শিরোনাম
সোমবার থেকে কাঁচামরিচ আমদানির কার্যক্রম শুরু হবে: কৃষিমন্ত্রী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে মিলবে ৫ শতাংশ করছাড়: এনবিআর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ সদস্যদের আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবিতে শ্রীমঙ্গলে মানববন্ধন হাকালুকি হাওরে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় হাজারো মানুষের ঢল শাহ আমানতে ৪২৭ গ্রাম সোনাসহ ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে চিকিৎসকদের : ভূমিমন্ত্রী চক্রান্ত না করে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন : তথ্যমন্ত্রী বিজিএমইএ’র নতুন মহাসচিব হিসেবে যোগ দিলেন ড. সাহেদুল ইসলাম ব্যাংকারের প্রধান দায়িত্ব আমানতের নিরাপত্তা দেওয়া: বিকেবি চেয়ারম্যান

আবুল কালাম আজাদ-এর উপন্যাস ‘ছায়া বৃক্ষের দিবারাত্রি’

  |   মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর ২০২১   |   প্রিন্ট   |   ১৭৪৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

Default Image

উপন্যাস

‘ছায়া বৃক্ষের দিবারাত্রি’
আবুল কালাম আজাদ

প্রকাশের কথা:
বইটি পড়ে আমি অনেক অজনা তথ্য জানতে পেরেছি। তাই আমার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ করার উদ্যেগ নিয়েছি। সবাইকে পড়ার অনুরোধ রইলো।

লেখকের কথা:
মোবাইল, ইন্টারনেটের এই যুগে খুব কম সংখ্যক মানুষ বই পড়ে। তবু লেখা থেমে থাকবে না। নতুন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। লেখক বই লেখবে, কম সংখ্যক মানুষ হলেও বই পড়বে, আমাদের ছোট বেলায় দেখেছি, পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার ছিল। মানুষ পাঠাগারের সদস্য হত, পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়ত। এখন সেই প্রথা প্রায় উঠেই গেছে। তখন আমরা একে অপরকে বই উপহার দিতাম। পাঠক সমাজের কাছে আমার অনুরোধ রইলো, আপনার সন্তানের হাতে মোবাইল না দিয়ে গল্পের বই দিন। প্রিয়জনকে বই উপহার দিন। বই হোক সবার নিত্য সঙ্গী। যা হউক ছায়া বৃক্ষের দিবারাত্রি বইটি করনা কালের অফিস ছুটিতে লিখেছিলাম। পাঠক সমাজ বইখানা পড়লে আমার কষ্ট ও পরিশ্রম সার্থক হবে। বই খানা লিখতে গিয়ে অনেক ইতিহাস, তথ্য ও উপাত্ত, সংগ্রহ করতে হয়েছিল। কিছুটা আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতা, আমার কলিগ এবং অন্যন্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি, তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ ।
সহযোগিতায়:
সুবর্না, পপি, জাকির, তমাল, তৌসিফ, নজরুল ভাই, তানভীর হাসান।

যাদের নামে বইটি উৎসর্গ করলাম:
মা-বাবা, নানা-নানু, দাদা-দাদু, বাবুল ভাই, এরাদ মামা, রাজ্জাক মামা ও এনাম মামা।

লেখক পরিচিতি:
আবুল কালাম আজাদ ১৯৬৬ সালের ৪ঠা জুন ফেনীর দাগন ভূঞাঁ উপজেলার দক্ষিন আলীপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম প্রভাষক ইঞ্জিনিয়ার আবুল খায়ের। (মিরপুর জার্মান পলিটেকনিক্যাল) মায়ের নাম রোশনের জাহান বেগম। ছমি ভূঞাঁর হাট ও মিরপুর প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা, দাগন ভূঞাঁ কামাল আতাতুর্ক হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ফেনী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও চৌমুহনী কলেজ থেকে ¯œাতক শিক্ষা লাভ করেন। ছোট বেলা থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। মূলত: পঞ্চম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় প্রধান শিক্ষক বাবু ফনিভূষন মজুমদারের পরিচালনায় পন্ডিত আবুল ফজল রচিত ‘ঈমান’ নাটিকার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদার্পন। এর পর যোগ দেন দাগভূঞাঁ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ কালান্তর গোষ্ঠী ও জহুর হোসেন চৌধুরী’ পাঠাগারে। এ সময় তিনি ফেনী জেলার অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এডভোকেট জয়নাল আবেদীন (জয়নাল ভাই) এর সান্নিধ্যে আসেন। তাঁরই নেতৃত্বে তাৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ¯ৈ^রাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে ব্রিটিশ মালিকনাধীন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ‘ডানকান ব্রাদার্স’ এর চা বাগান, শমশের নগর চা বাগানে হিসাব সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। ছায়াবৃক্ষের দিবা রাত্রি উপন্যাসটি মূলত: চা বাগানের খেটে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষদের নিয়ে রচিত। এছাড়া তার রচিত ‘একাত্তর এর এই বাংলা’ ও ‘চৈতন্য’ নামে আরও দুইটি গল্প ও নাটক প্রকাশিত হয়েছে। লেখক একজন অভিনয় শিল্পী ও নাট্যকার। তার রচিত ও অভিনীত একাত্তরের এই বাংলা নাটক দক্ষিণ আলীপুর নাট্যমঞ্চে মঞ্চস্ত: হয়। এছাড়াও ২০০৩ সালে সিলেট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত, সিলেটের খ্যাতিমান নাট্যকর মীর লিয়াকত আলী রচিত, “ঐশ্বর্য্য সাংস্কৃতিক সংগঠন” এর পরিবেশনায় ‘সুরমা’ নাটকেও অভিনয় করেন। অবসর কাটে লেখা লেখি ও বই পড়ে। আস্ত
প্রিয় ব্যক্তিত্ব ‘হযরত ওমর (রা:)। প্রিয় বই ‘অসামাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। প্রিয় উপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্রপাধ্যায়। প্রিয় শিল্পী চিত্রাসিং ও অলকা। জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ও স্মরনীয় মূহুর্ত, ৮২ সালে ২৪ শে ডিসেম্বর তৎকালীন তুরুস্কের প্রেসিডেন্ট কেনান এভরাহান কামাল আতাতূৃর্ক হাই স্কুল পরিদর্শনে এলে তার সাথে করমর্দন।
ছায়া বৃক্ষের দিবা রাত্রি বইটি তার তৃতীয় প্রকাশিত বই। এছাড়া প্রকাশের অপেক্ষায় আছে ছায়া বৃক্ষের দিবা রাত্রি-২। নিঝুম দীপান্তর, লাভ স্টোরী -১৯৩০ ও ফেলে আসা স্মৃতি।
াাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাাা
‘ছায়া বৃক্ষের দিবারাত্রি’

ট্রেন যখন শমশের নগর ষ্টেশনে পৌঁছালো তখন সকাল ৬টা। অবশ্য দেড় ঘন্টা আগে পৌঁছানের কথা ছিল, কিন্তু ঢাকা থেকে ছাড়তেই বিলম্ব হয়েছে। আসাদ ট্রেন থেকে নামলো। মফ¯^লের ছোট্ট ষ্টেশন। কয়েক জন কুলির হাক ডাক। কমসংখ্যক যাত্রী উঠা নামা করলো। সকাল হয়ে গেছে।সূর্য পূর্ব দিগন্তে লাল আভা ছাড়িয়েছে। আসাদ ষ্টেশন পেরিয়ে রিকশা ষ্টেন্ডে আসতেই কয়েকজন রিকশাওয়ালা সম¯^রে ডেকে উঠলো, ‘বাবু কোথায় যাবেন?’ এর মধ্যে ১৫/১৬ বছরের একটা রিকশাওয়ালা ছেলে এগিয়ে এসে বললো ‘বাবু কোথায় যাবেন?’
আসাদ বললো, ‘ওসমান নগর চা বাগানে যাবো।’
‘আমি যাবো, ‘ আমার বাড়ী ওসমান নগর চা বাগানে।’
আসাদ ছেলেটার রিকশায় উঠে পড়লো। ষ্টেশন পেরিয়ে শমশের নগর বাজার। বাজারে এখনও দোকান পাঠ খোলেনি। রিকশাওয়ালা আসাদকে নিয়ে ওসমান নগরের দিকে রওয়ানা দিল। সূর্য তখন উঠে গেছে। সারারাত ট্রেনে আসাদের ঘুম হয়নি। একটু ক্লান্তি ভাব। রেল স্টেশন থেকে ওসমান নগর চা বাগানের দুরুত্ব প্রায় দেড় কি.মি.। বাজার পেরিয়ে পাহাড়ী ু উঁচুনীচু রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সবুজ চা বাগান। অবশ্য এর আগেও সে এই জনপদে একবার এসেছিল। তখন এসেছিল চা বাগানে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য। আজ এসেছে চা বাগানের চাকুরিতে জয়েন্ট করার জন্য। রাস্তার দুপাশে উঁচু চা গাছের সারি। তার মধ্যে রিকশা চলছে। বড় বড় ছায়া বৃক্ষগুলো ছোট চা গাছগুলোকে পরম যতেœ আগলে রেখেছে। মনে নানা ভাবনা উকি দিচ্ছে। নতুন জনপদ, নতুন মানুষ,তাদের সাথে এ্যাডজাষ্ট করে থাকতে হবে। হঠাৎ রিকশা ওয়ালা ছেলেটার কথায় তার ভাবনা ভঙ্গ হলো।
‘বাবু কার বাসায় যাবেন ?’
‘না কারও বাসায় যাবো না, তুমি আমাকে অফিসের সামনে নিয়ে যাও।’
‘তোমার বাড়ি?’
‘ ওসমান নগর চা বাগানে।’
‘বাগানে তোমার কে কে আছে?
‘মা, বাবা ও ছোট একটা বোন ।’
‘তোমার নাম?’
‘অজিত।’
‘বাবা কি করে ?’
‘বাগানে কাজ করে।’
‘ও আচ্ছা।’
রিকশাওয়ালা ছেলেটা একটু চঞ্চল প্রকৃতির সে আবার জিজ্ঞেস করলো ,
‘বাবু অফিসে কোন বাবুর কাছে যাবেন?’
‘তুমি সব বাবুকে চেনো?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি অফিস বড় বাবুর কাছে যাবো।’
‘অজিত হাসি দিয়ে বললো, ‘বড় বাবুর কাছে যাবেন, আপনি আগে বলবেন তো।’ একটু পরেই রিকশা অফিসের গেইটের সামনে এসে থামলো । বিশাল লোহার গেইট। ওপরে ইংরেজিতে লেখা আছে ওসমান নগর ‘টী এসটেট্। আসাদ রিকশা থেকে নেমে, ভাড়া পরিশোধ করে সিকিউরিটি পোস্টে গেল। পিছনে অজিত যেয়ে বললো, ‘উনি বড় বাবুর কাছে যাবেন।’ সিকিউরিটি গেট খুলে দিল। আসাদ গেট পেরিয়ে অফিসে প্রবেশ করলো।’
সকালের চা বাগানের অফিস কোলাহলপূর্ণ থাকে। সকাল সাড়ে ৬ টা থেকে অফিস শুরু হয়। সর্দার, বাবু, ছোট সাহেব সবাই মিলে সারা দিনের কাজের প্রোগ্রাম ঠিক করে । শ্রমিকরা আসে তাদের নানা রকম সমস্যা নিয়ে, কারো রেশন এর সমস্যা, কারো ঘরের সমস্যা ইত্যাদি। আসাদ অফিসে ঢুকে অফিস চৌকিদারকে জিজ্ঞেস করলো,
‘বড় বাবুর রুম কোনটা?’
লোকটা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, ‘ঐ যে, ঐ রুমটা।’
এপয়েন্টমেন্ট লেটার – এ অফিসে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। আসাদ বড়বাবুর রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো।
দরজার সামনে থেকে বললো ‘আসতে পারি?’
‘আসুন।’
বড়বাবুর রুমে আরও ৪/৫ জন ছিল। আসাদ ঢুকে পড়লো। মাথায় টাক, ফর্সা, বয়স ৫০ এর মতো হবে। চোখে পাওয়ার চশমা । ভদ্রলোক আসাদের দিকে তাকালো, আসাদ সালাম দিল।
‘কি চাই?’
‘জ্বী আমি ইমরুল কায়েস আসাদ।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা। ’
তারপর বড় বাবু একটু হেসে বললো,‘বড় সাহেব আপনার কথা আমাকে বলেছেন,আমি তো আপনার অপেক্ষায় আছি। আজকে তো আপনার জয়েনিং ডেইট।’ বলে আসাদকে বসতে বললেন।
বড়বাবু আবার বলতে লাগলেন, ‘নিশ্চয়ই ট্রেনে এসেছেন।’
‘জ্বী।’
পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো?’
‘না।’
বাগানের অফিস বড়বাবু, টিলা বড় বাবু, গুদাম বড় বাবু ও ফ্যাক্টরি বড় বাবু খুবই গুরুত্বপূর্ণ পোষ্ট। ২০/২৫ বৎসরের অভিজ্ঞতা না হলে কেউ বড় বাবু হতে পারে না । এই বড় বাবুদের দিয়ে বড় সাহেব, ছোট সাহেব বাগান পরিচালনা করেন। এদের সহযোগিতা করেন অন্যান্য বাবু ও সর্দাররা ।
বড় বাবু আবার আসাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি একটু বসুন, আমি হাতের কাজটা সেরে নেই।’
বড় বাবু তার হাতের কাজ সেরে আসাদকে নিয়ে, বড় সাহেবের রুমে ঢুকলেন। বড় সাহেবের রুমে তখন কেউ নেই । বিশাল বড় রুম। ভিতরের দেওয়ালে অনেক তৈলচিত্র। চোখে চশমা, ফর্সা, লম্বা গড়ন, গায়ে সাদা হাফ প্যান্ট পরিহিত বড় সাহেব বড় বাবুর দিকে তাকালো।
‘বড় বাবু কিছু বলবেন ?’
‘স্যার, আমাদের নতুন বাবু’। আজ তার জয়েনিং ডেইট- বলে আসাদকে দেখিয়ে দিল।
আসাদ সালাম দিল, বড় সাহেব গম্ভীর মুখে আসাদকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি’
‘ইমরুল কায়েস আসাদ।’
‘বড় বাবু আপনি ওনার জয়েনিং রিপোর্ট টা নিয়ে নিন।’ আর আমাদের আমল বাবু যে কাজগুলো করে, সেগুলো ওনাকে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তারপর বড় সাহেব আসাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসাদ, আপতত: আপনার বাসস্থানের একটু সমস্যা হতে পারে।’
বড় সাহেব কলিং বেল চাপলেন। অফিস চৌকিদার এলো।
বড় সাহেব বললেন, ‘ওলিবাবুকে আসতে বল।’
এই ওলিবাবুও বাগানের গুরুত্বপূর্ণ বাবু। পদে ষ্টোর বাবু, এর বাইরে কোম্পানী চেয়ারম্যান সাহেবের বাংলো, বড় সাহেবের বাংলো এবং সব সাহেবের বাংলোর মার্কেটিং এর কাজ এই ওলি বাবুকে দেখতে হয়। সাহেব, বাবু ও শ্রমিকদের কাছে এই ওলিবাবু জনপ্রিয় মানুষ। ভালো কাজের জন্যে কোম্পানীর হেড অফিসের চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে ধন্যবাদপত্র ও পেয়েছেন।একটু পরেই ওলি বাবু এলো। হাসি খুশি মুখ, মুখে যেন সব সময় হাসি লেগেই আছে।
বড় সাহেব বললেন, ‘ওলি বাবু।’
‘ জী স্যার।’
‘ ওলি বাবু আমাদের নতুন বাবু, ইমরুল কায়েস আসাদ, আপাতত: আপনার বাসায় থাকবে, কোন অসুবিধা হবে? ’
‘ না স্যার।’
‘ঠিক আছে এখনতো নাস্তার সময় হয়ে গেছে। ওনাকে উপস্থিত সব বাবুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন এবং আপনার বাসায় নিয়ে যান।’
‘জী স্যার।’
বড় সাহেব তার আসন থেকে উঠে পড়লো, এখন বাংলোয় যাবেন। বড় বাবু, ওলি বাবু ও আসাদ, বড় সাহেবের রুম থেকে বেরিয়ে এলো । বড় বাবু আসাদকে নিয়ে উপস্থিত সব বাবুদের সাথে একে একে পরিচয় করে দিলেন।
জয়েনিং রিপোর্ট ও পরিচয় পর্ব শেষে ওলি বাবু ও আসাদ অফিস থেকে বের হলো।ওলি বাবু একটু আগে, পিছনে আসাদ, একটু মিটি হেসে ওলি বাবু বললো, বাসায় চলুন।’ বলে সামনে গ্যারেজের দিকে গেল। বিশাল গ্যারেজে স্তরে স্তরে গাড়ি সাজানো । বড় সাহেব ছোট সাহেবেদের গাড়ী বাবুদের মোটর সাইকেল- বাই সাইকেল।
ওলি বাবু মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে আসাদকে উঠতে বললেন।
আসাদ বললো, ‘ওলি ভাই বাসা কত দূরে।’
‘এই তো মিনিট পাঁচেকের পথ, হাঁটলে ১০ মিনিট লাগবে।’
একটু পরেই বাসার সামনে এসে তারা পোঁছালো। বাসার সামনে বিশাল খেলার মাঠ। মাঠের চারিদিকে স্টাফ কোয়াটার। ওলি বাবু ও আসাদ মোটর সাইকেল থেকে নামলো এবং বাসার আঙিনায় ঢুকলো। বাসার সামনে বারান্দা। বারান্দা পেরিয়ে ড্রয়িং রুম। সাজানো গোছালো বিশাল ড্রয়িং রুম, ওলিবাবু আসাদকে সোফায় বসতে বলে ভিতরে গেল।
একটু পরেই ওলি বাবু তার স্ত্রী মায়াকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকলো।
ওলি বাবু বললো,‘ উনি আমাদের নতুন বাবু, নাম আসাদ।’
আসাদ মায়াকে সালাম দিল।
মায়া বললো, ‘আপনার দেশের বাড়ী?’
‘কালিয়াকৈর।’
‘ আমাদের বাড়ী গাজীপুর’
আসাদ বললো ‘ গাজীপুর! গাজীপুরে কোথায়?’
‘ চালনা’
একটু পরেই মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ভর্তি বয়স্ক একটা লোক নাস্তা নিয়ে এলো। রুটি, ডিম, মামলেট, সবজি ভাজি।
ওলি বাবু বললো, ‘ নিন শুরু করুন।’
‘খেতে খেতে আসাদ বললো, দেশের বাড়ী যান?’
‘না তেমন যাওয়া হয়না।’
‘বাগানই চাকুরী করলে বাগানই বাড়ী হয়ে যায়। তা ছাড়া নির্দিষ্ট দ্বায়িত্ব ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু দ্বায়িত্ব আমাকে পালন করতে হয়।’
আসাদ বললো, ‘সে কি রকম?’
‘যেমন আমি ষ্টোর বাবু, কিন্তু এ ছাড়াও কো¤পানী মার্কেটিং এর সমস্ত দ্বায়িত্ব আমাকে দেখতে হয় । তা ছাড়া সাহেবেদের বাংলোগুলোর ভালো মন্দ আমাকেই দেখতে হয়।’
একটু পরেই চা এলো। আসাদ চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,
‘কয়টা বাংলো।’
‘ মেইন গার্ডেন ফাঁড়ি বাগান সব মিলিয়ে ১০ টা বাংলো আছে।’
‘এত বাংলো!’
হ্যাঁ, ১০ বাংলোয় ১০ জন সাহেব থাকেন। এর মধ্যে একটা ইঞ্জিনিয়ার বাংলো, একটা ডাক্তার বাংলো, বড় সাহেবের বাংলো, একটা কো¤পানী সাহেবের বাংলো। চা- নাস্তা শেষে ওলি বাবু আসাদকে, পাশের এক রুমে নিয়ে গিয়ে বললো,
‘এই আপনার আপাততঃ থাকার রুম। এখানে অবশ্য আরও দুইজন বাবু থাকেন, একজন কো¤পানীর রাবার প্রজেক্টে আছেন। অন্যজন গলফ্ কোর্স প্রজেক্টে আছে।’
আসাদ দেখলো রুমটা বেশ বড়। তিনটা খাট সাজানো আছে। ওলীবাবু আসাদের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এটা আপনার সিট,বাসা না পাওয়া পর্যন্ত আপাতত: এখানেই থাকবেন। কোন অসুবিধা হবে?’
‘না কোন অসুবিধা হবে না, আমি একা মানুষ বরং ভালোই হলো আরও দুজন সঙ্গী পেলাম।’
‘তা ওনারা কোথায়?’
‘ এখনও টিলায়।’
‘ নাস্তা করতে আসেন নি?’
‘ না এখনও আসেন নি। বোধ হয় ছোট সাহেবের সাথে টিলায় কাজে ব্যস্ত আছে’। ওলি বাবু বলতে না বলতেই দুজন মধ্য বয়সী লোক রুমের ভিতরে ঢুকলো।
ওলিবাবু বললো, ঐ যে, ‘ওরা এসে গেছে।’
একজনের বয়স ৩৭/৩৮ বয়স হবে। অন্য জনের বয়স ৪০/৪১ হবে। দুজনের পরনে হাফপ্যন্ট,গায়ে টি শার্ট, পায়ে সাদা কেডস্। ঘর্মাক্ত ক্লান্ত দেহে তারা সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়লো । তাদের একজনের নাম তোহা অন্য জনের নাম মোস্তাক।
ওলিবাŸু নিজেই উঠে ফোনের স্পীডটা বাড়িয়ে দিল। তারপর তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে একটু মিটি মিটি হেসে বললো, ‘ওনার নাম আসাদ, আমাদের নতুন বাবু, আজকে জয়েন্ট করেছে আপাতত: আপনাদের সাথে থাকবে।’
আসাদ সালাম দিল এবং হ্যান্ডশেক করলো।
মোস্তাক বাবু রাবার প্রজেক্টে আছেন, আর তোহা বাবু গল্ফে আছেন।
বাগানের অফিস সাধারণত: সকল ৬.৩০ টা থেকে শুরু হয়। ৬.৩০ থেকে ৮.৩০টা পর্যন্ত অফিস টাইম। ৮.৩০ টা থেকে ১০.০০ পর্যš Í নাস্তার সময় । ১০টা থেকে ১.৩০ টা পর্যন্ত অফিস টাইম। ১.৩০ টা থেকে ৩টা পর্যন্ত লাঞ্চ টাইম। ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত আবার অফিস টাইম। রাত্রে ওলি বাবু আসাদকে এই অফিস টাইম সম্বন্ধে একটা ধারনা দিল।
পরদিন থেকে আসাদ পুরোদমে অফিস শুরু করলো। অমল বাবু আর মাত্র সপ্তাহ খানেক আছেন। দীর্ঘ ৪০ বৎসর চাকুরী করে রিটায়ার্ডে যাচ্ছেন। অবশ্য এর মধ্যে ছেলে মেয়েদেরকে মানুষ করেছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা ভালো চাকুরী করে। তাছাড়া নিজেও ফান্ড-গ্রাচুইটি মিলে অনেক টাকাও পাবেন। তবে বাসা এখনো ছাড়ছেন না । ফান্ড গ্রাচুইটি পেতে আরও ৩/৪ মাস লাগবে। ফান্ড-গ্রাচুইটি পেলে তারপর বাসা ছাড়বেন। অমল বাবুর টেবিলের পাশেই আসাদকে একটা চেয়ার দেওয়া হলো। অমল বাবু আসাদকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণত ডেইলী রিপোর্ট, প্রভিডেন্ট ফান্ড এর কাজসহ অন্যান্য অফিসিয়ালি কাজগুলো তিনি করতেন। এই কাজগুলো কিভাবে করতে হয় তা আসাদকে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে তাকে দু:খ ভরাক্রান্ত মনে হচ্ছে। সম্ভবত: চল্লিশ বৎসরের চাকুরীর মায়া। অফিসের অন্যন্য সহকর্মীরা এসে তাকে সান্তনা দেয়। চাকুরী শেষের পরেও দুই বৎসর কন্ট্রাক্টে ছিলেন। তিনি অবশ্য আরও দুই বৎসর থাকতে চেয়েছিলেন কিন্তু হেড অফিস তা অনুমোদন করেনি। লম্বা পাতলা গড়নের লোকটা ভালো মানুষই ছিলেন।
দেখতে দেখতে সপ্তাহ কেটে গেল। আজ শনিবার, অমল বাবুর চাকুরীর শেষ দিন। আসাদেকে কিছু উপদেশ ও বাকী কাজগুলো বুঝিয়ে দিলেন। রাবিবার বাগান সপ্তাহিক ছুটির দিন। সোমবার থেকে তিনি আর আসবেন না। আর ঐ চেয়ারেও আর বসবেন না। সোমবার থেকে ঐ চেয়ারে বসবেন আসাদ।
অমল বাবুর চোখে পানি। দীর্ঘ দিনের কর্মস্থল, সহকর্মীরা তাকে সান্তনা দিয়ে বলছেন, ‘বাগানের পাশে জায়গা কিনেছেন, বাড়ী করেছেন, সবসময় আসবেন।’
বিকেলে বড় সাহেব আসলেন। সব বাবুদেরকে ডাকলেন। অফিবাবু, ফ্যাক্টরী বাবু, ষ্টোর বাবু, টিলা বাবু, ফাঁড়ি বাগানের সব বাবুরা, ছোট সাহেব, ডা: সাহেব এবং ইঞ্জিনিয়ার সাহেবও আসলেন। অফিসের পাশেই বাবুদের ক্লাব, তার সামনে প্যান্ডেল সাজিয়ে সেখানে বিদায়ের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হলো। সব ব্যবস্থা ওলি বাবুই করলেন। বাগানের কোন অনুষ্টান, পার্টি সব কিছুর দ্বায়িত্ব এই ওলিবাবুর উপরই থাকে।
অনুষ্ঠানে বাবুরা অমল বাবুর কর্মময় জীবন নিয়ে বক্তব্য রাখলেন। বড় সাহেব, ছোট সাহেব, লেবার, পঞ্চায়েত প্রধান সকলেই অমল বাবুর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রশংসা করলেন। অমল বাবু তার বক্তব্যে কেঁদে ফেললেন। অমল বাবুকে বাবু সর্দার, সাহেব ও পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে উপহার দেওয়া হলো। সাতটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হলো।
রবিবার দিন সাধারণত: বাগান সপ্তাহিক বন্ধ থাকে, ওলি বাবু বিকেলে কাঁচা বাজার সেরে একটু কার্ড(তাস) খেলতে
ফাঁড়ি বাগান, ফুল ছড়ায় যায়। আজও বিকেলের দিকে যাওয়ার জন্য তার কামলা সতীশকে ডাকলো। সতীশ বাজারের ব্যাগ নিয়ে এলো। পিছনে মায়া। কি কি আনতে হবে তার একটা লিষ্ট দিল।
আসাদ বললো ‘ওলি ভাই আমি ও আপনার সাথে একটু বাজারের দিকে যাবো।’
ওলিবাবু হেসে বললেন ‘যাবেন।’
‘হ্যাঁ’
‘তাহলে চলুন।’
ওলি বাবু সতীশকে বললো, ‘তুই মাছ বাজারে দিকে আয়, আমরা ওখানেই থাকবো।’
ওলি বাবু মোটর সাইকেল স্টার্ট দিল, পিছনে আসাদ বসলো। মটোর সাইকেল চলতে লাগলো।
আসাদ বললো ‘ ভাই মোটর সাইকেল কবে নিয়েছেন, নতুন মনে হচ্ছে।’
‘এই তো ৫/৬ মাস হয়।’
‘দাম কত?’
‘কোম্পানী দিয়েছে, পুরো তেল খরচও কোম্পানী দেয়।’
কিছুক্ষণ পর ওলিবাবু বলতে লাগলো, ‘জানেন আসাদ বাবু আমি যেদিন প্রথম জয়েন্ট করতে আসি তখন কিন্তু এই পিচ রাস্তা ছিল না, কাঁচা মাটির রাস্তা ছিল। শমশের নগর বাজারে ২/৩ টা পুরানো বিল্ডিং ছাড়া সবই ছিলো টিনের ঘর অথচ দেখুন, আজ কত পরিবর্তন, বড় বড় মার্কেট হয়েছে এবং হচ্ছে, দুটো ব্যাংকের শাখা হয়েছে, বাজার বিশাল হয়েছে, ফাঁড়ি থানা হয়েছে। রেলষ্টেশন ও পোষ্ট অফিস অবশ্য আগেও ছিলো। ছোট একটা বাজার থেকে আজ শমশের নগর টাউন হয়েছে।’
কথা বলতে বলতে ওলি বাবুর মোটর সাইকেল একটা দোকনের সামনে এসে দাঁড়ালো। দোকানী ওলি বাবুর পূর্ব পরিচিত। ওলি বাবুকে দেখে বললো, ‘ওলি ভাই আসুন- বসুন।’
ওলিবাবু একপাশে মোটর সাইকেল রেখে, মোটর সাইকেল থেকে নেমে দোকানের সামনে রক্ষিত চেয়ারে এসে বসলো। মায়ার দেওয়া লিস্ট বের করে দোকানীর হাতে দিয়ে বললো, ‘জিনিসগুলো আর দুই বস্তা চাউল, একটা রিক্সা করে বাসায় পাঠিয়ে দিবেন। আমি একটু মাছ বাজারের দিকে যাচ্ছি।’ বলে মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিল। সতীশ ব্যাগ নিয়ে মাছ বাজারের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ওলিবাবুকে দেখে এক মাছ ব্যবসায়ী বললো, ‘আইড় মাছ এই দুটো আছে, একদম বিলের মাছ।’
ওলি বাবু বললো, দুটের দাম কত?’
‘দাম পরে হবে, নিয়ে নিন।’
সতীশ মাছ দুটো নিয়ে নিলো। ওলি বাবু এদের বড় কাস্টমার। কোম্পানী সাহেবের বাজার থেকে সব সাহেবের বাজার এদের থেকে নিয়ে থাকে। এরপর কাঁচা বাজার শেষে, সতীশকে একটা রিকশায় উঠিয়ে বাসার দিকে পাঠিয়ে দিলো এবং সতীশকে বললো,
‘আমি নতুন বাবুকে নিয়ে ফুলছড়া যাচ্ছি, ফিরতে রাত হবে।’
‘উঠুন আসাদ বাবু।’
ওলি বাবুু মোটর সাইকেল স্টার্ট দিলো। এবার অন্য পথ দিয়ে ফুলছড়ার দিকে চললো। একটু চলার পর বাগানের রাস্তায় ঢুকলো। উঁচু নীচু পাহাড়ী রাস্তা, চা বাগানের বুক চিরে কাঁচা রাস্তা। এর মধ্যে দ্রুতগতিতে মোটর সাইকেল চলছে।
আসাদ বললো,‘ওলি ভাই বাগানের এরিয়া কতটুকু। ’
উত্তর দক্ষিণে ৯ কি.মি. লম্বা আর পূর্ব পশ্চিমে ৪ কি.মি. চওড়া হবে।’
‘এত বড়!’
‘হ্যাঁ’
‘আমরা এখন কোন দিকে যাচ্ছি?’
‘ফুলছড়া ফাঁড়ি বাগানের দিকে?’
‘সেটা আবার কোথায়?’
‘শুনুন, আমাদের এই ওসমান নগর চা বাগান চার ভাগে বিভক্ত। ফুলছড়া, জাগহাটি, ডাবছড়া, ও মেইন গার্ডেন(ওসমান নগর)।ফুলছড়া, জাগহাটি ও ডাবছড়াকে আউট গার্ডেন বা ফাঁড়ি বাগান বলে।প্রত্যেক ফাঁড়ি বাগানের আলাদা অফিস আছে। ছোট সাহেব, বড় টিলবাবু, ছোট টিলা বাবু ও শ্রমিক আছে। সাহেবদের বাংলো আছে। আর বাবুদের স্টাফ কোয়াটার আছে। শ্রমিকদের কোয়াটার আছে। শ্রমিকরা পতি(পাতা) উঠায়। বাবুরা কাজ করায় ও হিসাব পত্র করে। ছোট সাহেব কাজ দেখে। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পাতি ওজন দেয়, মেইন গার্ডেন থেকে ট্রাক্টর আসে। কামলারা সেই ট্রাক্টরে পতি ভরে দেয়। ট্রাক্টর পতি নিয়ে মেইন গার্ডেনে ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যায়। সেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং এর মাধ্যমে কালো চা-পাতা হয়।’
ওলি বাবু মোটর সাইকেলের স্পীডটা আরও বেড়ে দিলো। সামনে একটু বাক নিয়ে মোটর সাইকেল বাগানের পাশ দিয়ে পাকা রাস্তায় উঠলো। কিছুক্ষণ চলার পর ওলি বাবু বললো, ‘ঐ যে, এয়ারপোর্ট। আসাদ একটু আশ্চার্য হয়ে বললো, এয়ারপোর্ট মানে! এখানে এয়ারপোর্ট কোথায় পেলেন?’
‘কেন শমশেরনগরে যে এয়ারপোর্ট আছে,‘ তা আপনি জানেন না ?’
‘না’
‘তাহলে শুনুন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ এখানে একটা বিমান ঘাঁটি করেছিল। সেটা এখনো রয়ে গেছে। এখন অবশ্য এটা বিমান বাহিনীর প্রশি¶ন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।’
বলতে না বলতে বিশাল রানওয়ে চোখে পড়লো। রানওয়ের পাশ দিয়ে পিচ ঢাকা পাকা রাস্তা। আরও মিনিট দুয়েক পথ পেরিয়ে তারা, একটা বড় বটগাছের সামনে এসে দাঁড়ালো।
ওলি বাবু বললো, ‘ এ হলো ফুলছড়া ডিভিশন।’
আসাদ দেখলো, ৪/৫ টা স্টাফ কোয়াটার। একটা অফিস ও একটা হাসপাতাল। পথের দুই পাশে অনেকগুলো লেবার হাউজ ।
ওলি বাবু বললো, ‘আমি যখন প্রথম এসেছিলাম, এখানে একজন বাবু আছেন। ওনার বাসায় ৪ বৎসর ছিলাম, এখন উনি রিটায়ার্ড করেছেন। তার ছেলে এখানে টিলায় চাকুরি করে, চলুন ওনার বাসায় যাই।’
প্রতি রবিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত হেমন্তবাবুর বাসায় তাসের আসর বসে। কলিংবেল টিপ দিতেই একজন কামলা এসে দরজা খুলে দিল। ওলি বাবু আসাদকে নিয়ে একটা রুমে প্রবেশ করতেই দেখা গেল আরও ৩ জন তার অপেক্ষায় বসে আছে। এদের একজন হরিপদবাবু। বয়স ৫৫ এর মতো হবে। ডাবছড়ার বড় বাবু। আর একজন যতীন বাবু (রিটায়ার্ড)অন্য একজন হেমন্ত বাবু (রিটায়ার্ড)এরা ফুলছড়ার সাবেক বাবু। এখন তাদের ছেলেরা বাগানে চাকুরী করে। তারা অবসরে আছেন।
হেমন্ত বাবু ওলিবাবুকে বললো, ‘ওলি দেরি হয়ে গেল।’
‘হ্যাঁ দাদা, দেরি হয়ে গেল। একটুু বাজার করতে হলো। ’
যতিন বাবু বললো, ‘তুমিতো সারাক্ষন শুধু কোম্পানীর বাজার নিয়ে থাকো।’
‘হরিপদ বাবু বললো, তা ওলি কি খবর, ‘তোমাকে তো আজকাল দেখাই যায়না। তোমরা মেইন গার্ডেন এ থাকো। আর আমরা ৮/৯ কি:মি: দূরে ডাবছড়ার জঙ্গলে পড়ে আছি। আমাদের তো কোন খোঁজ খবর রাখো না।’ বলে হেসে উঠলো।
‘না বড় বাবু কি বলেন? আপনার খবরাখবর সব সময় রাখি। আসলে হয়েছে কি, আপনি তো জানেন নানা রকম কাজে কর্মে সারাক্ষন আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়।’
‘তা জানি, তুমি সারা দিন-রাত কোম্পানীর কাজে ব্যস্ত থাকো। আবার অতিরিক্ত কিছু দ্বায়িত্ব পালন করো। সাহেবেদের আবার তোমাকে না হলে চলে না। তাদের সবকিছু তোমাকে সামলাতে হয়। মাঝে মাঝে রেষ্ট নাও। এভাবে দৌঁড়ঝাপ কাজ করে শরীরটাকে শেষ করো না। নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করো। তা- মায়া ও বাচ্চা গুলো কেমন আছে।’
‘ভালো আছে।’
‘তোমার বড় মেয়েটা অনার্সে পড়ে না?’
‘জী’
ওলি বাবু একটু হেসে বললো, ‘দাদা আপনিতো দেখছি সবার পরিবারের খবর রাখেন।’
‘আমি সবার খবর রাখি ওলি, এই গার্ডেন এর সব স্টাফ এবং লেবার পরিবার সম্বন্ধে আমি জানি। আমি এই ওসমাননগর চা বাগানের প্রত্যেক ফাঁড়িতে কাজ করেছি। এখন শেষ বয়সে ঐ রিমোট এরিয়া ডাব ছড়ায়, ৩৭ বৎসর চাকুরী হলো আর ৩ বৎসর আছে। এরপর (রিটায়ার্ড.) এ চলে যাবো।’ বলতে বলতে হরিপ্রসাদ বাবুর গলা জড়িয়ে এলো।
ওলি বাবু বললো, ‘না দাদা কোম্পানী বোধ হয় এত তাড়াতাড়ি আপনাকে ছাড়বে না, কারণ আপনার মত এমন দক্ষ প্ল্যান্টার কোম্পানী এখন কোথায় পাবে? তাছাড়া বড় সাহেব আপনাকে খুব ভালোবাসেন। উনি বোধ হয় আপনাকে ছাড়বে না। মেয়াদ শেষের পর ও কন্ট্রাক্টে রাখবেন।’
‘এখনই হাফিয়ে উঠেছি, বাগানের যে অবস্থা, আগে সর্দার লেবার সবাই ভয় পেত, মান্য করতো, এখন সেই সর্দারগুলোও নেই। এখন বাগান কন্ট্রোল করা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দেখোনা,গতমাসে তুমি ২০ বস্তা সার পাঠিয়েছিল। কিছু এন্ড্রিন ও থায়োডন পাঠিয়েছিলে। আসতে না আসতেই দেখি কয়েক বস্তা ফুটো করে সেখান থেকে সার নিয়ে গেছে। এন্ডিন ও থায়োডিন এর পরিমাণও কম, তাছাড়া রাত হলেই পাশের গ্রামের কিছু লোক গাছও পাতি (পাতা) চুরিতে নেমে পড়ে। রাত্রে অনেক চৌকিদার বাড়িয়েও কোন ফল হচ্ছে না, কারণ বাগানের কিছু লোকও জড়িত আছে। শুধু কিছু মদ খাওয়ার টাকা দিলেই লক্ষ টাকার গাছ দিয়ে দিবে। চার্জ শীট দিয়ে নাম কেটেও কোন ফল হচ্ছে না। শুধু আমার ফাঁড়ি বাগানেই নয়, মেইন গার্ডেন, জাগহাটি, ফুলছড়া সবখানে একই অবস্থা।’
একটু পরে চা এলো। হেমন্ত বাবু সবাইকে চা পরিবেশন করলো। তারপর আসাদের দিকে তাকিয়ে বললো,‘তা ইনি কে ওনাকে তো চিনলাম না?’
ওলি বাবু বললো, ‘আমাদের নতুন বাবু, নাম আসাদ। কয়েকদিন আগে জয়েন্ট করেছে। সাধারণত: প্রতি রবিবার সন্ধ্যার পরে হেমন্তবাবু, যতীন বাবু, ডাকছড়ার হরিপদ বাবু ও ওলিবাবু তাস খেলায় বসে। শুধু তারা নয়, প্রায় অনেকে তাস খেলায় বসে। তবে তা টাকার উপর নয়। আজও তারা চারজন তাস খেলায় বসে গেল। রাত ৯টায় তাস খেলা শেষ হলো। আসাদ দর্শক হয়ে তাদের খেলা দেখলো।

