| বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট | ২৮৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
উছিলা
#
আজো ভুলে গেছি উঠোনে ভাত ছিটাতে।
কাকরা রাজনীতি বোঝে না। তাদেরকে কেউ হয়তো বোঝায় নি– রাজনীতি করলে রাজা পাওয়া যায়। আর রাজা পেলে নিজ দেশে পরবাসী হয় প্রজা।
ঈশা খাঁ শীর্ষক জাতীয় বীর পদক প্রদান অনুষ্ঠানে কাচের তলোয়ারের আজকাল দারুণ কদর। সাইরেন বেজে ওঠে পান থেকে চুন খসলেই। পুতুলনাচের ইতিকথা ভুলে এইসব অভিজ্ঞান অনেকে সুগন্ধি তেজপাতা চিনতেও ব্যবহার করে থাকতে পারে।
তেমন সূত্র ধ’রে তোমাকে বলি নি, পাশের বাসার ডাকপিয়নটাই শৈশবে প্রথম আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে আঙুলের দাগ গুণে মারবেলের হিসেব রাখতে হয়। বানানে কাঁচা– এই উছিলায় কতদিন আমাকে লেখো না চিঠি। আর আমিও সস্তা হাততালি পেতে রুমাল থেকে কবুতর বানানোর ম্যাজিকটা শিখে নিতে শুধু অবহেলাই করে গেলাম।
ইশতেহার
#
শেখ সাদির নিতল পদাবলি কে আমাকে পাঠাল সবুজ নদীর মোড়কে ভরদুপুরে?
ভুলে গেছি– কীভাবে কলাপাতার করতলে বিছিয়ে রাখতে হয় নদী।
কতটা পুঁথিতে গড়া একটি পরমাত্মীয় মালা শঙ্খমালার কন্ঠ থেকে শুকতারার মতো প্রচ্ছন্ন হয় না? পর্যটনপ্রিয় এই আমি তো একদিন তোমার অঙ্গুরির মতো তোমার মাঝে নিত্য লীন হতে চেয়েছিলাম।
নদীমাত্রিক জমিনে মৃত দৈত্যদের দ্বিত্ব আত্মা মাপতে গিয়ে আনুবিস কখনো ভুল ক’রে বসে না তো?
বালির চাকচিক্যে বোনা নদীর নির্ভুল করিডোরে বেগুনি আভা কচুরি ফুল হয়ে ফোটে।
হৃদয় কর্তৃক শোণিতে উচ্চারিত ইশতিহারের একান্ত শব্দগুলো হায়ারোগ্লফিক্স হতে পারে না। যেমন ধানফুলের প্রফুল্লতা নিয়ে অচেনা আতরের সুগন্ধে মুখরিত মহুয়ার বন।
গঙ্গাহৃদিজুড়ে
#
ভারি চশমার অকপট স্বীকারোক্তিকে পুঁজি করে আত্মবিশ্বাসী বৃদ্ধ ভুলে থাকে একটি সুঠাম ছড়ির অভাব। নকল নেকাবের মতো জীর্ণ কুয়াশা সদ্যজাত রোদের নখে ছিন্নভিন্ন হতে বাকি। সারাবেলা আমাকে পথে ঘাটে মাঠে তাড়া করে বেড়াল তেলনুনের কামনার্ত সংশ্লেষে জন্ম-নেয়া একটা হুলুস্থুল শীৎকার ।
পেশাদার শৃগাল তো নিরীহ শিকার ভেবে খরগোশকে তাড়া করবেই। আঙুল-ফুলে ধর্মান্তরিত কলাগাছের বিভিন্ন প্রজাতির নাম সন্ধান করতে গিয়ে মনে হল– আমার প্ড়ার ঘরটা সুপ্রাচীনকালে লয়প্রাপ্ত ভূগর্ভস্থ কোনো সভ্যতার নিদর্শন। মটরশুঁটির পাতা থেকে কাঁপনের ক্ষরণ চুয়ে পড়লেই বাঁশির সুরে হরণ ডানা মেলে লু হাওয়ার আল্লাদে। ত্রিজগৎ বয়ে-বেড়ানো উটের নিষ্কণ্টক কুঁজের তরঙ্গ খুলে কে গুণবে তৃষ্ণার সুবিবেচনা? এক-চিবুক ক্রোধ নিয়ে লাল মোরগটা আজো প্রতিবাদ করল– কেন ইশকুলে পড়ানো হয় না পাখিদের শ্লোক! অভিবাদন তুলতুলে মিষ্টি কোনো কাঠবেড়ালি? গঙ্গাহৃদিজুড়ে পাঁচডোরা কাঠবিড়ালির বিনম্র পরিক্রমা? ওরকম চনমনে সাগ্রহ প্রত্যাশা কে-না পোষে বিস্মরণ-দগ্ধ চিন্তনে!
