রাজধানী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট | ২৫৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহিত ছবি
বুড়িগঙ্গার তীরে চকবাজারে মোগল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন বড় কাটরা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় ২ নম্বর এবং আবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকার ৬৪ নম্বরে বড় কাটরা।
গত দুই মাস ধরে ফটকে তালা ঝুলিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী পুরাকীর্তিটি ভেঙে সাত তলা ভবন নির্মাণ করছিলেন স্থাপনাটির মালিক দাবি করা আলী হোসেন নামের একজন। রাজউক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কেউ এ বিষয়ে খবরই পায়নি। গত রোববার আরবান স্টাডি গ্রুপ (ইউএসজি) খবর পেয়ে চকবাজার থানায় জানায়। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মোঘল স্থাপনাটি ভাঙা বন্ধ করে সিলগালা করে দেয়।
জানা যায়, বড় কাটরার মূল স্থাপনার একটি অংশ (বড় কাটরা লেনের ১৫ নম্বর হোল্ডিং) ভাঙা হয়েছে। দোতলা স্থাপনাটি ভাঙা শুরু হয় গত জুলাইয়ে। বিষয়টি জেনে গত ৩১ জুলাই চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে ইউএসজি। এরপর কিছুদিন ভাঙার কাজ বন্ধ ছিল। ভবনটি আবার ভাঙা হচ্ছে বলে গত রোববার খবর পায় ইউএসজি। বিষয়টি চকবাজার থানায় জানানো হয়। তখন থানার পক্ষ থেকে কাজ বন্ধ করার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়। ওইদিন অভিযানে বড় কাটরায় দখলকৃত ২২টি দোকান সিলগালা করে সিটি করপোরেশন। এছাড়া একটি দখলকৃত সরাইখানা ভাঙা বন্ধ করে সিটি করপোরেশন।
ইউএসজি প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, ভাঙার সঙ্গে আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। তিনি নিজেকে স্থাপনার ওই অংশের মালিক বলে দাবি করছেন। এর আগে খবর পেয়ে চকবাজার থানায় জিডি করা হয়। এর পরেও ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে ভিতরে ভাঙার কাজ চলছিল।
গতকাল বুধবার দুপুরে পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত বড় কাটরা ও ছোট কাটরা পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেন, দেশের অন্যতম প্রাচীনতম ঐতিহ্যের নিদর্শন পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত বড় কাটরা ও ছোট কাটরা এখন শুধুই ইতিহাসের পাতায় বিরাজমান। দখল হতে হতে এখন এ ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলো খুঁজে পাওয়াটাই দায়। যতটুকু অবশিষ্ট আছে তা যেন আর দখলদাররা দখল না করতে পারে সে জন্য বড় কাটরা ও ছোট কাটরার পূর্ণ সংস্কার ও সংরক্ষণের কার্যক্রম আমরা হতে নিবো।
এ সময় তিনি বলেন, মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত আমাদের এ ঐতিহ্য দুটিকে সরকারিভাবেই দেখভাল করার কথা ছিল। এগুলো দেখভালের দায়িত্ব জেলা প্রশাসক, সিটি করপোরেশন, প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর অথবা গণপূর্ত অধিদপ্তরে ন্যস্ত হওয়ার কথা ছিল। এটা কোনোভাবে সরকারের বাইরে যাবার কথা ছিল না। কিন্তু এ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের উপলব্ধি সকলের মধ্যে না থাকার কারণে এগুলো এভাবে দখল হয়ে গেছে।
মেয়র বলেন, আমরা আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছি। কিছুদিন পূর্বে আমরা রূপলাল হাউসকে একটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দিয়েছি। তেমনভবে আমরা বড় কাটরা ও ছোট কাটরাকেও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রূপদান করব। আর এ কাটরাগুলো যারা দখল করে আছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পুরাকীর্তিটি এভাবে দখল হওয়ার পেছনে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায় আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বিভাগের মহাপরিচালক রতন চন্দ্র পণ্ডিত বলেন, এতে আমাদের কোনো অবহেলা ছিল না। বড় কাটরা ও ছোট কাটরা আমাদের ঐতিহ্যের নিদর্শন সংরক্ষণের গ্যাজেটভুক্ত। আমরা বিভিন্ন সময় এখানকার স্থানীয় পুলিশ বাহিনী দ্বারা চেষ্টা করেছি যেন দখল না হয়ে যায়। কিন্তু রাতের আঁধারে এগুলো দখল হয়ে গেছে। এই যে রাতের আঁধারে হওয়া দখল ঠেকাতে হলে স্থানীয় জনগণকে ঐতিহ্য রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ যদি প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত না থাকে এ ঐতিহ্য রক্ষায়, তাহলে এগুলো দখলমুক্ত রাখা কঠিন হয়ে যাবে। আমরা চাই, এখানকার জনগণ আমাদের কাজে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।
যে সরাইখানাটি ভাঙা বন্ধ করা হয়েছে তার মালিক দাবি করা আলী হোসেন বলেন, আমি ১৯৭৮ সালে এ বাড়িটি এক হিন্দু মালিকের কাছ থেকে কিনি। তিনি এই জমি ১৯৬৩ সালে কিনেছিলেন। আমার কাছে সকল ডকুমেন্টস আছে।
এ বাড়িটি কেন ভাঙা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়িটি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ২০০১ সালে আমাকে সিটি করপোরেশন থেকে চিঠি দেয়। কিন্তু তখন আমার কাছে বাড়ি ভাঙতে যে অর্থের প্রয়োজন তা চিল না। তাই ভাঙতে পারিনি। পরে ২০১৬ সালে আমাকে আবারও নোটিশ দেয়া হয় বাড়ি ভাঙার জন্য। এরপর বাড়ি ছেড়ে আমি অন্যখানে বসবাস শুরু করি। এতদিন বাড়িতে কেউ থাকত না। এখন বাড়িটি আমি ভাঙতে এলে আমাকে এভাবে বাধার সম্মুখীন হই।
তবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আঞ্চলিক সহকারী অথরাইজড অফিসার সুরত আলী সরকার বলেন, এ ধরনের ভবন ভেঙে কখনো নতুন করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় না। এ ধরনের ভবন ভাঙতে বিশেষ ছাড়পত্র পাওয়ার কথা না।
এদিকে, বড় কাটরার ৮৩ শতাংশ জমির বেশিরভাগই ওয়াকফ্ নিয়ে জমিয়া হোসাইনিয়া আসরাফুল বড় কাটরা মাদরাসা নামে একটি মাদরাসা পরিচালিত হয়ে আসছে ১৯৩১ সাল থেকে। মাদরাসাটি বড় কাটরা ভবনের বেশিরভাগ অংশজুড়ে পরিচালিত হচ্ছে।