নূর আহমেদ সাহেব বাগানের বড় সাহেব। দীর্ঘ ২২ বৎসর বেশ সুনামের সঙ্গে টী গার্ডেনে জব করছেন। আজ এই সকালের অফিস টাইমে উনি সব বড় বাবুদের তার রুমে ডাকলেন। সব বড় বাবু তার রুমে ঢুকলেন। বড় সাহেব প্রথমে মেইন গার্ডেনের টিলা বড় বাবুকে চার্জ করলেন।
‘রনজিত বাবু, বাগানের কোন খোঁজ খবর রাখেন?’
‘জী স্যার রাখি।’
‘কি রাখেন?’
রাগত: ¯^রে বড় সাহেব বললেন, ‘প্রতিদিন রাত্রে বাগান থেকে বড় বড় গাছ চুরি হচ্ছে। সেক্শন গুলো থেকে কাঁচাপাতি (পাতা) চুরি হচ্ছে তার কি কোন খবর রাখেন? কারা এর সাথে জড়িত? তার কোনো খোঁজ রাখেন? এ পর্যন্ত একজন চোর ধরেছেন?’
‘জী স্যার, সপ্তাহ খানেক আগে একজন গাছ চোর ধরেছি। তাকে পুলিশে সোপার্দ করা হয়েছে।’
‘শুধু কি এই একজনই?আমার জানামতে গ্রাম এলাকার একটা সংঘবদ্ধ দল এবং বাগানের কিছু লোক এর সাথে জড়িত। গত রাত্রেও জাগছড়া থেকে গাছ চুরি হয়েছে। এরপর বড় সাহেব, পঞ্চায়েতদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দেখো, এই বাগান তোমাদের পূর্ব পূরুষের। তোমরা আজ বাগানে কাজ করছ। ভবিষ্যতে তোমাদের ছেলে মেয়েরাও কাজ করবে। আমরা আজ আছি তো কাল নেই। তোমাদের বাগান তোমাদেরকে রক্ষা করতে হবে। এই যে গাছ চুরি হচ্ছে পাতি চুরি হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে ছায়াবৃক্ষ না থাকলে বাগান ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন তোমরা কোথায় যাবে?’
পঞ্চায়েত প্রধানদের একজন রবীন্দ্র তেলেংগা। গায়ের রং কালে লম্বা, মুখে খোঁচা-খোঁচা কাঁচা পাঁকা দাঁড়ি, তাকে উদ্দেশ্য করে বড় সাহেব রাগত ¯^রে বললো,‘কী রবীন্দ্র কিছু বলো?’
রবীন্দ্র একটু মাথা নীচু করে বললো, ‘জী সাহেব, আমরা তো এটার কিছুই জানি না। ’
‘জানো না মানে? আমি তো জানি বাগানের কিছু লোকও এর সাথে জড়িত। এরপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, পরবর্তী সময়ে -এ যে সেক্শন থেকে গাছ, পাতা চুরি হবে, সে সেক্শনের বাবু ও রাত চৌকিদারকে চার্জশীট দেওয়া হবে। প্রয়োজনে নাম কেটে বাগান থেকে বের করে দেওয়া হবে।’
রবীন্দ্র বললো, ‘জী স্যার।’
বড় সাহেব রনজিৎ বাবুকে বললেন,‘বড় বাবু, সেকশনে ডাবল করে রাত চৌকিদারের ডিউটির ব্যবস্থা করুন। এখন আপনারা আসুন। সবাই বড় সাহেব এর রুম থেকে বের হয়ে এলো।
ওলি বাবুর হাতে কিছু অফিসিয়াল কাগজ, বড় সাহেবের হাতে সাইন করতে হবে। আসাদের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
আসাদ বললো, ‘বড় সাহেবের রুমে যাবেন?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আজ সকল থেকে বড় সাহেবের মুড ভালো নয়, কি করে যাই বলুন?’
আসাদ সাহস দিয়ে বললো, ‘কিছু হবে না আপনাকে কিছু বলবে না।’
আর অপেক্ষা না করে, ওলি বাবু বড় সাহেবের রুমে ঢুকলো। বড় সাহেব খুব মুডে ছিলেন। ওলি বাবুকে দেখে একটু সামলে নিয়ে বললেন,‘ কি বাবু?’
‘না স্যার, কিছু সই করতে হবে।’
‘দিন’
ওলিবাবু কাগজ পত্র বড় সাহেবের সামনে টেবিলে রাখলো।
বড় সাহেব কলিং বেলে চাপ দিলেন। চৌকিদার এলো। ‘বড় বাবুকে আসতে বলো, ‘ একটু পরেই বড় বাবু রুমে ঢুকলো। বড় সাহেব বললো, বড় বাবু আসাদ বাবু আজ ১০/১৫ দিন যাবৎ ওলি বাবুর বাসায় আছে। কিন্ত সমস্যা হলো ওনার বাসা নিয়ে। একেতো অন্যন্য বাসা থেকে তার বাসা ছোট। এরপর তিন মেয়ে এক ছেলে। তার উপর রাবার বাবু, গলফ বাবু ও আসাদ বাবুও আছে। এছাড়া হেড অফিস থেকে এবং অন্যন্য গেষ্ট আসলে তার বাসায় আমি পাঠিয়ে দেই। আমি তাকে বললে বেচারা হ্যাঁ ছাড়া না করে না। এভাবে চলতে পারেনা। ওলি বাবুর বাসাতো একটা হোটেল হয়ে গেছে।’
একসঙ্গে অনেকগুলো কথা বলে বড় সাহেব আবার কলিং বেল চাপলেন, চৌকিদার এলো।
‘ছোট সাহেবকে আসতে বলো।’
একটু পরে ছোট সাহেব, বড় সাহেবের রুমে ঢুকলো। বড় সাহেব বললো, ‘মাসুদ টু-ইন কোয়ার্টারের কাজ কতটুকু এগিয়েছে। শেষ হতে আর কতদিন লাগবে?’
‘আরো দুই মাস লাগবে।’
‘কি বলো?’
‘কাজ শুরু হয়েছে কতদিন হলো।’
‘ ৩ মাস।’
‘এত দেরী কেনো?’
‘কন্ট্রাক্টারের গাফলতির কারণে।’
‘কন্ট্রাক্টারকে আমার সাথে দেখা করতে বলবে। আজ বিকেলের দিকে আমি তোমাকে নিয়ে ওদিকে যাবো। তাকে বলবে কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে এবং আমার সাথে দেখা করতে।’
তারপর বড় সাহেব, বড় বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বড় বাবু এখন আপাতত: কি কারা যায়, বলুনতো? আচ্ছা আমাদের বাগানে কয়টা বড় বাসা আছে।’
বড় বাবু একটু মনে মনে গুনলেন। তার পর বললেন,‘স্যার দুটো বাসা বড় আছে। একটা সূর্য বাবুর বাসা, অন্যটা সজীব বাবুর বাসা। এর মধ্যে সজীব বাবুর বাসাটা বেশ বড়।
কয় রুম?
‘ছয় রুম, দুটো বাথরুম আছে।’
‘ওনার ফ্যামিলির সংখ্যা কত।’
‘৫ জন, ¯^ামী- স্ত্রী দুই ছেলে ও এক মেয়ে।’
‘ আপনি রাবার আর গলফ বাবু, এই দুজনকে ওখানে দুই রুমে থাকার ব্যবস্থা করেন। আর আসাদকে ফুলছড়ার সূর্য্য বাবুর বাসার এক রুমে থাকার ব্যবস্থা করুন।’
রাতে ওলিবাবু রাবারবাবু, গলফবাবু ও আসাদকে বড় সাহেবের এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।
আসাদ বললো ‘ বড় সাহেব অর্ডার করেছেন। তা-তো মানতেই হবে।’
‘ওলি বাবু বললো ‘কাল রবিবার ছুটির দিন আছে, নাস্তা- এর পর আপনাকে সূর্য্য বাবুর বাসায় নিয়ে যাবো। গত সপ্তাহে যে বাসায় আমরা কার্ড খেলেছিলাম, সে বাসায়। ঐ বাসাকে হেমন্তবাবুর বাসা বলে। কারণ সূর্য বাবুর বাবা হেমন্তবাবু আগে ফুলছড়া ডিভিশনের বড় বাবু ছিলেন। আমি যখন প্রথম আসি, তখনও বাসার সমস্যা ছিল। তখনকার বড়সাহেব আমাকে ফুলছড়ার টিলাবাবু, ঐ হেমন্তবাবুর বাসায় থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। হেমন্তবাবু বড় ভালো মানুষ। তার স্ত্রীও খুব ভালো মানুষ। ৪ বৎসর তাদের ওখানে ছিলাম। তারা আমাকে খুব যতœ করে রেখেছিলেন। আশা করি আপনার কোন অসুবিধা হবে না। ঐ বাসাটাও বড়। ছয় রুমের বাসা। তার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বাসার উত্তর পাশে একটা বড় রুম আছে। সম্ভবত: সেই রুমই আপনাকে দেওয়া হবে।’
পরদিন রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আসাদকে নিয়ে ওলিবাবু ফুলছড়ার উদ্দেশ্য মোটর সাইকেল যোগে রওয়ানা দিল। ওলিবাবু বললো, বুঝলেন আসাদবাবু,ওরা খুব ভালো মানুষ। কুলাউড়া জমিদার বাড়ীর মানুষ । তার পাশের বাসা ¯^পন বাবুর, তার বাবা যতীন বাবুও টিলা বাবু ছিল। পাশাপাশি দুটো বাসা। দুই বাসায় বড়ই মিল। আমি এই বাসায় এক বেলা খেলে তো ঐ বাসায় অন্য বেলা খেতাম। সূর্য্য বাবুও তার বোনেরা, ¯^পন বাবু ও তার বোন, আমাকে মামা ডাকে। চার বৎসর ফুলছড়া ছিলাম। পরে মেইন গার্ডেনে এই বাসা খালি হলে চলে আসি। তখনতো ব্যাচলার লাইফ ছিল। প্রথম মাসের যখন খাওয়ার টাকা দিতে গেলাম। তখনতো হেমন্তবাবু রেগে বললো,‘ আরে তুমি আবার কি টাকা দিবে?’
‘আমি বললাম,‘তা কি করে হয়? আপনার এখানে থাকবো, খাবো, অথচ টাকা দেবো না, তা কি করে হয়?’
‘আরে কি খাচ্ছ? টাকা দিবা, কয় টাকা দিবা? আরে আমি কুলউড়া জমিদার বাড়ীর ছেলে। চাকুরি করি, শুধু সম্মানের জন্য। এখনও বাড়ী থেকে ধান, চাউল, মাছ ও ফল ফলাদি বাবত অনেক টাকা আসে।’
তারপরও আমার কাছে খারাপ লাগতো। বিনে পয়সায় খাচ্ছি। রাতে অবসর সময়ে হেমন্ত বাবুুও যতীন বাবুর ছেলেমেয়েদের পড়াতাম। সেখানেও বিপত্তি। মাস শেষে তারা আমাকে প্রাইভেট পড়ানোর টাকা দিত। অবস্থা এমন হলো যে, দুপুর বেলা হেমন্তবাবুর বাসায় খেলে, রাত্রে যতীন বাবুর বাসায় খেতে হতো। আমি ও ছাড়ার পাত্র নয়, মাস শেষে মাহিনা পেলে, শমশের নগর থেকে বড় দামী মাছটা নিয়ে আসতাম। কিন Íু এতে তারা রাগরাগি করতো। তারা বলতো,
‘আরে ওলি টাকা জমাও, বিয়ে শাদী করতে হবে, ভবিষ্যতে টাকা লাগবে।’
আমি বললাম, ‘ এ কি করে হয়?’
তারপর হেমন্ত বাবু ও যতীন বাবু আমাকে বললো,‘দেখ ওলি, তুমি খাওয়ার টাকা না দিয়ে, এই টাকা পোষ্ট অফিসে জমা করো। মনে করো, টাকাটা তোমার বিয়ের খরচ হিসেবে আমরা গিফ্ট করছি। বড় ভলো মনের মানুষ ওরা, দুদিন থাকলে বুঝতে পারবেন।’
কিছুক্ষণ পরে মোটর সাইকেল ফুলছড়ায় এসে পৌঁছালো।
পাশাপাশি দুটো বাসা। আরও দুটো বাসা আছে। একটা বড় বাবুর। অন্যটা কম্পাউন্ডার বাবুর। সেগুলো একটু দূরে। মোটর সাইকেল সূর্য্য বাবুর(হেমন্তবাবু) বাসার সামনে এসে পৌঁছালো। বারান্দায় হেমন্ত বাবু চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছে। ওলি বাবুকে দেখে খুশি হয়ে এগিয়ে এসে বললো,
‘এসো ওলি, এসো। ছোট সাহেব কাল সন্ধ্যা বেলায় ফোনে বলেছে যে, আমাদের এখানে একজন নতুন বাবু থাকবে। তাই সকাল থেকে যে রুমটাতে তুমি থাকতে, সেই রুমটা দুইজন কামলা দিয়ে ভালো করে ধোঁয়া-মোছা করালাম। সিঙ্গেল একটা খাট আছে, আর আমার লাইব্রেরীটা আছে, বলেই হেমন্তবাবু, আসাদ এবং ওলিবাবুকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকলো।
বেশ সাজানো গোছানো পরিপাটি ড্রয়িং রুম। কয়েকটা সেলফ্ । তার মধ্যে হরেক রকম বই সাজানো অবস্থায় শোভা পাচ্ছে। শরৎন্দ্র-রবীন্দ্র রচনাবলী সমগ্র, বাইবেল, গীতা, মহাভারত, আর একটা সেল্ফে দেখা গেল, রুশ বিপ্লব, চীন বিপ্লব, কিউবা বিপ্লব, কালমার্কস, লেলিন, মাও সেতুং গ্রীক সভ্যতা, চার খলিফার জীবন কাহিনী ‘হযরত মোঃ (সাঃ) এর জীবন কাহিনী, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি, প্রভৃতি দূর্লভ বই চোখে পড়লো।’
হেমন্ত বাবু, আসাদ ও ওলি বাবুকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসলো। তারপর জোর গলায় হাঁক ডাক শুরু করলো। তার ডাকে তার স্ত্রী ফাগুনী, ছেলে মেয়ে সবাই ড্রয়িং রুমে জড়ো হলো। তারপর হেমন্ত বাবু তার, বড় মেয়ে ছায়াকে দেখিয়ে বললো, এই আমার বড় মেয়ে। দর্জিলিং এ থাকে। ওর হাজ্বেন্ড- দার্জিলিং এর একটা চা বাগানের ম্যানেজার। কয়েকদিন হলো বেড়াতে এসেছে।’
এরপর মেঝ মেয়ে দিবা, ছোট মেয়ে রাত্রি, ছেলে সূর্য্য বাবু ও হেমন্তবাবুর স্ত্রী ফাগুনীর সাথে আসাদ এর পরিচয় করিয়ে দিলেন।
ফুলচড়া চা বাগানে সাধারনত: সন্ধ^্যার পরে নীরব নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এখানে রাত তাড়াতাড়ি নেমে আসে। শুধু টিলাবাবুদের একটু পেন ওয়ার্ক এর কাজ থাকে। তাও ঘন্টা খানেক। মাঝে মাঝে লেবার লাইন থেকে গানÑকীর্তন শোনা যায়। দূরে মেইনগার্ডেন থেকে ফ্যাক্টরীর ম্যানুফেক্চারিং এর আওয়াজ শোনা যায়। এই সময়ে বাবুরা তাস খেলায় বসে যায়। তবে তা টাকা উপর নয়। হেমন্ত বাবু, যতীন বাবু, টিলা বড় বাবু ও কম্পাউন্ডার বাবু তাস খেলায় বসে যায়। পাশাপাশি দুটো বাসা। একটা হেমন্ত মুখার্জির (সূর্য্য বাবু)। অন্যটা যতীন বন্দোপাঠ্যায়ের (¯^পনবাবু)। অবশ্য দুজনই এখন রিটায়ার্ড, তাদের দুই ছেলে সূর্য্যবাবু ও ¯^পনবাবু বাগানে চাকুরী করে। দুজনে বয়সে এক মাসের বড় ছোট, স্কুল জীবনের ক্লাস মেইট, খেলার সাথী। হেমন্ত বাবু একটু ঠান্ডা ও চাপা ¯^ভাবের আর যতীনবাবু তার বিপরীত অর্থাৎ মেজাজ গরম। হেমন্ত বাবু কুলাউড়া জমিদার বাড়ীর ছেলে। আর যতীনবাবু সিলেটের জিন্দাবাজারের বিখ্যাত ব্যবসায়ী-পরিবারের ছেলে। দুজনে শমশের নগর হাই স্কুল ও মৌলভী বাজার কলেজ থেকে লেখা পড়া করেছেন। দুজনেই গলায় গলায় ভাব। তবে তর্ক বিতর্ক লাগলে কেউ কাউকে ছাড়ে না। হেমন্তবাবু সমাজতন্দ্রে বিশ্বাসী। আর যতীনবাবু তার ঘোর বিরোধী।
মেইন গার্ডেন থেকে ফুলছড়ার দূরত্ব ২ কি: মি:। আসাদ কখনো রিকশাযোগে, রিকশা না পেলে পায়ে হেঁটে অফিসে আসা- যাওয়া করে। সেদিন ওলিবাবু বললো, ‘একটা সাইকেল নিয়ে ফেলুন আসা যাওয়ার সুবিধা হবে।’
আসাদ বললো, ‘ভাবছি, নিয়েই নেবো।’
অফিস আর বাসা এভাবে আসাদের দিন কেটে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর, অবসর সময়টা হেমন্ত বাবুর সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। কখনো রাজনৈতিক. কখনও দর্শন কখনও গার্ডেন এর ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে। হেমন্ত বাবু সব বিষয়ে পারদর্শী। সব বিষয়ের উপর প্রচুর স্টাডি আছে।
আজ রবিবার সাপ্তাহিক গার্ডেন ছুটির দিন। এখন ভোরবেলা। হঠাৎ দরজায় টোকা শব্দে আসাদ এর ঘুম ভাঙলো। উত্তর দক্ষিণে লম্বা বাসার এক পাশের রুমে আসাদ এর রুম। দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দে আসাদের ঘুম ভেঙে গেল।
‘কে?’
‘আমি?’
‘কাকা বাবু!’
হ্যাঁ, দরজাটা খোল?’
আসাদের চোখে একটু ঘুম ঘুম ভাব। আসাদ দরজা খুলে দেখে হেমন্ত বাবু তার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা জায়নামাজ ও এক ছড়া তস্বি।
‘কাকা বাবু আপনি এই সকালে?’
‘আমি তো খুব সকালে ঘুম থেকে উঠি, এটা আমার ছোট বেলার অভ্যাস। হেমন্ত বাবু তস্বি ও জায়নামাজ আসাদের হাতে দিয়ে বললো, ‘ তাড়াতাড়ি ওজু করে, ফজরের নামাজ পড়ে নাও। আমি পুজো দিতে মন্দিরে যাচ্ছি।’
আসাদ একটু অবাক হলো। একজন হিন্দু ভদ্রলোক তাকে নামাজের জন্য বলছে। নামাজ শেষে আসাদ বের হলো। সূর্য উঠতে এখনও দেরী আছে। সকালের পাখিগুলো ডাকছে। ছুটির দিনে টেনশান বিহীন সকালে হাঁটতে ভালোই লাগছে, সামনেই মন্দির, হেমন্ত বাবুও পুজো দিয়ে মন্দির থেকে বের হলো। আসাদকে দেখে বলল,
‘চলো একটু বেড়িয়ে আসি। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। সামনের বিশাল বটগাছটা পেরিয়ে তারা মেইন গার্ডেন অভিমুখী রাস্তায় হাঁটতে লাগলো।
হেমন্ত বাবু বললো, ‘শোনো, কাল বিকেলে শামশের নগর বাজারে গিয়েছিলাম।ওলির সাথে বাজারে দেখা হতেই তোমার কথা জিজ্ঞেস করলো। কেমন আছো, কোন সমস্যা।অমনি তোমার নামাজের কথা আমার মনে পড়লো।’
‘কি মনে পড়লো?’
‘আমি আজ কয়দিন থেকে দেখছি, তুমি তোমার বিছানায় নামাজ পড়ছো। তাই ওলিকে নিয়ে একটা কাপড়েরর দোকানে যেয়ে, এই জায়নামাজ ও তস্বি ছড়াটা কিনলাম। দাম অবশ্য ওলিই দিয়ে দিল।আমাকে কিছুতেই দাম দিতে দিল না।’
‘আপনাকে এবং আপনাদেরকে আমি যতই দেখছি। ততই আমি অবাক হচ্ছি।’
‘সে কেমন?’
‘এই ধরুন আপনি হিন্দু ধর্মালম্বী- হয়েও মুসলমান ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’
‘এ আবার এমন কি? তোমার ধর্ম তুমি পালন করবে, আমার ধর্ম আমি পালন করবো। তাছাড়া এই ফুল ছড়ায় লেবার বাবু সবই হিন্দু। একমাত্র তুমিই মুসলিম। এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন মসজিদ নেই। তোমার ধর্ম কর্ম পালনে সহযোগিতা করা আমাদের কর্তব্য।’
আসাদ হেমন্তবাবুর মুখের দিকে তাকালো। তারপর বললো, ‘কাকাবাবু একটা কথা বলবো।’
‘বলো।’
‘কিছু মনে করবেন না তো?’
হেমন্ত বাবু আসাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘না বলো,শোন আমি ফ্রি মানুষ আমাকে যখন যাা ইচ্ছা, তা জিজ্ঞেস করতে পারো, বলতে পারো।’
‘ মানুষ বলে যে, যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা নাকি ধর্ম মানে না, আল্লাহ মানেনা।’
‘হেমন্ত বাবু একটু উচ্চ¯^রে হাসি দিয়ে বললো, ও এই কথা, এ কথা জানার জন্য তুমি এত ভূমিকা করছো। শোন, ধর্ম মানুষের মনকে বিশুদ্ধ করে, সুন্দর করে। ভালো কাজের দিকে ধাবিত করে। মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে, ধর্ম বিশ্বাস, ভগবান বিশ্বাস, মানুষের অন্তরে। প্রত্যেক ধর্মে ভাল কাজ পালনের আদেশ আছে আর মন্দ কাজ পরিহার করার নিষেধ আছে। আর এটা হলো পুঁজিবাদী লোকদের মিথ্যা রটনা। লেনিন ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করার পর ৪০ এর দশক থেকে সমাজতন্ত্র যখন দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়লো, তখন ধনীরা ভীত হয়ে এই মিথ্য প্ররোচনা চালাতে থাকে। আসলে সমাজতন্ত্র হলো একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, পৃথিবীতে দুটো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে, একটা হলো ধনিক শ্রেণীর শোষনের ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আর মেহনতি মানুষের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। পৃথিবীর বড় বড় মহাপুরুষ, মনিষী, সবাই সমাজতন্ত্র ও সাম্যের কথা বলেছেন। তবে আমি এ কথাও বলব যে, সমাজতন্ত্রীদের একটা অংশ ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তা সম্মন্ধে ভিন্ন মত পোষন করে। আর এই সুযোগটা ধনীরা লুফে নিয়েছে।’
‘কিন্তু সমাজতন্ত্রতো এখন ব্যথর্।’
‘হ্যাঁ ব্যর্থ, এটা হয়েছে ধনিক শ্রেণীর ষড়যন্ত্রের কারনে, সমাজতন্ত্র প্রয়োগের ব্যার্থতার কারনে, কিছু সমাজতন্ত্রী লোকের হটকারিতা, সুবিধাবাদীতার জন্যে। সমাজতন্ত্র মহনতি মানুষের কল্যান কারে ধীরে ধীরে এগোয়। আর পুঁজিবাদ,গরীব শোষন করে তাড়াতাড়ি এগোয়। তবে ব্যর্থ হোক আর সফল হোক। সমাজতন্ত্র পৃথিবীতে আসায় পুঁজিবাদীরা ভয়ে অনেক সংশোধন ও সচেতন হয়েছে। তারা ও সমাজতন্ত্রের কিছু কিছু নিয়ম মেনে নিয়েছে।’
কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে তারা মেইনগার্ডেনের সীমানায় এসে পড়লো। ওদিক থেকে হেঁটে হেঁটে ওলিবাবু আসছে, ওলিবাবুকে দেখে আসাদ বললো,
‘ওলি ভাই সালাম, কেমন আছেন।’
‘ভালো।’
‘হেমন্তবাবু বললো, ‘চলো, ফুলছড়ার দিকে যাই।’
তিনজন হাঁটতে লাগলো, তারা একটু অগ্রসর হতেই দেখলো, যতীন বাবু তাদের দিকে এসে মিলিত হলো। চার জন এসে বড় বট গাছটির নিচে বসলো। একটু পরেই দুই বাসা থেকে দুই কামলা ফ্লাক্স ভর্তি চা বিস্কুট নিয়ে এলো। সাধারনত: প্রতিদিন সকলের হাঁটা শেষে হেমন্ত বাবু ও যতীন বাবু এই বট গাছ তলায় বসে একটু হাল্কা নাস্তা সারে।
চা পান শেষে আসাদ হেমন্ত বাবুকে বললো, ‘কাকাবাবু আপনারা কথা বলুন । আমি আসি, আমাকে শ্রীমংগল যেতে হবে।’
‘কেন?’
প্রভিডেন্ট ফান্ড অফিসে একটু কাজ আছে। তাই যেতে হবে।’
চা এর রাজধানী শ্রীমঙ্গল। চারিদিকে চা বাগান পরিবেষ্ঠিত মফ¯^লের ছোট্ট শহর। এখানে বাংলাদেশ চা গবেষণার ইনষ্টিটিউট আছে। চা শ্রমিক-কর্মচারির প্রভিডেন্ট ফান্ড অফিস, শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন অফিস আছে। আসাদ প্রভিডেন্ট ফান্ড অফিসের কাজ শেষ করে যখন শমসের নগরে এলো, তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। রিকশা স্ট্যান্ডে আসতেই সেই অজিতের সাথে দেখা।
অজিত বললো, ‘বাবু ফুলছড়ায় যাবেন?’
‘হ্যাঁ।’
অজিত আসাদকে নিয়ে ফুলছড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।’
‘আচ্ছা অজিত, রিকশা চালিয়ে দৈনিক কত টাকা পাও?’
‘সামান্য, এই টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়।’
রিক্শা শমসেরনগর থেকে একটু অগ্রসর হতেই আসাদ দেখলো, রাস্তার একপাশ দিয়ে দিবা একা একা ফুলছড়ার দিকে হেঁেট যাচ্ছে। আসাদ অজিতকে রিকশা থামাতে বললো। তারপর রিকশা থেকে নেমে তার কাছ যেয়ে বললো,
‘কোথায় গিয়েছিলেন? ’
দিবা আসাদের দিকে তাকালো, মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। এই প্রথম আসাদের মুখোমুখি। একটু নীচু গলায় বললো, ‘মেইন গার্ডেনে।’
‘আসুন রিকশায় উঠুন।’
‘না-না আমি যেতে পারবো, আপনি যান।’
‘কি বলেন! আপনাকে একা ফেলে আমি চলে যাবো।’
দিবা একটু মৃদু হেসে বললো,
‘ প্রতিদিনই তো আমি, এই সময়ে মেইন গার্ডেন থেকে একাই হেঁটে যাই।’
‘হেটে যান!’
‘হ্যাঁ’
আসাদ দেখলো, দিবা রিকশায় যাবে না। তাই অজিতকে আর দাঁড়িয়ে না রেখে, ভাড়া দিয়ে বিদায় করে দিল।
দিবা বললো ‘ রিক্শা বিদায় করে দিলেন। ’
‘হ্যাঁ দিলাম।’
‘কেন?’
‘সন্ধ্যা আসন্ন। জনামানবহীন এই পাহাড়ী রাস্তায় একজন মেয়ে মানুষকে একা ফেলে কী করে যাই? একটা দায়িাত্ববোধ আছে না। বিশেষত: যাদের বাসায় থাকি, খাই। ’
‘বেশ দায়িত্ববোধ আছে তো মনে হচ্ছে। ’
‘অবশ্যই আছে।’
দিবা বললো,‘শুধু রাস্তায় দাঁিড়য়ে দাঁিড়য়ে কথা হবে, না কি হাঁটবেন।’
‘কোথায় গিয়েছিলেন। ’
‘টিউশনি করতে।’
‘টিউশনি করতে, প্রতিদিন এই সময়ে আসা যাওয়া হয়।’
‘হ্যাঁ’।
‘রিকশায় উঠলেন না কেন?’
‘পাগল নাকি কেউ যদি দেখে, তাহলে সারা বাগান রটে যাবে।’
‘কী রটে যাবে?’
‘বদনামি।’
‘কী বলেন, এই যুগেও এখানে এই প্রথা আছে নাকি?’
‘হ্যাঁ বাবু আছে।’
‘আচ্ছা, আপনি কি আমার উপর কোন কারনে রেগে আছেন?’
‘ কই না-তো, এভাবে বলছেন কেন?’
‘এই ধরুন আজ সপ্তাহ খানেক আপনাদের বাসায় আছি। বাসার কাকী মা, রাএি, ছায়াদিদি, সূর্যদা সবাই আমার সাথে ফ্রি, কথা বলে, অথচ আপনি আড়ালে চুপচাপ।’
‘এটা আমার ¯^ভাব।’
‘ও আচ্ছা, তাহলে ¯^ভাবটা কার?’
‘কাকীমার না কাকাবাবুুর।’
‘কারোই না।’
‘কাকাবাবু বলেন, আমার মেঝো মেয়েটা আমার ¯^ভাব পেয়েছে।’
‘আপনার কী মনে হয়?’
‘আমার মনে হয় ,‘চেহারায় আপনি কাকীমার পেয়েছেন,¯^ভাবে কাকা বাবুর । তবে একটু পার্থক্য আছে, কাকা বাবু খুব মিশুক, ফ্রি আর আপনি। ’
‘আমি কি?’
‘বলবো না।’
‘কেন?’
পরে বলবো।’’
আসাদ কথা পাল্টে বললো, ‘হাতে ওটা কি বই?’
‘ক্লিউপেট্টা।’
‘পড়েছেন?’
‘হ্যাঁ, অনেক আগেই পড়েছি।’
‘কেমন লেগেছে?’
‘আগে পড়েই দেখুন।’
‘বই পড়ার অভ্যাস আছে?’