খনার বচন থেকে উঠে-আসা আনচান আওড়াতে-আওড়াতে কনিষ্ঠ বর্ষা কুমারপাড়া হয়ে ভুবনডাঙা স্টেশনের দিকে বাঁক নিল। একেকটি কদম লাবণ্য হয়ে ফুটেছে। এর মধ্যে নাইওর এসে হাজির কামনাদের বাড়ি। আঁশহীন আশ্বাসবাণী চিতল-অভিপ্রায়ে চেতনার নিতল সরসীতে খেলা করে। আশার প্রদীপ সুহৃদ ছবির মতো দীর্ঘায়ু হলেও, নানান জাতের রাজপথে বেড়ে-ওঠা ধুলোরা জানতে পারে না চিত্রার পাড়ে গোধূলি-উৎসব কত স্বর্গীয়!
পরিভাষা
#
স্পর্ধা কি জ্বালাময়ী বল্লমের পরিভাষা? অবহেলিত কোনো দাম্ভিক মন্ত্র বিড়বিড় স্বরে খুচরো কচুরিপানাদের কণ্ঠে বেজে উঠেছিল জলের জ্বলন্ত তাগিদে।
সমরখন্দের উচ্ছ্বাসে-আঁকা একটি বিকেল ঝুপ করে নেমে এসেছে বলেই, কদবেল-বৃক্ষের ক্রন্দন থেকে অমসৃণ বেদনাটা নারকেল পাতাদের থুতনি ছুঁয়ে দ্বীপান্তরিত হল।
মঙ্গলকাব্যের নাব্য মগ্নতায় সনির্বন্ধ কে কাকে বলে ম্যাজিকওয়ালা? দিনমান নাগরদোলার দ্যোতনাতে চেপে বদলে যায় দোরের ঘর, ঘরের বাড়ি, বাড়ির জন, জনের মুখে বিচ্ছুরিত আবহাওয়া-পূর্বাভাস।
দীর্ঘশ্বাস-উছলানো জামবাটির মতো খাঁখাঁ দিঘি ঝুম বৃষ্টির অপেক্ষা করছে পরিপূর্ণতা পাওয়ার আশায়।
গাঁয়ে ডাকাত-পড়ার আতঙ্কে আগের মতো ঘনীভূত হয় না রাত। আঁধার পোহালেও কাকলীরা সুরেলা শিসে কুলুপ এঁটে নীড়ে শীতঘুম দেবে? কলস থেকে ছলকে-পড়া জলে আচমন করতে গিয়ে দেখি– তোমার হাতে মগ্ন এক রুমাল; তাতে লেখা, ‘ভুলো না আমায়!’
বেলা-অবেলায় গঙ্গা থেকে ভলগার দূরত্বে প্রবাল হয়ে-যাওয়া ইতিহাসগুলো আজ প্রবল উল্লাসে রাতের বাতাসে তারা হয়ে উড়ে গেল কিছুটা সময়ের জন্যে।
ভাঁটফুলের লোপাট হয়ে-যাওয়া খানিক কমনীয়তা খুঁজে পাওয়া যাবেই অনুজ ফড়িঙের নিপাট ডানায়। কে সেই জন– ঝড়ো হাওয়ার সংকেত পেতেই মুহ্যমান শুঁড়িখানার বাগান থেকে সকল চন্দ্রমল্লিকা চুরি করে নিয়ে গেছে?
লাবণ্য
#
নির্লিপ্ত খড়কুটোর মহিমাতে যে-স্বর্ণমুদ্রা ডহর সিন্দুকের অন্দরে চিরায়ু হয়, সে কী করে বুঝবে জোছনা আর অমাবস্যার পার্থক্য?
কখনো কি শুনেছ– ম্রিয়মাণ মেঘের আত্মিক মেধারা পুরোহিতবেশে আসন্ন রোদের আগমন-জপে ব্যস্ত? কিংবা প্রতিটি আগমনই যেন জ্বরে-পুড়ে-যাওয়া প্রতীক্ষার শৃঙ্গারে চূড়ান্ত পরিণতি অনুসন্ধান করে!
