| রবিবার, ০৬ জুন ২০২১ | প্রিন্ট | ২৪৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
পরিবার হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না
সৈয়দা শাহানাজ পারভীন
মানবজীবনে পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম।আর নানাবিধ কার্যাবলি সম্পাদন করে মানব জীবনকে অর্থবহ করে তোলে পরিবার। পরিবার মানব সমাজের মূল ভিত্তি।
পারিবারিক জীবন ব্যতিরেকে মানব সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। মানুষের অস্তিত্বের জন্য পারিবারিক জীবন অপরিহার্য। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, উন্নতি-অগ্রগতি ইত্যাদি সুষ্ঠু পারিবারিক ব্যবস্থার উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল।
সুতরাং আদর্শ সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত আদর্শ পরিবার গঠন। এই পরিবারের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
প্রাথমিক পর্যায়ে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও বর্তমান সময়ে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবার নিয়ে আমাদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবার হচ্ছে সমাজের মৌলিক প্রতিষ্ঠান, মৌলিক অর্থনৈতিক একক। সামাজিক অগ্রগতি ও জীবনমান উন্নয়নে সমাজ গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ আয়তনের তুলনায় জনবহুল দেশ। এজন্য পরিবার গঠন ও কর্ম বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবারের ভূমিকাও ভিন্ন ভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়।
পরিবারের কোনো একক রূপ বা নেই কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞা। তবে পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য যে বৈশিষ্ট্য সেটি হচ্ছে তার বৈচিত্র্য।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবারের গঠন ও অন্যান্য অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে।
ঐতিহাসিক ভাবেই সব সমাজ ও সংস্কৃতিতেই পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। একই সময় মুসলিম পরিবারের অবস্থা ছিল তার উল্টো। এ সময় মুসলমান পরিবারে নিজস্ব সম্পদের প্রতি মহিলাদের কর্তৃত্ব ছিল।
শিল্প বিপ্লব পরিবারের গঠনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। শিল্পায়ন ও নগরায়ন ভেঙে দেয় জমিদারি রাজত্ব এবং পরিবর্তন আনে জীবন ও কর্মক্ষেত্রে। বহু লোক বিশেষ করে তরুণরা গ্রামের ক্ষেত-খামার ছেড়ে শহরে বিভিন্ন কারখানায় কাজ নেয়। তখন বিশাল পরিবারে শুরু হয় বিচ্ছিন্নতা।
ক্রমে পুরুষ প্রধান পরিবারের প্রবেশ করে মহিলাদের কর্তৃত্ব। সমতার সম-অধিকারের হাওয়া বইতে শুরু করে পরিবারে পরিবারে। মহিলা শুধু ঘরের কাজ ও ছেলেমেয়েদের দেখবে আর পুরুষ শুধু আয় করবে, এ চর্চার অবসান নেমে আসে ধীরে ধীরে।
অনেক স্ত্রী ঘরের বাইরে আসে। যোগ দেয় নানা কাজে। পরিবারের গঠন,কর্মকাণ্ড,নেতৃত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। এবং
হারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক আনুষ্ঠানিক বিয়ে,বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ।
আধুনিক সমাজে সবই অনু পরিবার পিতামাতা ও সন্তানের এক সঙ্গে বসবাস। এ ধরনের পরিবারই এখন সব জায়গায়। নাগরিক সমাজে এ ধরনের পরিবারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
একাধিক যুগলের একত্রে বসবাসই একান্নবর্তী পরিবার ও এভাবে পরিবর্তনের ধারাবাহিক পরিবারের নতুন গঠন, জীবনযাত্রার এসেছে পরিবর্তন। যাতে পরিবার আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে একই সঙ্গে পরিবারের প্রত্যেকের অধিকার সামাজিক দায়িত্ত্ব বজায় থাকে সেক্ষেত্রেও সকলের ভূমিকা সমান রাখতে হবে।
সদস্যদের অধিকার হবে সমান, মর্যাদা হবে যথাযোগ্য। পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। বিদ্যমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিবেকবান ব্যক্তিগণ সমাজের অবক্ষয় রোধে ‘পারিবারিক বন্ধন’ মজবুত করতে সমাজের নিকট আহবান জানিয়ে চলছেন।