‘হ্যাঁ, রাত জেগে বই পড়ার অভ্যাস আছে।’
‘আর কি কি হবি আছে?’
‘গান শোনা, বই পড়া এবং লেখালেখি।’
‘কেমন বই ভালোলাগে?’
‘সব রকমের বই।’
‘যেমন’
‘গল্প, উপন্যাস, ধর্মীয়, রাজনৈতিক।’
‘আপনি তো আব্বুর মতো।’
‘তা অবশ্যই বলতে পারেন।‘তবে তার মত যোগ্যতা এখনও অর্জন করতে পারিনি।’
‘কি গান ভালো লাগে।’
‘হারানো দিনের বাংলা ও হিন্দী গান।’
‘প্রিয় শিল্পী?’
‘প্রিয় শিল্পীর লিষ্টটা অনেক লম্বা।’
‘লিষ্টটা বলুন।’
‘লতা, অনুরাধা, মান্না, কুমার শানু।’
‘তালিকা তো বেশ লম্বা, তবে এদের অধিকাংশতো পূরানো শিল্পী।’
‘এরা ছাড়া বর্তমানে নতুন হিট গানের শিল্পী কয়জন এসেছে?’
‘আর লেখালেখি।’
‘গান, কবিতা, ছোটগল্প।’
‘গল্প, কবিতা লিখেন?’
‘চেষ্টা করি।’
আসাদ বললো, ‘শুধু তো আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। আর আমিও নিজের ঢোল পিটাচ্ছি।এবার আপনার কথা বলুন।’
‘কি বলবো?’
‘আপনার কথা।’
‘আমি দিবা মুখার্জি, লাইফটা ট্র্যাজেডিতে ভরপুর।’
‘তা জানি।’
‘জানেন আমার লাইফের ট্র্যাজেডি।’
‘হ্যাঁ জানি।’
‘কে বলেছে?’
‘কেন, কাকাবাবু আপনার সব কথা আমাকে বলেছে।’
‘মৌলভী বাজার কলেজে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছি।’
‘তাও জানি’
‘বই পড়া ভালো লাগে। গান, কবিতা ভালো লাগে। তবে গান শোনার চেয়ে গাইতে ভালো লাগে।’
‘তাই নাকি! তা হলেতো আপনি শিল্পী?’
‘শিল্পী কিনা বলতে পারবো না। তবে আমার গান অনেকের কাছে ভালো লাগে।’
কথা বলতে বলতে কখন যে পথ ফুরিয়ে গেছে, তারা কেউ টের পায়নি। তাদেরকে একত্রে আসতে দেখে, বাসা থেকে রাত্রি বের হয়ে বললো, ‘আসাদ ভাই, দিদি ভাইকে কোথায় পেলেন।’
‘আসাদ বললো ‘শমশের নগর থেকে আসছিলাম, পথেই দেখা।’
সাধারনত: দিবা ও রাত্রি একই রুমে একই বিছানায় ঘুমায়। পিঠে পিঠি দুই বোন। দুজনে একে অপরের কথা শেয়ার করে। রাত্রি ভানুগাছ কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। দেখতে দুই বোন একই চেহারায় মিল থাকলেও দুজনের ¯^ভাব ভিন্ন। দিবা ধীর স্থির ও শান্ত প্রকৃতির । আর রাত্রি খুব চটপটে ও চঞ্চল প্রকৃতির। প্রতি রাত্রে ঘুমানোর আগে দুজনে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করে। এরপর রাত্রি ঘুমিয়ে পড়ে। দিবা ঘন্টা খানেক বই পড়ে। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচরায়। তারপর ঘুমোতে যায়। আজও রাত্রির সাথে গল্প করার পর, ক্লিউপেট্রা পড়ছে। কিন্তু কিছুতেই পড়ায় মন বসছেনা। বইটা রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো, নিজেকে আয়নায় দেখলো। চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ালো। আয়নায় নিজেকে নিজে দেখলো। বিষন্ন চেহারা। দেড় বৎসর আগে তার জীবনে যে কাল বৈশাখীর ঝড় বয়ে গিয়েছিল। তার দাগ এখনও কাটেনি। সেই ঘচনা ও দু:¯^হ স্মৃতি মনে উঠলে এখন ও সে আঁতকে উঠে। সেই থেকে কখনও তার কথা উচ্চ¯^রে কেউ শুনেনি। কি করে যে কি হয়ে গেল। সে একজন শিল্পী ও ভালো গান গাইতে পারে। মৌলভী বাজার জেলায় গান প্রতিযোগিতায় সে পর পর দুবার প্রথম হয়েছে। বিধাতা যেমন তার রূপ দিয়েছে, তেমন কন্ঠ ও দিয়েছে। সেই কালো অধ্যায়ের পর সে আর কখনও ¯^াভাবিক হতে পারেনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে সে দু:স্মৃতি। মাত্র ১ মিনিটে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল। একটি দূর্ঘটনা। তারপর সব শেষ। সে থেকে দিবা চুপচাপ নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা হতে ফাংশনের অফার আসলে সে না করে দেয়। এখনও সে সহজ হতে পারেনি। রুমের মধ্যে কয়েকবার এদিক সেদিক পায়াচারি করলো। তারপর আবার আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। আয়নার দিবা তাকে যেন বলছে।
‘কি দিবা মুখার্জি? আজ তোমার মনটা ভালো লাগছে কেন? কেন আজ আবার গান করতে ইচ্ছে করছে? জীবনের ২৪ বসন্ত পেরিয়েছে, কিন্তু কখনও তো এমন হয়নি। আবার মনে মনে বলে উঠলো, ধেৎ কি সব ভাবছি? কোথায় আসাদ। আর কোথায় সে। আসাদ মুসলমান, সে হিন্দু, তাও আবার ব্রাক্ষনের মেয়ে, জাত, কুল মান সবই যাবে।
এখন প্রায় সময় টিউশনি শেষে দিবা আসাদের সাথে বাসায় ফিরে। প্রায় সময় গল্প করতে করতে তাদের রাস্তা ফুরিয়ে যায়। আসাদ ও দিবার মনে হয়, ইস্ পথটা যদি আরও বেশী হত। সেদিনও তারা একত্রে ফিরছিল। আসাদ বললো,
‘বইটা পড়েছেন?’
‘কোন বইটা?’
‘ঐ যে ক্লিউপেট্রা।’
‘হ্যাঁ অর্ধেক শেষ করেছি।’
‘কেমন লাগছে?’
‘ভীষন ভালো লাগছে’
‘কেন ভালো লাগছে?’
‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, তার সম্বন্ধে পড়তে কার না ভালো লাগবে।’
‘আপনি যা পড়েছেন। বাস্তবের ক্লিউপেট্রা অত সুন্দরী ছিলেন না। কবি সাহিত্যিকরা তাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বেশী সুন্দরী বানিয়ে ফেলেছেন।’
‘তাই নাকি’?
‘হ্যাঁ’
‘আপনি কিভাবে জানলেন?’
তাহলে শুনুন, সম্প্রতি মিশরের প্রতœতত্ববিধরা কিউপ্লেট্রার শাসন আমলের কয়েকটা ধাতব ¯^র্ন মুদ্রার খোঁজ পেয়েছেন,্ তাতে তাঁর ছবি দেখে তাঁরা একমত হয়েছেন যে, বাস্তবের ক্লিউপেট্রা অত সুন্দরী ছিল না।’
‘কিন্তু আমি যে ক্লিউপেট্রার বই খানা পড়ছি, সেই বইতে তাঁর কয়েকটা ছবি আছে। তাতে তাঁকে দেখতে অপরূপ সুন্দরী মনে হয়।’
‘আপনার চেয়েও সুন্দরী?’
হঠাৎ আসাদের এই কথায় দিবা একটু থতমত খেলো। পরক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
‘কি সব বলছেন?’
দিবা আম্তা আম্তা করে বললো, ‘আমি,আমি সুন্দরী হতে যাবো কেন? কার সাথে কি তুলনা করছেন। কোথায় মিশরের সুন্দরী রানী ক্লিউপেট্রা আর কোথায় ওসমান নগর চা বাগানের দিবা মূখার্জী। কথায় বলে, কিসের সাথে কী? পান্তা ভাতে ঘি।’
‘আমি শতভাগ বলতে পারি যে, আপনি ক্লিউপেট্রা থেকে অনেক সুন্দরী।’ যদিও দিবা আসাদের কাছে নিজের সৌন্দর্য্য লুকাচ্ছে। তবে আসাদের মুখে তার সৌন্দর্য্যরে প্রসংসা শুনতে ভালোই লাগছে। তাছাড়া নিজের সৌন্দয্যের প্রসংশা শুনতে কোন মেয়ের ভালো না লাগে।
দিবা বললো,‘ আপনি কিন্তু ঠিক বলেছেন না।’
‘আমি শতভাগ ঠিক বলছি, আচ্ছা বলুনতো সৌন্দর্য কিসে? শুধু গায়ের রং ফর্সা হলেই একটি মেয়ে সুন্দর? একজন মেয়ের সৌন্দর্যের মাপকাঠি তার গায়ের রং ছাড়া, তার অন্যান্য গুনও তো কাজ করে।’
‘কি সে সব গুন?’
শিক্ষিত, ভালো ব্যবহার, বুদ্ধিমতি, ভালো কাজ জানা ইত্যাদি।’
‘আমার মধ্যে কি এসব আছে?’
‘অবশ্যই আছে,‘তাছাড়া যেগুলো আপনার মধ্যে আছে, তা ক্লিউপেট্টার মধ্যেও নেই।’
‘সে কী রকম?’
‘এ ধরুন আপনি সুকন্ঠী, ভালো গান গাইতে পারেন। কিন্তু ক্লিউপেট্রাতো সুকন্ঠী ছিলেন না, ভালো গানও গাইতে পারতেন না।’
‘আচ্ছা সেটা না হয় মানলাম, কিন্তু সে তো ভালো অভিনয় জানতেন, সে নাকি যার চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি কথা বলতেন তাকে সহজে বশ করে ফেলতেন। জুলিযার্স সিজার ও মার্ক এন্থেনি তার চোখে চোখ রেখে মোহিত হয়ে গিয়েছিলো।’
আসাদ এবার অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে বললো, ‘কালকে নাকি ছায়া দিদি দার্জিলিং চলে যাবে?’
‘হ্যাঁ, দিদির জন্য খুব খারাপ লাগছে।’
‘আপনি কি কখনও দার্জিলিং গিয়েছিলেন?’
‘দিদির সাথে একবার গিয়েছিলাম।’
‘শুনেছি দার্জিলিং খুব সুন্দর জায়গা, সেখানে কি কি দেখেছেন?’
‘অনেক কিছ।ু’
প্রতিদিন অফিস থেকে আসা যাওয়ার এই পথটা আসাদের সাথে দিবার দেখা ও কথোপোকন, এরই মধ্যে তারা একে অপরের অনেক কাছাকাছি এসেছে। দুজনের সম্বোধন আপনি থেকে তুমি হয়েছে। তবে সবার সামনে দিবা আসাদকে আপনি বলেই সম্বোধন করে, আর আসাদ দিবাকে তুমি বলে সম্বোধন করে।

হঠাৎ পাগলা ঘন্টির আওয়াজে আসাদের ঘুম ভাঙলো। দেওয়াল ঘড়িতে দেখল রাত ২টা। কারণ কি? বাহিরে লোকজনের হট্টগেলা শোনা যাচ্ছে। বাগানে সাধারণত: চোর ডাকাত পড়লে বা কোন বিপদ ঘটলে রাত্রে যে ঘন্টা বাজে। তাকে পাগলা ঘন্টি বলে। আসাদ উঠে তার রুমের দরজা খুলে দেখে, বাসার সামনের রাস্তায় লোকজন দৌড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে সূর্য বাবু, হেমন্ত বাবু সবাই দরজা খুলে সামনের রাস্তায় এলো। ফুলছড়া বড় বাবুর (টিলা) বাসার দিকে সবাই যাচ্ছে। কে একজন বললো, বড় বাবুর অবস্থা ভালো না। আসাদ, সূর্যবাবু, হেমন্ত বাবু, বড় বাবুর বাসার দিকে ছুটলো। যেয়ে দেখলো অজয় বাবু ( বর্তমান ফুলছড়া টিলা বড়বাবু) অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। তাঁর স্ত্রী বললো, রাত ১২টার দিকে বুকে খুব ব্যথা উঠেছে। সেই থেকে এই অবস্থা। অজয়বাবু ফুলছড়া ফাঁড়ি বাগানের বড় টিলা বাবু। বয়স প্রায় ৫৬/৫৭ হবে। প্রেসার ও ডায়াবেটিক্স এর সমস্যা আছে। এক ছেলেও এক মেয়ে। ছেলে লন্ডনে থাকে। আর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আসাদ দেখলো পাশে কম্পাউন্ডার বাবু আছে। এদিকে আসাদ জাগহাটি কোম্পানী হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন দিল। ফুলছড়া থেকে জাগহাটির দূরুত্ব ১.৫ কি: মি: হবে, অ্যাম্বুলেন্স আসতে একটু দেরী হচ্ছে।
একটু পরেই এ্যাম্বুলেন্স বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। আসাদ, সূর্যবাবু, হেমন্তবাবু সবাই ধরাধরি করে বিজয়বাবুকে এ্যাম্বুলেন্সে উঠালো। সূর্যবাবু ,আসাদ এবং বিজয়বাবুর স্ত্রী এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে উঠলো। এ্যাম্বলেন্স জাগহাটির দিকে ছুটলো। বিজয় বাবুকে স্ট্রেচারে করে বেডে নেওয়া হলো। ডাক্তার এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করলো, পালস্ দেখলো। তারপর বিজয়বাবুর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললো,‘সরি উনি নেই’ বিজয় বাবুর স্ত্রী চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। সকাল হতেই পুরো ওসমান নগর চা বাগান প্রচার হয়ে গেল, বিজয়বাবু মারা গেছেন। দলে দলে লোক হাসপাতাল দিকে ছুটলো, তাকে এক নজর দেখার জন্য। ততক্ষনে তাকে বাসায় নিয়ে আনা হলো। লোকজন হাসপাতাল থেকে তার বাসার দিকে আসতে লাগলো। বড় সাহেব, ছোট সাহেবসহ অন্যান্য বাবুরা আসলেন। বড় সাহেবকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছে, কারণ বিজয় বাবুর মত এত ভালোমানুষ ও দক্ষ প্ল্যান্টার পাওয়া খুবই দুষ্কর। চাকুরীর শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছেন আর ৩ বৎসর বাকী ছিল। অবশ্য ছেলে মেয়েদের মানুষ করেছেন। এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে লন্ডনে থাকে। আর মেয়ে ডাক্তার, বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বড় সাহেব তার পরিবার বর্গকে সান্তনা দিলেন। দুপুরের পর বিজয়বাবুর সৎকার করা হলো।
পরদিন বিকেলের দিকে বড় সাহেব সব বাবু সর্দার ও পঞ্চায়েতদেরকে অফিসে ডাকলেন। বড় সাহেব তার কথার শুরুতে বললেন,‘আপনারা জানেন, আমাদের বিজয়বাবু ইহলোক ত্যাগ করেছেন। সৃষ্টিকর্তা তাকে ¯^র্গবাসী করুন। তিনি খুব ঙনবফরবহঃ এবং ভালো এমপ্লোয়িস ছিলেন এবং একজন ভালো প্ল্যানটার ছিলেন। তার স্থান পূরণ হতে অনেক সময় লাগবে।’
তারপর হেমন্তবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন ‘বাবু ওনারতো কোন পোষ্য নেই, ছেলে থাকে লন্ডন। আর মেয়েতো ডাক্তার।
‘জ্বী স্যার।’
‘থাকলে তো চাকুরি দেওয়া যেতো।’
‘জ্বী স্যার।’
অফিস বড়বাবু বললো, ‘ ওনার ছেলে মেয়ে দুজনই প্রতিষ্ঠিত। তাছাড়া শমাশের নগরে ওনি বাড়ী করেছেন। সেখান থেকে ভাড়া পান।’
‘সে আমি জানি।’
বড় সাহেব এবার সূর্য্যবাবুর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সূর্য্যবাবু আপনি আপাতত: বিজয় বাবুর দফাটা দেখেন।’
আসাদকে বললেন, ‘ আসাদবাবু আপনি আপাতত সূর্য্যবাবুর দফা দেখবেন।’ তারপর অফিস বড় বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বড় বাবু অফিসের কাজটা আপাততঃ আপনারা চালিয়ে যান। মাস খানের মধ্যে আমি নতুন নিয়োগের ব্যবস্থা করছি। বড় সাহেব, সব বড়বাবু ও হেমন্তবাবুকে তার রুমে থাকতে বললেন। আর সব বাবু ও পঞ্চায়েতদেরকে যেতে বললেন। তারপর হেমন্তবাবুর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ‘বাবু শরীর কেমন?’
‘আপনাদের আর্শিবাদে ভালো স্যার।’
‘এই বয়সে কোনো চাকুরি করতে পারবেন?’
হেমন্ত বাবু একটু আশ্চার্য হলেন, মৃদু হেসে বললেন, ‘কি রকম চাকুরী স্যার?’
‘না আপনাকে কোন বড় রকমের কাজ করতে হবে না। শুধু মাত্র একজনের গাইড এবং শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে হবে। অবশ্য এর জন্য মাসিক ভালো ভাতা পাবেন।’
বড় সাহেব সবার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন,‘আমাদের বাগানে একজন ব্রিটিশ ম্যাডাম আসছেন, উনি আবার আমাদের লন্ডন অফিসে এডমিনে জব করেন। ওনার নানা ওসমান নগর চা বাগানের বড় সাহেব ছিলেন। আগে তো ব্রিটিশ সাহেবরা সব টী গার্ডেনের বড় সাহেব ছিলেন। ওনার মায়ের জন্ম আমাদের এই ফুলছড়া চা বাগানের বাংলোয়। উনার বাবা বাঙ্গালী মুসলমান, সিলেট জেলার অধিবাসী। আর মা স্কর্টিশ। আবার উনার মা সম্পর্কের দিকে আমাদের ওয়াট্সন ব্রাদার্সের আত্মীয়, অতএব বুঝতেই পারছেন উনি মালিক পক্ষের লোক।’
উনি এখানে আসছেন চা বাগাান নিয়ে গবেষনা করতে। অতএব তার কাজে আমাদের সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, তাই আমি অনেক ভেবে চিন্তে উনার এই গবেষনা কাজে সহযোগিতা করার জন্য হেমন্তবাবুকে দ্বায়িত্ব দিচ্ছি। আর ওলিবাবু ও আসাদকে ওনার সুবিধা অসুবিধা ও সার্বিক তত্বাবধান এবং মার্কেটিং এর দ্বায়িত্ব দিলাম। উনি প্রয়োজনে যার কাছে যা সহযোগিতা চায়, তাকে সহযোগিতা করবেন। মনে রাখবেন, এ ব্যাপারে কারও গাফলতি পাওয়া গেলে হেড অফিস কাউকে ছাড়বে না।’
হেমন্ত বাবু বললেন,‘স্যার, উনি কখন আসছেন?’
‘সম্ভবত: আগামী মাসে আসতে পারেন।’
এর পর বড় সাহেব ফুলছড়ার ছোট সাহেবকে বললেন, ‘তুমি জাগহাটিতে যে, ডাক্তার বাংলো খালি আছে, তাতে শিফ্ট করবে।’
তারপর ওলি বাবুকে বললেন, ওলি বাবু, ‘আপনি আর হেমন্তবাবু মিলে কাল ফুলছড়া বাংলোটা ভালো করে দেখবেন। বাংলোর বিভিন্ন রুম, ওয়াশ রুম, বারান্দা সংস্কার করতে হবে কিনা? তা আমাকে জানাবেন।’
মাস খানেক হলো বিজয় বাবু মারা গিয়েছেন। তার ছেলে লন্ডন থেকে এসেছেন। মেয়ে এখন আপাতত: মায়ের সাথে থাকে। ফুলছড়া থেকে শ্রীমঙ্গল যেয়ে অফিসের ডিউটি করে। ¯^ামী সংসার ছেলে মেয়ে আছে। তাদের স্কুল আছে, দুই ভাইবোন মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, মালপত্র গুলো তাদের শমশেরনগরের বাসায় একটা রুমে রাখবে। আর তার মা থাকবে আপাতত: মেয়ের সাথে। এরপর ছেলে লন্ডনে যেয়ে মায়ের জন্য সিটিজেন শীপের আবেদন করবে। পরে তাকে নিয়ে যাবে। সেই মোতাবেক বাসার মালপত্র শমশের নগরের বাসায় একটা রুমে রাখলো এবং বাগানের বাসা ছেড়ে দিল। মা মেয়ের কাছে শ্রীমঙ্গল চলে গেল এবং ছেলে লন্ডন চলে গেল।
অফিস থেকে টিলায় ট্রান্সপার হওয়ার পর আসাদের কাজের ধরন ও ড্রেস-আপ ও পাল্টে গেল। আগে তাকে ফুলছড়া হতে মেইন গার্ডেন (ওসমান নগরে) এ এসে অফিসে ডিউটি করতে হতো। এখন ফুলছড়া ফাঁড়ি বাগানে অফিস করতে হয়। সকাল ৬.৩০ টা থেকে ৮.৩০ টা অফিস। বাগানের ভাষায় এই সময়কে মাষ্টারিং বলে। মাষ্টারিং হলো সারাদিনের কাজের প্রোগ্রাম। এ ছাড়া টিলা এবং লাইন চৌকিদারের ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট । আসাদ টিলার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো। টিলার কাজ সংক্রান্ত কোন সমস্যা হলে সূর্য বাবু, হেমন্তবাবু থেকে সহায়তা নিচ্ছে। সেদিন টিলায় পাতি ওজন দিচ্ছে এমন সময় ছোট সাহেব আসাদকে বললো,‘বড় সাহেব বলেছেন, আপনাকে বিজয়বাবুর বাসায় শিফট্ করতে। কাল বাগান ছুটি আছে, তাই ৩/৪ জন কামলা নিয়ে বাসাটা পরিষ্কার করে আপনার ফার্নিচার নিয়ে বাসায় উঠে পড়–ন।’
‘জী-স্যার।’
আসাদ মনে মনে ভাবলো, ফার্নিচার বলতে একটা খাট, একটা টেবিল ও চেয়ার। এতদিন হেমন্ত বাবুর বাসায় ছিলো, কোন সমস্যা হয় নি। এখন নতুন কিছু ফার্নিচার কিনতে হবে। বাসাটাও অনেক বড়। পাঁচ রুমের বাসা।
খুব সুন্দর এবং পারি পাটি করে আসাদ তার নতুন বাসা গুছিয়ে নিয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে হেমন্তবাবু, ওলিবাবু তাকে খুব সহায়তা করেছেন। হেমন্ত বাবু, ওলি বাবু ও আসাদকে নিয়ে শমশের নগর বাজারে গেলেন এবং বাসার জন্য কিছু ফার্নিচার কিনলেন। প্রায় দেড় বৎসর চাকুরী হয়েছে। কিছু টাকা আসাদের হাতে জমেছিল। সেই টাকা এখন বাসা সাজাতে কাজে লাগলো। দিবা-রাত্রি তার বাসা সুন্দর করে সাজিয়ে দিল। আসাদের বাসা দক্ষিণমুখী। সামনে বড় বারান্দা। তার সামনে ফুলের বাগান।অবশ্য বিজয়বাবুই বাগানটা সৃজন করেছিলেন। গোলাপ, জবা, রজনীগন্ধা হরেক রকম ফুল ফুটে আছে। দিবা, রাত্রি, আসাদ শমমের নগর যেয়ে, নার্সারী থেকে কিছ ফুলের টব নিয়ে এনে বারান্দা সাজালো। বাসার পিছনে রান্না ঘর। তার পিছনে সব্জি বাড়ী। বাগান থেকে ফ্রি কামলা পাওয়া যায়। তাদের দিয়ে সবজির চাষ ও ফুল বাগানের পরিচর্যা করায়। হেমন্তবাবুর পাশের বাসা যতীন বাবুর বাসা, তার পরের বাসা আসাদের । আসাদ নতুন বাসায় উঠেছে ঠিকই কিন্তু খাওয়া দাওয়া এখনও হেমন্তবাবুর বাসায় রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে হেমন্তবাবু ছাড় দিতে নারাজ। তিনি বললেন,‘নতুন বাসা পেয়েছ ঠিক আছে, সেখানে শুধু থাকবে। আর খাওয়া দাওয়া আমাদের বাসায় করবে। ঠিক আগের মতই।’
তাঁর কথায় দিবা ও ফাগুনী সায় দিল। সেই থেকে খাওয়া দাওয়া হেমন্তবাবুর বাসায়,আর থাকা নিজ বাসায়।
বেশ কয়দিন দিবার সাথে আসাদের দেখা হচ্ছে না। কারণ আসাদ শ্রীমঙ্গলে শ্রম কল্যাণ বিষয়ক সেমিনারে অংশ গ্রহণ করার জন্য সকালে বের হয়ে যায়। সন্ধ্যায় শমশেরনগর এসে, মেইন গার্ডেনে ওলিবাবুর বাসায় যায়, সেখানে গল্পগুজব ও রাত্রের খাওয়া সেরে, ফুলছড়া আসতে অনেক রাত হয়ে যায়। দিবা পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। তাই আসাদও মোবাইলে তাকে ডিস্টার্ব দেয় না।
রাত প্রায় ১০টা। আসাদ সবেমাত্র বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পেপার পড়ছে। এমন সময় দিবা ফোন দিল। ‘তোমাকে খুব মিস্ করছি।’
‘সত্যি।’
‘হ্যাঁ সত্যি।’
‘যদি সত্যি হয়, তাহলে যখন ফোন দিলাম তখন ফোন কেটে দিলে কেন?’
‘আরে মশাই,তখন আমি আব্বুর সাথে কথা বলছি।’
‘আর তুমি যখন কল দিয়েছিলে, আমি তখন সেমিনারে।’
‘ও আচ্ছা।’
আসাদ বলল, ‘কী করছ?’
‘পড়ছি।’
‘এই জন্যইতো ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব দিচ্ছি না।’
‘কিন্তু এই দুই দিন তোমাকে না দেখতে পেরে খুব খারাপ লাগছে।’
‘আমার ও খুব খারাপ লাগছে।’
‘তার চাইতে আগেই ভালো ছিল।’
‘কি রকম?’
এই যে, তুমি আগে আমাদের বাসায় যখন থাকতে, তখনই ভালো ছিল। তখন সারাক্ষন তোমাকে দেখতে পেতাম।’
‘এখন কি দেখতে পাও না?’
‘না, কারন সকাল বেলায় তুমি যখন ব্রেকফাস্ট সারাও, তখন আমি ঘুম থেকে উঠি। দুপুরে যখন টিলা থেকে আস, তখন আমি কলেজে, রাতে যখন খেতে আস, তখন আমি পড়ার টেবিলে। যখন অফিসে ছিলে, তখন মেইন গার্ডেন থেকে দুজনে একসাথে আসতে পারতাম, আমাকে কবিতা উপহার দিতে।’
আসাদ বললো,‘ ঠিকই বলেছ।’
‘এই একটা কবিতা শোনাও তোমার মুখে কবিতা শুনতে ইচ্ছে করছে।’
‘কি কবিতা শোনাবো? আমার সব কবিতা-তো সব তোমাকে শোনানো হয়েছে।’
‘তারপরও একটা শোনাও।’
আসাদ কবিতা আবৃত্তি শুরু করলো,
‘আমার সব ভালোবাসা, সব কবিতা তোমাকে দিয়েছি উপহার,
তোমাকে দেবার মতো আর কিছু নেই আমার।
ওগো মন-মানষী আমার
কী উপমা দেবো তোমার
তুমি আমার কবিতার ছন্দ
তোমার ভালোবাসায় আমি অন্ধ
ওগো মোর প্রেয়সী
তুমি আমার পথ চলার সাথী
তোমাকে পেয়ে আমি ধন্য
তুমি আমার এক গুচ্ছ গোলাপের সুবাস
তুমি আমার ঝিরি ঝিরি দ¶িনা বাতাস
তুমি আমার শ্রাবনের বৃষ্টিধারা
তোমাকে কাছে পেলে হই আত§হারা।’
দিবা বললো,‘আসাধারন!, খুব সুন্দর হয়েছে। আমাকে নিয়ে কবিতা লেখার জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।
আসাদ বললো,‘এই তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। তাই ভিডিও কল দিচ্ছি।’
অল্পক্ষন পরেই দিবার ছবি আসাদের মোবাইলে ভেসে উঠলো। দিবা পড়ার টেবিলে। পরনে গোলাপী সেলোয়ার কামিজ পরিহিতা দিবাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।
‘আসাদ আসাদ বললো, ‘আজকে তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’
‘শুধু কি আজকে?’
‘না মানে বলছিলাম কি, গোলাপী কালারের এই ড্রেসটা তোমাকে খুব মানিয়েছে। এই ড্রেস পরতে তোমাকে আগে কখনও দেখেনি।’
‘তাই নাকি?’
‘তাহলে গায়ের সুন্দর আর ড্রেসের সুন্দরকে ভালোবাসো, নাকি আমি দিবাকে ভালোবাস? ধর আমার গায়ের রং ফর্সা না এবং চেহারা যদি সুন্দর না হতো, তাহলে আমাকে কি ভালোবাসতে? শোনো, মানুষের সৌন্দর্য্য তার ভিতরের মন,
বাহ্যিক নয়।’
‘আসাদ তর্ক না করে বললো, ‘মানছি বাবা মানছি। এখন তোমার ওকালতি যুক্তি রাখো তো।’
‘তোমাকে তো খুব স্মার্ট দেখাচ্ছে। পরনে কোয়াটার প্যান্ট আর গেঞ্চি পরিহিত আমার টিলা বাবুকে খুব অপূর্ব লাগছে।’ সুযোগ পেয়ে এবার আসাদ বললো, ‘এই সুন্দরতো বাহ্যিক, দুজনে হেসে উঠলো।’
আসাদ বললো, ‘নতুন খবর আছে।’
‘কি খবর?’
‘আমাদের বাগানে যে বিলাতী মেম সাহেব আসার কথা ছিল, সে এসেছে।’ দিবা এই কথা আসাদের কাছ থেকে শুনতে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।
দিবা বললো, ‘হ্যাঁ আমি শুনেছি।’
‘কার কাছে?’
‘আব্বুর কাছে, তা উনি কোন বাংলোয় উঠেছেন?’
‘কোম্পানী গেস্ট হাউজে উঠেছেন, আজকে ওলি ভাইয়ের সাথে গেস্ট হাউজে গিয়েছিলাম।’
‘কেনো গিয়েছিলে?’
‘ওলি ভাই নিয়ে গিয়েছিল।’
‘তারপর কি দেখলে?’
‘উনাকে দেখলাম।’
‘বয়স কত হবে?’
‘এই ধরো, তোমার বয়সী হবে। লম্বা ও গোলাপী বর্নের।’
আসাদের এই কথায় দিবার কপালে যেন ভাঁজ পড়লো।
‘থাক্ থাক্ তোমাকে আর বর্ননা দিতে হবে না।’
‘তার মানে?’
‘মানে, হঠাৎ তাকে নিয়ে তোমার এত কৌতুহল কেন?’
‘আমার কৌতুহল হবে কেন? বড় সাহেব আমাকে, কাকাবাবু ও ওলি ভাইকে, তাঁর সুবিধা আসুবিধা দেখার জন্য দ্বায়িত্ব দিয়েছেন।’
‘ওনার সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য আব্বু ও ওলি মামা আছে, তোমার না দেখলেও চলবে।’
‘ বড় মুশকিল, আমি বলি কি, আর সে বোঝে কী। আরে ম্যাডাম চাকুরী করতে হলে, বড় সাহেবের নির্দেশ মানতে হবে। এখন মন খারাপ না করে পড়ায় মন দাও। নয়তো ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়ে গেছে।’
‘আমার পড়ার কথা তোমার না ভাবলেও চলবে।’ বলে অভিমানে দিবা মোবাইল রেখে দিল। আসাদ কয়েকবার রিং দিল। দিবা কেটে দিল।কিছুক্ষণ পর আসাদ আবার রিং দিল, এবার দিবা ধরলো।
‘ডিস্টার্ব করছ কেন?’
‘রাগ করেছ?’
‘না- পড়তে দাও, কালকে পরীক্ষা।’ বলে মোবাইল রেখে দিল।
বড় সাহেব তার বাংলোয় বিলেতী ম্যাডামের সম্মানে পার্টি ডাকলেন, পার্টিতে সব সাহেব ও মেম সাহেবরা অংশগ্রহণ করলেন। ওলি বাবু পার্টির ব্যবস্থা করলেন। পার্টিতে হেমন্ত বাবু ও আসাদকে বড় সাহেব থাকার জন্য বললেন। বড় সাহেব বিলেতী ম্যাডামকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
বড় সাহেব বললেন, ‘ওনার নাম গুলবাহার জাহান মুনমুন। উনার পৈত্রিক নিবাস এই সিলেটে। আমাদের লন্ডন অফিসে এডমিন বিভাগে আছেন। উনি এখানে এসেছেন টী গার্ডেন নিয়ে গবেষনা করতে। বড় সাহেব আরও বললেন, ‘তাঁর এই কাজে আমাদের সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, বিশেষ করে হেমন্ত বাবু, ওলিবাবু ও আসাদকে এ ব্যাপারে বিশেষ দ্বায়িত্ব দেওয়া হল।’
বড় সাহেব-হেমন্তবাবু, ওলিবাবু ও আসাদের সাথে মুনমুন ম্যাডামের পরিচয় করে দিলেন। পার্টি শেষে মুনমুন ম্যাডামকে সবাই তার বাংলোয় উঠিয়ে দিলেন।বড় সাহেব ঘুরে ঘুরে মুনমুনকে বাংলোর প্রতিটি রুম দেখালেন।
মুনমুন আসাদ বললো, ‘সব ঠিক আছে।’
তারপর মুনমুন বড় সাহেবকে আসাদ বললো, ‘কাল আমাকে ঢাকায় যেতে হবে, এমবেসিতে ভিসা সংক্রান্ত কাজ আছে। ফিরতে সপ্তাহ খানেক লাগবে। ঢাকা থেকে এসে কাজ শুরু করবো।’
চা বাগানে সাধারণত শ্রমিকদের মজুরি সপ্তাহিক হিসেবে দেওয়া হয়। একজন শ্রমিক দৈনিক ২০ কেজি পাতা উঠালে তার হাজিরা পূর্ণ হয়। এরপর প্রতি কেজি পাতা উঠানের জন্য অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয়। এ হিসেবে একজন শ্রমিক তার দৈনিক মজুরির সাথে অতিরিক্ত টাকাও পেয়ে থাকে। সাপ্তাহিক মজুরির তারিখকে বাগানী ভাষায় তলব বার বলা হয়। মেইন গার্ডেন ও ফাড়ি বাগানগুলোতে একই তারিখে মজুরি দেওয়া হয়। অবশ্য তার আগে মেইন গার্ডেনে, প্রত্যেক ফাঁড়ি বাগান থেকে ছোট সাহেব ও টিলবাবু ¯^াক্ষরিত পেমেন্ট সামারি ¯িøপ মেইন গার্ডেনে এর অফিসে পাঠাতে হয়। সেই মোতাবেক অফিস বড়বাবু ও অন্যান্য বাবুরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আনে এবং বন্টন করে। কোম্পানী গাড়ী করে বেলা ১ টার মধ্যে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বাবুরা হাজিরা বই অনুযায়ী পেমেন্ট দেয়। ওসমান নগর চা বাগানে সাধারণত বুধবার দিন সপ্তাহিক মজুরি দেওয়া হয়। এই উপলক্ষে মেইন গার্ডেনে ও ফাঁড়ি বাগানের অফিস শ্রমিকদের পদচারণায় ভরে উঠে। একই দিন আবার সপ্তাহিক রেশন (আটা) দেওয়া হয়। ৪ টার দিকে মজুরি দেওয়া শুরু হয়। ৬ টা পর্যন্ত চলে। তলব বার (পেমেন্ট ডে)উপলক্ষে মেইন গার্ডেন ও ফাঁড়ি বাগানগুলোতে সপ্তাহিক হাট বাজার বসে। দূর-দূরান্ত থেকে বেপারীরা এসে দোকান সাজিয়ে বসে। সস্তা মানের শাড়ী, ব্ল¬াউজ, পেটিকোট, শাট, প্যান্ট, জুতা ছোট বাচ্চাদের কাপড়, খেলনা থেকে চাল, ডাল, মাছ, মুরগী ও সব্জীর বাজার বসে। ফুলছড়াতে তিন দফায় তিনটা হাজিরা বই।আসাদ, সূর্যবাবু, ¯^পন বাবু সপ্তাহিক তলব দেয়।
প্রতি দফায় প্রায় ২০০ জন শ্রমিক এক বাবুর অধীনে কাজ করে। উক্ত দফার বাবু, শ্রমিকদেরকে তলব দেয়। তলব দেওয়ার সময় সর্দার, ছোট সাহেব পেমেন্ট টেবিলে থাকে। বাবু হাজিরা বই দেখে, শ্রমিকের নাম ধরে ডাক দেয় এবং টাকার পরিমান উল্লেখ করে। ছোট সাহেব নিজ হাতে পেমেন্ট দেয়. সর্দার লক্ষ্য রাখে। কারও কোন সমস্যা থাকলে, সর্দার তা বুঝিয়ে দেয়। অফিসের সামনে খোলা জায়গায় চেয়ার টেবিল সাজিয়ে তলব দেওয়া হয়। আজ সপ্তাহিক তলব বার। আসাদ ছোট সাহেবকে নিয়ে, সূর্য্য বাবু কম্পাউন্ডার বাবুকে নিয়ে, ¯^পন বাবু অনিল মাষ্টার বাবুকে নিয়ে, তলব দিচ্ছে। অন্য বাবু মাষ্টার সুশীল বাবু, রেশন কার্ড দেখে নাম ডেকে রেশন দিচ্ছে। সাধারণত: একজন শ্রমিক সপ্তাহে ৩১২ কেজি আটা পায় এবং মা অথবা স্ত্রী থাকলে ২১২ কেজি, (১-৮) বৎসরের বাচ্চা থাকলে ১১২ কেজি আট পায়। (৯-১২) বৎসরের বাচ্চা থাকলে ২১২ কেজি আট পায়। সব মিলিয়ে একজন শ্রমিক সপ্তাহে ৮/৯ কেজি রেশন পায়। সাড়ে ছয়টা বেজে গেছে পেমেন্ট এখন শেষ পর্যায়ে। কয়েকজনের পেমেন্ট এখনও বাকী। এমন সময় আসাদের বাসার কামলা সীতারাম এসে বললো,
‘বাবু বাসায় কুটুম (অতিথি) এসেছে।’
‘কুটুম! কোথা থেকে এসেছে?’
‘আপনার দেশের বাড়ি থেকে।’
আাসাদ একটু অবাক হলো, কারন দেশের বাড়ীর কেউ এলে, তাকে আগেই ফোনে জানিয়ে আসে। এভাবে হঠাৎ কে আসলো? আসাদ লিস্ট এবং টাকা সর্দারের হাতে দিয়ে সীতারামকে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা হলো। ফুলছড়া অফিস থেকে বাসার দূরুত্ব মিনিট পাঁচেকের পথ। আসাদের বাসা দক্ষিনমুখী, পাঁচ রুমের বাসা। সামনে খোলা বারান্দা এবং ফুল বাগান। বাসার চারিদিকে কাঠাল, আম, লিচু, ফল ফলাদির গাছ। বাসার পিছনে রান্নাঘর। তার পিছনে সব্জি ক্ষেত। বাসার সামনে এসে আসাদ একটু অবাক হলো। ভুল দেখছে না-তো। তার দুই বন্ধু জিকো, মভিজ ও ২০/২১ বৎসরে একটা মেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ।জিকো তার সমবয়সী বন্ধু। আর মুভিজ ৩/৪ বৎসররের জুনিয়র বন্ধু। তিনজনে এক পার্টি এবং এক ক্লাবের সদস্য। আসাদ জিকোর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কিরে হঠাৎ করে এভাবে কোন খবর না দিয়ে-
তারপর মুভিজের দিকে তাকিয়ে বললো.‘ মুভিজ কি ব্যাপার, হঠাৎ এভাবে?’
জিকো বললো, ‘আরে আগে ঘরে বসতে দে, তারপর সব কথা হবে।’
সীতারাম বাসার তালা খুললো। সবাই বাসার ভিতরে গিয়ে সোফায় বসলো।
মুভিজ বললো, ‘ভাইয়া বাসাতো বেশী সুন্দর করে সাজিয়েছেন। এতবড় বাসা, রাতে একা থাকেন কি করে?’
আসাদ জিকোকে বললো,‘তা তোরা কি করে? কোন ফোন না দিয়ে আসলি? তাছাড়া আজ সপ্তাহ খানেক তোদেরকে ফোন করি, রিং হয় অথচ কেটে দিস, কারণ কী?’
জিকো বললো, ‘এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা।’
মুভিজ বললো, ‘ভাইয়া গলা শুকিয়ে গেল, পানি খাবো।’
আ্সাদ সীতারামকে পানি আনতে বললো।
‘তা জিকো, এলাকার কি খবর? পার্টি এবং ক্লাবের কি খবর?’
‘রাখ তোর পার্টিÑ ক্লাব, জান নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে গেছে’
‘কি বলিস, এলাকায় কোন গ্যাঞ্জাম হয়েছে নাকি?’
মুভিজ বললো, গ্যাঞ্জাম না ঘটলে এভাবে কেউ ফোন-খবর না দিয়ে এই জঙ্গলে চলে আসে?’
‘কি ব্যাপার, ‘জিকো কিছু বল?’
‘জিকো বললো, ‘আর কি বলবো, বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে।’
‘কি সমস্যা?’
‘সমস্যা ওনাকে নিয়ে, বলে মুভিজ মেয়েটার দিকে ইংগিত করলো ।
মেয়েটা একটু হাসলো। আ্সাদ মেয়েটার দিকে তাকালো। মেয়েটা ফর্সা, লম্বা, গায়ে সেলোয়ার কামিজ পরিহিত।
এরপর জিকো, মুভিজ ও আসাদকে নিয়ে বারান্দায় এসে বললো, ‘মেয়েটা আমাদের এলাকার উপজেলা চেয়ারম্যানের মেয়ে। প্রায় এক বৎসর তার সাথে আমার সম্পর্ক। তুইতো জানিস, তারা এলাকার সবচাইতে ধনী ও প্রভাবশালী ফ্যমিলি ও শিল্পপতি। তাদের মেয়ের সাথে আমার মত সামান্য স্কুল মাষ্টারের সম্পর্ক তারা মেনে নেবে না। তাই আজ মুভিজ ও তাকে নিয়ে এদিকে চলে আসি।’
আসাদ বললো, ‘এক বৎসর সম্পর্ক! প্রতিদিনতো তোর সাথে ফোনে কথা হয়। অথচ তার কথাতো কথনও বলিস নি।’
মুভিজ বললো, ‘বলবে কি? আজকালকার মেয়েরা আজ একটার সাথে তো কাল আরেকটার সাথে।’
‘কাজী অফিসের কাজ সরিয়েসিছ?’
‘না সরাই কি করে, এলাকার কোথাও সময় সুযোগ পেলাম না।’
আসাদ বললো, বড়ই সমস্যা হলো, ‘বাঘের মুখে পড়েছিস।’ মুভিজ বলল, বাঘের মুখে পড়েছি মানে, ধরতে পারলে কচু কাটা করবে। তাইতো আপনার এই গার্ডেন -এই সেভ জোন মনে করে চলে এলাম।’
আসাদ সাহস দিয়ে বললো ‘ভালোই করেছিস, এখানে এসে। মেয়েতো আমাদের ফেভারে আছে। ওরা যতই প্রভাবশালী ও শিল্পপতি হোক সেটা এলাকায়, এখানে না।’ বলেই আসাদ মোবাইলে রিং দিল।
‘হ্যালো দিবা। ’
‘বলো’
‘তুমি রাত্রিকে নিয়ে আমার বাসার দিকে একটু এসো।’
‘কেন কি হয়েছে?’
‘দেশের বাড়ী থেকে আমার কিছু গেস্ট এসেছে।তুমি রাত্রিকে নিয়ে এখনই চলে এসো।’
‘আচ্ছা আসছি।’
আসাদ, মুভিজ ও জিকোকে নিয়ে আবার বাসায় ঢুকলো।সীতারামকে বললো, ফ্রিজ খুলে কোল্ড ড্রিংকস দেওয়ার জন্য।
তারপর জিকোকে বললো, ‘এখন শোন, আগে বিয়ের কাজটা সেরে ফেল। আমাদের মসজিদের ঈমাম সাহেবকে আমি ফোন করলে এখনই চলে আসবে। বিয়েটা রাতেই সেরে ফেল। জিকো, মুভিজ, মেয়েটা একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটু মিটি মিটি হাসলো।
‘জিকো বললো,‘রাতটা থাক, সকালে কাজী অফিসে যেয়ে একত্রে সব কাজ সেরে আসবো।’
মুভিজ তাতে সায় দিল। একটু পরেই দিবা রাত্রিকে নিয়ে বাসায় ঢুকলো। সীতারাম চারটা গ্লাসে কোল্ড ডিংকস ঢালছে সাথে পিরিছে বিস্কুট সাজাচ্ছে। দিবা ও রাত্রি সীতারামকে সহায়তা করলো।
ট্রে করে এনে, দিবা নিজেই পরিবেশন করলো। আসাদ বললো,‘এই হলো, আমার ঘনিষ্ট বন্ধু জিকো ও মুভিজ।’
দিবা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললো,‘উনি?’
আসাদ একটু আম্তা আম্তা করে বললো, ‘উনি মানে, উনিও আমার বন্ধ।ু’
আসাদ দিবা ও রাত্রিকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে সব খুলে বললো। সব শুনে দিবা বললো, ‘মেয়ে তার ইচ্ছায় এসেছে। এখানে তার গার্জিয়ান কি করতে পারে?’
দিবা আরও বললো,‘চলো ওদের সাথে কথা বলি।’
আসাদ বললো,‘কাকাবাবু কোথায়।’
‘সে কি? তুমি জানো না, তারা আজ দুপুরের দিকে আম্মুসহ কুলাউড়া গেছে।’
‘কেন?’
‘দেশের বাড়ীতে জায়গা জমি সংক্রান্ত ঝামেলা আছে।’
আসাদ দিবাকে বললো,‘তোমরা অতিথিদের সাথে গল্প করো, ‘আমি একটু আসি।’
‘রাত্রি বললো, ‘কোথায় যাচ্ছেন, আসাদ ভাই?’
‘এই তো অফিসের দিকে, কিছু কাজ এখনও বাকী আছে।’ বলে সীতারামকে ডাকলো।
সীতারাম আসাদের সাথে রওয়ানা দিল। অফিসের সামনে এসে দেখে সর্দার, অন্যান্য বাবু, চৌকিদার কেউ নেই। পেমেন্ট শেষে অফিস বন্ধ করে সবাই চলে গেছে।
আসাদ সুরি সর্দারকে মোবাইলে রিং দিল।
‘হ্যালো সর্দার,তুমি কোথায়?’
‘এইতো বাবু আমি বাজারে।’
‘তুমি একটু অফিসের সামনে এসো।’
‘জ্বী বাবু আসছি।’
একটু পরে সুরি সর্দার এলো, ‘বাবু কেন ডেকেছেন?’
‘সর্দার গ্রামের বাড়ী থেকে আমার কিছু অতিথি এসেছে?’
‘অতিথি এসেছে?’
‘হ্যাঁ ’
‘এখন তারা কোথায়?’
‘ আমার বাসায়।’
‘কখন এসেছে?’
‘এইতো একটু আগে।’
‘ সুরি সর্দার বললো, ‘আজকে তো বড় বাবু, (হেমন্ত বাবু) কাকীমাও নেই। এখন কি করবেন?’
‘সেটাই ভাবছি, রাত্রের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা তো করতে হবে।’
‘তা-তো করতে হবে। এক কাজ করুন, গুনতি বাজার এখনও ভাঙেনি। তাড়াতাড়ি আমরা বাজারটা সেরে ফেলি।’
‘আমি ও তা ভাবছি।’
‘তাহলে চলুন, মাছ বাজারে এখনও কিছু বড় মাছ দেখে এসেছি। আর কয়েকটা মুরগি নিলে চলবে।’
আসাদ, সুরি সর্দার ও সীতারামকে নিয়ে মাছ বাজারের দিকে চললো।
ফুলছড়া চা বাগানে উত্তর-দক্ষিনে রাস্তা। রাস্তায় পূর্ব পাশে বাবু ও শ্রমিকদের বাসা। আর পশ্চিম পাশে প্রাইমারি স্কুল, খেলার মাঠ, তার পাশে ফুলছড়া চা বাগানের অফিস। আসন্ন লাল পুজা (হলি, বাসন্তী উৎসব) উপলেক্ষ আজ বাজার বেশ জমেছে। স্কুলের মাঠেই বাজার বসেছে। পুজোর শেষ বাজর। দূর-দূরান্ত থেকে আগত বেপারীরা মলপত্র দিয়ে তাদের দোকান সাজিয়েছে। অন্যন্য দিনের থেকে আজকের বাজার ভালো জমেছে । তাছাড়া পুজা উপলক্ষে শ্রমিকরা বোনাস পেয়েছে। শাড়ী-শার্ট প্যান্ট, বাচ্চাদের কাপড়, মাছ, মুরগী থেকে বাচ্চাদের খেলনা সবই বাজারে উঠেছে। সুরি সর্দার আর আসাদ মাছ বাজারে যেয়ে দেখলো, মাত্র দুটো বড় রুই বিক্রির বাকী আছে। সাধারণত: দামী বড় মাছ উঠলে, যাদের সামর্থ্য আছে, তারা একাই কিনে নেয়। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তারা কয়েকজনে একত্রে কিনে ভাগ করে নেয়। আসাদ দেখলো মাছ আর নেই, তাই দুটোই নিয়ে নিল। মোট ৭ কেজি হলো।
পাশে মুরগীর দোকান। সেখান থেকে এক হালি মুরগি নিলো। সীতারাম দুহাতে মাছ ও মুরগী নিলো। তারপর মুদি দোকান থেকে কিছু সওদা নিলো। আসাদ বললো, ‘সর্দার মাছ মুরগীতো নিলাম, রাঁধবে কে?’
‘সে আপনাকে ভাবতে হবে না।’
‘মুনমুন ম্যাডাম এর বাংলোর বাবুচির্, সুগীরকে আমি এই মাত্র কাপড়ের দোকানে দেখেছি, তাকে ডেকে নেবো।’
সুরি সর্দার আসাদকে নিয়ে কাপড়ের দোকানের দিকে গেল এবং সুগীরকেও সাথে নিয়ে নিলো। আসার পথে সুরি সর্দার তার মেয়ে মালতী ও আসাদের বাসার মেয়ে কামলা লক্ষীকেও সাথে নিয়ে নিলো।
সীতারামের দুহাতে মাছ মুরগী, সুরি সর্দারের হাতে মুদি মালামাল নিয়ে, তারা যখন বাসায় পৌঁছালো, তখন রাত -৮টা। এরই মধ্যে দিবা, রাত্রি, ফারিয়া, মুভিজ ও জিকো খুব খোশ-গল্পে মেতে উঠেছে।
দিবা বললো,‘আমাদেরকে বসিয়ে রেখে তোমরা কোথায় গিয়েছিলে? আবার দেখছি বাজার। আমাদের বাসার ফ্রিজে মাছ মাংস সবই আছে। আবার এগুলো আনতে গেলে কেন? আব্বু শুনলে খুব ক্ষেপে যাবে।’
সুরি সর্দার বললো, ‘দিদি ভাই, বড় বাবুকে(হেমন্তবাবু) আমি সামলাবো। রান্না এ বাসায় হবে। তুমি, রাত্রিদি, মালতী ,লক্ষী, সুগিরকে একটু সাহায্য কর। আর আমি তো আছি। আজ না হয় আমরা ছোট বাবুর (আসাদ) বাসায় পিক্নিক করবো, কি বাবু ঠিক বলিনি?’ বলে সুরি সর্দার হেসে উঠলো।
আসাদ হেসে বললো, ‘ঠিক বলেছ সর্দার।’
সবাই মিলে কাজ শুরু করলো। সুগীর বাবুর্চি চুলায় আগুন দিল। তাকে মালতী ও লক্ষী সহায়তা করতে লাগলো। মাঝে মাঝে সুরি সর্দার রান্না ঘরে যেয়ে খোঁজ খবর নেয় এবং হাঁকডাক দেয়।
অনেক দিন পরে আসাদ, জিকো ও মুভিজকে পেয়ে খোশ-গল্পে মেতে উঠলো। এলাকার খবর, পার্টির কথা, ক্লাবের কথা।
এদিকে দিবা-রাত্রি, ফারিয়াকে নিয়ে গল্পে মেতে উঠেছে। এরই মধ্যে দুবার করে চা এলো। সুগীর বাবুর্চির রান্নার নাম ডাক আছে। অনেক সাহেব মেস সাহেবকে রান্না করে খাওয়াইয়াছে। একটু পরে মাংস রান্নার ঘ্রান ভেসে আসলো। সুগীর বাবুর্চি ড্রয়িং রুমে এসে দিবা ও আসাদকে ডেকে রান্না ঘরে নিয়ে গেল। সুরি সর্দার ও সেখানে আছে। সুগীর বাবুর্চি একটা বাটিতে কয়েক টুকরা রান্নার মাংস দিবার হাতে দিয়ে বললো,
‘দিদি, একটু দেখুনতো ঠিক আছে কি না?’
দিবা একটু মুখে দিয়ে বললো,‘ঠিক আছে।’
আসাদ বললো,‘সুগীর সব রান্না শেষ হয়েছে?’
‘জী ছোটবাবু, সব শেষ হয়েছে, শুধু মাংসটুকু বাকী।’
তারপর সুগীর, নিজেই রন্ধনকৃত সামগ্রীগুলো ঢাকনা উল্টিয়ে দেখালো। মাছ, মাংস, পোলও ডিম, সব্জি ভাজি ও রোষ্ট। রান্না যখন শেষ হলো তখন রাত ১১ টা। টেবিলে খাবার দেওয়া হলো। জিকো, ফারিয়া, মুভিজ, আসাদ, রাত্রি খেতে বসলো। দিবা সবাইকে পরিবেশন করছে।
রাত্রি মুভিজের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘মুভিজ ভাই, তিনজন আসা ঠিক হয়নি, জোড় মিলিয়ে আসতেন।’
‘সেটা কোথায় পাবো?’
‘কেন, এখনও খুঁজে পাননি?’
‘না পাই নি।’
‘তাহলে বলুন, ব্যবস্থা করে ফেলি।’
‘কেউ আছে নাকি?’
‘শুধু আপনি একবার বলুন, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
‘আমাকে কে গ্রহণ করবে?’
‘কেউ গ্রহন না করলে, আমি তো আছি। ’
তার কথায় সবাই হেসে উঠলো। মেয়েটা কথাবার্তা খুব স্পষ্টবাদী এবং ফ্রি।
সুরি সর্দার ও সুগীর বাবুর্চি রান্নাঘর থেকে একে একে বাটি ভর্তি পোলাও, মাছ, মাংস নিয়ে আসছে।’
সুরি সর্দার বললো,‘দিদি ভাই তুমিতো ওনাদের সাথে বসে যেতে পারতে, এসব আমরা পারতাম।’
‘না সুরিদা, আমি তোমাদের সাথে একত্রে খাবো।’
খাওয়া দাওয়া গল্পগুজব করতে করতে রাত ১টা বেজে গেল। কামলারা খাবার পরই বিদায় নিয়েছে।
আসাদ, জিকো, মুভিজ দিবা রাত্রিসহ সিদ্ধান্ত নিলো, আগামী কাল সকাল ৮টার দিকে শমশের নগর কাজী অফিসে যেয়ে, বিয়ের কাজ সেরে ফেলবে। একটু পরে সুরি সর্দার, দিবা ও রাত্রি বিদায় নিলো। আসাদের বাসা ৫ রুম। সামনে ড্রয়িং রুম, তিন বেড রুম, একটা ষ্টোর রুম, দুই বেড রুমে দুইটা সিংগেল খাট। ফারিয়াকে একটা রুমে থাকার ব্যবস্থা করা হলো। সামনের বড় ড্রয়িং রুমে বিছানা পেতে আসাদ, মুভিজ ও জিকো তিন বন্ধু ফ্লোরিং করলো এবং সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। ভোর রাতে আসাদের ঘুম ভেঙে যায়, দেখে মুভিজ নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে, জিকো পাশে নাই। আসাদ বাথরুম সেরে, মুভিজ এর কাছে এসে, তার ঘুম ভাঙ্গালো।
‘মুভিজ জিকো কই?’
‘ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে মুভিজ বললো,‘বোধ হয় বাথরুমে গেছে।’
‘সেখানেও তো দেখলাম,নেই।’
‘মুভিজ বললো নেই!’
তারপর তারা ফারিয়ার রুমের সামনে এসে দেখলো, রুমের দরজা বন্ধ। আসাদ বললো,‘মুভিজ ব্যাপার কি? জিকো কোথায় গেল?’
মুভিজ দরজায় টোকা দিল। কয়েকবার টোকা দেওয়ার পর ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে জিকো রুমে থেকে বের হয়ে এলো।
আসাদ ঠাট্টা করে বললো,‘কিরে বিয়ের আগেই — তখন পই্ পই্ করে বললাম যে, ইমাম সাহেবকে ডেকে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে, না- তা শুনলি না।’
মুভিজ হো হো করে হেসে উঠে বললো,‘একেই বলে লিভ টুগেদার’
সকাল হয়ে গেছে, আসাদ বললো, ‘যা ফ্রেশ হয়ে নে।’
একটু পরেই দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। আসাদ দরজা খুলে দেখলো, দিবা ও রাত্রি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দিবা ও রাত্রিকে আসাদ বললো, ‘কি ব্যাপার? তোমরা এত সকালে, রাতে ঘুমাও নি?’
দিবা মৃদু হেসে বললো,‘ঘুমাই কি করে? আমরা এখান থেকে যাবার পর আব্বু ফোন দিয়ে বলেছে যে, বাসায় অতিথি এসেছে, তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছি কিনা?’
‘কাকাবাবু জানলেন কি করে?’
‘সূর্য্যদা ফোনে বলেছে, তোমাকে মোবাইলে কল দিয়েছে, তুমি ধরোনি।’
আসাদ ড্রয়ার থেকে মোবাইল নিয়ে দেখলো ৪ মিস্ডকল!
দিবা বললো, ‘আব্বু খুব রেগে গেছেন, তোমার এখানে রান্না হয়েছে শুনে আমি, রাত্রি সূর্য্যদাকে খুব বকা দিয়েছেন। বলেছেন যে, ২/৩ জন মানুষকে তোরা রান্না করে খাওয়াতে পারিস না। আপদার্থরা কোথাকার।তাই সকাল বেলায় ফোন করে আমাদেরকে ঘুম থেকে উঠালো। তারপর বললো, নাস্তা বানিয়ে ওদেরকে বাসায় নিয়ে আয়।’