প্রতীক্ষাকে চণ্ডিদাস আর কালের মায়াকে রজকিনী বলে যেই ভাবা, অমনি মনে হল– বহুদিন দুপুরতান্ত্রিকভাবে দেখি নি জোড়াশালিক।
পাশে পড়ে থাকল পৃথিবীর মুখ। পুনর্ভবার পহর, পহরের পুনর্ভবা হৃদপিণ্ডে লুটোপুটি খেতে থাকে। ঝিঙেমাচাটার কোলঘেঁষে শালিকদের পায়চারি। কাছে যেতেই দেখি ওদের হলুদ ঠ্যাঙ আরো বেশি লাবণ্যে হয়েছে সুচারু। নদীতে জল-আনতে-যাওয়া নববধূটার কাচা হলুদ রঙের শাড়িটার স্নিগ্ধতাকেও হার মানায় যেন সে-লাবণ্য।
গোলাপি ফুলের মতো লাবণ্যময় বেলারা শ্বাস নেয় অনাত্মীয় হাওয়ার হাঁপরে।
দ্বিধান্বিত দূরে কোথাও ঘণ্টাধ্বনি বাজছে। ছায়ানটবাসী ঘাসদের জানা আছে– এমন সময় কীভাবে গুচ্ছগুচ্ছ শ্যামল তীব্রতাকে নজরদারি করতে হয়।
কচ্ছপরা এর মধ্যে নির্ভরযোগ্য সঙ্কেত পেয়ে গেছে। জলধির তীরঘেঁষে ডিম পেড়ে যায় ঝাঁকেঝাঁকে।
বায়োস্কোপ
#
যে-পথ গেছে চলে মানস সরোবরে
আমিও সেই পথে খুঁজব অরণিকে
আলোর অক্ষর বাস্পীভূত হল
তালপাতাতে বেলা ভাগ্য রাখে লিখে।
বটের বিস্তৃতি বৃষ্টি-জ্বরে পোড়ে
পাতকী শূন্যতা মেলুক পারাবত
পাকদণ্ডী বেয়ে বায়োস্কোপ দেখি–
বিদেহী স্নানে রত কাচের সৈকত।
ঝরাপাতার ঝড়ে চৈত্র নেচে ওঠে
বলেছ, ‘হতে পারো বাড়িগ্রস্ত তবে!’
সাগর চুয়ে বাড়ে নোনতা সংসার
দখিনে গিয়েছিলে? আছ তো অনুভবে।
বাতাসে রোদ্রের ছড়ানো পোড়াদাগ!
ক্ষরণে প্রাণ পায় গোলাপ অপরূপ?
অস্তিত্বহীন চরকি-অভ্যাসে
মস্তিষ্কে ধূ ধূ মেঘের স্তূপ।
দেবীরা নশ্বর নাগরদোলা চেপে
চিরুনি গুণেগুণে নামতা মনে রাখে
নিঃসঙ্গ কোনো কাকাতুয়ার গাঁয়ে
ছায়ার প্রচ্ছায়া মোরগফুল আঁকে।
দু’ কাঁধে দু’ বেণীতে সাজত অন্নদা
ফুলেল ছাই ওড়ে ললিত পাকঘরে!
কতটা দূরে গেলে লেখা না কেউ চিঠি?
পর্যটনে থাকি কেবলি ডাকঘরে।
#
অনিরুদ্ধ আলম (Anirudha Alam) পেশাগত জীবনে একজন ফ্রিল্যান্স উন্নয়নকর্মসূচি কন্সালটেন্ট এবং উন্নয়ন-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি এ পর্যন্ত পঞ্চাশটিরও অধিক বই লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: সোনালি নৈঃশব্দ্যের হরিণাবলি (কবিতা), প্রেম কি কেবলি পাখিপ্রবণ (কবিতা), ভালবাসা প্রিয়তমাসু (কবিতা), অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ঘুমিয়ে পড়ার আগে (কিশোর কবিতা), ২৪ অক্টোবর ১৯৭১ (উপন্যাসিকা), এইসব রাতদিন (কিশোর কবিতা), দূরের ডাক (ছড়া-কবিতা), তারপর তারপর (ছড়া), সকলের জন্যে পরিবেশ পরিবেশের জন্যে সকলে (ছড়ানাটিকা), পিঁপড়ে (সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস), অপারেশন ক্যালপি বত্রিশ (সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস), এবং ক্রিনোর অপেক্ষায় (সায়েন্স ফিকশন), তেইশশত দুই সালের এক জানুয়ারি (ছোটো গল্প), দু’ শ’ বছরের সেরা বাংলা কিশোর গল্প (সম্পাদিত গল্পের সংকলন), তোমাদের জন্যে বাংলা বানান (শিশুকিশোরদের জন্যে বাংলা বানান সংক্রান্ত বই), আমাদের কালো মানিক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (জীবনী)।