বর্তমানে পাশ্চাত্য সমাজ বস্তুবাদের রঙিন নেশায় বুঁদ হয়ে পরিবার প্রথাকে উপেক্ষা করেছে। ফলে আদর-স্নেহ, মায়া-মমতা বঞ্চিত বন্ধনহীন এসব শিশু-কিশোর যুবক-যুবতী তথা আপামর জনতা অবৈধ যৌনাচারসহ নানাবিধ অন্যায়-অপকর্মে জড়িয়ে পরেছে। ওপেন সংস্কৃতি ও ইভটিজিং সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যত্রতত্র অশালীন আড্ডা,মাদক,সন্ত্রাসের সয়লাব সর্বত্র। এ সকল কাজে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারের সাথে
মনোমালিন্য, চুরি-ডাকাতি ছিনতাই, কিডন্যাপ,খুন-খারাবী কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
অভিজাত এলাকাগুলোর পিতা-মাতা, যুবক-যুবতী সন্তানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ,তারা যেন সন্তানের নিকট এক ধরনের জিম্মি হয়ে আছেন। ঘরে ঘরে অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।
নিঃসন্দেহে পরিবার গুলোর অশান্তির প্রভাব সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যেন পিতামাতার মতই অসহায়! আর্থিক-নৈতিক-সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন সন্তান-গার্ডিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে।
অপরদিকে যুব সমাজের কল্যাণময় অবদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যক্তি,পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র! যে সকল যুবক-যুবতী উচ্ছৃঙ্খল অনৈতিক জীবন যাপন করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজে নানা সমস্যা সৃষ্টি করে চলছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে,তাদের অধিকাংশের পরিবারই উদাসীন,সন্তানের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করেন না। অন্ধস্নেহে সন্তানের কোন ভুলত্রুটি গার্ডিয়ানের চোখে ধরা পরে না।
দরিদ্র শ্রেণীর তো ‘নূন আনতে পান্তা ফুরায়’ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অশিক্ষা-কুশিক্ষায় এদের সন্তানরা ব্যাঙের ছাতার মত বেড়ে ওঠে। এ সন্তান একটু বড় হলেই রোজগারে লাগিয়ে দেয়। ফলে এই শ্রেণীর সন্তানদের মাঝেই অপরাধ প্রবণতাও স্বাভাবিক ভাবেই বেশি।
অপরদিকে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই মোটামুটি সমাজের বিবেকবান বা সচেতন সমাজ বলা যায়।
এসব পরিবারই এতদিন সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ভারসাম্য ধরে রেখেছিলেন। এ সকল পরিবারের অভিভাবকগণ সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি আদব-কায়দা,ভদ্রতা,শালীনতা,দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ নৈতিকতা ইত্যাদি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও যত্নের সাথে শিক্ষা দিয়ে থাকেন।
বাস্তব প্রেক্ষাপটে, প্রত্যেকেই কারো না কারো উপর দায়িত্বশীল। স্ব স্ব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে সমাজে এত সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
একজন পুরুষ তার পরিবার-পরিজনের কর্তা। একজন স্ত্রী লোক সেও তার স্বামীর বাড়িঘর,পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তুতির কর্ত্রী। অতএব প্রত্যেকেই কর্তা এবং প্রত্যেককেই সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। পরিবার বা ঘরই হল মানুষের প্রাথমিক বিদ্যালয় বা প্রকৃত শিক্ষালয়। এখানে যা শিখবে তাই সারাজীবন প্রতিফলিত হতে থাকবে।
বর্তমান সমাজের বিশৃঙ্খলা,নৈতিক অধঃপতন রুখতে হলে পরিবারকে
মজবুত বাঁধনে বাঁধতে হবে। স্বামী-স্ত্রী’র পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হতে হবে।
পারিবারিক বন্ধন হোক দৃঢ়ঃ মা,বাবা,ভাই,বোন,সন্তান-সন্ততি নিয়ে বসবাস করছে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ। একজনের সুখে অন্যজন সুখী হচ্ছে, একজনের দুঃখে কাঁদছে অন্যজন।
নিবিড় বন্ধন যেন গড়ে উঠেছে পরিবারের মধ্যে। একে অপরকে নানাভাবে সাহায্য করে। এরা অল্পতে খুশি থাকে। পরিবারের মধ্যে আমাদের খুবই নিবিড় বন্ধন একান্ত প্রয়োজন ভবিষ্যৎ প্রজন্মর জন্য।
তা না হলে আগামীর সফলতা অর্জনের পথ ব্যহত হবে।
এবং নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত হবে নিরাপদ জীবন থেকে।
জাতি হয়ে পড়বে অসহায়।
লেখক: কবি ও কলামিষ্ট