শনিবার ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
উই আর নট বাঙ্গালি, উই আর বাংলাদেশী- কুলাউড়ায় এমপি শওকতুল ইসলাম দেশের আকাশে চাঁদ দেখা গেছে, ঈদ ২৮ মে শ্রীমঙ্গলকে যানজট ও মাদকমুক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত মহাখালী টার্মিনালে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ এক সপ্তাহের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচার শেষ হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিডল্যান্ড ব্যাংকের সঙ্গে কনকর্ড ডায়াগনস্টিকস ও ইডব্লিউ ভিলা মেডিকার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সবুজ অর্থনীতির পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ: প্রধানমন্ত্রী প্রাইম ব্যাংকের নতুন সিইও ফয়সাল রহমান শ্রীমঙ্গলে একদিনে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু আধুনিক কারিকুলাম ছাড়া টেক্সটাইল শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়: বাণিজ্যমন্ত্রী
Advertise with us

প্রকৃতির বিচারটা কেউ এড়াতে পারে না

অনলাইন ডেস্ক:   |   রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১   |   প্রিন্ট   |   ১৭৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

Default Image

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রকৃতির বিচারটা কেউ এড়াতে পারে না। খুব কঠিন হয় সে বিচার। এতটা কঠিন যেটা কঠিনের ভিতরটাকে আরও আহত করে ক্ষতবিক্ষত করে। সেটা দেখার জন্য প্রতীক্ষা করতে হয়। অনেকটা প্রতীক্ষা। যেখানে সময় এসে প্রকৃতির সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। সে সময়টা এতটাই কঠিন হয় যা কঠিনকে ভেঙে খণ্ডিত বিখণ্ডিত করে দেয়। প্রকৃতির বিচারটা খুব নীরবে, নিঃশব্দে হয়। সব মানুষ সে বিচারের ফলাফলটা বুঝতে পারে না। প্রকৃতি সেটা মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে বলতে চায় না।

প্রকৃতি মানুষকে আগে তৈরি করে, সময়কে চেনাতে চেনাতে মানুষকে একটা শূন্যতার জায়গায় টেনে নিয়ে যায়। তারপর সময় সেটা মানুষকে একসময় জানিয়ে দেয়। তখন হয়তো সেটা ইতিহাস। কিংবা একখণ্ড মমি। পাপের মুখোশটা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়, ধসে পড়ে জনপদের পরে জনপদ মানবিক মূল্যবোধ। পাপের পরিণতির আগে প্রকৃতি পাপীদের পরীক্ষা নেয়। সে পরীক্ষাটা মানুষের পরীক্ষার চেয়ে অনেক কঠিন হয়। সেটা জীবনের পরীক্ষা, যা তিলে তিলে পাপীদের আঘাত করে। অনুশোচনার কঠিন আগুনে দগ্ধ করে। প্রতিদিন তাদের পুড়িয়ে পুড়িয়ে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার নগ্ন দেহটাকে তাদের সামনে ব্যবচ্ছেদ করে। এভাবে অনেক দিন ধরে প্রকৃতি তাদের অবিচারের বিচারটা করতে থাকে, যা একদিন চূড়ান্ত হয়। সেখানে মানুষের পৃথিবীর মতো আইন-আদালত থাকে না। পক্ষ-বিপক্ষ থাকে না। সেখানে ঠাঁই কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্রকৃতি। ক্রমাগত বোবা কান্নাকে চেপে রাখা প্রকৃতি সরব হয়। প্রকৃতির অদৃশ্য মানসপটে ভেসে উঠে বিদীর্ণ মহাকাল।

সময়টা ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব। এথেন্সের আদালতে হাজির হলো সক্রেটিসকে। যুবকদের পথচ্যুত করা এবং প্রচলিত ধর্মের অবমাননার অভিযোগ আনা হলো তার বিরুদ্ধে। অথচ এই অভিযোগগুলো ছিল ভিত্তিহীন। একটা অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি অথচ নিজেকে মাছির সাথে তুলনা করতেন। নিজেকে ছোট করে ভাবতে শিখেছিলেন বলেই হয়তো এতো বড় মাপের মানুষ হয়েছেন।
গ্রীক দর্শনের জন্মদাতা ছিলেন তিনি। সে দর্শন আর গ্রীক দর্শন থাকেনি বরং তা কালক্রমে বিশ্বজনীন দর্শনে পরিণত হয়েছে। তিনি জানতেন তিনি কোনো অপরাধ করেননি কিন্তু তাকে অপরাধী বানানো হয়েছে। কারণ একটাই ঈর্ষা, অহংকার, বিদ্বেষ। তিনি যে তার প্রতিভার শক্তিতে রাজাদের রাজাদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। সম্রাটদের সম্রাটদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। সৃজনশীল চিন্তার সাথে ক্ষমতা কি কখনো পেরে উঠেছে। কখনোই পারেনি। ক্ষমতাধর মানুষরা ইতিহাসে টিকে থাকে না, সৃষ্টিশীল মানুষরাই টিকে থাকে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতির অমোঘ বিধান।

