৫ সালের সমাজ সেবা অধিদপ্তরের এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের শতকরা ৪১ ভাগ শিশুর ঘুমানোর বিছানা নেই। ৪০ শতাংশ প্রতিদিন গোসল করে না। ৩৫ শতাংশই খোলা জায়গায় মল্মুত্র ত্যাগ করে। ৮৪ শতাংশ শিশুর শীত বস্ত্র নেই। ৫৪ শতাংশ শিশুর দেখার কেউ নেই। ৭৫ শতাংশ শিশু ডাক্তার দেখাতে পারে না। ( সুত্র- বিডিনিউজ২৪ডটকম, ৩রা নভেম্বর ২০২০)। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিস্তান বি আ ই ডি এসের জরিফ বলছে সারা দেশে পথ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এটা তো সেই ১৫ বছর আগের কথা। এই সময়ে এসে কেমন আছে পথ শিশু, তা কেবল তারাই বলতে পারবেন যারা ওদের নিয়ে কাজ করছেন। আর এই শিশু কিশোরদেরকে নানা ধরণের অপরাধ জনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করছে এক শ্রেণির মানুষ নামক প্রাণী।
যদিও সমাজসেবা অধিদফতর এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এসব বিষয় নিয়া নানা ধরনের পদক্ষেপ থাকার কথা, বাস্তবে এর কোন কিছু এ জাতি দেখেছে বলে মনে হয় না। আর কবে হবে , তা কেবল উনারাই জানেন। মোদ্দা কথা, ছিন্নম‚ল মানুষেরা এমনিতেই স্বাভাবিক জীবন যাত্রার সময় টিকে থাকতে পারেন ন। আর করোনা মহামারীতে ত্রাহি অবস্থা। কে নিবে ব্যাবস্থা, নাই কোন আস্থা। করোনা কি তা তারা জানেও না। জীবন ই যেখানে ঝুকিতে, স্বাস্থ্যবিধি তো কল্পনাতীত। সময় এসেছে এদের জন্য বসতি স্থাপনসহ সকল আধিকারের সুযোগ করে দেয়া, আর তা সদাশয় রাষ্ট্রকেই করতে হবে। আর তাই বলতে ইছা করছে-
” তবুও তো চলছে জীবন, জীবনের পথে
শত বঞ্ছনার, শত নিপীড়নের ব্যাথ মনোরথে “