রাত্রি বললো, ‘জিকো ভাই, ফারিয়াদি, মুভিজ ভাই চলুন আমাদের বাসায়, আবার সবাইকে কাজী অফিসে যেতে হবে।’
মুভিজ বললো,‘আর যেতে হবে না।’
দিবা বললো, ‘কেন?’
‘বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘হয়ে গেছে, মানে! কোন সময়, কোথায়?’
‘সারপ্রাইজ দিবাদি, সারপ্রাইজ।’
‘বিয়েতো আজ ১৫ দিন আগেই হয়ে গেছে। আসাদ ভাই ও আপনাদের সাথেএকটু ফান(মজা) করলাম।’
‘ রাত্রি বললো, কী? আমাদেরকে এতবড় বোকা বানানো হলো।’
আসাদ এতক্ষন দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তারপর জিকোর দিকে তাকিয়ে বললো,‘কিরে আমাকে না জানিয়ে বিয়েটা করে ফেললি।’
জিকো হো হো করে হেসে বললো,‘মুভিজ, তুমি সব বলো।’
মুভিজ সবার দিকে তাকালো, তারপর বললো,‘তাহলো শুনুন দিবাদি, রাত্রি। জিকো ভাইয়ের দাদীর বয়স ৮০ বৎসরের মত হবে, বুড়ির শখ নাত বৌ দেখবে। কয়েক বছর থেকে বলাবলি করছে যে, জিকো ভাইকে বিয়ে করতে। আমরা তাদের বাড়ীতে গেলেই বুড়ির শুধু একটা কথা, ওরে মুভিজ, জিকোকে বল্না বিয়ে করার জন্য। নাতি-বৌ কি দেখতে পারবো না? জিকো ভাই বিয়েতে অমত, কারন নতুন চাকুরী তাও আবার হাই স্কুলের মাষ্টারীর চাকুরী। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে করবে। কিন্তু বুড়ির ঐ এক কথা, নাতি-বৌ দেখবে। শেষে বুড়ি রাগ করে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিল। জিকো ভাই বিয়ে না করলে, বুড়ি নাকি কিছুই খাবে না। নাওয়া খাওয়া বন্ধ। না খেতে খেতে বুড়ি শয্যাশায়ী। এরই মধ্যে গার্জিয়ানের তরফ থেকে অবশ্য মেয়ে দেখা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু একদিক হলে তো আর একদিক হয় না। শেষে এই ফারিয়া ভাবীকে পাওয়া গেল। তাড়াতাড়ি করে তাই বিয়ের আয়োজন। আসাদ ভাইকে ফোনে দাওয়াত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা ভাবলাম, আসাদ ভাই অল্প সময়ের মধ্যে ছুটি নিয়ে এটেন্ড করতে পারবে না। তাই আমি প্রস্তাব দিলাম, যখন এটেন্ড করতে পারবেই না। তখন নিমন্ত্রন দিয়ে লাভ কি? তার চাইতে বিয়ের পর হানিমুনটা আসাদ ভাইয়ের ওখানেই হবে এবং আসাদ ভাইকে সারপ্রাইজ দিব। তাই এই অভিনয়। আসল কথা হলো, ফারিয়া ভাবী কোন চেয়ারম্যান বা শিল্পপতির মেয়ে না।’
রাত্রি আবারও বললো, ‘কি? আমাদেরকে এত বড় বোকা বানানো হলো।’
মুভিজ বললো, ‘না একটু ফান(মজা) করলাম আর কি?’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, ‘এখন নাস্তা খেতে আমাদের বাসায় চলুন।’
সবাই নাস্তা খেতে হেমন্তবাবুর বাসার দিকে চললো। ওদিকে ফোনে হেমন্ত বাবুর তর্জন গর্জন।তার বাসার অতিথি অন্য বাসায় খেয়েছে, এটাই অতিথি পরায়ন এই লোকটার মাথা ব্যথা। দিবা-রাত্রি ও সূর্যবাবুকে, ফোনে খুব বকাঝকা করলো। তিনি ফোনে বলতে লাগলেন, সামান্য দুইজন মানুষকে তোরা খাওয়াতে পারিস না। অপদার্থরা কোথাকার। তোদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তিনি আসাদ ও সুরি সর্দারকে ও ফোন করলেন।
‘ সুরি সর্দার বললো, বাবু আপনি বাগানে আসুন, তারপর সব কথা হবে।’
আসাদ আম্তা আম্তা করে বললো, ‘কাকাবাবু আপনি আসলে সব কথা হবে।’