আদালতে দাঁড়িয়ে অসঙ্কোচিত চিত্তে সক্রেটিস বললেন, “এথেন্সের মানুষ, আমি তোমাদের শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। কিন্তু তারচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ ঈশ্বরের প্রতি। যতক্ষণ জীবন ও সামর্থ্য আছে, দর্শন চর্চা এবং শিক্ষাদান থেকে কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। কখনো বদলাবো না আমার এই পথ। যদি বহুবার মৃত্যুবরণ করতে হয়, তবুও না।”

বন্দি করা হলো সক্রেটিসকে। হেমলক পানে মৃত্যুদণ্ডের সাজার ঘোষণা এলো। মানুষের পৃথিবীর প্রহসনের বিচার ছিল সেটা। প্রকৃতি নীরবে কেঁদেছে, গুমরে গুমরে মরেছে। আছাড়ি বিছারি খেয়েছে। তারপরও কিছু বলেনি সে সময়। কারণ প্রকৃতি অপেক্ষা করে। অপেক্ষার পর অপেক্ষা করে। তারপর সবার অলক্ষ্যে একদিন ফুঁসে উঠে। প্রকৃতি তার মতো বিচার করে। কারাগার থেকে সক্রেটিস ইচ্ছা করলে পালতে পারতেন। তা তিনি করেননি। তাহলে যে মিথ্যে সত্য হয়ে যেত, সত্য মিথ্যে হয়ে যেত। কখনো কখনো সত্যের জন্য মরতে হয়। প্রকৃতির বিচারটা খুব অদ্ভুত এখানেই। যারা সেদিন সক্রেটিসকে অপরাধী বানিয়েছিল, সময়কে সাথে নিয়ে প্রকৃতি তাদের অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত করেছে। প্রকৃতি সে অপরাধীদের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলেছে আর মৃত্যুঞ্জয়ী কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে সক্রেটিসকে। ভাবা যায় কত বছর আগের ঘটনা। মানুষ ভাবে সময় যত ক্ষেপণ করা যাবে মানুষ তত বিষয়টিকে ভুলে যাবে। এটা মানুষের ভুল ধারণা। প্রকৃতি সব সময় জেগে থাকে।

মার্কিন লেখক ও ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন একটা কথা প্রায় বলতেন, ‘যদি তুমি রাস্তা থেকে কোনো ক্ষুধার্ত কুকুরকে বাড়িতে নিয়ে যাও এবং লালন-পালন করো, তবে কুকুরটি কখনো তোমাকে কামড়াবে না। এটাই হলো মানুষ ও কুকুরের মধ্যে পার্থক্য।’

মার্ক টোয়েন প্রকৃতিকে খুব গভীর জীবনবোধ থেকে দেখেছিলেন, যা তাকে প্রকৃতির মতো ভাবতে শিখিয়েছে। মানুষ তো আর মানুষ নেই। মানুষের এখন দেশের প্রতি মায়া নেই। মমতা, ভালোবাসা নেই। মানুষ এখন প্রকৃতির মতো করে পৃথিবীকে দেখে না। মানুষ পৃথিবীকে দেখে তার স্বার্থের মতো করে। আপনজনের টান মানুষকে কাঁদায় না। কারণ মানুষ যে প্রকৃতির কাছে উদারতার শিক্ষাটা নিতে পারে না। সেটা নেওয়ার মতো যে একটা বড় মন থাকতে হয়, সেটাও তো মানুষের নেই। না আছে মানুষের বিবেক, না আছে আবেগ। সব যেন ভেঙেচুরে ওলটপালট হয়ে গেছে। মানুষভাবে প্রকৃতি তারা ফাঁকি দিবে। প্রকৃতির সাথে লুকোচুরি খেলবে। কানামাছি খেলবে। অথচ মানুষ জানেনা প্রকৃতি লুকিয়ে লুকিয়ে সবকিছু দেখে। মানুষ যত না বড় খেলোয়াড় প্রকৃতি তার থেকে আরো অনেক বড় খেলোয়াড়। অথচ বোকা মানুষ নিজেদের চালাক ভাবে প্রকৃতিকে বোকা বানাতে চায়।

