| মঙ্গলবার, ০৪ মার্চ ২০২৫ | প্রিন্ট | ১৯৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
লাবণ্য পূজা’র ভ্রমণ গল্প ’চিম্বুক পাহাড়ের পরীরা’
জীবনের যাঁতাকল থেকে একটুকু ফাঁক পেলে বা ফাঁক না পেলে ফাঁক বের করে নিয়ে ব্যাগ কাঁধে হাওয়া হয়ে যাওয়া আমার অভ্যেস। টার্ম পরীক্ষার পর ছুটি হবে কি হবে না;হলেও ঠিক কত দিনের হতে পারে – এসব চিন্তায় যখন বাকি সবাই ব্যস্ত ততক্ষনে আমরা ক’জন টইটই বন্ধু মিলে “তূর্না নিশিথা”ট্রেনে চেপে পগাড় পার।উদ্দেশ্য-বান্দরবান!
কত শত ঘটন-অঘটনের সাক্ষী হয়ে সে রাত্রে বান্দরবন হোটেলে গিয়ে উঠলাম সে গল্প বলতে গেলে আরেক মহাভারত রচিত হয়ে যাবে। তবে মেঘ ধরতে পরদিন একদম ভোরে “চান্দের গাড়ি” করে আমাদের আট জনের দলটি যখন রওনা দিলাম,উত্তেজনা আর শান্ত পরিবেশ আমাদের পূর্বশ্রান্তি পূর্বক্লান্তি সব যেন ভুলিয়ে দিল। সাঁ সাঁ করে ছুটছে আমাদের গাড়ি পাহাড় কাটা খাড়া রাস্তা দিয়ে। গাড়ি তো নয়,যেন রকেটে উঠেছি।কান কেটে বয়ে যাচ্ছে ঠান্ডা বাতাস।কিছুক্ষনের মধ্যে কেমন কুয়াশায় ঢেকে এল পথ। ঠোঁট,নাকের মাথা আর চোখের পাঁপড়িতে জমতে শুরু করলো জলবিন্দু।কিছুক্ষনের মধ্যে বুঝলাম,এ তো কুয়াশা নয় গো! এ যে মেঘ!গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে দুপাশ দিয়ে যাচ্ছে পেঁজা তুলো মেঘ। আর সেই মেঘের ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে, অবাক নেশা কাটতে না কাটতেই গাড়ি থামল। সকাল ৭:৩০। চোখের সামনে চিম্বুক পাহাড়!!
চিম্বুক পাহাড়ের প্রেমে পড়েছি আমি।ছিমছাম,সুন্দর পাহাড়;কোলে কাঁখে এত লজ্জাবতী গাছ।ধরলেই নুইয়ে নিচ্ছে নিজেকে। মেঘ দিয়ে শাড়ি পরে আছে; ঘন কুয়াশার মত মেঘ, কিন্তু আরেকটু যেন হালকা। বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ মোবাইলে মুহূর্তবন্দী করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। হঠাৎ পথ কেটে গেল সবুজ চিকন সাপ।ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। পিছ থেকে কেউ একজন বললো ও ঢোঁড়াসাপ। বিষ নেই।তাও রাস্তার ধারে থেকে এক বড়ো ডাল কুড়িয়ে নিয়ে তাতে ভর দিয়ে উঠতে লাগলাম পাহাড়ে।আরাম ও হলো,অস্ত্র ও হলো!!
পাহাড়ের চূড়ায় এক কুটির আছে। এখানে দেখা হল দুই মিশ্রিদানা ছোট্ট পরীর সাথে,মারি-মারফি।
মারি বড়। সাড়ে চার বছর। ও বেশ লাজুক। প্রথমে দেখেই দৌড় ভয়ে দরজার পিছে গিয়ে ওর মায়ের পরনের থামির আড়ালে একদম ভ্যা কান্না। মারফি ছোট্টটা,তিন বছর হবে-সে তার দিদির কান্না দেখেই হোক আর আমাদের বেশভুষা দেখেই হোক;হেসে কুটিকুটি হচ্ছিল নিঃশব্দে। ও জানালার ফাঁক দিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে আবার আমাকে ইশারায় ডাক দিল। যাই হোক ওদের সাথে ভাব হতে বেশি সময় লাগলো না। আমার হাত ধরে দুই বোনে ছুটে ছুটে আধো আধো বোলে চিনিয়ে দিতে থাকলো যে উপর থেকে দেখে কী করে বুঝবো কোনটা নাফ নদী আর কোনটা চাঁটগার সীমানা!!
পাহাড়ের পাদদেশে ডলি দিদির ছোট্ট সাজানো দোকান।দিদিকে ছবি তুলব বলতেই রাজি হয়ে গেল।ডলি দিদি এত সুন্দর আর এত সরল। দিদির সাথে গল্প করে মজা পেলাম। দিদি বললো উনি মারমা; আর দাদা নাকি চাকমা।তারপরও তারা একসাথে ঘর বেঁধেছেন চিম্বুক পাহাড়ের কোলে। দাদা নাকি দিদিকে অনেক ভালোবাসেন। ভালো যে উনারা বেশ আছেন তা দিদির মুখের হাসি আর গোলাপি আভা দেখেই বুঝতে বাকি রইলো না।…….
পাহাড়ের মানুষের জীবন যেমন সরল;ওরা নিজেরাও তেমনি ভারি সরল। এই প্রকৃতির সারল্য ওরাই সত্যিকারে ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমাকে -আপনাকে ওখানে সত্যিই মানায়না। “এখানে তোক মানাইছেনাই গো;এক্কিবারে মানাইছেনাই গো।। ”
-: লেখক পেশায় একজন চিকিৎসক:-