আসাদ ও সূর্য্য বাবু টিলায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তাদের ড্রেস আপ দেখে জিকো, মুজিভ ও ফারিয়া একটু অবাক হলো।্ পরনে হাফ পেন্ট, সাদা গেঞ্জি ও পায়ে সাদা কেডস্ পরিহিত আসাদকে অন্য রকম লাগছে। একটু পরে সূর্য্য বাবু টিলার দিকে চলে গেল। আসাদ যাওয়ার সময় সুরি সর্দার দিবা ও রাত্রিকে বললো,জিকো মুভিজ ও ফারিয়াকে বাগান দেখানোর জন্য এবং তার ১৫ নং সেক্শনে আজ ডিউটি, সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আসাদ মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিল এবং অফিসের দিকে চলে গেল। সেখান থেকে টিলার দিকে চলে গেল। আজকে প্রচুর কাজ আছে। নাস্তা সেরে সুরি সর্দার গল্প জুড়ে দিল। প্রায়ই সে এ সময় দিবা, রাত্রির সাথে গল্প জুড়ে দেয়। আজকে জিকো ফারিয়া ও মুভিজকে পেয়ে গল্প আরও জমেছে। কবে, কোথায় পাহাড়ে হেমন্তবাবুসহ বাঘ মেরেছে সেই গল্প। সুরি সর্দার কোন ঘটনা এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে, মনে হয় যেন ঘটনা এখনই ঘটছে। রিটায়ার্ড করেছে। আজ প্রায় দশ-বৎসর। বয়স ৭০ এর কাছাকাছি হবে। তবে শরীর এখনও টন্টনে। গায়ে শক্তি ও প্রচুর এই বয়সে। খুব পরিশ্রম করতে পারে। হেমন্তবাবুর বিশ্বস্ত ও অনুগত। রিটার্ডের পর এখন হেমন্তবাবুর বাসায় পড়ে থাকে। বউ মারা গেছে প্রায় বৎসর পাঁচেক আগে। ঘরে জোয়ান বিবাহ উপযুক্ত এক মেয়ে ও এক ছেলে। রাত্রে বারান্দার পাশে ছোট একটা রুম আছে, সেখানে থাকে। দিনে দুই-তিন বার নিজ বাসায় যায়। হেমন্তবাবু তাকে খুব ¯েœহ করে। সুঠাম দেহের অধিকারী। এখনও গায়ে প্রচুর শক্তি। হেমন্তবাবু সপ্তাহ শেষে কিছু হাত খরচ দেয় এবং সে সপ্তাহ শেষে কিছু পেন্শনের টাকা পায়। তাতে তার হাত খরচ চলে যায়। ছেলে ও ছেলের বউ বাগানে কাজ করে । দুই নাম। মেয়েটা এবার এইচ এস সি পরীক্ষা দেবে। সুরি সর্দারের বিশ্বস্ত ও অনুগতের জন্য হেমন্তবাবু বড় সাহেবকে বলে তার ছেলের বউকে একটা স্থায়ী কাজ নিয়ে দিয়েছে। এতে সুরির্সদার হেমন্তবাবুর প্রতি কৃতজ্ঞ। চাকুরীর প্রথম জীবনে হেমন্তবাবুকে কাজ শিখিয়েছেন। বয়সে হেমন্ত বাবু থেকে ১/২ বৎসরের বড়। কর্ম জীবনে প্রায় ৩০ বৎসর হেমন্তবাবুর সাথে কাজ করেছে। তাই হেমন্তবাবুকে ছাড়তে পারে না। এখনও হেমন্ত বাবুর সওদা, সব্জি ¶েতের কামলাদের কাজ দেখা, গোয়ালের গরু দেখা, সমস্ত কিছু তাকে দেখতে হয়। সুরি সর্দার তার বাঘ শিকারের গল্প যখন শেষ করলো, তখন ঘড়িতে সকাল দশটা। মুনমুন ম্যাডামের বাংলোর বাবুর্চি সুগীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে সুরি সর্দার বললো,
‘কিরে কি খবর?’
‘ভালো, কাকু ছোট বাবু (আসাদ) আমাকে পাঠিয়েছে রান্না করার জন্য।’
‘কাল রাত্রে তো ভালোই রেঁধেছিস।’
তাদের কথোপকথনের মধ্যে দিবা রান্না ঘর থেকে বললো,‘এসো সুগীর, রান্না ঘরের দিকে এসো।’
সুগীর, সুরি সর্দার কে পাশ কেটে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।
দিবা তাকে সব দেখিয়ে দিয়ে বললো, ‘এখানে মাছ, মাংস, পোলাও চাউল ও অন্যন্য সামগ্রী আছে, তুমি কষ্ট করে দুপুরের খাবারটা রান্না করে দেবে। ঠিক কাল রাত্রে যেমন করে রান্না করেছ, সাথে মালতী ও লক্ষী আছে। তোমাকে সাহায্য করবে। আমরা অতিথিদেরকে নিয়ে বাগান দেখাতে বের হব।’
সুগীর একটু মৃদু হেসে বললো,‘সে আর ভাবতে হবে না দিদিমনি, আমি সব ঠিক করে নেবো।’
দিবা বললো,‘আচ্ছা তোমাদের মুনমুন ম্যাডাম কোথায়?’
‘ঢাকা গেছে।’
‘ও আচ্ছা, তোমাকে ফ্রি পাওয়া গেল।’
তারা যখন বাগান দেখতে বের হলো, তখন বেলা ১১টা। সামনে বড় বটগাছটা পের হতেই উঁচুনীচু টিলার বুক চিরে লাল মাটির রাস্তা। দুই পাশে চা গাছের সারি। মনে হয় সবুজের গালিছা বিছানো। মুভিজ ফটো উঠার দ্বায়িত্ব নিল। শুরু হলো তার মোবাইলে ফটো ও ভিডিও ধারন। কখন ও গ্রæফ ছবি, কখনোও সিংগেল ছবি উঠাতে লাগলো। জিকো, মুভিজ ফারিয়া এত সুন্দর দৃশ্য আর কখনও দেখেনি। সুরি সর্দার আবার গল্প জুড়ে দিল। তবে এবারের গল্প চা বাগানের চাষাবাদ নিয়ে। কিভাবে বীজ বপন করতে হয়, চারা লাগানো, শেড ট্রি লাগানো, সার দেওয়া, পাতা তোলা, ও ম্যানুফ্যাকচারিং পর্যন্ত সব জিকো, মুভিজ ও ফারিয়াকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। হাঁটতে হাটঁতে তারা ১৫ নং সেকশনের কাছে এসে পৌঁছালো।
সুরি সর্দার বললো, ‘পয়লা(প্রথম) বেলা পাতি ওজন দেওয়ার সময় হয়ে গেছে।’
সামনে একটা খোলা পাকা ঘর দেখা গেল। তার সামনে মেয়েরা সারিবদ্ধ ভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। সবাইর কাঁধে পাতার ঝুড়ি। সামনে ওজন মাপানো মেশিন। সর্দার, আসাদ ও ছোট সাহেব দাঁড়ানো। মেয়েরা এক এক করে পাতার ঝুড়ি ওজন মাপার মেশিনের ওপর রাখছে। সর্দার ওজন দেখছে এবং শ্রমিকের নাম ধরে পাতার ওজনের পরিমান বলছে। আসাদ ছোট একটা বইতে উক্ত শ্রমিকের নামের পাশে পাতার ওজনের পরিমান লিখছে, ছোট সাহেব পর্যবেক্ষন করছে। আসাদের দফায় প্রায় দুইশ জন শ্রমিক আছে। তাদের পাতা ওঠানে, ওজন দেওয়া, চা গাছে রোগ বালাই লাগলে তাতে ঔষধ ছিটানোর ব্যবস্থা করা, এসব কাজের তদারকি করা, আসাদের কাজ। অবশ্য এসব কাজে সর্দার, যুগালী সর্দার তাকে সহযোগিতা করে। এ ছাড়া সপ্তাহিক মুজুরীর পেমেন্ট বই, হাজিরা বই ঠিক করা, পেমেন্ট দেওয়া আসাদের কাজ।
একটু দূরে দিবা, রাত্রি, ফারিয়া, মুভিজ, জিকো সুরি সর্দার দাঁড়িয়ে পাতা ওজন দেখছে। জিকো, মুভিজ ও ফারিয়ার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। দিবা রাত্রি ও সুরি সর্দারের কাছে তা ¯^াভাবিক। পাতা ওজন শেষে মেয়ে গুলো অল্পক্ষনের জন্য বিশ্রামে গেল। সকাল ৮টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত পাতা উঠিয়েছে। এটা হল পয়লা বেলা। একটু পরেই দোসরা (২য়) বেলা শুরু হবে। দোসরা বেলা পাতা ওজন দেওয়া হবে বিকেল ৪/৫ টার সময়। বিশ্রামের এই ফাঁকে তারা দুপুরের খাওয়া সেরে নেয়। খাওয়া বলতে বাগান থেকে যে রেশন আটা পায়, তার থেকে তৈরিকৃত ২/৩ টা বড় আটার রুটি সাথে একটু চাট্নি বা সব্জি এবং খাওয়া শেষে পেট পুরে পানি। মেইন গার্ডেন থেকে পানির গাড়ী এলো। সেখান থেকে তারা বোতলে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করলো। ট্রাক্টর এলো। পাতা নেওয়ার জন্য। পুরুষ কামলারা ট্রাক্টরে পাতা ভর্তি করে দিল। ট্রাক্টর পাতা নিয়ে, মেইন গার্ডেনের দিকে ফ্যাক্টরীর উদ্দেশ্য রওয়ানা দিল। আসাদ জিকোর কাছে এসে দাাঁড়ালো এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বললো,‘কিরে দেখলিতো, কিভাবে রৌদ্রে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাজ করি। তোরাতো স্কুলে ছায়ার নীচে আরামে মাষ্টারি করিছ।’
জিকো হেসে বললো,‘আরাম না-রে মাথা পুঁড়াই। মাথা শেষ হয়ে গেছে, মাথার স্ক্রুফ বল্টু সব নড় বড়ে হয়ে যাচ্ছে।’
দিবা বললো,‘সবারই একই অবস্থা, কারও শরীর পুড়ে, কারও মাথা পুড়ে।’
তার কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। সবাই পাতি ঘরে বসলো। মেয়ে কামলাগুলো, টিলার দিকে পাতা উঠতে চলে গেল। আসাদ দিবা, জিকোরা সবাই পাতি ঘরের ভিতরে এসে বসলো। বাগানে পাতিঘর বলতে, যেখানে চারিদিকে চা বাগান আর চা বাগান।১/২ কিলোমিটারের মধ্যে কোন জনবসতি নেই। সেখানে ছোট করে ঘর বানানো হয়। এটা সাধারণত: ঝড় বৃষ্টি শুরু হলে, শ্রমিকরা এই পাতি ঘরে আশ্রয় নেয়। অন্য সময় পাতিঘর ওজন দেওয়া এবং পাতা রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। পাতিঘর সাধারণত: গোলাকার এবং মেঝো পাকা হয়। একটু পরেই কোল্ড ড্রিংকস এলো। কোল্ড ড্রিংকস দেখে মুভিজ খুব খুশি হলো। কারণ প্রচন্ড গরম পড়ছে। সে আসাদকে বললো,‘ আসাদ ভাই জনবসতিহীন এই জায়গায় আবার কোল্ড ড্রিংক্স কোথায় পেলেন?’
‘তোমরা আসার আগেই ব্যবস্থা করে রেখেছি।’
‘মুভিজ বললো ‘থ্যাংক ইউ ভাইয়া।’
তার কথায় সবাই সম¯^রে বলে উঠলো,‘থ্যাংক ইউ।’
আসাদ সুরি সর্দারকে বললো, ‘সর্দার তুমি এদেরকে ১৪ নম্বরে লেকের পাশ দিয়ে, লেক দেখাতে দেখাতে বাসায় নিয়ে যাও। আমি আবার ১৬ নম্বরের দিকে যাবো। ছোট সাহেব অপেক্ষা করছে। বড় সাহেবও আসবেন।’
চা বাগান, লেক ও শ্রমিকের কাজ দর্শন শেষে দিবারা যখন বাসায় পৌঁছালো, তখন বেলা দেড়টা। সুগীর বাবুর্চি ততক্ষনে রান্না সেরে মালতী ও লক্ষীকে রেখে বাসায় চলে গেল।
¯œান সেরে সবাই খেতে বসলো, ‘ড্রাইনিং টেবিলে দিবা খাওয়ার সাজাচ্ছে। মালতী, লক্ষী তাকে সহযোগিতা করছে। দিবা ছাড়া সবাই খেতে বসলো। একটু খাওয়ার পর জিকো ওয়াক্ ওয়াক্ করে উঠলো। মুভিজও উহু আহা ঝাল বলতে লাগলো। জিকো বাহিরে গিয়ে বমি করে ফেললো।
কি হয়েছে? কি হয়েছে? বলে দিবা-সুরি সর্দার-রাত্রি, মুভিজ ও জিকোর দিকে এগিয়ে এলো।
জিকো বললো,‘ভাই আগে একটু চিনি আনুন, ঝাল, লবন বেশী এবং হলুদের গন্ধ। খাওয়ার অযোগ্য।’
সুরি সর্দার সুগীর বাবুর্চির উপর ক্ষেপে গেল। ভাগ্যিস, সুগীর তখন পাশে ছিল না। থাকলে তাকে বোধ হয় তাকে চিবিয়ে খেতো। সে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে গেল, সোজা সুগীর বাবুর্চির ঘরে গিয়ে, তার হাত ধরে হন্ হন্ করে তাকে টেনে এনে দিবাদের সামনে এনে হাজির করলো এবং রাগত¯^রে বলতে লাগলো,
‘হারামজাদা কি রেঁধেছিস? তোর রান্না খেয়ে সবাইর এাহি অবস্থা।’
সুগীর বললো,‘কি হয়েছে?’
সুরি সর্দার আরও ক্ষেপে গিয়ে বললো,‘কি হয়েছে মানে, আগে তুই একটু মুখে দিয়ে দেখ।’
সুগীর বাবুর্চি একটু মুখে দিয়ে দেখলো, সব খাদ্য ঝাল, লবন ও হলুদের বিশ্রী গন্ধ। মুখে দিলে বমি আসার উপক্রম। সুরি সর্দার তাকে ধমক দিয়ে বললো, ‘হারামজাদা, বাগানের বদনাম করলি। ভিন দেশী অতিথি এসেছে, তাদের জন্য কি রেঁধেছিস?’ তার কথার সাথে রাত্রিও সায় দিল।
সুগীর বাবুর্চি কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, ‘দিব্বি করে বলছি কাকু,আমি সুন্দর ভাবে, ভালো ভাবে রান্না করেছি। ঠিক কাল রাতে যে রকম রান্না করেছিলাম ঠিক সেরকম। মালতী ও লক্ষী সেখানে ছিল। রান্না শেষে আমি নিজে টেষ্ট করে দেখলাম। তাদের দুজনকে সব খাওয়ার একটু একটু করে খাওয়ালাম। তখনতো সব ঠিক ছিল। এখন দেখছি সব উল্টা-পাল্টা হয়ে গেছে।’
সুরি সর্দার চিৎকার করে বলে উঠলো,‘বেটা তোর মাথা উল্টা পাল্টা হয়ে গেছে। আহাম্মক কোথাকার। তোর বাপের মাথা রেঁধেছিস।’
ওদিকে ফারিয়া-মুভিজ- জিকো ঝালে উহু-আহা করছে। দিবা চিনি নিয়ে এলো, সবাইকে চিনি দিল। চিনি খাওয়ার পর ঝাল একটু কমলো।
এমন সময় বাসার সামনে, মোটর সাইকেলের শব্দ হলো। আসাদ মোটর সাইকেল থেকে নেমে, তাদেরকে জটলারত অবস্থা দেখে বললো,‘কি হয়েছে?’
সুরি সর্দার বললো,‘কি আর হবে ছোট বাবু, যত গন্ডোগোলের মূল ঐ হারামজাদা।’ বলে সুগীরকে দেখালো।
‘কি হয়েছে সুগীর?’
সুগীর কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,‘ছোট বাবু আমি ভালোভাবে রেঁধে বাসায় গিয়েছিলাম। মালতী ও লক্ষী ছিল। নিজে একটু টেষ্ট করলাম এবং তাদেরকেও দিলাম, তারা বললো,ঠিক আছে।এখন দেখছি, সব ঝাল, লবন ও হলুদের বিশ্রী গন্ধ।’
আসাদ টেবিলের কাছে গিয়ে দেখলো,‘বাটিতে স্তরে স্তরে মাছ, মুরগী রোষ্ট, পোলাও সাজানো আছে। সে মুরগীর মাংস একটু মুখে দিল।দেখলো বিশ্রী-গন্ধ ঝাল ও লবনাক্ত যা খাওয়ার অনুপোযোগী।
তারপর সুগীরের দিকে তাকিয়ে বললো,‘রান্নারতো একদম বারোটা বাজিয়ে দিয়েছ। এই খাবারতো কেউ খেতে পারবে না।’
‘জী ছোট বাবু, এত সাহেব, মেমসাহেবকে রান্না করে খাওয়ালাম, কেউ কোনদিন অভিযোগ করেনি, আজ এই প্রথম।’ তার কথা শুনে সুরি সর্দার আর ও ক্ষেপে গিয়ে বললো,
‘হারামজাদা, তোর আগের বাহাদূরী এখন রাখ। আজকে এরকম রান্না করেছিস্ কেন?’
আসাদ সুরি সর্দারকে থামিয়ে বললো, ‘থাক সর্দার হযতো ভুল হয়ে গেছে, রাতেরটা ভালো করে রান্না করবে। তাছাড়া কালকে রাত্রেও সে ভালো রান্না করেছে।’
আসাদ এদিক সেদিক তাকালো, । তারপর দিবার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ফ্রিজে আর অন্য কোন খাবার আছে কিনা?’
দিবা বললো, ‘নুডুল্স পাকানো আছে।’
‘কতটুকু আছে?’
‘বড় বড় দুই বাটি আছে।’
‘তা দিয়ে এখন চালিয়ে যাও। রাতে সুগীর ভালো করে রান্না করবে।রাত্রি আর তুমি তাকে সাহায্য করবে।’
আসাদ, সুগীর কে বললো, ‘ রাত্রের খাওয়ারটা ভালো করে রান্না করবে। ’
‘জী বাবু।’
আসাদ একটু বিশ্রাম নিয়ে দোসরা (২য় বেলা) বেলার পাতি(পাতা) ওজন দেওয়ার জন্য টিলার দিকে চলে গেল। দোসরা বেলার পাতি (পাতা) ওজন শেষে আসাদ বাসায় ফিরলো। সন্ধ্যার দিকে মেইন গার্ডেনে ফ্যাক্টরীতে যাওয়ার কথা। সেখানে জিকো, ফারিয়া ও মুভিজকে ম্যানুফ্যাকচারিং দেখানোর কথা। কিভাবে কাঁচা সবুজ চা পাতা থেকে বিভিন্ন প্রক্র্রিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক টী বা কালো চা পাতা হয়। কিন্তু আজ বোধ হয় আর যাওয়ার হবে না। দুপুরের পর থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। বিকেলের দিকে চারিদিকে গুমোট অন্ধকার হয়ে গেল। টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি পড়তে লাগলো। সেই বৃষ্টি পরে অঝোরে পড়তে লাগলো। বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে গিয়ে এই ফাগুন মাসে আষাঢ়ের বৃষ্টির রুপ নিলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। আশে পাশে দু-একটা বজ্রপাতের শব্দ শোনা গেল। বারান্দায় বসে সবাই বৃষ্টি দেখতে লাগলো। এর ফাঁকে কয়েকবার চা চানাচুর, মুড়ি, চিড়া ভাজা, তেলের পিঠা এলো। সুগীর, মালতী, লক্ষী তা তৈরী করছে।
সুরি সর্দার বললো,‘এ বৎসর আগাম বৃষ্টি হচ্ছে। সেই মাঘ মাসের শেষ দিক থেকে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।’
সুরি সর্দার তার এবং হেমন্তবাবুর অতীত কর্মময় জীবনের গল্প জুড়িয়ে দিল। গল্প বলতে সে খুব ওস্তাদ। তার গল্প দিবা, রাত্রি ও সূর্য্য বাবু অনেক শুনেছে। সেই ছোট বেলা থেকে ভুত প্রেতের গল্প থেকে বাস্তব জীবনের গল্প। সুরি সর্দার ভুত প্রেতাতœায় বিশ্বাস করে এবং ভুত তাড়ায়। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে জিকো, ফারিয়া ও মুভিজ সুরি সর্দারের গল্প শুনছে। দিবা ট্রে ভর্তি চা নিয়ে এলো এবং সবাইকে নিজ হাতে চা পরিবেশন করলো। বর্ষন মূখর এই সন্ধ্যায় চা খেতে ভালোই লাগছিলো। ‘জিকো বললো ,‘সুরিদা আপনি এত গল্প কোথা থেকে শুনেছেন?’
সুরি সর্দার একটু হেসে বললো ‘আমার দাদার এক ছোট ভাই ছিল। সে জাহাজে চাকুরি করতো। তার মুখে শুনেছি।’
দিবা বললো, ‘সুরিদা তোমার সেই লটারীর গল্পটা অতিথিদেরকে শোনাও।’
হঠাৎ লটারীর গল্পের কথা বলতেই সুরি সর্দার আবার হেসে উঠলো এবং বললো,
‘দিদিভাই তুমি ভালো একটা গল্পের কথা বলেছ। এতক্ষণ এই গল্পের কথা আমার একদম খেয়ালই ছিল না। আসলে এটা গল্প না। এটা একটা সত্য ঘটনা। এই ঘটনা থেকে অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে।’
মুভিজ বললো,‘সুরিদা গল্পটা বলুন।’
সুরি সর্দার একটু নড়ে চড়ে বসলো এবং সুপারি ও জর্দা মিশ্রিত পান মুখে দিয়ে বললো, ‘তাহলে শুনুন, ঘটনাটা অবশ্য আমি আমার ছোট দাদার মুখে শুনেছি। আমার ঘরের পাশের টিলার নাম উড়িয়া টিলা। ঐ টিলার এক শ্রমিক ছিল। তার নাম ছিল বিনোদ উড়িয়া। সে ব্রিটিশ পিরিয়ডের শেষ দিকের কথা। তখন ছিল পয়সা, আনার যুগ। শ্রমিকরা আনা হিসাবে মজুরি পেতো। এমনই এক সপ্তাহিক পেমেন্ট ডেইটে এক বিলাতী সাহেব আসেলেন। কিছু লটারীর টিকেট বিক্রি করতে। টিকেটের মূল্য আধা পয়সা। যার ভাগ্যে লাগবে, সে রাজা হয়ে যাবে। একথা বলে সে টিকেট বিক্রি করতে লাগলো। তার ডাকে সাড়া দিয়ে, কয়েকজন শ্রমিক আধা পয়সা করে কয়েকটা টিকেট কিনলো। আমার ছোট দাদাও কিনেছিল। ঐ বিনোদ উড়িয়াও একটা টিকেট কিনলো। টিকেটের দুই অংশ ছিল। এক অংশ যার কাছে বিক্রি করা হলো, তার কাছে এবং উপরে নম্বর। অপর অংশ ঐ বিলেতী সাহেবের কাছে ছিল তাতে যে টিকেটটা ক্রয় করেছে তার ঠিকানা ও নম্বর। সাহেব টিকেট বিক্রি করে চলে গেল। যাওয়ার সময় বললো, এই টিকেটের ড্র লন্ডন শহরে হবে। মাস তিনেক পরে টিকেটের ড্র হলো এবং বিনোদের টিকেট খানা লটারীতে ১ম পুরস্কার পেল।’
সুরি সর্দারের এই কথা শুনে জিকো, মুভিজ নড়েচড়ে বসলো। এই ফাঁকে সুরি সর্দার তার জর্দা, চুন ও সুপারি মিশ্রিত পান আবারও মুখে দিল। সুরি সর্দারের এই একটা অভ্যাস। একটু পর পর জর্দা, চুন, সুপারি, মিশ্রিত পান খাবে। সেটা দিনরাত সারাক্ষন।
মুভিজ বললো, ‘বলুন সুরিদা, তারপর কি হলে?’
সুরি সর্দার পান চিবোতে চিবোতে বললো,‘টিকেটের অপর কপি খামে ডাকযোগে, আমাদের এই ওসমাননগর চা বাগনের, বড় সাহেব বরাবর লন্ডন থেকে এলো। তখনকার দিনে সব চা বাগানগুলোতে বড় সাহেব ছিলেন বিলেতী সাহেবরা। তারাই বড় সাহেব ও ছোট সাহেব ছিলেন। দেশীয় শিক্ষিত হিন্দুবাবুরা বাবু ছিলেন। আর আমরা তো সেই পূর্ব পুরুষ থেকেই শ্রমিক। আমাদের মধ্যে শিক্ষা- দীক্ষা ছিল না। এই আমি ক্লাশ ফোর পর্যন্ত পাশ দিয়েছি। একটু পড়তে লিখতে পারি।’
জিকো বললো,‘আপনারা, আপনাদের পূর্ব পুরুষ কেন লেখাপড়া করলো না?’
‘কিভাবে করবে বাবু, একেতো আমরা গরীব, নুন আনতে পানতা পুরায়। তার উপর এই কাছে কিনারে কোন স্কুল নেই, এখনও স্কুল বলতে বাগানের এই বেসরকারী প্রাইমারী স্কুল। তাছাড়া আমাদের মধ্যে অধিকাংশই অসচেতন। মদের নেশায় আসক্ত। অবশ্য এটা ব্রিটিশ সুকৌশলে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে বিনা মূল্যে মদ খাওয়ানো শিখিয়েছিল। আমাদের বংশধররা যেন কোন লেখাপড়া না করতে পারে। সারাক্ষণ নেশায় বুদ হয়ে থাকবে আর ব্রিটিশের বাগানে আজীবন বংশ পরষ্পরায় গোলামী করবে। বেশী শিক্ষিত হয়ে গেলে বাগানের এই কাজ, অল্প মজুরীতে কে করবে? তাই ব্রিটিশের এই কৌশল।’ এক সময় আমাদের নাগরিকত্বও ছিল না, ¯^াধীনতার পর ‘বঙ্গবন্ধু’ আমাদেরকে নাগরিকত্ব দিয়েছেন।’
সবাই সোফায় বসে তার কথা শুনছে। সুরিসর্দার একটা টুলে বসে তার গল্প বলছে। অনেকক্ষন টুলে বসতে বসতে তার কোমর ধরে গেছে। মুভিজ তাকে সোফায় বসতে বললো।
সে একটু ইস্ততত: করছে, কারন বাগানে শ্রমিক ও সর্দাররা বাবুদের সামনে টুলেই বসে এবং বাবু, সাহেব ও তাদের পরিবার পরিজনেরা তাদের সাথে “তুমি” বলে সম্বোধন করে।
দিবা বললো, ‘সুরিদা, সোফায় বসে ভালো করে অতিথিদেরকে গল্প শোনাও।’
তখন সুরি সর্দার সোফার মাঝ খানে গিয়ে বসলো এবং আবার গল্প শুরু করলো। ‘বড় সাহেব চিঠির খাম খুলে তো অবাক। বিনোদের নামে লটারীর টিকেট এবং তাতে সে ১ম পুরুস্কার পেয়েছে। টিকেটের পাশে তার নাম ঠিকানা সব লেখা আছে। বড় সাহেব দেখলেন, যে টাকা সে পেয়েছে, তাতে সে এরকম ওসমাননগর চা বাগান একটা কিনতে পারবে। বড় সাহেব সপ্তাহ খানেক চুপ করে রইলেন। কি করবেন চিন্তা করতে লাগলেন। এত বড় সংবাদ তাকে কি করে জানাবেন? সপ্তাহ খানেক পরে একদিন বেলা ১১ টা দিকে তাকে চৌকিদার দিয়ে অফিসে ডাকলেন। বিনোদতো ভয়ে অস্থির। ¯^য়ং বড় সাহেব তাকে অফিসে ডেকেছেন। না জানি কি অন্যায় করে ফেলেছে। ভয়ে ভয়ে সে বড় সাহেবের রুমে ঢুকলো। বড় সাহেব তার রুমের সব দরজা জানালা বন্ধ করে দিলেন। বাগানে সাধারণত: ১১টার দিকে অফিসে, অফিস বাবুরা ছাড়া আর কেউ থাকে না। পাশে ফ্যাক্টরী, ফ্যাক্টরীতে শ্রমিক ও বাবুরা কাজে ব্যস্ত থাকে। অন্য সব কামলারা টিলায় কাজে ব্যস্ত থাকে।
বড় সাহেব বললো,‘ তুমি কোন বিলেতি সাহেব থেকে লটারীর টিকেট কিনেছ?’
‘বিনোদ বললো,‘জী-সাহেব।’
বড় সাহেব ধমক দিয়ে চিৎকার করে বললেন, কেন কিনেছ? বিনোদ কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, উনি আমাকে কিনতে বলেছেন যে, লটারীতে জিতলে নাকি রাজা হয়ে যাবো। শুধু আমি কিনিনি আরও কয়েকজনে কিনেছে।কয়েকজনের কথা রাখো, তুমি কিনলে কেন? এই কথা বলে, বড় সাহেব বেত দিয়ে তাকে পিটাতে লাগলো। তার চিৎকারে পঞ্চায়েত, ফ্যাক্টরীর সব শ্রমিক, বড় সাহেবের রুমের সামনে জড়ো হয়ে গেল। পঞ্চায়েত প্রধান ক্ষেপেই গেলেন। কেন বিনোদকে অকারনে মারছে। একটু পরে বড় সাহেব তার রুমের দরজা খুললেন। পঞ্চায়েত প্রধান, পঞ্চায়েতের অন্যান্য সদস্যরা তার রুমে ঢুকে তার কাছে জানতে চাইলো, কেন তিনি বিনোদকে অকারনে মারলেন? বড় টিলাবাবুকেও খবর দেওয়া হলো। বড় সাহেব সবাইকে শান্ত করলেন। তারপর বিনোদ যে লটারীর ১ম পূরুষ্কার পেয়েছে, সে কথা বললেন এবং বললেন, সে এখন সবাই থেকে ধনী। ওসমান নগর চা বগান কেনার মত তার টাকা আছে। তার টিকেট লন্ডনে ড্র হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে তাকে লন্ডনে যেয়ে পূরুস্কারের টাকা আনতে হবে।’
পঞ্চায়েত প্রধান বড়সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো,‘সাহেব আমাদের মানুষকে তাহলে খামাখা কেন মারলে?’
‘তখন সাহেব বললো,‘যদি তাকে আমি ডেকে না মেরে সরাসরি বলে দিতাম যে, সে হাজার হাজার পাউন্ড পূরুস্কার জিতেছে ।তখন সে অতি আনন্দে আতœহারা হয়ে হার্ট অ্যাটাক করতে পারে। তাই তাকে আগে মারলাম, তার চোখের জল বের করলাম, তার মনের মধ্যে দু:খ বোধ আনলাম। তারপর তার খুশির খবর বললাম। এখন তোমরা দেখবে তার আর কিছু হবে না।’
বড় সাহেব বললেন,‘ কাউকে কোন বড় দু:খের সংবাদ সরাসরি শুনাতে নেই এবং বড় আনন্দের সংবাদ ও সরাসরি শুনাতে নেই।’
পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত প্রধান, বড়সাহেবের বুদ্ধিমত্তা দেখে সাহেবকে প্রনাম জানিয়ে, অফিস থেকে বের হলো এবং বিনোদকে কাঁধে নিয়ে মিছিল করতে লাগলো। বড় সাহেব পরের মাসে তার বাৎসরিক ছুটিতে লন্ডনে যাওয়ার সময় বিনোদকে তাঁর সাথে নিয়ে গেলেন। বিনোদ লন্ডনে গিয়ে তাঁর পূরুষ্কার নিয়ে কয়েক বৎসর লন্ডনেই থাকলো। সেখানে সে কাজের ব্যবস্থা ও নাগরিকত্বের ব্যবস্থা করে, দেশে ফিরে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে লন্ডনে চলে গেল।’
জিকো বললো,‘বাহ্ সুরিদা খুব সুন্দর একটা শিক্ষানীয় কাহিনী বললেন।’
‘জী বাবু’
মুভিজ বললো,‘সুরিদা আপনি ভূত প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করেন?’
‘করি মানি, আমি নিজে ভূত- প্রেতাত্মা তাড়াই। কত ভূত- প্রেতাত্মা আমি তাড়িয়েছি, তার হিসেব নেই। এই একটা ব্যাপারে আমার বড় বাবুর (হেমন্ত বাবু) সাথে আমার অমিল। উনি ভূত- প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করেন না। আর আমি ভূত প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করি। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক লোক আমার কাছে আসে ভূত তাড়ানোর জন্য।
মুভিজ বললো,‘আপনি ভূত তাড়ান!’
‘হ্যাঁ’
‘কিভাবে?’
‘মন্ত্র পাঠ করে এবং ঝাড়– দিয়ে পিটিয়ে।’
‘তাহলে আমাদেরকে একটা ভূতের গল্প শোনান।’
মুভিজের কথা শুনে ফারিয়া বাধা দিয়ে বললো,‘সুরিদা থাক থাক এখন না, আমার ভয়ে গা চম্ চম ্করছে।’
‘ভয় কিসের দিদি?’
‘না থাক, অন্য সময়।’
সুরি সর্দার এবার চারিদিকে তাকালো, ‘তারপর দিবার দিকে তাকিয়ে বললো,‘দিদি ভাই তার চাইতে এই সন্ধ্যা বেলায় তুমি আমাদের কয়েকটা গান শোনাও।’
সুরি সর্দারের মুখে গানের কথা বের হতেই আসাদ, জিকো, মুভিজ, ফারিয়া সবাই দিবাকে ধরলো গান গাওয়ার জন্য। দিবা বললো,‘এই ভাবে, একদম অপ্র¯ুÍত অবস্থায়।’
সুরি সর্দার বললো,‘দিদি আমি তবলা বাজাবো। হারমোনিয়ামতো তুমি বাজাবে, অসুবিধা কোথায়?’
সুরি সর্দার নিজেই পাশের রুম থেকে হারমোনিয়াম ও তবলা নিয়ে এলো।
মুভিজ বললো,‘দিদি বৃষ্টির দিনে বৃষ্টির গান দিয়ে গান শুরু করুন।’
শুরু হলো গান। প্রথমেই দিবা শুরু করলো, ‘আকাশ মেঘে ঢাকা শাওন ধারা ঝরে’
এরপর রাত্রি শুরু করলো,‘এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি চলে যেওনা।’
এরপর সুরিসর্দার একটা হিন্দি গান ধরলো ‘মেরি ¯^প্নকে রানী কভু আই জিতে।’
আবার দিবা গাইলো, ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের জল ধুয়োনা।’
রাত্রি এবার আসাদকে ধরলো, গান গাওয়ার জন্য, সঙ্গে সঙ্গে সবাই। বাহিরে অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে।
আসাদ বললো, ‘আমি কি গাইবো। আমার গলা হলো ফাটা বাঁশ। তাছাড়া হারমোনিয়াম জানিনা, আমি কি গাইবো?’
দিবা সাহস দিয়ে বললো, ‘গাও আমি হারমোনিয়াম ম্যানেজ করবো। অনেক চাপাচাপির পর আসাদ শুরু করলো, ‘আমার সারাটা দিন মেঘল আকাশ বৃষ্টি, তোমাকে দিলাম।’
আসাদের গান শেষে দিবা-সুরি সর্দার বললো, ‘হারমোনিয়াম, তবলা আপনাকে আমরা শিখিয়েই ছাড়বো।’
এরপর সূর্য্যবাবু গাইলো, ‘ওগো বৃষ্টি তুমি ঝরো নাকো অমন করে।’
এরপর রাত্রি গাইলো, ‘টিপ্ টিপ্ বর্ষা পানি।’
এরপর মুভিজ গাইলো, ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন।’