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, প্রকৃতির গভীরে তাকাও তাহলে তুমি সবকিছু আরও ভালাে করে বুঝতে পারবে। সে তাকানোটা বোধ হয় মানুষের আর কোনোদিন হয়ে উঠে না। মানুষ যদি প্রকৃতির গভীরে ঢুকতে পারতো তবে প্রকৃতি মানুষের ভিতর মনুষ্যত্বের রস ভরে দিতো। মানুষকে অদেখা পৃথিবীর সন্ধান দিতো। তখন মানুষ ছোট থেকে ছোট জীবনের স্পন্দনগুলো খোঁজ পেতো। সেই বোধটা হয়ে উঠতো পৃথিবীর বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মতো। মানুষ শিল্পী হতো, ছবি আঁকতো কল্পনায় প্রকৃতির বুকে, যেখানে প্রকৃতি মানুষকে তার অদেখা জীবনকে দেখানোর জন্য অভূতপূর্ব শক্তি গড়ে দিতো। প্রকৃতি, প্রেম ও একাকিত্বের কবি মহাদেব সাহা প্রকৃতিকে উপলব্ধি করেছেন জীবনের মর্মবাণী দিয়ে। যেমন তিনি বলেছেন, আমার জীবন আমি লিখে রেখে যাবো, স্বপ্নের খাতায়, সমুদ্র সৈকতে, অশ্রুজলে-ধোয়া প্রেমিকের জীবনপঞ্জিতে। প্রকৃতি মানুষকে কেবল তার যাপিত জীবনের সময়কে দেখায় না বরং মৃত্যুর পরের জীবনকেও দেখায়। যারা প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তারা সে জীবনটাকে কখনো দেখতে পায় না।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’ কবিতায় খুব গভীর বেদনাবোধ নিয়ে বলেছেন, ‘আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি-তার ভেতরের কুকুরটা দেখব বলে।’ প্রকৃতি আমাদের মধ্যে এমন বোধশক্তি গড়ে তুলুক। প্রকৃতি এমন একটা শক্ত মাটির মতো মনের কাছে এসে দাঁড়াক। বদলে ফেলুক মানুষ। জাগিয়ে তুলুক মানবিক মূল্যবোধের শহর। যেখানে পাপ, পাপী, অপরাধ, অপরাধী সবটাই এক সমীকরণে এসে বলবে, ‘অশুভ চিন্তা হারিয়ে যাক, শুভ চিন্তা বেঁচে থাক।’ সব অপরাধ পাপ নয়, সব পাপ অপরাধ নয়। দর্শনটা যে কারো হতে পারে। তবে প্রকৃতির দর্শন আর সময়ের মনস্তত্ব দেখার গভীরতা মানুষের মধ্যে থাকতে হয় । প্রকৃতি সব জানে, সব দেখে, সব বুঝে। প্রকৃতি কখনো কাঁদে, কখনো হাসে, কখনো বেঁচে উঠে। কিন্তু কখনো মরে যায় না। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। প্রকৃতি সে ধ্বংস স্তুপের ভিতর থেকে আবার নতুন করে জেগে উঠে পৃথিবীকে চমকিত করে। যারা এটা বুঝে তারা টিকে যায় আর যারা বুঝেনা তারা হারিয়ে যায়।

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার প্রায় বলতেন, প্রকৃতির একটা সূর আছে, অনেকেই তা শুনতে পায়। সেটা কান দিয়ে শোনা যায় না, সেটা জীবনের টুকরো টুকরো অন্ধকারের কারাবন্দি মনের উপর আলো ফেলে শুনতে হয়। জীবনকে সূর্যের তীব্র আলোয় পুড়িয়ে শুনতে হয়। কারণ তখন গিটার, দোতারা আর বেহালার সুর প্রকৃতির সুরের সাথে মিশে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। আর রেখে যায় কিছু প্রশ্ন। যার কোনো উত্তর থাকে না। কারণ সব প্রশ্নের উত্তর থাকতে নেই। সূত্র: বাংলাদশে প্রতিদিন

Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office