তাওহিদা জাহান | সোমবার, ১১ মার্চ ২০২৪ | প্রিন্ট | ৫৫৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সুমি ইসলাম রচিত এক টুকরো মেঘ উপন্যাসটি আমি আদ্যোপান্ত পাঠ করেছি। এই উপন্যাসের রচয়িতা বাংলা সাহিত্যে নবীন। তবে ইতোমধ্যে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে।
এক টুকরো মেঘ লেখকের উপন্যাস হলেও এটিতে তিনি বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বলে আমি মনে করি। প্রথমত, এই উপন্যাসের নামকরণের প্রসঙ্গে আসা যাক। উপন্যাসটি মেঘ নামক অটিজমে আক্রান্ত একজন বিশেষ শিশুর জন্ম ও জীবনকাহিনিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। মেঘ এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র না হলেও কাহিনির বিস্তার ও উপসংহারে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ফলে ‘এক টুকরো মেঘ’-এই নামের মধ্য দিয়ে লেখক মেঘকে আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের সঙ্গে তুলনা করে আলংকারিক রূপকতা দান করেছেন। আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘ যেমন সবার মনে এক ধরনের পবিত্র ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে সবার কাছে আকর্ষণীয় ও কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে, এই উপন্যাসের বিশেষ শিশু মেঘও একইভাবে পবিত্র ও স্বর্গীয় চেতনাদ্যোতক। মেঘ নামক এই বিশেষ শিশুটি কিছুতেই সমাজের কাছে অচ্যুত বা ফেলনা নয়, বরং মেঘের মতোই পবিত্র, সুন্দর ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নামকরণের মধ্য দিয়ে সেই লেখক আমাদের কাছে সেই বার্তাটিই দিতে চেয়েছেন। তাই সব মিলিয়ে বলা যায়, এই নামকরণের মধ্য দিয়ে লেখক পাঠককে এক ধরনের চমৎকারিত্ব উপহার দিয়েছেন।
এই উপন্যাসের গ্রন্থনা ও কাহিনিবিন্যাসের ক্ষেত্রেও লেখক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। উপন্যাসটির সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব হচ্ছে, এর কাহিনি পাঠককে টেনে ধরে রাখে। এর বিস্তারটি এমনইভাবে এগিয়েছে যে, শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাঠক নিবিষ্টচিত্তে পাঠ করে যায়। এতে বুঝা যায়, এই উপন্যাসে একটি নিটোল ও আকর্ষণীয় কাহিনি আছে যা যেকোনো উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আমরা জানি যে, উপন্যাস হচ্ছে যেকোনো সমাজের চলতি ঘটনাপ্রবাহের এক ধরনের আখ্যানগত রূপান্তর যার মধ্য দিয়ে সেই সমাজের সমকালীনতা এবং সমকালের নানা অনুষঙ্গের চিত্র ফুটে ওঠে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এক টুকরো মেঘ বিশেষ গুরুত্ববাহী। কারণ এই উপন্যাসটিতে রূপায়িত হয়ে উঠেছে অটিজমে আক্রান্ত মেঘ নামক এক বিশেষ শিশুর দুঃখময় জীবনের বর্ণনা যা বর্তমান বাংলাদেশের এক অনিবার্য বাস্তবতাও বটে। এছাড়া লেখক এতে সার্থকভাবে চিত্রিত করেছেন মেঘ নামের একটি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু সম্পর্কে এই সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, মেঘকে লালনপালনে বাবা আবিরসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রচ- অনীহা এবং এর ফলে শিশুটির মা তিথির দুঃখময় এবং কষ্টচর্চিত জীবনপাত। মূলত শিশু মেঘকে নিয়ে তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও বেদনা উপন্যাসটিকে অন্য ধরনের সৌন্দর্য ও মহিমা দান করেছে। এই উপন্যাসে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে যে, সমাজে বিশেষ শিশুদের এক নির্ভরতা, আশ্রয়স্থল ও পরম মমতার নাম হচ্ছে জননী যে তাকে গর্ভে ধারণ করে। সমাজের অন্য সবার কাছে বিশেষ শিশুরা ঘৃণা ও বঞ্চনার শিকার হলেও একমাত্র জন্মদাত্রী মাতাই তাকে সমাজের কাছে মূল্যবান মানব সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
সবমিলিয়ে এক টুকরো মেঘ উপন্যাসটি বেশ সুখপাঠ্য ও একটি ব্যতিক্রমী কাহিনিনির্ভর গ্রন্থ যা পাঠককে এক ধরনের ভিন্ন স্বাদ এনে দেবে বলে মনে করি। আমি এই উপন্যসটির বহুল প্রচার কামনা করছি।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।