এভাবে বৃষ্টির গান গাইতে গাইতে রাত দশটা বেজে গেল। লক্ষী ও সুগীর ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। দিবা বাদে সবাই খেতে বসলো। কিন্তু খাওয়ার একটু মুখে দেওয়ার পর আবার শুরু হলো সেই উহ্হু আহা ঝাল। সেই উৎকট বিশ্রী গন্ধ। জিকো আবার বমি করে ফেললো। এবার সে ক্ষেপে গেল। সেই কাল রাতে, সে তৃপ্তিসহকারে ভাত খেয়েছে।এমনিতে সে ভাতের পাগল, ভাত না খেলে থাকতে পারে না।
আসাদকে বললো, ‘এইখানে কাছে কিনারে কোন ভাতের হোটেল আছে কি না?’
আসাদ বললো ‘শমসের নগর বাজার ছাড়া আর কোনখানে ভাতের কোন হোটেল নেই। তা-এখান থেকে তিন কিলোমিটার দুরে। তাছাড়া এই অঝোরে বৃষ্টির ভিতরে কিভাবে যাবি?’
আমি বৃষ্টির ভিতরেই যাবো, এবং কাল সকালেই চলে যাচ্ছি। গুষ্টি মারি, তোর হানিমুন।’ তার কথায় মুভিজ ও ফারিয়া একটু হাসলো।
সুুরি সর্দার বলে উঠলো, ‘কি যে হলো, মনে হয় ঐ সুগীরের উপর ভুত প্রেতাতœার ভর হয়েছে। না হয়, রান্না ঘরের উপর ঐ শেওড়া গাছের ভুত নেমে এসেছে।’ বলেই সে রান্না ঘরের দিকে গেল এবং সুগীরের হাত ধরে টেনে সবার সামনে হাজির করলো। এবং বলতে লাগলো, ‘ হারামজাদা, বেটা বেত্তুমিজ কোথাকার। আবারও সেই একই অবস্থা করেছিস। তোর উপর ঐ শেওড়া গাছের ভুত-প্রেতাতœা ভর করেছে।’ এ কথা বলে সুগীরের মুখের দিকে ক্রদ্ধভাবে তাকিয়ে রইলো। সুগীর এমনিতেই দূর্বল প্রকৃতির লোক। বয়স ৪৫/৪৬ হবে। গায়ের রং কালো । হালকা পাতলা সুরিসর্দারকে খুব ভয় পায়। সুরি সর্দাররের মুখে ভুত প্রেতœীর কথা শুনে আরও ভয় পেয়ে গেল। তার হাত পা থর থর করে কাঁপতে লাগলো। সারা শরীর ঘামাতে লাগলো।
সুরি সর্দার বলতে লাগলো ‘ তুই মরিছ দিতে গিয়ে হলুদ বেশি দিয়ে দিছ। পানি দিতে গিয়ে তেল বেশী দিয়ে দিছ। এসব তো তুই করিছ না। যে খবিশ তোর উপর সওয়ার হয়েছে, সে এসব করছে।’ বলেই সুরিসর্দার সুগীর বাবুচির বুড়ো আঙ্গুল ধরে চিপ দিল। সুগীর উহু কাকু করে চিৎকার করে উঠলো। সুরিসর্দার ক্রদ্ধ¯^রে বললো, ‘এখন ভালোয় ভালোয় যাবি না থাকবি।’
‘কাকু,এই বৃষ্টিতে কোথায় যাবো?’
‘তাহলে ভালোয় ভালোয় যাবি না, বলেই সুরি সর্দার সুগীরের হাত ছেড়ে বারান্দায় তার রুমের দিকে গেল। সেখান থেকে নারিকেল গাছের শলার ঝাড়–টা বের করলো। এই ঝাড়– সব সময় সে তার বিছানার মাথার পাশে রাখে। ঝাড়–টা হাতে নিয়ে সে সুগীরের সামনে এলো এবং তার ডান হাত খানা ধরলো। তারপর বললো, ‘তাহলে যাবি না?’
সুগীর ভয়ার্ত কন্ঠে বললো, ‘কাকু আমি ঠিক আছি, আমার কিছু হয়নি।’
সুরি সর্দার বললো, ‘খবিশে ধরলে এরকম সবাই বলে।’
এরপর সুরি সর্দার বিড়্ বিড়্ করে মন্ত্র পাঠ করতে লাগলো। সবাই এই দৃশ্য দেখছে। সুরি সর্দার মন্ত্র এবার আরও জোরে পাঠ করতে লাগলো এবং কিছুক্ষন পর সড়াৎ সড়াৎ ঝাড়–র পিটুনি সুগীরের গায়ে মারতে লাগলো।
সুরি সর্দার বলতে লাগলো, ‘জীবনে কত ভুত প্রেতœী তাড়ালাম তুইতো তার তুলনায় কিছুই না।’
ঝাড়ুর পিটুনি খেতে খেতে সুগীর বলতে লাগলো, যাচ্ছি কাকু যাচ্ছি।’ বলে সে সুরি সর্দারের হাত থেকে নিজেকে ছেড়ে নিয়ে, খোলা দরজার দিকে ছুঁটে যেতেই সুরি সর্দার তাকে ধরে বললো,
‘হারামজাদা তুই কোথায় যাচ্ছিস, তোর ভিতরে যেটা সওয়ার হয়েছে, সেটা যাবে কিনা বল?’ সুগীর পড়লো মহাবিপদে, হ্যাঁ বললেও দোষ না বললেও দোষ। এবার সুরি সর্দারের ঝাড়–র পিটুনি জোরে পড়তে লাগলো। মন্ত্রের বেগও বেড়ে চললো। আসাদ, জিকো, মুভিজ গিয়ে সুরি সর্দারকে ধরলো এবং সুগীরকে তার হাত থেকে মুক্ত করলো। ছাড়া পেয়ে সুগীর ভরা বৃষ্টির মধ্যে তার ঘরের দিকে দিল দৌঁড়। সুরি সর্দার তার পিছনে যেতে উদ্যত হতেই আসাদ ও মুভিজ তাকে ধরে থামালো। সুরি সর্দার চিৎকার করে সুগীরকে শুনিয়ে বলতে লাগলো, ‘আমি তোর ঘরের দিকে আসছি, আজ যত রাতই হোক তোর ভূত তাড়িয়েই ছাড়াবো।’
তার এই অবস্থা দেখে আসাদ বললো,‘সর্দার তুমি এটা ঠিক করলে না, তাকে ঝাড়– দিয়ে পিটালে আবার বৃষ্টিতেও ভেজালে, বেচারা।’
রাত্রি এবার মুখ খুললো,
‘সুরিদা তোমার ভূত-প্রেতœী ওসব কিছুই নেই। তোমার ওসব মন্ত্র-টন্ত্র সব ভূয়া। এই যে, খাওয়ায় ঝাল, লবনাক্ত ও হলুদের বিশ্রী গন্ধ এসব আমি করেছি।’
‘কি বললে দিদি! তুমি কি বললে! তুমি এসব করেছ?’
‘হ্যাঁ আমি করেছি।’
তার কথায় সবাই তার দিকে তাকালো। দিবা তার কাছে এসে তাকে বললো,‘তুই করেছিস?’
সূর্য্যবাবু বললো, ‘তুই করেছিস?’
সবাই অবাক দৃষ্টিতে রাত্রির দিকে তাকিয়ে রইলো। মুভিজ বললো,‘বুঝেছি, তাহলে সর্ষেতেই ভূত।’
সুরি সর্দার রাত্রির কাছে যেয়ে বললো,‘কেন করেছ দিদি?’
করেছি একটু ফান (মজা)করলাম। জিকো ভাই-মুভিজ ভাই, ভাবী বিয়ে নিয়ে কালকে রাত্রে আমাদের বোকা বানিয়েছিল এবং ফান(মজা) করেছিল। তাই আমিও একটু ফান(মজা) করলাম।’
দিবা বললো,‘তাই বলে খাওয়া নিয়ে করবি?’
ফারিয়া বললো,‘রাত্রি ঠিকই করেছে, আমরা ফান করেছি। তাই সেও আমাদের সাথে ফান করেছে। সমান সমান হয়ে গেল।’
শুধু আসাদ বললো, ‘কী দূষ্ট মেয়েরে বাবা।’
রাত্রি এবার জিকো, ফারিয়া ও মুভিজের কাছে এলো এবং বললো, ‘ভাইয়া-ভাবী সরি এবং সকলের দিকে তাকিয়ে বললো, সরি, সরি বলে কেঁদে ফেললো। তাকে কাঁদতে দেখে ফারিয়া কাছে এসে বললো,‘রাত্রি কাঁদছ কেন? আমরাতো কেউ তোমাকে কিছু বলি নি।’
‘না ভাবী, কাঁদছি বেচারা সুগীরের জন্যে। আমার কারনে বেচারা শুধু কতগুলো ঝাড়–র পিটুনি খেল।’
তারপর সুরি সর্দারের দিকে তাকিয়ে বললো,‘সুরিদা তোমার ওসব ভূত-প্রেত মন্ত্রটন্ত্র সব ভূয়া, বাস্তবে কিছুই নেই। তা আজ প্রমান হয়ে গেল। সুরি সর্দার ও কম যায়না, সে তার মন্ত্র-টন্ত্র ,ভূত-প্রেতের ¯^পক্ষে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বললো,
‘নাই কেমনে বুঝলে দিদি, এই যে, আমি মন্ত্র পড়লাম, ঝাড়– পিটুনি দিলাম, তাতে-তো আসল ভূত প্রেতের কথা বের হয়ে এসেছে।’
‘শোন দিদি আমাদের সকলের মধ্যে মাঝে মাঝে খারাপ আত্মা ভর করে। সেটাই মনে করো খারাপ প্রেতাত্বা। সুগীরকে ঝাড়–র পিটুনি দেখে, তোমার মধ্যে যে খারাপ আত§া ভর করেছে, তা বেরিয়ে এসেছে এবং আমরা সকলে আসল রহস্য জানতে পেরেছি।’
মুভিজ বললো,‘সুরিদা আপনি ঠিকই বলেছেন।’ রাত্রি বেশ জব্দ হলো।
সে আবারও বললো, সরি, সুরিদা।’
আসাদ বললো, ‘থাক আর সরি বলার দরকার নেই, এখন যে খাওয়া গুলো আছে,তার ঝোলগুলো ফেলে আবার মশ্লা দিয়ে, দিবা আর ফারিয়া ভাবী রাঁধবে। আমরা সবাই সাহায্য করবো।’
এক চুলায় মাংস দেওয়া হলো, আর অন্য চুলায় মাছ ও সবজি দেওয়া হলো। সবাই মিলে রান্না শুরু করলো। অল্পক্ষনের মধ্যে রান্না হয়ে গেল। সবাই খেতে বসলো। সুগীরের কথা আসাদের মনে পড়লো ।
আসাদ দিবাকে বললো,‘কিছু ভাত মাছ, মাংস তরকারি সুগীরের জন্য রেখো।’
খাওয়া শেষে আসাদ ও সুরি সর্দার দুটো ছাতা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে খাওয়ার নিয়ে সুগীরের ঘরের দিকে রওয়ানা হলো। সুগীরের বাাসর সামনে যেয়ে সুরি সর্দার সুগীরকে ডাকলো। সুগীর তখনও ঘুমোয়নি, ভয়ে চুপ করে রইলো।
অনেকক্ষন ডাকা ডাকির পর তার বউ জবাব দিল,‘জী কাকু।’
সুরি সর্দার বললো,‘সুগীর ঘুমিয়েছে?’
তার বৌ বললো,‘না কাকু এখনও ঘুমায়নি।’
সুরি সর্দার ধমকের ¯^রে বললো,‘তাহলে জবাব দিচ্ছে না কেন?’
‘আপনার ভয়ে।’
সুরি সর্দার আবার ডাকলো,‘সুগীর।’
এবার সুগীর জবাবা দিল,‘জী কাকু।’
‘দরজা খোল।’
‘না কাকু, আমার শরীর এখন পাতলা লাগছে। যে খবিশ ভর করেছিল, আপনার ঝাড়–র পিটুনিতে তা চলে গেছে।’
এবার আসাদ ডাকলো,‘সুগীর দরজা খোলো।’
আসাদের ডাক শুনে সুগীর বললো,‘ছোটবাবু, কিভাবে খুলবো।সুরি কাকুতো ঝাড়ুর পিটুনি দিবে।’
‘পিটাবে না, আমি আছি।’
আসাদের কথায় সাহস পেয়ে উঠে এসে সুগীর দরজা খুলে দিল। পিছনে তার বৌ। শ্যামলা, ¯^াস্থ্যবতী গোলাকার চোহারা। আসাদ খাবার ও কিছু টাকা তার হাতে গুজে দিয়ে বললো,
‘তুমি দুদিন কাজ করেছ, তোমাকে চারদিনের রোজ(মজুরী) দিলাম। কাল সকালে এসো। খাওয়া আমরা কোন রকমে আবার রেঁধে নিয়েছি।’
অনেকগুলো টাকা একত্রে পেয়ে সুগীর খুব খুশী হলো এবং ঝাড়–র পিটুনীর কথা ভুলে গেল।
তারপর খুশিতে গদ গদ হয়ে সুগীর বললো,‘যাবো ছোট বাবু, কাল সকালে যাবো।’
পরদিনও অবিরাম বৃষ্টি ঝরতে লাগলো। সারা বাগান জুড়ে হুলুস্থুল পড়ে গেল। লেবার লাইনের ঘরগুলো ধীরগতিতে মেরামত হচ্ছিল। অধিকাংশ লেবার হাউজের টিনগুলো পুরানো হয়ে গেছে। ঘরগুলোর টিনের চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ছে। এবছর আগাম এত যে বৃষ্টি হবে, তা কেউ ভাবে নি। তাই সকাল বেলায় বৃষ্টির মধ্যে প্রায় সব শ্রমিক পরিবার পরিজন নিয়ে অফিস ঘেরাও করলো। তাদের অভিযোগ তাদের ঘরে পানি পড়ছে, ঘরের মধ্যে পরিবার নিয়ে থাকা যাচ্ছে না। এই সমস্যার সাথে অন্যন্য সমস্যা ও দাবী যুক্ত হলো। তারা জানিয়ে দিল, তাদের সমস্যাগুলো সমাধান ও দাবি গুলো না মানলে তারা কাজে যাবে না এবং কাজ বন্ধ থাকবে। আসাদ, সূর্য্যবাবু, ¯^পনবাবু ও ছোট সাহেব বিব্রতকর অবস্থায় পড়লো। ছোট সাহেব পঞ্চায়েত সদস্যদেরকে ডাকলো। তাদের সাথে আলাপ করলো কিন্তু কোন সমাধান হলো না। মেইন গার্ডেন, জাগহাটি, ডাবছড়া ফাঁড়ি বাগান থেকেও একই খবর এলো, শ্রমিকরা কাজে যাচ্ছে না অর্থাৎ বাগানের কাজ বন্ধ। বৃষ্টিও অঝোরে ঝরছে। ফুলছড়াতে আজ গ্যাঞ্জামটা একটু বেশী হচ্ছে। কারন এখানে আজ হেমন্তবাবু নেই। থাকলে হয়তো উনি নিজে এসে সবাইকে বুঝিয়ে কাজে যাওয়ার জন্য বলতেন।শুধু ফুলছড়াতেই নয়,জাগহাটি মেইনগার্ডেন,ডাবছড়াতেও তিনি সমান জনপ্রিয়। কারন আজীবন তিনি সর্বহারা ও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি করেছেন। শ্রমিকদের সুখে দুঃখে ছিলেন এবং আছেন। তিনি একটা কথা যখন পঞ্চায়েতদেরকে বলেন, তখন তারা শুনতে বাধ্য। কিন্তু আজকে তিনি বাগানে নেই। তাই লেবার প্রবলেম সমাধান করার জন্য কেউ নেই। তাঁকে বড় সাহেব, ছোট সাহেব ও আসাদ ফোন দিল এবং বাগানের অবস্থা জানালো। তিনি সব শুনলেন এবং বললেন, যে সব ঘরগুলোর টিনের চালের ফুটো দিয়ে বেশী পানি পড়ছে। সেগুলো প্রথমে চিহ্নিত করে পুরো টিনের চালের উপর আপাতত: পলিথিন/তেরপাল দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হউক। ঘর রিপিয়ারিং না হওয়া পর্যন্ত এভাবে চলবে। আর দাবী দাওয়ার ব্যাপারে তিনি সব পঞ্চায়েত প্রধানের সাথে ফোনে কথা বললেন, আগামী রবিবার এ ব্যাপারে সাহেব বাবু ও পঞ্চায়েত সবাই একটা সমাধানের জন্য বসবে । তার কথা পঞ্চায়েত প্রধান মানলেন এবং বললেন,
‘বড় বাবু ,আপনার কথায় আমরা কাজে যাচ্ছি। আমাদের দাবীগুলো যেন মানা হয়।’
‘হেমন্তবাবু বললেন, ‘অবশ্যই তোমাদের দাবী যদি বিসিএস (বাংলাদেশ চা সংসদ) এর নিয়ম অনুযায়ী হয়, তাহলে অবশ্যই আমি বড় সাহেবকে অনুরোধ করবো মানার জন্যে। তাঁর কথায় আশ্বাস পেয়ে শ্রমিকরা কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তত হলো। কিছু কিছু যুবক ছেলে কাজে যেতে অপরাগতা প্রকাশ করলো। সুরি সর্দার ক্ষেপে গেল। আমাদের বড় বাবু (হেমন্ত বাবু) বলেছে, সব সমস্যার সমাধান হবে। আর তোরা কাজে যেতে গড়িমসি র্কছিস। যা অফিসের সামনে থেকে, কাজে যা।
একজন বললো,‘কাকু, কাজে যাবো কি করে? এখনো বৃষ্টি হচ্ছে।’
‘বৃষ্টি এখন একটু কমে গেছে। তোরা কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হ।’ এদিকে সব বাবু ও সর্দার লেবার লাইনে গিয়ে ঘর দেখতে লাগলো। যে সব ঘরগুলোতে পানি পড়ছে, তাতে মেইন গার্ডেনের গুদাম থেকে ট্রাক্টর ভর্তি পলিথিন এনে মুড়িয়ে দেওয়া হলো। এভাবে মেইন গার্ডেন ও সব ফাঁড়ি বাগানের ঘর গুলোতে একই ব্যবস্থা করা হলো। আপাতত: পানি পড়ার সমস্যার সমাধান হলো। বৃষ্টি বন্ধ না হওয়ার কারনে বাগান আন্লিভ (ছুটি) ঘোষনা করা হলো। বিকেলের দিকে বৃষ্টি বন্ধ হলো এবং শেষ বেলায় সূর্য দেখা দিল।
পরদিন বিকেলের দিকে এক ট্রাক মালামাল ও মাইক্রোবাস নিয়ে হেমন্তবাবু ও ফাগুনী বাগানে ফিরলো। ট্রাকের মধ্যে তার ক্ষেতের চাউল, ডাল, মাছ, সব্জি। সুরি সর্দার ট্রাক দেখে আগেই এগিয়ে গেল এবং ট্রাক বাসার সামনে থামাতে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল।
গাড়ী থেকে নেমেই হেমন্তবাবু সুরি সর্দারকে ডাকতে লাগলো। সুরি সর্দার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং প্রনাম দিল।
হেমন্তবাবুর মুখখানা একটু রুক্ষ ভাব। সুরি সর্দারকে একটু ধমকের ¯^রে বললো, ‘অতিথিরা কোথায়, আমার বাসার অতিথি এসে অন্য বাসায় খায়। তুমি কোথায় ছিলে। ২/৩ জন মানুষ দূর থেকে বেড়াতে এসেছে। তাদেরকে তোমরা রেঁধে খাওয়াতে পারো না। আসাদ, দিবা, রাত্রি, সূর্য্য কোথায়?’ একসঙ্গে অনেকগুলো কথা বলে হেমন্তবাবু থামলো। সুরি সর্দার একটু নরম ¯^রে বললো,‘বাবু আপনি একটু থামুনতো, সব ঠিক আছে।’
‘কি ঠিক আছে? তুমি জানো অতিথি আপ্যায়নে ভূলক্রটি হলে, গৃহস্থের অমঙ্গল হয়?’
সুরি সর্দার বললো,‘বাবু সব ঠিক আছে, অতিথিরা আপনার বাসায়ই আছে এবং আপনার বাসায়ই খাওয়া-দাওয়া খাচ্ছে। শুধু পরশু রাত্রে ছোট বাবুর (আসাদ) বাসায় খেয়েছে থেকেছে।’
সুরি সর্দারের কথা শুনে হেমন্ত বাবু একটু থামলো এবং রাগ কমলো। ততক্ষনে আসাদ দিবা, রাত্রি, মুভিজ, জিকো ও ফারিয়া বাসা থেকে বের হয়ে এলো। আসাদ অতিথিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। জিকো, মুভিজ ও ফারিয়া হেমন্তবাবুকে সালাম দিল। হেমন্তবাবু জিকো ও মুভিজকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরলো এবং বললো,‘বাবারা তোমরা এসেছ, আমি ছিলাম না। কোথায় থাকছো,কি খাচ্ছ? এরাতো কিছু ম্যানেজ করতে পারে না।’
জিকো বললো,‘না কাকাবাবু সব ঠিক আছে। আমরা ঠিকমত নাওয়া-খাওয়া করেছি, কোন অসুবিধা হয়নি। বলে রাত্রির দিকে তাকালো।
মুভিজ একটু মৃদু হাসলো।
মুভিজ বললো,‘ কাকাবাবু আজ তিন দিন আপনাদের এখানে এসে, সবার মুখে শুধু আপনার কথা শুনতে শুনতে ,আপনাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে গেছি।’
‘তাই নাকি, ‘আমার কথা আর কি শুনবা? দেখ, আমি আবার তোমাদের সবাইকে তুমি করে বলে ফেললাম।’
জিকো বললো, ‘আপনিতো আমাদের বাবার বয়সী, তুমি বলবেন নাতো কি বলবেন?’
সবাই বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। হেমন্তবাবু সুরি সর্দারকে হুকুম দিল। কামলা দিয়ে ট্রাক থেকে মাল গুলো খালাস করার জন্য। তারপর সবাইকে নিয়ে বাসায় ঢুকলো এবং ড্রয়িং রুমে সবাইকে বসতে বললো। তারপর জিকো- মুভিজকে উদ্দ্শ্যে করে বললো, ‘তা বাবারা তোমরা কে কি করো?’
মুভিজ বললো, ‘জিকো ভাই আর ভাবী একটা হাই স্কুলে শিক্ষকতা করে। আমি অন্য একটা স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে আছি।’
হেমন্তবাবু বললো, ‘বেশ ভালো, তোমরা মহান পেশা বেছে নিয়েছ। পৃথিবীতে যত পেশা আছে, সব থেকে সুন্দর ও সম্মানীয় ¯^াধীন ও সৎ পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। আমিও প্রথম জীবনে একটা হাইস্কুলে কয়েক বছর অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করে ছিলাম। তারপর এই বাগাানের চাকুরী। এখন অবসর শেষে ঐ যে স্কুলখানা দেখছো, ওটা বেসরকারী প্রাইমারী স্কুল। ওটা কয়েকজন শিক্ষিত ছেলে মেয়েকে নিয়ে চালাই। যা হউক তোমারাও শিক্ষক, আমিও শিক্ষক, কাকতালীয় ভাবে মিলে গেল।’
একটু পরেই বাসার কামলা রামচন্দ্র ট্রেতে চা নিয়ে এলো। পিছনে ফাগুনী, দিবা-রাত্রি।’
দিবা নিজ হাতে ট্রে থেকে চা নিয়ে একে একে সবাইকে দিল। চায়ে চুমুক দিয়ে হেমন্তবাবু বললো, ‘তা বাগান কেমন দেখলে?’
‘মুভিজ বললো,‘ খুবই সুন্দর কাকাবাবু, এরকম সুন্দর জায়গা জীবনে আর কোথাও দেখেনি।’
‘সবটা ঘুরে দেখেছ?’
আসাদ বললো,‘না কাকাবাবু শুধু মাত্র সেক্শন ও লেকগুলো দেখেছে। এরপরতো বৃষ্টি, তাই আর কিছু দেখা সম্ভব হয়ে উঠেনি।’
‘আচ্ছা যা হউক, আমি যখন এসেছি তখন তোমাদেরকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখাবো। ওসমাননগর চা বাগান ও শমশের নগরে দেখার মত অনেক কিছু আছে।’
রাত্রি বললো,‘আছে না ছাই, কি আছে এখানে? এটা একটা দেখার কোন জায়গা হলো। শুধু কিছু চা গাছ, ছায়াবৃক্ষ আর সারাক্ষন বৃষ্টি।’
আসাদ বললো,‘তুমি এখানে সব সময় থাকো তো, এই জন্য এখানকার সৌন্দর্য তোমার চোখে লাগবে না। যারা বাহির থেকে বেড়াতে আসে, তাদের কাছে জায়গাটা খুবই সুন্দর।’
হেমন্তবাবু বললো,‘তুমি ঠিকই বলেছ আসাদ, যারা যেখানে বাস করে, তারা সেখানকার সৌন্দর্য বুঝতে পারে না। বাহির থেকে যারা আসে তারাই তার সৌন্দর্য বুঝতে পারে। আমাদের এখানে দেখার মত অনেক কিছু আছে।’
রাত্রি বললো,‘কি আছে আব্বু ? শুধু চারিদিকে ঘন জঙ্গল, গাছ-গাছালি, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ।সারা বৎসর বৃষ্টি, এই জায়গায় থাকতে থাকতে একদম ঘেন্না ধরে গেছে।’
রাত্রির কথায় সবাই হেসে উঠলো ।
আসাদ বললো,‘এখানে দেখার মত, সৌন্দর্য উপভোগ করার মত সব কিছু আছে।’
‘কি আছে?’
‘এই ধরো, চা বাগান, ছায়াবৃক্ষ, লেক, গাছ গাছালিতে অসংখ্য পাখি। শ্রমিকদের পাতি (পাতা) উঠানো, ফ্যাক্টরী, রাবার বাগান, গলফ্ মাঠ, এয়ারপোর্ট ,খাসিয়াদের জীবনযাত্রা। ৩/৪ কিলোমিটার দূরে ভানুগাছে আছে মনিপরী সম্প্রদায়ের জীবন যাত্রা এবং হাম্ হাম্ এর মত বড় ঝরনা।’
হেমন্ত বাবু ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,‘আমার মাষ্টার মা কিছু বলছো না কেন?’ ফরিয়া একটু মৃদু হাসলো।
তারপর জিকো ও মুভিজকে বললো,‘তোমরা একে একে সব দেখবে এবং পুরো বাগান তোমাদেরকে মাইক্রো বাস নিয়ে ঘুরে দেখাবো। পরশু দিন থেকে লাল পূজা (হলি) বাসন্তী উৎসব শুরু হবে। বাসন্তী উৎসব চলবে চার দিন। বাসন্তী উৎসবে আমাদের এখানে বড় সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। তোমাদেরকে নিয়ে এবার বসন্তী উৎসবে আমরা আনন্দ ফুর্তি করবো।’
জিকো বললো,‘তাতে তো আনেকদিন থাকতে হবে।’
‘আর কয়দিন থাকবে। না হয় সপ্তাহ খানেক। বিয়ের পর হানিমুন করতে এসেছ। হানিমুনতো আর ২/৩ দিনের হয়না। অন্তত: সপ্তাহখানেক না হলে চলে।’
জিকো বললো,‘কি বলেন কাকাবাবু, এতদিন আমাদের স্কুলের অবস্থা কি হবে? চাকুরীতো থাকবে না।’
হেমন্তবাবু একটু হেসে বললো,‘থাকবে- থাকবে, বিবাহ সংক্রান্ত ব্যাপারে কেউ কিছু বলবে না।’
তারপর আসাদকে উদ্দেশ্য করে হেমন্তবাবু বললো,‘শোন আসাদ, এই কয়েকদিন তুমি তোমার বাসা জিকো ও ফারিয়াকে ছেড়ে দেবে। তারা দুজনে তোমার বাসায় থাকবে।আর তুমি আর মুভিজ আমাদের বাসায় উত্তর পাশের রুমটায় থাকবে।’
এমন সময় হেমন্তবাবুর মোবাইলে রিং বেজে উঠলো। মুনমুন ম্যাডামের ফোন।
‘হ্যালো’ বলে হেমন্তবাবু পাশের রুমে গেল।
অনেকক্ষন কথা বলার পর হেমন্তবাবু এসে বললো, আসাদ, ম্যাডাম তোমাকে ও আমাকে বাংলোয় যাওয়ার জন্য ডেকেছে।’
আসাদ বললো,‘চলুন কাকাবাবু।’
‘চলো’
তারা বাসা থেকে বের হতেই দেখলো,‘ম্যাডামের গাড়ী তাদের বাসার দিকে আসছে এবং গাড়ী এসে বাসার সামনে থামলো। ড্রাইভার নির্মল গাড়ীর দরজা খুলে, গাড়ী থেকে নেমে হেমন্তবাবু ও আসাদকে প্রানম জানিয়ে বললো,
‘বাবু, ম্যাডাম আপনাদেরকে সালাম দিছেন।’
আসাদ ও হেমন্তবাবু গাড়ীতে বসলো। নির্মল দুজনকে নিয়ে মুনমুন ম্যাডামের বাংলোর দিকে চললো।
ফুলছড়া বাংলোটা উঁচু টিলার উপরে। বেশ পুরানো বাংলো। সেই ব্রিটিশ আমলের বাংলো। অবশ্য এখন অনেক সংস্কার করা হয়েছে। অনেক ব্রিটিশ সাহেব এই বাংলোতে থেকেছে। বিশাল বারান্দায় স্তরে স্তরে সাজানো ফুলের টব। সামনে ফুলের বাগান। বেতের সোফায় বসে মুনমুন পেপার পড়ছে। গাড়ীর শব্দ শুনে উঠে দাঁড়ালো। হেমন্তবাবু ও আসাদ গাড়ী থেকে নামলো। মুনমুন নিজেই সোফা থেকে উঠে এসে হেমন্ত বাবুকে প্রনাম জানিয়ে বললো,‘আসুন বাবু, আসুন।’
তারপর আসাদকে বললো,‘বাবু কেমন আছেন?’
‘ভালো।’
হেমন্তবাবু বললো ‘ম্যাডাম আপনার ভিসা সংক্রান্ত ঝামেলা শেষ হয়েছে।’
‘না বাবু।’
‘আবার ৩ মাস পর ঢাকায় যেতে হবে।’
‘তা আপনার গ্রামের বাড়ীর ঝামেলা শেষ হয়েছে তো?’
‘জী শেষ হয়েছে।’
‘কালকে ফ্রি আছেন?’
হেমন্তবাবু বললেন, ‘ম্যাডাম ঢাকা থেকে আমার কিছু গেষ্ট এসেছে, তাদেরকে কাল বাগান ও ফ্যাক্টরী দেখাবো।’
‘ মুনমুন বললো,‘সামনে পূজা, তাহলে আপনাকে এই কয়দিন আর পাচ্ছি না।’
জী ম্যাডাম, ‘এই কয়টা দিন ছুটি চাচ্ছি।’
‘ছি: কি বলছেন?’ আপনার মত একজন জ্ঞানী ও এক্সপেরিয়ান্স লোক যে পেয়েছি, সেটা আমার ভাগ্য। আমার গবেষনার জন্য আপনার মত লোক পাবো, তা আমি ¯^প্নেও ভাবিনি।’
‘ছি: ম্যাডাম আর লজ্জা দিবেন না। আমি কিছুই জানি না। আমি একজন সাধারণ মানুষ মাত্র।’
‘যারা জ্ঞানী, তারা কখনও নিজেকে তা ¯^ীকার করে না। যা হউক আপনারা গেষ্টদেরকে নিয়ে বাগান দেখুন আমিও একটু রেস্ট নেই। তারপর দেখা যাবে।’
একটু পরেই চা এলো। সুগীর বাবুর্চি ট্রে করে চা নিয়ে এলো। আসাদ সুগীরের দিকে তাকালো। সুগীরও আসাদের দিকে তাকালো। আসাদ মনে মনে বললো, বেচারা।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে মুনমুন বললো,‘বাবু আমি আসলাম আজ প্রায় সপ্তাহখানেক হলো। অথচ পুরো বাগানটা এখনও ঘূরে দেখলাম না, এক কাজ করলে হয় না, কালকে গেষ্টদের নিয়ে আমরা সবাই বাগান দেখতে বের হই।’
‘আপনি আমাদের সাথে বেড়াতে যাবেন?’
‘যাবো।’
কিন্তু আপনার যাওয়ার ব্যাপারে কিছু রেস্টেক্শান আছে।’
‘তা কি রকম?’
হেমন্তবাবু একটু হেসে বললো,‘প্রথমে আপনি বাগানের ভিআইসি পার্সন। আপনার নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। আমরা ফুলছড়া হতে জাগহাটি সেন্ট্রাল হাসপাতাল, সেখান থেকে জাগহাটি লেক, সেখান থেকে ডাবছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, তারপর গলফ্ মাঠ, গলফ্ মাঠ থেকে ফ্যাক্টরী। তারপর আসার পথে এয়ারপোর্ট দেখে বাসায় আসবো। সব মিলিয়ে ১৫/১৬ কিলোমিটার পথ। পুরো দিনটা আমাদেরকে ভ্রমন করতে হবে। দুপুরের খাবার আমরা গলফ্ মাঠে খাবো। দীর্ঘ এই পথের কিছু পথ নিরাপদ নয়। তাছাড়া আপনাকে নিয়ে যেতে হলে বড় সাহেবের পারমিশন নিতে হবে।’
‘সে আমি দেখবো। বড় সাহেবকে আমি বলবো।’ বলেই মুনমুন মোবাইল চাপলো এবং পাশের রুমের দিকে গেল। আসাদ ও হেমন্ত বাবু সোফায় বসে রইলো। একটু পরেই মুনমুন রুম থেকে বের হয়ে এলো এবং বললো,‘বাবু, বড় সাহেবকে বলেছি, বড় সাহেব রাজী হয়েছেন, তবে উনি আপনার সাথে সম্ভবত: কথা বলবেন।’
একটু পরেই হেমন্ত বাবুর মোবাইলে রিং বেজে উঠলো। হেমন্তবাবু দেখলো, বড় সাহেবের কল।
হেমন্তবাবু পাশের রুমে গেল এবং রিসিভ করে বললো,
‘আদাপ স্যার।’
‘কেমন আছেন বাবু?’
‘ভালো স্যার।’
‘বাগানে কবে ফিরলেন?’
‘এইতো একটু আগে স্যার।’
‘গ্রামের বাড়ীর ঝামেলা শেষ হয়েছে তো?’
‘জী স্যার।’
‘আচ্ছা শুনুন বড় বাবু, মুনমুন ম্যাডাম ফোন করেছেন পুরো বাগানটা ঘুরে দেখার জন্যে। কালকে নাকি আপনারা গেষ্ট নিয়ে বাগান দেখবেন। উনিও আপনাদের সাথে ঘুরতে চাচ্ছেন।’
‘জী স্যার।’
‘উনি যখন আপনাদের সাথে বাগান দেখতে ইচ্ছা করেছেন, তাকে ভালো করে বাগান ঘুরে দেখাবেন। তার কোন ব্যাপারে না বলা চলবে না। একে তো উনি আমাদের লন্ডন অফিসের এড্মিনিস্টেটর। তার উপর উনার নানা এক সময় এই গার্ডেনের বড় সাহেব ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো উনার মা ওয়াটসন ব্রাদার্সের আত্মীয়। তাহলে বুঝতেই পারছেন,উনি আমাদের মালিক পক্ষের লোক। উনি দুই বৎসরের জন্য এখানে চা বাগান, চা বাগান সংস্কৃতি নিয়ে গবেষনা করতে এসেছেন। অতএব উনার এই কাজে আমাদের সহযোগিতার কোন ক্রটি যেন না হয়। সেদিকে আমাদের সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি কোন ক্রটি বিচ্যুতি হয় তাহলে ঢাকা অফিস এবং লন্ডন অফিস কাউকে ছাড়বে না। এটা ঢাকা অফিসের কড়া নির্দেশ।’
‘জী স্যার।’
‘আপনারা কোন কোন দিকে যাবেন, কিসে যাবেন?’
‘স্যার, আমরা প্রথমে ফুলছড়া থেকে জাগহাটি যাবো। সেখানে হাসপাতাল দেখবো, সেখান থেকে লেক, তারপর ডাবছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে, তারপর গল্ফ কোর্সে। দুপুরে ওখানে লাঞ্চ সারাবো। সেখান থেকে ফ্যাক্টরী, তারপর এয়ারপোর্ট হয়ে ফুলছড়া।’
‘একদিনে এত কিছু ভালো করে দেখতে পারবেন।’
‘যা সম্ভব হয়, আমরা সকাল ৮ টার দিকে বের হবো। ম্যাডাম নিজের গাড়ীতে যাবেন। আর আমরা একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করেছি।’
‘কিন্তু বাবু, ডাবছড়ার বর্ডার এরিয়া এবং খাসিয়া পুঞ্জি এলাকা একটু ঝুঁকিপূর্ন। তাই আমি ম্যাডামের নিরাপত্তার জন্য তিনজন সিকিউরিটি সহ একটা জীপ পাঠিয়ে দেব। জীপ সহ সিকিউরিটি ওনার পিছনে থাকবে। আর ডাবছড়ার বড় বাবুকে বলবো, রাস্তার পাশের সেক্শন গুলোতে সেক্শন চৌকিদার যেন এ্যালাট থাকে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে স্যার।’
পরদিন সকাল ৮টার দিকে হেমন্তবাবু ¯^পরিবারে আসাদ ও গেষ্ট সহ বাগান ভ্রমনে বের হলো। গাড়ী প্রথমে মুনমুন ম্যাডামের বাংলোর সামনে এসে থামলো। ম্যাডাম তার গাড়ী নিয়ে বাংলো থেকে বের হলো। পিছনে জীপে সিকিউরিটি। প্রথমে তারা জাগহাটির দিকে চললো। ফুলছড়া থেকে জাগহাটির দূরুত্ব দেড় কিলোমিটার। একটু পরেই গাড়ী এসে জাগহাটি কোম্পানী হাসপাতালের সামনে এসে থামলো। সবাই গাড়ী থেকে নামলো এবং হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিল। বিশাল হাসপাতাল। সামনে ফুলের বাগান। সবাই হাসপাতালে ঢুকলো।
হেমন্তবাবু বললো, ‘এটা কোম্পানীর সেন্ট্রাল হাসপাতাল। কোম্পানির বিশ বাগানের সব কর্মকর্তা কর্মচারি ও শ্রমিকদের এখানে চিকিৎসা হয়। এখানে সার্বক্ষনিক এমবিবিএস ডাক্তার থাকে। মাঝে মাঝে ঢাকা এবং বিদেশ থেকে বড় বড় অভিজ্ঞ ডাক্তারদের টিম আসে, জটিল অপারেশন করার জন্য।’ পিছনে ডাক্তারদের বাংলো, হেমন্ত বাবু তা দেখালেন।
মুনমুন বললো, ‘খুব সুন্দর তো, চলুন আমরা হাসপাতালের ভিতরে যাই।’
হেমন্ত বাবু একে একে সবাইকে হাসপাতালের অপারেশন রুম, প্যাথলজি বিভাগ, ঢ- রে রুম, রোগীদের বেড সব দেখালো। কয়েকটা বেডে কয়েকজন রোগীকে দেখা গেল। এরপর হাসপাতালের সামনে ফুলের বাগানে সবাই মিলে গ্রæফ ফটো উঠালো। আসাদ ফটো উঠানের দ্বায়িত্ব নিল। মুনমুন বললো, ‘বাবু এবার আমরা কোনদিকে যাবো?’
হেমন্তবাবু বললো, ‘এবার আমাদের গন্তব্য লেক।’
‘লেক?’
গাডেন-এ লেক আছে নাকি?’
‘আছে।’
‘তাহলে চলুন লেক দেখি।’
‘সবাই গাড়ীতে উঠলো। জাগহাটি থেকে লেকের দূরুত্ব দুই কিলোমিটার হবে। গাড়ী সেদিকে চললো। মিনিট খানেক চলার পর মুনমুন ম্যাডাম গাড়ী থেকে নেমে পড়লো। মুনমুনকে গাড়ী থেকে নামতে দেখে অন্যন্যরা গাড়ী থামিয়ে তার কাছে আসলো।
আসাদ মুনমুননের কাছে এসে বললো, ‘ম্যাডাম কোন সমস্যা?’
হেমন্ত বাবু বললো, ‘ম্যাডাম কোন সমস্যা?’
না বাবু । তবে একটু আন্ ইজি ফিল করছি।’
হেমন্ত বাবু বললো,‘ কোন শাররিক সমস্যা, হাসপাতালের দিকে রিমুভ করবো?’
‘না বাবু শারিরীক সব ঠিক আছে তবে আমার গাড়ীতে আমি একা। তাই একা গার্ডেন দেখতে আনন্দ পাচ্ছি না। তাই আপনাদের গাড়ীতে যেতে চাই।’
‘আমাদরে গাড়তি?ে’
‘হ্যাঁ বাবু’
‘কন্তিু আমাদরে গাড়তিাে এসি নইে’
‘এসি লাগবে না’
হমেন্ত বাবু আর ফাগুনি পাশাপাশি সটিে বসছেলি। তার পছেনরে সটিে জকিো, ফারযি়া। পছেনরে সটি গুলোতে দবিা, রাত্র,ি আসাদ, সুরি সরদার বসছেলি।হমেন্ত বাবু, দবিা রাত্রি ও ফাগুনকিে মুনমুনরে গাড়তিে উঠতে বললো। মুনমুন হমেন্ত বাবুর পাশে বসলো।হমেন্ত বাবু ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বললো। গাড়ি লকেরে দকিে চলতে লাগলো।রাস্তার দুই পাশে উঁচু-নচিু পাহাড়। পাহাড়রে বুক চরিে রাস্তা। এদকিে পাহাড় গুলো অনকে উঁচু। রাস্তার দুই পাশে সবুজ চা বাগান, ছায়াবৃক্ষ। হরকে রকম পাখরি কোলাহল।অদূরে কোকলিরে ডাক শোনা যাচ্ছ।ে হমেন্ত বাবু ডাইভারকে গাড়ি ধীর গততিে আস্তে চালাতে বললো। কারণ আস্তে আস্তে চালালে বাগান ভালো করে দখো যায়। জকিো,মুভজি,ফারয়িা প্রকৃতরি এই অর্পূব সৌর্ন্দয দখেে অভভিূত। মুনমুন বললো, ‘বাবু আমাদরে এই বাগান সম্বন্ধে কছিু বলুন।’
হমেন্ত বাবু একটু হসেে বললো, ‘কি বলবো ?’
‘ এই বাগান সৃষ্টরি ইতহিাস। বাগানরে আয়তন, প্রোডাকশন ইত্যাদ।ি’
‘আসলে এই বাগান সৃষ্টরি ইতহিাস এর আলাদা কোনো দললি বা বইপত্র নইে। আমি আমার দাদার কাছ থকেে উপমহাদশেরে ঞবধ ঢ়ষধহঃধঃরড়হ এর ইতহিাস সম্বন্ধে একটা পুরাতন বই পযে়ছে।ি তাতে এই কোম্পানরি মালকি ওয়াটসন ব্রার্দাস এর ব্রটিশি পরিয়িডে ভারতর্বষে আসার উদ্দশ্যে এবং ঞবধ ঢ়ষধহঃধঃরড়হ সম্বন্ধে লখো আছ।ে তনিি এটা পযে়ছেলিনে, উনার এক বন্ধুর বাবার কাছ থকে।ে তনিি র্দাজলিংি এর একটা চা বাগানে চাকুরি করতনে। বইটি ১৮৯০ সালরে লখো। যাহা হউক এই সম্বন্ধে তোমাকে পরে বলবো। সে বড় ইতহিাস’।এখন সংক্ষপেে বল।ি ১৮৬০ সালে আমাদরে এই বাগানরে গোড়া পত্তন হয়। ওয়াটসন ব্রার্দাসরে সম্বত: এটা প্রথম বাগান। তারা ব্যবসা করতে ভারতর্বষে আস।ে প্রথমে তারা এখানকার মাটি টস্টে করে এবং ওয়েদার র্পযবক্ষেণ কর।ে তারপর বাগান করার সদ্ধিান্ত নযে়। তখানকার দনিে এইসব অঞ্চল শুধু জঙ্গল ঘরো পাহাড়-র্পবত ছলি। এসব এলাকায় কোন মানব বসতি ছলি না। রাস্তাঘাট ও তমেন ছলি না। তাই তারা বাগান করার জন্য বহিার, মাদ্রাজ, তামলিনাড়ু, উড়ষ্যিা,উত্তর প্রদশে, মহারাষ্ট্র সহ ভারতরে বভিন্নি দরদ্রি পড়িীত এলাকা থকেে শ্রমকি এনে বাগানরে কাজ শুরু কর।ে তারপর দশেীয় হন্দিু সম্প্রাদায়কে বাগানরে হসিাবপত্র করার জন্য বাবু পদে নযি়োগ কর।ে এইভাবে বাগান শুরু হলো। এই হলো সংক্ষপ্তি ইতহিাস। র্বতমানে আমাদরে বাগানটা এরযি়া ২২০০ হক্টের। এর মধ্যে ১২০০ হক্টের ঢ়ষধহঃধঃরড়হ এরযি়া। বাকি ১০০০ হক্টের লকে, জম,ি লবোর হাউস, ফ্যাক্টর,ি স্টাফ কোযর়্াটার বাংলো, রাবার প্রোজক্টে ও গলফ্ র্কোস এরযি়া ।’
মুনমুন বললো, ‘র্বতমান বৎসরে কত কজেি চা উৎপাদন হয়।’
হমেন্ত বাবু বললো, ‘র্বাষকি চা উৎপন্ন হয়, প্রায় ১৫,০০,০০০ ( পনরেো লক্ষ) কজে।ি
মুভজি বললো, এটা ব্ল্যাক টি না সবুজ চা পাতা।’
‘এটা ব্ল্যাক টী।’ প্রতি ৪ কজেি সবুজ চা পাতা থকেে ১ কজেি চা পাতা হয়। হমেন্তবাবু কথা শষে করতে না করতে গাড়ি লকেরে কাছে এসে পৌঁছালো। সবাই গাড়ি থকেে নমেে পড়লো। চারদিকিে সুনসান নীরবতা। বশিাল পাহাড়রে কোল ঘঁেষে লকে। প্রায় ১ কলিোমটিার লম্বা হব।ে লকেরে মাঝে লাল পদ্ম ফুটে আছ।ে এক ঝাঁক হাঁসরে পাল দখো গলে।অদূরে লবোর হাউজ। লকেরে পাশে একটা পাতি ঘর দখো গলে। সবাই লােকরে পাড় ধরে হাঁটতে লাগলো। হমেন্তবাবু মুনমুন ও জকিোদরেকে লকে দখোতে লাগলো।
মুনমুন বললো, ‘খুব সুন্দর।’
জকিো বললো, ‘কাকাবাবু এরকম সুন্দর দৃশ্য কখনো দখেনি।ি’
বাগানরে বুক চরিে মাঝখানে লকে। দুপাশে চা বাগান, উপরে ছায়াবৃক্ষ। মুভজি লকেরে কয়কেটা ফটো উঠালো। ইতমিধ্যে লবোর হাউস থকেে দুই এক জন লোক তাদরে দখেে এগযি়ে এলো।
সুরি র্সদার বললো, ‘এই দকিে আসছি না, বলিতেি ম্যাডাম ও বাবুরা আছ।ে’
তারা লবোর কোযর়্াটাররে দকিে চলে গলে। হমেন্ত বাবু সবাইকে লকেরে কথা বলছ।েলকেগুলো কি করে হলো?
তনিি বলতে লাগলনে, ‘ব্রটিশি পরিয়িডে তখন এই পাহাড়ি এলাকায় চাপ কল ছলিনা। তখন শ্রমকিদরে পানরি চাহদিা মটোনোর ও চাষাবাদরে জন্য এই লকেগুলো খনন করা হয়।’

হাঁটতে হাঁটতে সবাই ক্লান্ত হয়ে গলে। যখোনটায় তারা গাড়ি রখেে এসছে,ে সখোনে আবার ফরিে এলো এবং পাতি ঘররে ভতিরে গযি়ে বসলো। একটু পরইে মোটরসাইকলে এর আওয়াজ শোনা গলে। ওলবিাবুকে আসতে দখো গলেো। তার মোটরসাইকলে পাতঘিররে সামনে এসে থামলো। মটরসাইকলেরে পছিনে একটা বাক্স। সুরি র্সদার গযি়ে বাক্সটা নাময়ি,ে পাতঘিরে নযি়ে আসলো। অলি বাবু এসে বাক্স খুলে এক একটা প্যাকটে সবার হাতে দলি।
‘হমেন্ত বাবু বললো, ‘তুমি আবার এসব করতে গলেে কনে ওল?ি’
‘না দাদা আমি করনি,ি করছেে ম্যাডাম।’
হমেন্ত বাবু মুনমুন কে বললো, ‘ম্যাডাম, আপনি আবার এসব কনে করতে গলেনে?’
‘ ‘না বাবু, তমেন কছিুনা, এই একটু হালকা নাস্তা।ওলি বাবুকে আমি সকালে ফোনে বলে দযি়ছে।ি’

