বৃহস্পতিবার ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us
ইজারা না দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে যাচ্ছে এলাকাবাসী

কুলাউড়ার বড়ছড়া থেকে অবাধে সিলিকা বালু উত্তোলন

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   |   বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

কুলাউড়ার বড়ছড়া থেকে অবাধে সিলিকা বালু উত্তোলন

এক গাড়ি সিলিকা বালুর মূল্য ১৭-১৮ হাজার টাকা। বছরের পর বছর থেকে সরকারিভাবে ইজারা না দেয়ার কারণে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এই মূল্যবান সিলিকা বালু হরিলুট করে আসছে ম্যালাদিন থেকে। বর্তমানে ওই মূল্যবান বালু উত্তোলন বন্ধ ও নতুন করে ইজারা না দেয়া এবং উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আন্দোলনে যাচ্ছে এলাকাবাসী। পরিবেশ বিপর্যয় রক্ষা এবং এলাকার একমাত্র প্রাকৃতিক এই জলাধারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আগামী ২৪ মে বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সামনে পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সর্বস্তরের সাধারণ জনগণের যৌথ উদ্যোগে এক প্রতিবাদী মানববন্ধন কর্মসূচি করা হবে বলে জানান আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল মুকসিদ চৌধুরী। এদিকে বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে স্থানীয় এলাকার শত শত লোকজনের স্বাক্ষরিত একটি স্বারকলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দেয়া হয়েছে।

 

জানা গেছে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ‘বড়ছড়া’ থেকে সরকারিভাবে ইজারা বন্ধ থাকার পরও স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট চক্র রাতের আধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জনজীবন হুমকির মুখে রয়েছে। স্থানীয় লোকদের অভিযোগ, রাজিব উদ্দিন নামে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি ছড়া থেকে রাতের অন্ধকারে বালু উত্তোলন করে তা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

 

গত ১২ মে কুলাউড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তারের সভাপতিত্বে ‘সিলিকা বালুর কোয়ারির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় সরকারি নীতিমালা ও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে কোয়ারিগুলো ইজারা দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় বক্তারা বলেন, মৌলভীবাজারে ৫২টি সিলিকা বালুর কোয়ারি থেকে অবাধে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বড়ছড়াসহ অন্য এলাকায় অবস্থিত দেওছড়া, বোবাছড়া ও ঘাগড়াছড়া কোয়ারি থেকে রাতের আধারে বালু পাচার হচ্ছে। এসব বালু মহাল নিয়মিত ইজারা দেওয়া হলে সরকার প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করতো। তবে চারটি মহালের মধ্যে বড়ছড়া সহ দুটি কোয়ারি নিয়ে বর্তমানে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। মতবিনিময় সভায় বড়ছড়া বালু ইজারা দেয়ার বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসায় বরমচাল ইউনিয়নে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরমচালের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ এই বড়ছড়া থেকে নির্বিচারে সিলিকা বালু উত্তোলনের ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পূর্বে পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় আওয়ামীলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবাধে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করতো। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বড়ছড়ার ওপর নির্মিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং বোরো চাষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি সুইচ গেট। বালু উত্তোলনের ফলে সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় এগুলো এখন কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা রেললাইন ও সিলেট-ব্রাহ্মণবাজার সড়কের ওপর নির্মিত সেতু যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার লোকদের অভিযোগ, বরমচাল ইউনিয়ন পরিষদের ৪,৫,৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রানু বেগমের ছেলে রাজিব উদ্দিনের নেতৃত্বে শক্ত একটি সিন্ডিকেট চক্র বড়ছড়া থেকে রাতের আধারে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ট্র্যাক গাড়ি প্রতি সিলিকা বালু বিক্রি করা হয় ১৭-১৮ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিনিয়ত ট্র্যাক, রিকশা, ভ্যান দিয়ে রাতের আধারে লক্ষ লক্ষ টাকার বালু বিক্রি চলছে। এই রাজিবের মাধ্যমে বালু বিক্রির টাকার ভাগ দেয়া হয় স্থানীয় পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, যদি পূর্বের আইনি জটিলতা কাটিয়ে নতুন করে বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে বড় ছড়ার দুই তীরের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলো চরম হুমকির মুখে পতিত হবে।

 

অভিযোগের বিষয়ে রাজিব উদ্দিন মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, অতীতে এই বড়ছড়া থেকে আওয়ামীলীগের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা অবাধে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন। আমি বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নই। এলাকার একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমার সামাজিক মান মর্যাদা নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তবে এটা ঠিক স্থানীয় অনেক লোক তাদের বসতবাড়ির প্রয়োজনে বালু উত্তোলন করছেন।

 

বরমচাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খোরশেদ আহমদ খান সুইট বলেন, অতীতে এই বড়ছড়া থেকে একাধিকবার বালু জব্দ করিয়েছি কিন্তু পরে জব্দকৃত বালুও লুট হয়ে যায়। বর্তমানে রাতের আধারে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট চক্র বড়ছড়া থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

 

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিছুল ইসলাম বলেন, বড়ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্থানীয় লোকজন আমাদের জানিয়েছেন। খুব শীঘ্রই অভিযান চালিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, গত ১২ মে ‘সিলিকা বালুর কোয়ারির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বড়ছড়ার বালু ইজারার বিষয়ে প্রশাসনের মতামত চাওয়া হয়। আমরা জানিয়েছি, বড়ছড়া নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান আছে। এটি ইজারা দিতে হলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, এলাকার লোকজন ও স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কোন ক্ষতি হবে কিনা সেটি যাচাইয়ের জন্য পরামর্শ দিয়েছি। বর্তমানে বড়ছড়ার বালু ইজারা দেয়ার কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি রিটের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত কুলাউড়ার বড়ছড়াসহ মৌলভীবাজারের ১৯টি সিলিকা বালু মহালের ইজারার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, যথাযথ পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) এবং পরিবেশ ছাড়পত্র (ইসিসি) ছাড়া কোনোভাবেই বালু উত্তোলন করা যাবেনা।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office