সারাদেশ ডেস্ক | রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট | ১০১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের জাঙ্গালিয়া এলাকা। সড়কের দুই পাশে চুনতি অভয়ারণ্যের গহিন বন। বিপজ্জনক বাঁকের কারণে এই অংশ দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে মহাসড়কের এই অংশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করেছে কর্তৃপক্ষের অপরিকল্পিত উন্নয়নকাজ। মহাসড়কের এই অংশে নতুন পিচ ঢালাই করা হয়েছে। কিন্তু সড়কের পাশে ফুটপাত তৈরি করা হয়নি, পিচের সমান করে সড়কের দুই পাশে মাটি বা ঢালাই দেওয়া হয়নি। ফলে এক পাশ মূল সড়ক থেকে এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত নিচু হয়ে গেছে। বড় গাড়িগুলো যখন অন্য গাড়িকে সাইড দিতে যায় বা ওভারটেক করে, তখন সড়ক থেকে গাড়ির চাকা পড়ে যায় মাটিতে, এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে, ঝরে যায় তাজা প্রাণ। মহাসড়কে মরণ ঢেকে আনা এই উন্নয়নকাজের কোনো অর্থ খুঁজে পান না যানবাহন চালকরা।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া অংশে একইরকম ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক রয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার। দোহাজারী সড়ক ও জনপদ বিভাগের অধীনে কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক থেকে চুনতি জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কে ফুটপাত না থাকা ও অসমান পিচ ঢালাই দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১১ নভেম্বর শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি হাজীরাস্তা এলাকায় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পিকনিক বাসের দুই যাত্রী নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা ধারণা করছেন, বাসের চাকা মূল সড়ক থেকে ছিটকে পড়ায় বাসচালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগান। এ রকম দুর্ঘটনা কিছুদিন পরপর ঘটছে লোহাগাড়া অংশে।
গাড়িচালক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘চলন্ত অবস্থায় বোঝা যায় না সড়কের ফুটপাত অংশ কোথায় সমান বা কোথায় অসমান। ফলে চাকা ছিটকে পড়লে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। এ ছাড়া ওভারটেক করার সময় বিপরীতমুখী গাড়ি হঠাৎ করে সামনে পড়ে গেলে ফুটপাত অংশে নামিয়ে দিতে হয়। রাস্তার সঙ্গে ফুটপাত অসম থাকায় গাড়ি উল্টে যায়।’
দোহাজারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লাইন প্রকল্পের সমীক্ষা চলছে। যার কারণে অন্য কোনো প্রকল্প আপাতত গ্রহণ করা যাচ্ছে না। ফলে মহাসড়ের দুই পাশ অসমান থাকলেও সেখানে ফুটপাত তৈরি করা যাচ্ছে না।’
স্থানীয় সমাজকর্মী রেজাউল হক রেজা বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লাইন করার প্রকল্প। কবে, কখন হচ্ছে তারও কোনো খবর নেই। আশার বাণী শুনতে শুনতে ক্লান্ত দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী। পর্যটননগরী কক্সবাজার ও বান্দরবান যাওয়ার এটি একমাত্র সড়ক হলেও ফাইলবন্দি হয়ে আছে চার লাইন প্রকল্প। মহাসড়কটি প্রশস্ত না হওয়ায় এবং দুই পাশে অসমান থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্টদের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।’
সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক প্রতি বছর বর্ষায় গর্তের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছরই সংস্কার হয়। সংস্কারের ফলে মূল সড়কের উচ্চতা বেড়েছে। ফলে মূল সড়কের দুই পাশ নিচু হয়ে গেছে। মূল সড়ক সংস্কারের পর দুই পাশের অসমান অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করেনি কর্তৃপক্ষ। এতে মহাসড়কের দুই পাশের অসমান অংশ হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক। প্রায় সময় ঘটছে দুর্ঘটনা।’
জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মইজ্যারটেক থেকে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকা পর্যন্ত ৬৬ কিলোমিটার পর্যন্ত দেখভাল করে দোহাজারী সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। ভারী যানবাহন চলাচল ও বৃষ্টির কারণে প্রতিবছর মহাসড়কের সিংহভাগ অংশে সংস্কার প্রয়োজন হয়। এতে নতুন করে কার্পেটিংয়ের ফলে দুই পাশ থেকে মহাসড়কের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের মূল অংশের চেয়ে দুই পাশ প্রায় দেড় থেকে দুই ফুট পর্যন্ত নিচু। মূল সড়কে উঠা-নামার দুই পাশের অসমান অংশই হয়ে উঠেছে বিপদজ্জনক। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ ছোট যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ছে বেশি। অনেক সময় মালবোঝাই ভারী যানবাহনও মূল সড়কের দুই পাশের অসমান অংশের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়।
আজিজনগর এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী শফিউল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দুই লেনের হওয়ায় একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গেলে মূল সড়কে আর জায়গা থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে মূল সড়ক থেকে নেমে যেতে হয়। মহাসড়কের উচ্চতা বৃদ্ধি ও দুই পাশ নিচু হওয়ায় মোটরসাইকেলসহ অন্য ছোট যানবাহন মূল সড়কে উঠানামার সময় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে।’
নিরাপদ সড়ক চাই লোহাগাড়া শাখার সভাপতি মোজাহিদ হোছাইন সাগর বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত না হওয়ায় অপ্রশস্ততার কারণে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। এরমধ্যে প্রতিবছর মহাসড়কের মূল অংশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মহাসড়কের দুই পাশে অসমান অংশ নিচু হয়ে পড়ছে। ফলে প্রায় সময় ঘটছে দুর্ঘটনা। মূল সড়কের দুই পাশের অসমান অংশ ভরাট করে দেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন বলেন, ‘মূল সড়কের দুই পাশে মাটি না থাকায় দুর্ঘটনা হচ্ছে। অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল মূল সড়ক থেকে চাকা সরে পড়তেই উল্টে যায়। ভারী যানবাহনও উল্টে যায় এতে পথচারীদেরও মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে।’
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি খাঁন মোহাম্মদ এরফান বলেন, ‘আমি যোগদান করেছি সবেমাত্র। এ মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় চার জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। সড়কের দুই পাশে ফুটপাত ভরাট না হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে-এটা সত্যি।’