সবাই, প্যাকটে খুলে সঙ্গিারা, চৌমুচা,মষ্টিি ও সদ্ধি ডমি খতেে লাগলো। ফাগুনি ফ্লাস্ক র্ভতি চা-বস্কিুট ও সন্দশে এনে ছলিো।সুরি র্সদার ও দবিা তা সবাইকে দলি। চায়ে চুমুক দতিে দতিে হমেন্তবাবু বললো, ‘একসময়, এই লকেে বড় বড় রুই-কাতলরে চাষ হতো। এখনো পোনা ছাড়া হয়-
কথা বলতে না বলতইে- লবোর হাউজ থকেে মৌমাছরি ঝাঁকরে মত নারী-পুরুষ, ছোট ছলেে মযে়ে এসে তাদরেকে ঘরিে ফলেলো। পঞ্চায়তে প্রধান নরন্দ্রে এসে বললাে, ‘বড়বাবু প্রনাম।’
একত্রে এতগুলো লোক দখেে জকিো, ফারযি়া, মুনমুন ও মুভজি ভয় পযে়ে গলে।
তাদরে সবার হাতে রঙরে বোতল। নজিরো রং মাখামাখি করে মুখ রঙনি করে ফলেছে।ে নরন্দ্রে বললো, ‘বাবু আমাদরে কী সৌভাগ্য য,ে আপনাকে আজ(হলি উৎসবরে আগরে দনি) আমাদরে মাঝে পযে়ছে।ি একটু আর্শীবাদ নতিে এসছে।িবলইে লাল রং র্ভতি বোতল হমেন্ত বাবুর হাতে দলি।’
হমেন্তবাবু একটু যতমত খলে, তারপর নজিকেে সামলে নযি়ে বললো, ‘ঠকি আছ।ে তব,ে এখানে বলিতেী ম্যাডাম আছে এবং ঢাকা থকেে কছিু অতথিি এসছে,ে তাদরে জামা কাপড় নষ্ট করওি না।’
বলইে হমেন্তবাবু লাল রঙরে বোতল খুলে নরন্দ্রের মুখে একটু লাগযি়ে দলি। নরন্দ্রের মুখখানা আগওে লাল- সবুজ রংয়ে রাঙানো ছলি। তার উপর লাল রংয়ে আরো রঙনি হয়ে উঠলো। নরন্দ্রেও বোতল থকেে রং নযি়ে হমেন্ত বাবুর পুরো মুখ রঙনি করে দলি।
এরপর কয়কেজন জোয়ান ছোকরা- ছোকরী এসে বললো, ‘তা হবে না, আমাদরে এখানে যখন এসছেনে, তখন সবাই আর্শীবাদ দযি়ে এবং নযি়ে যাবনে। কাউকে ছাড়ছি না।’
আর যায় কোথায়। তাদরে কথা শষে হতে না হতইে সবার উপর শুরু হলো রং বৃষ্ট।ি মুর্হূতরে মধ্যে সবার জামা-কাপড় মুখ লাল সবুজ রং ধারণ করলো। নরন্দ্রে ও সুরি র্সদাররে ধমকরে পর তারা থামলো বট,ে কন্তিু ততক্ষনে যা হওয়ার তা হয়ে গছেে র্অথাৎ সবার জামাকাপড় রঙে একাকার হয়ে গলে। মুনমুন ম্যাডাম রঙ ছটিানোকে এনজয় করছ।ে সে একজনরে কাছ থকেে রঙরে বোতল নযি়ে দবিা, রাত্র,ি হমেন্ত বাবু, আসাদ, জকিো, মুভজি সবার মুখে রং লাগাতে লাগলো। এরপর নরন্দ্রে সবার কাছে এসে মাফ চাইলো।
সে বললো, ‘মাফ করবনে ম্যাডাম, আমাদরে হোলি উৎসবে আমরা কাউকে ছাড়ি না। এমন কি রাস্তায় ছোট সাহবে, বড় সাহবেকওে যদি পাই, তাদরেকওে রংয়ে রাঙ্গযি়ে দইে।’
মুনমুন বললো, ‘মাফ চাওয়ার কি আছ?ে আমরা তোমাদরে এই আনন্দকে ভাগাভাগি করলাম এবং এনজয় করলাম। একটু পরে বড় ৮/১০ কাঁসার থালায় পূজার প্রসাদ এলো। কলা সন্দশে মষ্টিি ও নমিক।ি সবাই একটু একটু খলেো। বাকটিা হাতে নযি়ে গাড়তিে উঠলো। এবার গন্তব্য ডাবছড়া ফাঁড়ি বাগান ও খাসযি়া পুঞ্জ।ি গাড়-ি দক্ষণি দকিে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে ডাবছড়ার উদ্দশ্যে রওনা হলো। নরিব নস্তিব্ধ পথ। মাঝে মাঝে বাগানরে সকেশনে লাঠি হাতে চৌকদিার পাহারা দচ্ছি।ে একটু অগ্রসর হতইে, ছোট আরকেটা লকে দখো গলেো। এর এক পাশে চা বাগান। অপর পাশে রাবার বাগান। এখানে শত শত বানর দখো গলে। কউে লকেরে পারে খলো করছ,ে কউে এক গাছ থকেে অন্য গাছে লাফালাফি করছ।ে মুনমুন ম্যাডাম ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললো। তারপর হমেন্ত বাবুকে বললো, ‘বাবু এখানে বানর আছ,ে তা- তো আমাদরে আগে বলনেন।ি’
হমেন্ত বাবু বললো, ‘ম্যাডাম বানররে কথা একদম ভুলইে গযি়ছে।ি’
গাড়ি থামযি়ে তারা বানর দখেলো। মুভজি মোবাইলে বানররে ফটো উঠালো। বানরগুলো তাদরেকে দখেে হাঁক-ডাক বাড়যি়ে দলি। কয়কেটা বানর একবোরে তাদরে কাছে এলো।
‘ মুনমুন বললো, ‘চডি়যি়াখানায় অনকেবার বানর দখেছেি কন্তিু এভাবে প্রাকৃতকি পরবিশেে কখনো দখেনি।ি’
সবাই কছিু খাবার বানররে পালরে দকিে ছুঁড়ে মারলো।এর মধ্যে একটা বড় বানর দখো গলে। বোধ হয় তাদরে প্রধান। তার আওয়াজে খাদ্য নযি়ে তারা দূরে দাঁড়ালো। সবাই আবার গাড়তিে এসে বসলো। গাড়ি ১৫/২০মনিটি চলার পর ডাবছড়া ফাঁড়ি বাগান এসে পৌঁছালো।
ডাবছড়া ফাঁড়ি বাগান ওসমান নগর চা বাগানরে অংশ। বাংলাদশে-ভারত সীমান্ত ঘষো। ওসমান নগর র্গাডনে থকেে প্রায় আট কলিোমটিার, এখানে হাজার খানকে শ্রমকি আছ।ে সবাইর আলাদা আলাদা ঘর আছ।ে এখানে চারজন বাবু ,একজন ছোট সাহবে, প্রাথমকি চকিৎিসার জন্য একটা ছোট হাসপাতাল, একজন কম্পাউন্ডার ও একজন মডিওয়াইফ আছ।ে এছাড়া একটা প্রাইমারি স্কুল আছ,ে স্কুলরে সামনে খলোর মাঠ। হমেন্ত বাবু গাড়ি থকেে সবাইকে দখোলো। এই সীমান্ত ফাঁড়ি বাগানে আসলে হমেন্ত বাবুর মনটা দুঃখে ভরাক্রান্ত হয়ে যায়। সামনে কাঁটা তাররে বডে়া দখো গলে। ওপারে ভারতরে ত্রপিুরার র্মূতি ছড়া চা বাগান ও কলৈাশ শহর। এপারে বাংলাদশে। হমেন্ত বাবু গাড়ি থামাতে বললনে। রাস্তার একপাশে গাড়ি থামলো। হমেন্ত বাবু গাড়ি থকেে নামলনে, সুরি র্সদারও নামলনে। ইতমিধ্যে ডাবছড়ার বড়বাবু ও অন্যন্য বাবুরা আসলো।বড়বাবু ও অন্যন্য বাবুরা অনুরোধ করলভে বাসায় যাওয়ার জন্য। হমেন্ত বাবু হাঁটতে হাঁটতে কাঁটা তাররে বডে়ার কাছে গলেনে। পছিনে ফাগুনি ও সুরি র্সদার, হমেন্ত বাবুর দুচোখ বযে়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। সইেসাথে ফাল্গুনী ও ফুঁপযি়ে ফুঁপযি়ে কাঁদতে লাগলনে। গাড়ি থকেে সবাই নমেে পড়লো। মুনমুন জকিো, আসাদ যয়েে হমেন্ত বাবুকে ধরলাে।
মুভজি ও জকিো বললো, ‘কি হয়ছে,ে কাকাবাবু অসুস্থ বোধ করছনে?’
হমেন্ত বাবু ,জকিো ও মুভজি এর হাত ধরে বললনে, ‘না বাবা, আমি ঠকি আছ।ি এই স্থানটা আমার জন্য বড় ট্র্যাজডেি । এখানে আসলে আমার বুকটা হুহু করে ওঠ।ে’
মুভজি বললো, ‘ কনে কাকাবাবু?’
চোখরে জল মুছে নজিকেে একটু সামলে নযি়ে হমেন্ত বাবু বললনে, ‘সে অনকে কথা, অনকে ইতহিাস। তোমাদরেকে পরে বলবো। এই মুর্হূতে সে কথা বলে তোমাদরে মন দুঃখ ভরাক্রান্ত করতে চাই না।’
হমেন্ত বাবু সবাইকে গাড়তিে উঠতে বললনে এবং ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বললনে। গাড়ি আস্তে আস্তে চলতে লাগলো। পাহাড়ি এই উঁচুনীচু রাস্তায় গাড়ি সাধারণত: ধীর গততিে চল।ে হমেন্ত বাবু পাঞ্জাবরি পকটে থকেে মোবাইল বরে করে রংি দলিনে।
‘হ্যালো, হ্যালো।’
হ্যাঁ আব্রাহাম, ‘তুমি পুঞ্জতিে আছো, আমারা তোমার প্ঞ্জুরি সামনে এসে গছে।ি’
এই আব্রাহাম খাসযি়াদরে পুঞ্জি প্রধান। তারা তাকে মন্ত্রী বলে ডাক।ে পুঞ্জরি সমস্ত সম্পদরে মালকি স।ে অন্যান্য খাসযি়ারা তার জমতিে পান, লবেু ও জুম চাষ করে । একটু পরে গাড়ি খাসযি়া পুঞ্জরি সামনে এসে থামলো । পুঞ্জরি থকেে ৬/৭জন নারী-পুরুষ বরে হলো। ৪০/৪৫ বৎসররে একজন মোটা পুরুষ, তার পছিনে অন্যরা। সবার চহোরা মনে হয় একরকম। চ্যাপ্টা নাক ছোট টানা টানা চোখ, র্খবাকৃত।ি হমেন্তবাবুকে দখেে আব্রাহাম দৌড়ে এসে বুকে জড়যি়ে ধরলনে।
‘কমেন আছনে মামা?’
‘ তোমাদরে আর্শীবাদে ভালো।’
আব্রাহামরে স্ত্রী ন্যান্সি বললো, ‘তা মামা, বড়দনিরে নমিন্ত্রনে আসনেনি কনে? আপনাকে খুব মস্ িকরছে।ি’
‘ তোমার মামীকে নযি়ে আসতে চযে়ছেলিাম। কন্তিু তোমার মামী সদেনি অসুস্থ ছলি, তাই আসতে পারনি।ি’ পছিন থকেে ৬৫/৬৭ বছররে একজন বয়স্ক মহলিা বলে উঠলো, ‘অতথিদিরে সাথে শুধু বাহরিে দাঁড়যি়ে দাঁড়যি়ে কথা বলব,ি না বাসায় নযি়ে আসব।ি’ আব্রাহাম বললো,‘মামা বাসায় চলুন।’
সবাই তার বাসার দকিে চললো। পাহাড়রে উপর উঁচু পাকা বড় বাড়,ি মন্ত্রী আব্রাহামরে। উপররে তলায় ফ্যামলিি নযি়ে থাক।ে নচিরে তলায় র্অধকেটা ড্রয়ংি রুম, র্অধকে বঠৈকখানা হসিবেে ব্যবহৃত হয়। বঠৈকখানায় সামাজকি বচিার আচার হয়। সবাই ড্রইং রুমে এসে বসলো।
হমেন্ত বাবু সবাইকে পরচিয় করযি়ে দযি়ে বললনে, ‘ন্যান্সরি বড় মামা আমার ক্লাসমটে ছলিনে। সইে কশিোর বয়স থকেে পুঞ্জতিে আমার অবাধ যাতায়াত। এখানকার বভিন্নি উৎসবে আমি সবসময় আসতাম, তার মামাদরে নমিন্ত্রণ।ে তখনকার সময় বড়দনিরে উৎসব খুব ভালোই জমতো। প্রায় ৪/৫ দনি র্পযন্ত নাটক গান-বাজনা চলত। সইে নাটক-গান আমি পরচিালনা করতাম। ন্যান্সি বললো, জী মামা, সইে ছোটবলো থকেে দখেছি বড়দনিরে উৎসব, আপনার আর মামীর গান দযি়ে অনুষ্ঠান শুরু হতো।’
‘ সইে অনকে আগরে কথা। তখন তোমার মামারা ছলি। এখন তো তারা বযি়-ে থা করে অন্য পুঞ্জতিে চলে গছে।ে’
একটু পরইে কোল্ড ড্রংিকস এলো। সাথে হরকে রকমরে ফল ও নাস্তা এল। আব্রাহাম ও ন্যান্সি তা সবাইকে পরবিশেন করলো। খাওয়া শষেে হমেন্ত বাবু আব্রাহাম কে বললো,
‘আব্রাহাম চলো, এবার পুঞ্জটিা দখো যাক। বলিতেি ম্যাডাম ও অতথিদিরেকে আমি কথা দযি়ছেি য,ে তোমাদরে পুঞ্জি দখোবো।’
‘চলুন মামা।’
হমেন্ত বাবু একে একে সবাইর ঘররে সামনে গযি়ে পুঞ্জরি সবার খবরা-খবর নচ্ছিনে এবং খাসযি়াদরে জীবনযাত্রা সবাইকে দখোচ্ছনে। সাধারণত মাচার ওপর তাদরে ঘরগুলো। পুঞ্জতিে তনিি সবার কাছে পরচিতি ও জনপ্রযি়। বশিষেত: মযে়দেরে কাছ।ে কারণ মাতৃতান্ত্রকি সমাজ ব্যবস্থায় মযে়রো বযি়-ে থা করে এখানইে থাক।ে আর পুরুষরা বযি়ে করে অন্য পুঞ্জতিে চলে যায়। তাছাড়া মন্ত্রী আব্রাহামরে স্ত্রী তার ছাত্রী। পুঞ্জর্দিশন শষেে তারা আবার গাড়তিে উঠলো।
ড্রাইভার বললো, ‘কাকাবাবু এবার কোন দকিে যাবো?’
হমেন্ত বাবু বললো, এবার গন্তব্য গলফ মাঠ।’
ড্রাইভার গাড়ি র্স্টাট দলি। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ ধরে গাড়ি চলতে লাগলো।
জকিো বললো, ‘কাকাবাবু, এ্ই খাসযি়াদরে সম্বন্ধে কছিু বলুন। তার কথায় মুনমুন ও অন্যরা সকলে সায় দলি। হমেন্ত বাবু সামন-েপছেনে তাকালো ।
তারপর বললো, ‘খাসযি়া উপজাতি সম্বন্ধে বলতে গলেে অনকে সময়রে ব্যাপার। তবে সংক্ষপেে তাদরে সম্বন্ধে বলছ,ি ‘খসযি়ারা সাধারণত: মাতৃতান্ত্রকি নৃগোষ্টী এরা মঙ্গোলযি়ান বংশধর। এদরে গাত্রর্বণ হরদ্রিাভ। নাক চ্যাপ্টা, চয়োল উঁচু। চোখ কালো ছোট টান্ টান্ এবং র্খবকার। প্রায় ৫০০ বছর আগে আসাম থকেে এরা বাংলাদশেে আস।ে তার আগে এসছেলি তব্বিত থকে,ে এককালে এই জাতি যাযাবর জাতি ছলি।’
তার কথা সবাই মনোযোগ দযি়ে শুনছ।ে বশিষেত মুনমুন। জানালার পাশে বসে ছলি। এলোমলেো-বাসন্তী হাওয়ায় সোনালী এলোমলেো চুল উড়ছ।ে হমেন্ত বাবু বলতে লাগলনে, ‘ভারতরে মঘোলয় রাজ্যরে শলিং, চরোপুঞ্জ,ি বাংলাদশেরে উত্তর-র্পূব সীমান্ত অঞ্চল সুনামগঞ্জ মৌলভীবাজার জলোয় তাদরে আবাসভূম।ি কাঠ ও বাঁশরে মাচা বারান্দা সহ এরা কুঁড়ে ঘর বানায় ।বারান্দা সাধারণত বঠৈকখানা হসিবেে ব্যবহূত হয়। গ্রাম কে তারা পুঞ্জি বল।ে প্রত্যকে পুঞ্জরি একজন প্রধান থাক।ে তাকে তারা মন্ত্রী বল।ে তাদরে সমাজ জীবনে মন্ত্রীর ক্ষমতা খুব বশেি । পুঞ্জরি বচিার আচার অনুষ্ঠান, ববিাহ র্পাবন তার মাধ্যমে সমাধা হয়। মন্ত্রী বরিাট ভূমি সম্পত্তরি মালকি। তার জমতিে প্রায় সবাই র্বগাদার হসিবেে কাজ কর।ে খাসযি়াদরে র্ধম প্রাচীন। কন্তিু কালে কালে বর্বিততি। প্রথা ও কুসংস্কার এদরে মধ্যে বশে।ি খাসযি়াদরে মধ্যে হন্দিু, মুসলমান ও খ্রীষ্ট র্ধমরে প্রভাব লক্ষণীয়। খাসযি়া সম্প্রদায়রে পরর্বিতনটা তাদরে র্ধমে বশেি ঘটছে।ে দড়েশতাধকি বৎসর র্পূবে খ্রষ্টিান মশিনারীরা তাদরে মধ্যে র্ধম প্রচার করছেলি। র্বতমানে ৮০% ৯০% খাসয়িাই খ্রষ্টিান। প্রায় প্রতি পুঞ্জতিে গর্জিা আছ।ে প্রতি রোববার খ্রস্টিান খাসযি়ারা গর্জিায় র্প্রাথনা কর।ে তারা একশ্বেরবাদী । এছাড়া এরা দবে দবেতা ও জীবজন্তু পূজারী। সম্প্রতি কছিু খাসযি়া ইসলাম র্ধম গ্রহণ করছে।ে মৃতরে সৎকাররে সময় তাদরে গুরু র্প্রাথনা মন্ত্র পাঠ কর।ে এদরে ঐতহ্যিবাহী পোশাক হচ্ছে শরিে চুড় বাঁধা পাগড়ী পরধিান করা। এছাড়া সারাবছর তারা পূজা র্পাবন কর।ে বযি়ে না করা পাপ। নজি গোত্ররে মধ্যে ছলেে মযে়ে ববিাহ নষিদ্ধি। যদি কউে করে তাহলে তারা সম্পত্তরি অধকিার হারায় এবং গ্রাম থকেে বহস্কিৃত হয় এবং মৃত্যুর পর কবর দওেয়া হয় না। মাতৃতান্ত্রকি সমাজ ব্যবস্থা বধিায় মযে়রো অন্য গোত্ররে ছলেকেে পছন্দ করে বযি়ে কর।ে কখনো কখনো অভভিাবকরে সদ্ধিান্তে বযি়ে হয়। বযি়রে পর কন্যার মাতৃ গৃহরে পাশইে নবদম্পতরি জন্য ঘর বানযি়ে দওেয়া হয়। কনষ্ঠি কন্যার জন্য আলাদা ঘর বানযি়ে দওেয়া হয় না। কারন কনষ্ঠি কন্যা মাতৃগৃহ ও সমস্ত সম্পত্তরি অধকিারীনী। কন্তিু অন্য কন্যারা ভাগ পায়। তবে তাদরে সম্পত্তি বক্রিি করার অধকিার নাই। পারবিারকি পূজা র্আচনা ছোট কন্যার মাধ্যমে অনুষ্ঠতি হয়। এক ববিাহ খাসযি়াদরে রওেয়াজ। তবে স্ত্রীরা একাধকি ববিাহ করতে পার।ে পুরুষদরে বহুববিাহ বরিল।’ কথা শষে হতে না হতইে গলফ্ মাঠরে কাছে এসে গাড়ি থামলো। সবাই গাড়ি থকেে নামলো। ওলি বাবু আগইে মাঠরে পাশে মোটরসাইকলে থামযি়ে দাঁড়যি়ে আছ।ে তার পাশে গলফ মাষ্টার তোহা । ১৪/১৫ জন শ্রমকি গলফ মাঠ শ্রমকি কাজ করছ।ে সবুজ ঘাসে ঢাকা গলফ মাঠ। সবাই হঁেটে হঁেটে গলফ মাঠ দখেতে লাগলো। তোহা বাবু সবাইকে ঘুরে ঘুরে মাঠ দখোচ্ছনে। অনকেগুলো সবুজ ঘাসে ঘরো গোলাকার মাঠ। মুভজি কয়কেটা গ্রুপ ফটো তুললো। মাঠরে পাশে লকে।লকে পাড়ে হরকে রকম বড় গাছ। তােহা বাবু সবাইকে বুঝয়িে দচ্ছিে কভিাবে গলফ খলেতে হয়। প্রায় ১ কলিোমটিার এলাকা বস্তিৃত এই গলফ এরয়িা। এখানে কোম্পানি সাহবে , বড় সাহবে, অন্যান্য বাগানরে বড় সাহবেরা বকিলেে গলফ খলেতে আস।ে
তোহা বাবু বললাে,‘গলফ মাঠ তদারকি করা খুবই কঠনি কাজ। এই যে সবুজ ঘ্সা দখেছনে, তা জন্মানাে, সচে দওেয়া, সার দওেয়া সারাক্ষণ পাহারা দওেয়া, যাতে কোন গবাদি পশু ঢুকে ঘাসরে ক্ষতি করতে না পার।ের্অথ্যাৎ সারা বৎসর রক্ষনা বক্ষেন করতে হয়।’
হাঁটতে হাঁটতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়লো। অদূরে বাশেঁর উপর খড়রে ছাউনি গোলাকার একটা ঘর দেখা গেল।
হেমন্ত বাবু হাত ঘড়ির দিকে তাঁকিয়ে বললো,‘১টা বাজে,লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে।’ ওলি বাবু আগেই বাজার থেকে বিরিয়ানির লাঞ্চ প্যাকেট এনে রেখেছে। অবশ্য হেমন্ত বাবুু শমসের নগর বাজারের হোটেলের সাথে গতরাতে কন্ট্রাক করে রেখেছিল। সবাই লেকের ¯^চ্ছ পানিতে ফ্রেশ হয়ে নিল। ওলিবাবু সবার হাতে হাতে একটা করে লাঞ্চ প্যাকেট দিল। নিজে নিল ও তোহাবাবুর হাতে একটা প্যাকেট দিল।
খাওয়া শেষে মুনমুুন বললো,‘ বিরিয়ানিটা খুব ভালো হয়েছে।’
আসাদ বললো,‘ শুধু বিরিয়ানি ভালো লাগলো, দীর্ঘ বাগান ভ্রমণ।’
মুনমুন বললো, ‘অপূর্ব এই বাগান দর্শন।’
জিকো ও মুভিজ বললো, ‘অপূর্ব এই বাগান দর্শন কখনো ভুলবো না।’
রাত্রি বললো ‘ এ আর এমন কি ভালো লাগা, এসব দৃশ্য তো সব সময় দেখছি।’ গলফ মাঠ দেখা শেষে আবার সবাই গাড়িতে উঠলো।’
ড্রাইভার বললো,‘ কাকবাবু এবার গাড়ি কোন দিকে যাবো।’
হেমন্তবাবু বললো, ‘ফ্যাক্টরীর দিকে।’
গাড়ী মেইনগার্ডেন অভিমুখে ফ্যাক্টরীর দিকে চলতে লাগলো। একটু পরে গাড়ি ফ্যাক্টরীর গেইটে এসে থামলো। গেইটের উপর ইংরেজী বড় অক্ষরে লেখা আছে ওসমাননগর টি এস্টেট- ১৮৬০। হেমন্তবাবুকে দেখে সিকিউরিটি গেট খুলে দিল। সবাই ফ্যাক্টরী- এরিয়ায় ঢুকলো। ওসমান নগর ফ্যাক্টরী এরিয়া অনেক বড়। চারিদিকে বাউন্ডারী ওয়াল। এর মধ্যে অফিস, ফ্যাক্টরী, এগ্রোকেমিক্যাল গুদাম, আটা গুদাম, মেশিনারীর গুদাম, গাড়ী রাখার গ্যারেজ, তেলের গুদাম, সিকিউরিটি ব্যারাক । হেমন্ত বাবু ফ্যাক্টরী বড়বাবুকে মোবাইলে কল দিলেন। সামনেই অফিস। হেমন্ত বাবু একে একে সবাইকে তা দেখালেন। অফিসের সামনে আসেতেই দেখা গেল অফিস চৌকিদার সতনারায়ন ঝিমুচ্ছে।
হেমন্তবাবুকে দেখে বললো,‘নমস্কার বাবু।’ বলে সালাম দিল।
‘সতনারায়ন ভালো আছো?’
‘জী বাবু।’
‘বড় বাবু (অফিস বড় বাবু) আছে?’
‘না বাবু কোন বাবুই নেই, সবাই লাঞ্চে গেছেন।’
হেমন্তবাবু ঘড়ি দেখলেন, ঘড়িতে তখন পৌনে তিনটা। এ সময় কোন বাবু অফিসে থাকার কথা নয়।
অফিস কম্পাউন্ড পেরিয়ে সামনে যেতেই দেখা গেল, ফ্যাক্টরী বড় বাবু তাদের দিকে আসছেন।
‘নমস্কার দাদা’ বলে ফ্যাক্টরী বড় বাবু হেমন্তবাবুকে সালাম দিলেন।
হেমন্তবাবু- মুনমুন, জিকো, ফারিয়া ও মুভিজ এর সাথে, ফ্যাক্টরী বড় বাবুর পরিচয় করে দিলেন।
‘চলুন দাদা’ বলে জীতেন বাবু (ফ্যাক্টরীর বড় বাবু) সবাইকে নিয়ে ফ্যাক্টরীতে ঢুকলেন।
হেমন্তবাবু সামনে, তার পিছনে ফ্যাক্টরী বড় বাবু জীতেন। মাথাভর্তি চুল। গায়ের রং ফর্সা, বয়স ৫০ এর কাছাকাছি হব।ে হমেন্ত বাবুর ১০ বছররে জুনযি়র। হমেন্ত বাবু কে খুব সম্মান কর।ে চাকুররি প্রথম জীবনে হমেন্তবাবু প্রথমে ২ বছর অফসি,ে ফ্যাক্টরতিে চার বৎসর। বাকি সময় টলিাতে কাটযি়ছেনে। মুনমুন ও জকিো তার পাশইে ছলিো।
হমেন্ত বাবু তাদরেকে উদ্দশ্যে করে বললো, ‘বুঝলে জকিো, চাকুররি প্রথম জীবনে আমি অফসিে ২ বছর, চার বৎসর ফ্যাক্টরতি,ে বাকী সময় টলিায় ছলিাম।’
মুনমুন বলল, ‘বাবু ইউ আর অল-রাউন্ডার।’
তার কথা শুনে সবাই হসেে উঠলো। হমেন্তবাবু প্রথমে তাদরেকে নযি়ে গলেনে ট্রাফ হাউজ। ট্রাফ হাউজ হলো সবুজ চা পাতা থকেে কালো চা পাতা প্রক্রযি়া করনরে প্রথম ধাপ। এখানে বাগান থকেে কাঁচা পাতা সংগ্রহ করে এনে রাখা হয়। হমেন্ত বাবু সবাইকে উদ্দশ্যে করে বললো, ‘এটাকে বলা হয় ট্রাফহাউজ, এখানে বাগান থকেে কাঁচা পাতা সংগ্রহ করে লম্বা এই পাটাতনে বছিযি়ে রখেে নচি থকেে হালকা বাতাস ১২-১৪ ঘন্টা ধরে উইদারংি(বাতাস) করা হয়। সাধারণত কাঁচা চা পাতাতে ৮০ শতাংশ পানি থাক।ে সইে পানি কমে ৭০ শতাংশে নামযি়ে আনা হয়। যাতে করে আদ্রতা হ্রাস পায় এবং পাতাগুলো মালনি হতে শুরু কর।ে’ এভাবে লম্বা ৮/১০ টা পাটাতন দখো গলে। এরপর হমেন্তবাবু সবাইকে নযি়ে চা পাতা তরৈি দ্বতিীয় ধাপ ইটিসি মশেনিরে কাছে নযি়ে গলেনে।
হমেন্তবাবু বললো, ‘এই ধাপে পাতাকে ছোট ছোট করে কাটতে ও র্চূণ-বচর্িূণ করতে প্রথমে রোটার ভ্যান ও পরে র্পযাক্রমে র্কতনরে জন্য ৪/৫ সটিসিি মশেনিরে ভতিরে চালনা করা হয়। এই ধাপকে রোলংিও বলা হয়। এরপর হলো তৃতীয় ধাপ। এটার নাম হল র্ফামন্টেশেন করা। এই ধাপে র্চূণ পাতাকে তামাটে রঙে রূপান্তরতি করার জন্য মঝেে বা ট্ররে উপর পাতলা করে ছড়যি়ে আনুমানকি এক ঘন্টা রাখতে হয়।’
হমেন্তবাবু ও জতিনে বাবু সবাইকে তা বুঝযি়ে দচ্ছিনে। মুনমুন খুব গভীর মনোযোগ সহকারে দখেছনে এবং র্পযবক্ষেণ করছনে। সইে হাসপাতাল থকেে শুরু করে এই ফ্যাক্টরি র্পযন্ত সব বষিয়গুলো তার কাঁধে ঝুলানো অত্যাধুনকি ভডিওি ক্যামরোর সাহায্যে ভডিওি করছে। ফ্যাক্টররি শ্রমকি গুলো সবাই নজি নজি কাজে ব্যস্ত। যখন হমেন্ত বাবুর সামনে পড়ছ।েতখনই তাকে হাসমিুখে সালাম দচ্ছি।ে হমেন্ত বাবু ও নাম ধরে সবার কুশলাদি জজ্ঞিসে করছনে। এদরেই একজন হরি র্সদার। ফ্যাক্টরীর বড় র্সদার। সইে হমেন্তবাবু যখন ফ্যাক্টরতিে ছলিনে তখন থকেইে সে কাজ করছ।ে এখন সে বড় র্সদার, সামনে হতইে লম্বা একটা সালাম দলি। হমেন্ত বাবু বললো, ‘ করিে হরি কমেন আছসি?’
‘ভালো আছি বাবু।’
পররে ধাপ হলো শফিটংি। এই ধাপে র্ফমান্টডে চা পাতা গুলোকে গুগি শফিটাররে মধ্যে দযি়ে চালনা করা হয়। এই চালনা করার ফলইে চা পাতাগুলো দানাদার হয়। পররে ধাপ হলো ড্রায়ংি বা শুকনো পাতার রাসায়নকি বক্রিযি়া বন্ধ ও পাতা শুকাতে এক ধরনরে ড্রায়ার মশেনি ব্যবহার করা হয়। শুকানোর পর চা পাতার আদ্রতা হয় ৩%-৪%
হমেন্ত বাবু এবার সবাইকে চা পাতা তরৈি শষে ধাপ গ্রডেংি প্রক্রযি়ার কাছে নযি়ে আসনে। সাথে জতিনে বাবুও আছনে। এই ধাপে প্রস্তুত করা চা পাতাকে আকার অনুসারে চালুনি দযি়ে ভাগ করা হয়। আকৃতি অনুসারে চা পাতার নামকরণ ও ভন্নি হয়ে থাক।ে যমেন- বি ও প,ি ওএফ, পডিি প্রভৃত।ি ফ্যাক্টরি ও ম্যানুফ্যাকচারংি দখো শষেে সবাই এসে গাড়তিে উঠলো। হমেন্তবাবু ড্রাইভারকে এয়ারর্পোটরে দকিে যতেে বললো। মুভজি বললো, ‘কাকাবাবু এখান থকেে এয়ারর্পোটরে দূরত্ব কতটুকু হব।ে’
‘ এক কলিোমটিার হব।ে’
বাগানরে মধ্যে দযি়ে গাড়ি চলতে লাগলো। সামনে বড় বাংলো, তার পাশে ডাক্তার বাংলো, তার পাশে ইঞ্জনিযি়ারংি বাংলো। হমেন্ত বাবু সবাইকে তা দখেযি়ে দচ্ছিনে। বাগান পরেযি়ে গাড়ি ইউনযি়ন সড়কে উঠলো।
হমেন্ত বাবু বললো, ‘সড়করে দক্ষণি পাশ বাগান এরযি়া আর উত্তর পাশ এয়ারর্পোট এরযি়া।’
একটু পরে গাড়ি এসে এয়ারর্পোটে এসে পৌঁছালো। সবাই গাড়ি থকেে নামলো। এদকিটা এয়ারর্পোটরে পছিনরে দকি। এর পাশ ঘষে.ে ইউনযি়ন রোডরে রাস্তা চলে গছেে ফুলছড়তি।ে একটু পরইে কালো পচিরে বশিাল রানওয়ে চোখে পড়লো। প্রায় দড়ে কলিোমটিার এর মতো রানওয়ে এর আয়তন হব।ে
হমেন্ত বাবু বললো, ‘এটা হল শমশরেনগর এয়ারপোট।’
জকিো বললো, ‘কাকাবাবু এখানে এত বড় একটা এয়ারর্পোট আছ,ে তা-তো আমরা জানতাম না।’
‘আসলে তুমি ঠকিই বলছে, ‘দশেব্যাপী এই এয়ারর্পোটরে পরচিতিি কম, দশেরে অনকে লোকই জানে না যে এখানে এত বড় একটা এয়ারর্পোট আছ।ে’
মুনমুন বললো, ‘এর কারণ?’
হমেন্ত বাবু বললো, ‘এখানে র্বতমানে কোন প্লনে তমেন উঠানামা করে না। একসময় অবশ্য উঠানামা করতো। র্বতমান এটা বমিান বাহনিীর প্রশ¶িন ঘাঁটি হসিবেে ব্যবহৃত হচ্ছ।ে’
সামনে সকিউিরটিি পোস্ট, একজন সকিউিরটিি পাহারা দচ্ছি।ে পাশে সাইনর্বোডে লখো আছ,ে “বনিা অনুমততিে প্রবশে নষিধে’।” সকিউিরটিি লোকটা এগযি়ে এসে হমেন্ত বাবুকে বললো, ‘নমস্কার বাবু’।’
মাথা নডে়ে হমেন্তবাবু সালাম এর জবাব দলি। হমেন্ত বাবু মোবাইলে রংি দলি। বমিান ঘাঁটতিে তার এক বন্ধুর ছলেে জুনযি়র অফসিার রংেকে চাকুরী কর।ে প্রায় তার বাসায় বডে়াতে যায়, তাকে রংি দলি। মনিটি দশকে পরে দখো গলে, মোটরসাইকলে যোগে রানওয়রে অপর প্রান্ত থকেে দ্রুত গততিে মাথায় হলেমটে পরহিতি একজনকে আসতে দখো যাচ্ছ।ে মোটরসাইকলে তাদরে সামনে এসে থামলো। হমেলটে খুলে আগন্তক হমেন্ত বাবুকে সালাম দলি।
হমেন্ত বাবু বললো, ‘করিণ কমেন আছো বাবা।’
‘ ভালো আঙ্কলে।’
‘তোমার মা-বাবা ভালো আছে তো।’
‘জী ভালো ’
রাত্রি বললো, করিণদা ভালো আছনে
‘ভালো’
করিন তার মোটর সাইকলেটা সকিউিরটিি পোষ্টরে একপাশে রাখলো এবং সবাইকে নয়িে ঘাঁটতিে প্রবশে করলো। রানওয়রে উপর সবাই হাঁটতে লাগলো। উত্তর দক্ষণিে রনওয়।ে দড়ে কলিোমটিার এর মত লম্বা হব।ে
মুভজি বললো,, ‘কাকাবাবু সলিটেরে এত জায়গা থাকত,ে এই জংগল ঘরো পাহাড়ী এলাকায়, এই এয়ারর্পোট কনে হলো?’
‘সইে অনকে কাহনিী।’
মুনমুন বললো, ‘কি সে কাহনিী।’

তা হলে সংক্ষপেে শোনো, ‘দ্বতিীয় বশ্বিযুদ্ধরে সময় ব্রটিশি জঙ্গঁলঘরো পাহাড়ী এলাকায়, এই এয়ারর্পোট নর্মিান করে যুদ্ধরে জন্য। এখানে ৭০ সালে একটা পাকস্তিানী যাত্রীবাহী বমিান বধ্ধিস্ত হয়ছেলি। আসলে এই এয়ারর্পোট এবং ডাবছড়ার ঐ সীমান্ত পয়ন্টে, আমার জীবনরে সবচয়েে বড় ট্র্যাজডি,ি বলে হমেন্তবাবুর গলা জড়য়িে এলো। এই দুটো এলাকায় আসলে আমি নজিকেে ঠকি রাখতে পারি না। এখানে আসলে আমি হারানো অতীতে ফরিে যাই। মনটা দু:খে ভরাক্রান্ত হয়ে যায়।

ফাগুনী বললো, ‘থাক ওসব কথা মনে করে, দু:খ বাড়িয়ে লাভ নেই।’
মুনমুন বললো, ‘ বাবু কি সব কথা যা আপনি সে সময় ডাব ছড়ায়ও বলতে চান নি, এখন বলবেন?’
মুভিজ বললো, ‘কাকা বাবু কি কথা, তা দয়া করে আমাদের বলবেন?’
হেমন্ত বাবু নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ বাবা আমার যতই কষ্ট হউক, দুঃখ হউক, তোমাদেরকে সে কথা বলবো। তাহলে শোন, ‘৭১ এর ২৬ শে মার্চে যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন আমাদের এই শমশের নগরও যুদ্ধে আক্রান্ত হয়। তখন আমার বাবা এই ফুলছড়া বাগানের বড় টিলা বাবু ছিল। আমি একটা বেসরকারি স্কুলে বিনা মাইনে শি¶কতা করতাম। এপ্রিলের ১৫/১৬ তারিখের দিকে পাকবাহিনী এই শমশের নগরের রেল ষ্টেশন ও বিমান ঘাটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে। এলাকার কিছু শান্তি কমিটির লোক ও রাজাকার তাদের সহযোগিতা করতে লাগলো। একদিন দেখা গেল পাক বাহিনী মেইন গার্ডেনে ঢুকে অতর্কিতে আক্রমন করলো। লেবার ও বাবুদের বাসা বাড়ীতে আগুন দিল। লেবার লাইনে ঢুকে নির্বিচারে গুলি ও হত্যযজ্ঞ শুরু করে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যেতে লাগলো। ফুলছড়াতেও খবর রটে গেল, পাকবাহিনী ফুলছড়াতে আসছে। দলে দলে নারী পূরুষ সবাই ডাবছাড়া সীমান্ত অভিমূখে রওনা দিল। সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরা যাবে। আমার সংসারে তখন এক মেয়ে ও এক ছেলে, বৃদ্ধ মা ও বাবা। বাবা বললেন, তুই ছেলেমেয়ে ও ফাগুনিকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে কৈলাস শহর (ত্রিপুরা) তোর পিসির বাড়ীতে চলে যা । আমি বললাম, তোমরাও আমাদের সাথে চলো। বাবা বললো, আমাদের কিছু হবে না, আমরা বয়স্ক মানুষ। তাছাড়া গার্ডেনে চাকুরি করি। পরিচয়পত্র আছে। তুই যুবক, তোকে মুক্তি ভেবে ¶তি করতে পারে। তাছাড়া বৌমার জন্য সমস্যা আছে। তারা যুবকদের মারছে। আর যুবতীদের নিয়ে অত্যাচার করছে। আমি আর তোর মা বয়স্ক মানুষ, আমাদের কোন ¶তি করবে না । বাবার কথায় আমি আমার স্ত্রী ও পুত্র কন্যা নিয়ে ডাবছাড়া সীমান্ত অভিমুখে যাত্রা করলাম । তখনকার দিনে এত ভালো রাস্তাঘাট ছিল না। পাহাড়ী উচুঁনীচু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। আমার কোলে ছেলে বৃ¶ ছয় বৎসর বয়স । আর ছায়ার বয়স ১ বৎসর হবে। সে তার মায়ের কোলে। দুপুরে আমরা ফুলছড়া থেকে ডাবছড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । পাহাড়ী আঁকা বাঁকা পথ পেরিয়ে আমরা যখন ডাবছড়া পৌঁছালাম, তখন বিকেল ৫ টা। এর মধ্যে আমাদের আসার পথে পাকবাহিনীর বিমানগুলি শরনার্থী দলের উপর দিয়ে কয়েকবার ছক্কর দিয়ে গেল এবং সীমান্তের এপারে ও এপারে কয়েক দফা বোমা বর্ষন করলো। আমাদের উদ্দেশ্যে কৈলাশ শহর । আপাতত: আমাদের গন্তব্য সেখানে। সীমান্তের কাছাকাছি যখন আসি, দেখলাম হাজার হাজার মানুষ দলে দলে সীমান্ত পার হচ্ছে । আমরাও পার হচ্ছি । হঠাৎ আমাদের সামনে আকাশ বাতাস কাঁিপয়ে বিকট একটা শব্দ হলো। আওয়াজে বৃ¶ আমার কোল থেকে ছিটকে পড়লো । সবাই আহত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। এরপর যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন আমি কৈলাশ শহর হাসপাতালে। জ্ঞান ফিরে স্ত্রী পরিবার পরিজন ও ছেলে মেয়ের খোঁজ নিলাম। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলো না। অনেক খোঁজা খুঁজির পর কয়েক দিন পরে স্ত্রী ও মেয়ের সন্ধান পাই। তারা পাশে অন্য একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সীমান্ত পার হওয়ার সময় যে আওয়াজ শুনেছিলাম, সেটা ছিল একটা ভূমি মাইন। কিন্তু বৃ¶ের কোন সন্ধান পেলাম না। চিকিৎসা শেষে ভালো হলে, আমার সেই পিসির বাড়ীতে উঠি। সেখানে স্ত্রী ও কন্যাকে রেখে আগরতলায় যেয়ে যুদ্ধ প্রশি¶ণে যোগ দেই। এরপর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। এদিকে এলাকার কিছু রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকজনের সহায়তায় পাকবাহিনী বাবাকে এই বিমানঘাঁটির ক্যাম্পে নিয়ে এনে বললো, ‘তোমার ছেলে কোথায়? সে নাকি মুক্তিযোদ্ধা?’ এই অপরাধে বাবাকে ক্যাম্পে শাররিক নির্যাতন করে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে বাবা মৃত্যু বরন করে। তার মৃত্যু সংবাদ মায়ের কানে পৌছালে মা ও হার্ট ফেইল করে মারা যায়। তাই এই দুটো জায়গা আমার জন্য ট্র্যাজিডি । এ দুটো স্থানে আমি আমার ছেলে ও বাবাকে হারিয়েছি।’
বলেই হেমন্ত বাবু হু হু করে কেঁদে উঠলো। ফাগুনীও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সকলের চোখে পানি। সুরি সর্দার, দিবা, রাত্রি মুনমুন, আসাদ ও জিকো সবাই গিয়ে হেমন্ত বাবু ও ফাগুনিকে ধরলো এবং সান্তনা দিতে দিতে গাড়ীতে উঠালো।

আজ বাসন্তী উৎসব (হলি, লাল পুজা) রবিবার সহ বাগান চারদিন ছুটি। বাগানে সাধারণত: দুর্গাপূজা ও বাসন্তী পুজার ছুটি একটু বেশী হয়।
ওসমান নগর চা বাগানের সর্বত্র আজ আনন্দ উৎসব। উৎসবের ঢেউ ফুলছড়াতেও লেগেছে। সকাল থেকে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, নারী পুরুষ সবাই সেজে হলি উৎসবে মেতে উঠেছে। সকালে প্রথমে সুরি সর্দার কিছু লাল রং নিয়ে হেমন্ত বাবুর মুখে মেখে দিল। এটা তার বহু বৎসরের রেওয়াজ। হেমন্তবাবুকে রং মেখে সে হলি উৎসব শুরু করে। আজও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এরপর তার বাসা থেকে, তার মেয়ে মালতী এসে সবাইকে রং মেখে গেল। পাশের বাসার যতীন বাবু তার স্ত্রী ও তার মেয়ে সোমা এসে সবাইকে রংয়ে রাঙিয়ে গেল। এরপর একে একে বাগানের নারী পুরুষ সবাই এসে হেমন্ত বাবু, আসাদ, দিবা, রাত্রি ও সূর্য্য বাবু, সবার মুখ লাল রংয়ে রাঙিয়ে দিল।
‘হেমন্ত বাবু শুধু বললেন, ‘ আমাদের অতিথিদের কে রং দিওনা, তাদের জামা কাপড় নষ্ট করো না। কিন্তু আজ কে কার কথা শুনে? তারা জিকো, ফারিয়া ও মুভিজের গায়েও লাল, সবুজ রংয়ে রাঙিয়ে দিল। এক পর্যায়ে তারা হেমন্ত বাবু ও যতীনবাবুকে বের করে এনে, স্কুলের বারান্দায় বসিয়ে, মুখে মাথায় একটু একটু রং মাখিয়ে হলি উৎসবে মেতে উঠলো। সুরি সর্দার হেমন্ত বাবুর পাশে এক বালতি লাল রং এনে রাখলো। হেমন্ত বাবুও একে একে সবার মুখে রং রাঙিয়ে আশীর্বাদ করছে ও নিচ্ছে। স্কুলের বারান্দার একপাশে স্পিকারে মিউজিক বাজছে। ছেলে মেয়ে নারী পূরুষ সবাই মিউজিকের তালে তালে নাচছে এবং একে অপরকে রংয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছে। জিকো ফারিয়া মুভিজ এই অভূতপূর্ব আনন্দ উৎসব দেখছে। একটু পরে ওলিবাবু এলো। তাকেও সবাই রংয়ে রাঙিয়ে দিল। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং রাত্রে প্রীতিভোজ হবে। রাত ১২ টার পরে নাটক শুরু হয়ে ভোর ৫টা পর্যন্ত চলবে। বাসন্তী পূজা(হলি) উপল¶ে হেমন্তবাবু নিজ ফান্ড থেকে বাগানের গরীব শ্রমিকদেরকে কাপড় বিতরন করেন। প্রতি বৎসর তিনি এই ব্যবস্থা করে থাকেন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে হেমন্ত বাবু, ওলি বাবুর সাথে আলোচনা করছেন। বড়সাহেব, মুনমুন ম্যাডাম, মেমসাহেব, পুঞ্জির মন্ত্রী আসবেন। বাগানের শিল্পীরা গান গাইবে। সেজন্য প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরী হচ্ছে। ফুলছড়িতে সাধারনত: বাৎসরিক দুটো বড় অনুষ্ঠান হয় এক, বাসন্তী উৎসব (হলি) দুই, দূর্গাপূজার উৎসব । এতে গান, নৃত্য ও কৌতুক ও নাটক অনুষ্ঠিত হয়। এ মেইন গার্ডেন, জাগহাটি ও ডাব ছড়ার বাবু ও শ্রমিকদের ছেলে মেয়েরা অংশগ্রহন করে। সকাল থেকেই হেমন্ত বাবুর বাসায় নীলা, শাহরিয়ার, মানিক, সাজু, লিনেন: মৌ-মিতা, জনি, রনি, পারভেজ ও অন্যান্য বাবু ও শ্রমিকের ছেলে মেয়েরা আনুষ্ঠানের রিহের্সেল দিচ্ছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার থেকে ব্যান্ড শিল্পী আসবে। বিকেল চারটা থেকেই দলে দলে নারী পূরুষ বিভিন্ন ফাঁড়ি বাগান থেকে আসছে। কেউ রিকশা, কেউ সিএনজি, কেউ পায়ে হেঁটে স্কুলের মাঠে নির্মিত মঞ্চের সামনের আসনে এসে বসছে। বিভিন্ন ফাঁড়ি বাগান থেকে সব বাবু ও তাদের পরিবার পরিজন আসছে, বাসন্তী উৎসবের এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। মাঠের পাশে বড় বড় পিতলের ডেক্চিতে বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। ওলি বাবু, যতীন বাবু ও হেমন্তবাবু তা তদারকি করছেন। অনুষ্ঠানের সব খরচ হেমন্তবাবু বহন করছেন। প্রতি বৎসর বাগানের সবাইকে নিয়ে তিনি এই অনুষ্ঠান ও প্রীতিভোজের আয়োজন করেন। সন্ধ্যা পৌনে ৭ টার দিকে বড় সাহেব, মুনমন ম্যাডাম, ছোট সাহেব অন্যন্য সাহেব ও খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী ¯^স্ত্রীক অনুষ্ঠান স্থলে আসলেন।
ওসমান নগর চা বাগানে সাধারণত: ১৫/২০ সম্প্রদায় লোকের বসবাস। এরাা হলো, মাদ্রাজী, তামিল, বাউরি , উরিয়া, তুরিয়া তেলেগাং, কৈরী, প্রভৃতি। এরা আলাদা নিজ¯^ ভাষায় কথা বলে । সার্বজনীনভাবে তারা বাংলা ও অন্যান্য ভাষা মিস্ত্রিত বাগানী ভাষা ব্যবহার করে। দিবা, নীলা, মানিক ও শাহারিয়ার এর উপস্থাপনায় সন্ধ্যা ৭ টার দিকে বাসন্তী উৎসবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলো।
প্রথমে দিবা উপস্থাপনায় এসে বললো, সুপ্রিয় দর্শকশ্রোতা সবাইকে আজকের এই বাসন্তী উৎসবের অনুষ্ঠানে ¯^াগতম। কিছু হারানো দিনের গান, বাগানের বিভিন্ন ভাষার গান, নৃত্য, ও ছোট খাটো কৌতুক অভিনয় দিয়ে শুরু করছি বাসন্তী উৎসবের এই অনুষ্ঠান। আমাদের অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ২য় পর্ব প্রীতিভোজ , তৃতীয় পর্ব- নাটক। প্রথমেই ‘এই সুন্দর ¯^র্নালি সš^্যায়’ এ গানটি দিয়ে শুরু করলো নীলাঞ্জনা। নীলাঞ্জনার গান শেষে, মালতী ও তার দল এলো একটা মাদ্রাজী গান ও নৃত্য নিয়ে।
এরপর দিবা ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের নীল জল ছুঁয়ে এসেছ।’
এরপর একটা তামিল গান ও নৃত্য নিয়ে এলো বাগানের কিছু ছেলে মেয়ে।
তারপর রাত্রি এলো, ‘ শোন বলি কানে কানে’ গানটি নিয়ে।
তারপর অনিতা সিং এলো, মনিপুুরি গান ও নৃত্য নিয়ে।
এরপর মানিক ও মৌমিতা এলো, ‘ আকাশে বাতাসে চল সাথী’ গানটির নৃত্য নিয়ে।
এরপর বাগানের উরিয়া ছেলেমেয়েরা নিয়ে এলো, উরিয়া নৃত্য ও গান নিয়ে ।
তারপর ইলেন, আহমেদ, শাহরিয়ার নিয়ে এলো, হাসির কৌতুক নিয়ে। এরপর একটা ব্যান্ডের গান ‘ মন শুধু মন ছুঁয়েছে।’
এভাবে কখনও বাংলা হারানো দিনের গান কখনও হিন্দি গান চলতে লাগল। যদিও ভাষার ভিন্নতার কারণে গানের অর্থ সব বোঝা না গেলে ও গানগুলোর সুর শ্রুতিমধুর। কয়েক জন গিয়ে হেমন্তবাবুকে ধরলো, একটা গান গাওয়ার জন্য।
হেমন্ত বাবু মঞ্চে এলো এবং গান ধরলেন ‘ আমার ¯^প্নে দেখা রাজকন্যা থাকে, সাত সাগর আর তেরো নদীর পারে।’ তার গান শেষের পর ¯^য়ং বড় সাহেব ও অন্যান্য সাহেবরা রিকোয়েষ্ট করলেন, আর একটা গান গাওয়ার জন্য।
হেমন্তবাবু আবার ধরলেন, ‘ কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই।’
তারপর আর একটা ধরলেন, ‘ মানুষ মানুষের জন্যে।’
মাঝে মাঝে দু-একটা ব্যান্ডের গান। এভাবে গান, নৃত্য, কৌতুকে চললো রাত ১১ টা পর্যন্ত। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শেষ পর্যায়ে। এই ফাঁকে বড় সাহেবকে কিছু বলার জন্য হেমন্তবাবু অনুরোধ করলো। বড় সাহেব মঞ্চে উঠলেন এবং তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। ‘সুন্দর ও সুশৃংখল ভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনার করার জন্য বড় সাহেব সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন। তিনি বললেন, কথায় বলে,ভারতবর্ষ ঘুরলে অর্ধেক পৃথিবী দেখা হয়ে যায়, আমি বলবো,একটা চা বাগান ঘুরলে অর্ধেক ভারতীয় সাংস্কৃতি দেখা হয়ে যায়। তিনি বললেন, বাগান সংস্কৃতির কথা। এখানে বিভিন্ন জাতির বসবাস। এক মঞ্চে আমরা সবার গান, নৃত্য একত্রে উপভোগ করলাম।’ তিনি আরও বললেন, ‘আমাদের ক্লাবে যখন কোন পার্টি বা অনুষ্ঠান হয় তখন আমরা ঢাকা থেকে সংগীত শিল্পী নিয়ে আসি। অথচ আমাদেও গার্ডেন- এ বিচিত্র সংস্কৃতি ও ভালো শিল্পী আছে। ভবিষ্যতে আমাদের অনুষ্ঠান গুলোতে এই শিল্পীদের নিয়ে যাবো। এই বলে বড় সাহেব, সবাইকে ধন্যবাদজ্ঞাপন করে তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন এবং ভোজ শেষ করে তিনি ও অন্যন্য সাহবেরা বিদায় নিলেন। রাত ১ টায় শুরু হলো নাটক। বাগানের ছেলে মেয়েরাই এতে অভিনয় করলো। মাঝে মাঝে ব্যান্ডের গান চললো।ভোর ৫ টায় অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটলো।

জিকো, ফারিয়া, মভিজ রেলষ্টেশনে ট্রেনের আপে¶ায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় সপ্তাখানেক বাগান ও সিলেট ভ্রমনের পর আজ তারা বাড়ীতে ফিরে যাচ্ছে। আসাদ তিনটে টিকেট গতদিন কেটে রেখেছিল। আসাদ, দিবা, রাত্রি ষ্টেশনে এসেছে, তাদেরকে বিদায় দেওয়ার জন্য। জিকো, ফারিয়া মুভিজ এর কাছে খুব খারাপ লাগছে। এ কয়টা দিন খুব আনন্দ পূর্তিতে তারা কাটিয়েছে। বিশেষ করে মুভিজ এর খুব খারাপ লাগছে। বিদায় বেলায় হেমন্তবাবু ও সুরি সর্দারের কথা খুব মনে পড়ছে। অতিথিপরায়ন হেমন্তবাবুর মত মানুষ সে কখনও দেখেনি। আর সুরি সর্দার এর মত গল্পকার মানুষও সে দেখেনি। মাত্র অল্প কয়েকদিনে বাগানের সবাই তাদের আপন হয়ে গেছে। হেমন্ত বাবু তাদেরকে আরও কয়েকদিন থাকার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু চাকুরীর কারনে থাকা হয়ে উঠেনি। তারপরও তিনি দূর্গা পূজার উৎসবে আসার নিমন্ত্রন দিয়েছেন।
সকাল-৮টার ট্রেন, এক ঘন্টা বিলম্বে আসছে। রাত্রি মুভিজ এর সাথে ফ্ল্যাটফর্মের এক কোনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। রাত্রি বললো, ‘খুব খারাপ লাগছে।’
মুভিজ বললো, ‘কেন?’
রাত্রি বললো, ‘আপনারা চলে যাচ্ছেন তাই।’
মুভিজ আবার বললো, ‘কেন?’
রাত্রি বললো, ‘আপনার জন্য।’
‘আমার জন্য! আমি আবার কখন আপনার এত কাছের মানুষ – মুভিজ কথা শেষ করতে না করতেই ট্রেনের হুইসেল এর শব্দে, দুজন ট্রেনের দিকে তাকালো। ট্রেন ধীরগতিতে ষ্টেশনে প্রবেশ করছে।
আসাদ বললো, ‘মুভিজ-জিকো ট্রেন এসে গেছে।’
তিন জনে তাদের নির্দিষ্ট বগিতে উঠলো। জিকো, ফারিয়া ও মুভিজ নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসলো। দিবা, রাত্রি আসাদ ট্রেনের জানালার পাশেই দাঁড়ানো আছে। দিবা বললো,‘ জিকো ভাই, ভাবী, মুভিজ ভাই দূর্গাপূজার উৎসবে আসবেন
কিন্তু‘।’
রাত্রি বললো, ‘মুভিজ ভাই এবার আসতে কিন্তু একা আসবেন না। সাথে সঙ্গী নিয়ে আসবেন।’
‘মুভিজ হেসে বললো, ‘কোথায় পাবো মনের মত সঙ্গী।’
‘কাউকে না পেলে আমিতো আছি।’
‘মুভিজ বললো, ‘ তাহলে একাই আসবো’। তাদের কথায় দিবা ও আসাদ হেসে উঠলো। ট্রেন ছেড়ে দিল। সবাই হাত নেড়ে একে অপরকে বিদায় দিল।

 

সকাল বেলায় গাড়ীর হর্নের শব্দে হেমন্তবাবু বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। দেখলো মুনমুন ম্যাডাম এর ড্রাইভার নির্মল গাড়ীর দরজা খুলে নেমে তার দিকে আসছে। এই নির্মলকে কয়েকদিন আগে মুনমুনের গাড়ীর ড্রাইভারের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার বাবা বাবুলাল বড় সাহেবের ড্রাইভার। এই বাগানেরই লোক । তার বাবা বড় সাহেবের খুব বিশ্বস্ত। হেমন্ত বাবুর সামনে এসেই তাকে প্রনাম জানালো।
হেমন্তবাবু বললো, ‘কিরে কি খবর?’
‘বাবু ম্যাডাম, ‘আপনাকে সালাম দিছেন।’
‘তুই একটু দাঁড়া। আমি রেডি হয়ে নেই।’
হেমন্ত বাবু সাধারনত: কোন খানে বের হলে খাদি পাঞ্জবী ও পায়জামা পরে, চোখে চশমা পরে । আজও পায়জামা ও পাঞ্জবী পরে নির্মলের সাথে মুনমুনের বাংলোর দিকে চললেন। একটু পরে গাড়ী এসে বাংলোর সামনে এসে দাঁড়ালো। মুনমুন আগে থেকেই বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে, হেমন্ত বাবুর আগমনের প্রতী¶া করছে। গাড়ী থেকে নেমেই হেমন্ত বাবু সালাম দিতেই, মুনমুনও তাকে সালাম দিল।
মুনমুন বললো, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো’
‘হাঠাৎ ডিস্টার্ব করলাম।’
‘ না ম্যাডাম, ডিস্টার্ব কিসের, আমিতো আপনার ডাকের প্রতী¶ায় ছিলাম।’
‘ছি: ওভাবে বলছেন কেন, আমি কি আপনাকে ডাকতে পারি?’
মুনমুন হেমন্ত বাবুকে বারান্দায় বেতের সোফায় বসতে বললো এবং নিজে একটা সোফায় বসলো। একটু পরেই মুনমুন এর বাবুর্চি সুগীর ট্রে-তে চা-নাস্তা নিয়ে এলো। মুনমুন এক কাপ চা হেমন্ত বাবুকে আর এক কাপ চা নিজে নিয়ে, চায়ে চুমুক দিল।
হেমন্তবাবু বললো, ‘ম্যাডাম কোন সমস্যা, বাংলোর কাজের লোকেরা ঠিকমত কাজ করছে তো?’
মুনমুন বললো, ‘জী, ‘সব ঠিক আছে।’
এরপর মুনমুন চায়ে চুমুক দিয়ে বললো, ‘আচ্ছা, আপনি আমাকে ম্যাডাম না ডেকে আমার নাম ধরে ডাকবেন এবং তুমি বলে সম্মোধন করবেন।’
‘কি বলছেন ম্যাডাম!’
‘আমি ঠিকই বলছি, একেতো আপনি আমার বাবার বয়সী তার উপর আমি আপনার ছাত্রী। আমি লন্ডন থেকে এখানে এসেছি চা বাগান নিয়ে গবেষনা করতে। এই গবেষণায় আমার পথ প্রদর্শক আর শি¶ক হলেন আপনি। জানি বাগানে বড় সাহেব, ছোট সাহেব, বড় বাবু, ছোট বাবু, সর্দার ও শ্রমিক এই বিভিন্ন ক্যাটাগ্যারির লোক আছে। এখানে গার্ডেন পরিচালনার ¯^ার্থে চেইন বজায় রাখতে হয়। এখানে আমি একজন ছাত্রী। আমাকে সবার কাছে থেকে জানতে হবে। শিখতে হবে। বিশেষ করে আপনার কাছ থেকে। প্লিজ আমাকে অন্তত: আপনি, ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবেন না এবং তুমি বলে সম্বোধন করবেন, আর আমি আপনাকে কাকাবাবু বলেই ডাকবো।’
‘আপনি আমাকে বড়ই লজ্জায় ফেলে দিলেন ম্যাডাম, বড় সাহেব শুনলে কি মনে করবেন?’
‘কাকাবাবু, এখন থেকে নো ম্যাডাম, নো আপনি। বড় সাহেবকে আমি ম্যানেজ করব। আজকে আমি এ ব্যাপারে বড় সাহেবের সাথে কথা বলবো।’
আচ্ছা ঠিক আছে, ‘তোমার কথাই ঠিক থাকবে।’
তারপর মুনমুন বললো, ‘কাকাবাবু এখন কাজের কথায় আসা যাক। আমার এই গবেষনা কাজে অন্তত:প¶ে আরও তিন জন লাগবে। অবশ্য তাদেররকে ভাতা দেওয়া হবে। মেয়ে হলে ভালো হয়। এদেরকে মহিলা শ্রমিকদের ডাটা কালেকশনে আমার লাগবে।’
‘সে কেমন?’
‘এই ধরুন গার্ডেন শ্রমিকদের ¯^াস্থ্য, শি¶া, বার্থ কন্ট্রোল, স্যানিটেশন ও অন্যান্য বিষয়ে এরা আমাকে সহযোগিতা করবে। তাই আমার তিনজন শি¶িত মহিলা মাঠ কর্মী লাগবে। আপনি এই গার্ডেন এর শি¶িত তিনজন মেয়ের লিস্ট আমাকে দিবেন।’
‘হেমন্তবাবু বললেন, ‘এখন দেবো?’
‘পারলে এখনই দিন।’
হেমন্ত বাবু একটু চিন্তা করলেন, তারপর পকেট থেকে কলম এবং ছোট ডায়েরী বের করে তিনজনের নাম লিখলেন, প্রথমে নাম লিখলেন, দিবা মুখার্জি। তারপর লিখলেন, সোমা বন্দোপাধ্যায়। তারপর লিখলেন, মালতী মাদ্রাজী।
সবার নামের পাশে বাবার নাম লিখে, ডায়েরীর পাতাটা ছিঁড়ে লিস্টটা মুনমুনের হাতে দিলেন।
মুনমুন লিস্টটা পড়ে বললো, ‘তাদেরকে এখন এখানে আনা যাবে।’
হেমন্তবাবু বললো, ‘অবশ্যই আনা যাবে।’
হেমন্তবাবু নির্মলকে ডেকে বললো, ‘দিবা, সোমা ও মালতীকে এখনই বাংলোয় নিয়ে আয়।’
তারপর মুনমুন বারান্দার পাশের রুমটা দেখিয়ে বললো,
‘কাকাবাবু এই রুমটা গবেষনার কাজের জন্য সিলেক্ট করেছি, আপনি কি বলেন?’ বলে হেমন্তবাবুকে নিয়ে তার গবেষনার রুমে ঢুকলো এবং ঘুরে ঘুরে হেমন্তবাবুকে সব দেখালো। সব দেখে হেমন্তবাবু বললো, ‘তুমি ঠিক রুমই সিলেক্ট করেছ মা।’
পরদিন থেকে মুনমুন তার গবেষনার কাজ পুরোদমে শুরু করলো। হেমন্ত বাবু, ওলি বাবু, আসাদ, দিবা, সোমা ও মালতী তার গবেষনার কাজে তাকে সহায়তা করতে লাগলো। মুনমুন তার প্রতিদিনের কাজের একটা রুটিন করলো। সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত মাঠে পর্যায়ে পর্যব্¶েন এবং বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত তা নিয়ে গবেষনা রুমে আলোচনা। মুনমুন সময়সূচী হেমন্ত বাবুর হাতে দিয়ে বললো,‘ কাকাবাবু তাহলে আজকে থেকে শুরু করা যাক।’
দুজনে গবেষনা রুমে ঢুকলেন। ওলিবাবু, আসাদ সুন্দর করে মুনমুনের রুমটা সাজিয়েছে। কয়েকটা চেয়ার, টেবিল। একটা ব্ল্যাক বোর্ড দেওয়ালে টাঙানো হল। টেবিলের উপর ডাষ্টার ও একবক্স চক পেন্সিল দেখা গেল।
দুজনে চেয়ারে বসলেন। সামনে টেবিল, হেমন্তবাবু ও মুনমুন মুখোমুখী বসলো।
মুনমুন বললো, ‘কাকা বাবু এবার শুরু করা যাক, কারন আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ।’
‘আচ্ছা কাকাবাবু প্রথমে চায়ের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলুন। মুনমুন তার ভিডিও ক্যামেরাটা অন করলো।
হেমন্তবাবু বললো, ‘চায়ের ইতিহাস নিয়ে যদি আলোচনা করি, তাহলে আমাদের পাঁচ হাজার বছর আগে ফিরে যেতে হবে। মুনমুন আশ্চর্য হয়ে বললো,‘পাঁচ হাজার বছর আগে!’
‘হ্যাঁ মা।’
তারপর হেমন্তবাবু একটু হেসে বললেন, ‘অনেক কিছুর মত চায়ের আবিষ্কার চীন দেশে হয়েছিল। চীনে চায়ের ব্যবহার হয়েছিল, আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। সে সময় চীনের একজন শাসক ছিলেন, সৌভাগ্যবান এই শাসকের নাম ছিল শেনাং। একবার তিনি রাজধানী থেকে চীনের জুন্নান প্রদেশে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে এক বনানীর নীচে যাত্রা বিরতি করা হলো। গাছের ছায়ায় সবাই বসে আছে। কেউ বিশ্রাম করছে। কেউ দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করছে। খাবার তৈরীর জন্য শেনাং এর ভৃত্যরা পানি গরম করছিল। তিনি একটি গাছের তলায় বসেছিলেন। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। হঠাৎ বাতাস পাশের ঝোপ থেকে কিছু পাতা উড়িয়ে এনে ফুটন্ত পানির ভিতর ফেললো। পাতা তুলে ফেলে চেষ্টা করার আগেই সেটা জলে দ্রবীভূত হয়ে গেল। পানির রং বদলে বাদামী হয়ে যায়। খবরটা শাসক শেনাং এর কাছে গেল। শেনাং এসে কৌতুহলী হয়ে পানির ঘ্রান শুঁকে দেখলেন, অন্যরকম এক মাদকতা ছড়ানো গন্ধ। তিনি এটা পান করলেন। এই প্রথম মানুষ চায়ের ¯^াদ নিলো। সেই পানি পান করার পর তিনি শাররিক ভাবে বেশ চনমনে সতেজ অনুভব করেন। আর এভাবেই চায়ের জন্ম হয়। ইংরেজী চা শব্দটির উৎস চীনা ভাষা শব্দ থেকে। চীনা ভাষায় তেতো গুল্মকে বল হতো টেয়, এ শব্দটি থেকেই ইংরেজী ট ী শব্দটি উদ্ভব।
মুনমুন বললো, ‘বড়ই ইন্টারেস্টিং হিস্ট্রি।’
হেমন্ত বাবু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, ‘হ্যাঁ মা চায়ের ইতিহাস যেমন ইন্টারেস্টিং তেমনি এর ট্র্যাজেডি হিস্ট্রিও আছে।’
‘সে কেমন?’
‘সে কথায় পরে আসছি। এখন আসছি পৃথিবীতে চায়ের ব্যবহার কিভাবে ছড়ালো।’
‘সে কিভাবে?’ মুনমুন উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলো।
‘তাহলে শোনো, ১৬১০ সালের দিকে ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে পর্তুগীজদের হাত ধরে। শীতের দেশে উষ্ণ চায়ের কাপ প্রানে স্ফুর্তির জোয়ার নিয়ে এলো। ১৭০০ সালের দিকে ব্রিটেনে চা জনপ্রিয় হয়। ইংরেজদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে চা প্রবেশ করে। তারা ভারতের আসাম রাজ্যে চায়ের চাষ শুরু করে। প্রথম দিকে এ্যাংলো ইন্ডিয়ানরাই চা ব্যবসা শুরু করে। চা উৎপাদনে চীনের একক আধিপত্যকে খর্ব করতে বিলাতিরা চা চাষ শুরু করে। তারা আসাম, বাংলা দার্জিলিং ও কেরলায় চা চাষ শুরু করে। মূলত: ভারত বর্ষে চা এর চাষ শুরু হয় ১৮১৮ সালে। ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশরা সিলেটে সর্বপ্রথম চায়ের গাছ খুঁজে পায়। এরপর ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনী ছড়ায় শুরু হয় চা এর বানিজ্যিক চাষ।
হেমন্তবাবু বললেন, ‘আজকে এই পর্যন্তই থাক। পরবর্তীতে এ নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা করবো। চা এর ইতিহাস সম্পর্কে আমার কাছে ১৮৯০ সালের একটা বই আছে। সেটা আমি আমার দাদার কাছ থেকে পেয়েছি। সেটা তোমাকে দেবো। পড়লে অনেক কিছু জানতে পারবে।’
মুনমুন একটু হেসে বললো, ‘কাকা বাবু বই পড়ে তো সব কিছু শেখা যায় না। শেখার জন্য শি¶ক লাগে। শি¶া প্রতিষ্ঠান লাগে। আমি আগে শি¶কের কাছে শিখতে চাই, পাশাপাশি পড়াশোনাও চলবে।’
রুটিন মাফিক মুনমুনের গবেষনার কাজ চলছে। এই কাজে তাকে হেমন্তবাবু, আসাদ, দিবা, সোমা ও মালতী সহযোগিতা করছে। প্রতিদিন হেমন্ত বাবু, মুনমুন এর বাংলোয় ঘন্টাখানেক চায়ের ইতিহাস, চা চাষ, চা শ্রমিকের জীবন ধারা, চা বাগান ব্যবস্থাপনা, চা ম্যানুফ্যোকচারিং প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করে। এরপর জীপে করে প্র্যাকটিক্যালি মাঠ পর্যায়ে যেয়ে চা চাষ, শ্রমিকের পাতা উত্তোলন, ফ্যাক্টরী ম্যানুফ্যাকচারিং পর্যবে¶ন করে।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ হেমন্ত বাবু মুনমুনকে চা চাষ পদ্ধতির প্রাথমিক ধাপ নার্সারীতে নিয়ে আসলেন, সাথে আসাদও আছে। হেমন্তবাবু একে একে মুনমুনকে চা চাষ পদ্ধতি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। মুনমুন তার সাথে থাকা ভিডিও ক্যামেরায় সব ধারন করছে এবং নোট করছে।
বিকেলে উক্ত বিষয়গুলো নিয়ে বাংলোয় আবার আলোচনা শুরু হলো।
মুনমুন বললো, ‘কাকাবাবু চা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু বলুন।’
হেমন্তবাবু তার ¯^ভাব সুলভ হাসি দিয়ে বললেন, ‘চা চাষ পদ্ধতির কথা যদি শুরু করি তাহলে অনেক বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে। তবুও আমাকে বলতে হবে এবং তোমাকেও ধৈর্য্য ধরে মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে।’
মুনমুন বলল, ‘অবশ্যই।’
হেমন্তবাবু দেখলেন, মুনমুন প্রথম থেকেই কোন বিষয়ে জানতে ও শিখতে খুব সিরিয়াস্। কোন বিষয় না বুঝলে হেমন্ত বাবু থেকে বার বার বুঝিয়ে নিচ্ছেন। একটু পরেই চা এলো। মুনমুন এক কাপ চা হেমন্ত বাবুকে আর এক কাপ চা নিজে নিয়ে বললো, ‘কাকাবাবু এবার শুরু করুন।’
হেমন্তবাবু বললেন, ‘আজকে তোমকে যে নার্সারীতে নিয়ে গেলাম তা হচ্ছে চা চাষের প্রাথমিক ধাপ। চায়ের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে, ‘ক্যমিলিয়ান সাইনেসিস। বেলে, দো-আাঁশ মাটি চা চাষের জন্য ভালো। উষ্ণ আদ্র পরিবেশে এবং তাপমাত্রা ২৬-২৮ ডিগ্রী সেঃ, ২০০০ মি:মি: এর উপর বৃষ্টিপাত, আদ্রতা ৭০-৯০% চা চাষের জন্য উপযুক্ত। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি কোনটাই চায়ের অনুকুল নয়। চা গাছ না ছেটে রাখলে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। একটি চা গাছ সাধারনত: ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফলন দিতে স¶ম। সাধারনত: দুইভাবে চা গাছের বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। এক, বীজের মাধ্যমে। দুই, অঙ্গজ (ক্লোন) এর মাধ্যম্।ে বীজের মাধ্যমে চাষ পদ্ধতি হলো চা বীজ গুটি বাড়ী থেকে সংগ্রহ করে বীজ তলায় ২০ সে:মি: দ্ধ ২০ সে:মি: ত্রিভুজ দূরুত্ব পদ্ধতিতে লাগাতে হয়। বীজ তলায় ছনের চাউনি দিয়ে ছায়া প্রদান করতে হয়। এক হেক্টর জমিতে প্রায় ৪০,০০০ বীজ রোপন করা হয়ে থাকে।
অঙ্গজ বিস্তার বা কাটিং পদ্ধতি উন্নতমানের ক্লোন হতে চারা তৈরী করা হয়। কাক্সিখত ক্লোনের মাতৃব¶ হতে ডাল সংগ্রহ করে একটি পূর্নপাতা ও তার সঙ্গে সুপ্ত পত্র কলি সমেত কাটিং তৈরী করা হয়। প্রথমে প্রাথমিক বেডে কাটিং লাগিয়ে ২-৩ পাতা গজানো পর্যন্ত, ৩-৪ মাস পর নার্সারি ব্যাগে মাধ্যমিক স্থানান্তর করা হয়। কাটিং নার্সারিতে ১৫০-১৮০ সে:মি: উচুঁতে ছন যা বাঁশের চাপ্টা দিয়ে ছায়ায় ব্যবস্থা করতে হয়। পোকা মাকড় রোগ বালাই এর হাত থেকে চারা গুলোকে র¶া করার জন্য প্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হয়। এরপর জমি নির্বাচন করতে হয়। এতে ২০ থেকে ৪০ ফুট দূরে দূরে একটি পূর্ন বয়স্ক স্থায়ী বড় ছায়াবৃ¶ থাকলেই চলে। কাকর শিরিস, সাফেজ, কালো শিরিস, কড়ই গাছ থাকলে ভালো হয়। এরপর ভূমিতে, চাষ ও মই দিয়ে এবং আগাছা পরিস্কার করে জমি তৈরী করতে হয়। সাধারনত: এপ্রিল-মে মাসে চারা রোপন করা হয়। ১২০ সে:মি: দ্ধ ৭৫ সে:মি: থেকে ৯০ সে:মি: দ্ধ ৬০ সে:মি: দূরত্বসহ প্রতি হেক্টরে ১৫,৫০০ থেকে ১৮,০০০ চারা রোপন করা হয়। এরপর মালচিং হিসাবে সবুজও নরম পাতা ব্যবহার করতে হয়। আপাতত: কিছু না থাকলেও ধানের খড় ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। বীজ ও কাটিং হতে উৎপন্ন ৬-১০ মাস বয়সের চা গাছ আনুমানিক ১৫ সে:মি: উচ্চতায় ধারাল ছুরি বা কাচি দ্বারা কেটে দিতে হয়। চা গাছ রোপনের পর থেকে ৫ বৎসর পর্যন্ত একে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা অপরিনিত চা গাছ হিসেবে গন্য করা হয়। এ সময় মাঝে মাঝে ছাঁটাই করতে হয়। এরপর গাছ পরিনত হলে চা গাছ আবার ছাঁটাই করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো গাছটিকে ঝোপাকৃতি করা। যত বেশী ঝোপন শাখা প্রশাখা বেশী হবে, তত বেশী পাতা পাওয়ার সম্ভাবন বেশী থাকে। ছাঁটাই পাঁচ রকমের হয়ে থাকে ১) লাইট প্রুনিং, ২) ডীপ স্কীফ, ৩) মিডিয়াম স্কীফ, ৪) লাইট স্কীফ মিডিয়াম প্রুনিং। এ সময় ছাঁটাই এর উচ্চতা ও পাতা চয়ন উচ্চতা ঠিক রাখতে হয়। ছাঁটাই প্রক্রিয়ার পর মার্চ মাসের শেষে অথবা এপ্রিলে চা গাছের শাখা থেকে কচি কচি শাখা ও পাতা গজায়। এ কচি ডগাগুলো নির্দিষ্ট উচ্চাতায় প্রথম টিপিং করা হয়। এভাবে একটা চয়ন টেবিল প্রতিষ্ঠা করে, পরের সপ্তাহ অন্তর অন্তর পাতা তোলা হয়। উৎপাদন বেশীর জন্য চা গাছে ইউরিয়া, ফসপরাস, পটাশ প্রয়োগ করতে হয়, চা উৎপাদনে ¶তিকর এখন পর্যন্ত ২৫ প্রজাতির পতঙ্গ, ৪ প্রজাতির মাক্ডসা ও ১০ প্রজাতির কৃমি পোকা সনাক্ত করা হয়েছে। তন্মধ্যে চায়ের মশা, উঁইপোকা, লাল মাক্ডসা, এসিফ, জেসিড, থ্রিপিস, ফ্লামওয়াম ও কৃমি পোকা ইত্যাদি। ২২ প্রজাতির জীবানু ঘটিত রোগ সনাক্ত হয়েছে। সেগুলো হলো, পাতা পচা রোগ, ¶য় রোগ, ফোঁস্কা রোগ আগামরা রোগ, লাল মরিচা রোগ, গোড়া পচা রোগ, চার কোন স্টাম ইত্যাদি। ৩৭টি প্রজাতির আগাছা সনাক্ত করা হয়েছে। এই সব ¶তিকর আগাছা কীটপতঙ্গ ও জীবানু দমন করার জন্য মেটা সিসটড ২৫. ডব্লিউ পি সালফার ডাসবান, এড মায়ার, এস.এল থায়াডন, রিপকর্ড, পোড়া মবিল, ফুরাডন গ্রামোক্সেন, ম্যাকু পড়– ডব্লিউ পি-৭৭ কিউপ্রাডিট প্রয়োগ ও স্প্রে করতে হয়।’

দীর্ঘ আলোচনা করে হেমেন্ত বাবু একটু থামলেন এবং এক গ্লাস পানি চাইলেন। তাকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মুনমুন সুগীরকে পানি দেওয়ার জন্য বললো। সুগীর পানি নিয়ে এলো। হেমন্তুবাবু পানি পান করে আবার তার আলোচনা শুরু করতেই মুনমুন বললো, ‘কাকাবাবু থাক, আজ আর না, আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বাকীটা কাল মাঠ পর্যায়ে দেখবো।

এভাবে রুটিন মাফিক মুনমুনের গবেষনার কাজ চলছে। এই গবেষনার কাজে কখনও তাকে গুটি বাড়ী কখনও প্লাকিং (পাতা উত্তোলন), কখনও নার্সারি কখনও চা চাষ পদ্ধতি, কখনও ম্যানুয়েরিং, (সার প্রয়োগ) কখনও কীট পতঙ্গ পর্যবে¶ন, কীট পতঙ্গ ও আগাছা দমনের জন্য এগ্রোক্যামিকেল প্রয়োগ, ফ্যাক্টরী ম্যানুফ্যাকচারিং সব বিষয়ের উপর পর্যবে¶ন ও গবেষনা করতে হচ্ছে। সাথে হেমন্তবাবু ও আসাদ তাকে সহায়তা করছে। তা ছাড়া সপ্তাহে একদিন শ্রীমঙ্গল চা গবেষনা ইনস্টিটিউটে তাকে যেতে হয়। সেখানে অনেক কৃষি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আছেন, তাদের সহযোগিতা নেন এবং মত বিনিময় করেন। দেখতে দেখতে দেড় বৎসর কেটে গেল। বাগানের নারী পুরুষ সবাই তাকে আপন করে নিয়েছে। সেও সবাইকে আপন করে নিয়েছে। কেউ তাকে মুনমুন ম্যাডাম বলে ডাকে, কেউ তাকে বিলেতী ম্যাডাম বলে ডাকে।

বেশ কয়েক দিন ধরে হেমন্তবাবুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডায়াবেটিস ও প্রেসারের সমস্যা আগ থেকেই আছে, তবে তা কন্ট্রোলের মধ্যে ছিল। কিন্তু ইদানিং মাঝে মাঝে পেটের মধ্যে প্রচন্ড ব্যথা করে। সাধারন ডাক্তার দেখিয়ে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেয়েও কোন ফল হচ্ছে না। সেদিন টিলায় মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। আসাদ, মুনমুন তাকে কোম্পানী হাসপাতালে নিয়ে গেল, বড় ডাক্তার দেখানোর জন্য। ডাক্তার তাকে কতগুলো টেষ্ট দিলেন। ইদানিং তার শরীরটা খুব দূর্বল বোধ হয়।
‘ তাই মুনমুন বললো, কাকাবাবু আপনি আগে সুস্থ হয়ে নিন, গবেষনা অপাতত: বন্ধ থাকবে।’
হেমন্ত বাবু বললো, ‘না-মা তা কি করে হয়? তুমি অনেক পিছিয়ে যাবে।’
‘না কাকাবাবু আমি পিছিয়ে যাবো না, আপনি আগে সুস্থ হয়ে নিন, তার পর আমরা কাজে ফিরবো।’
‘না- মা তা হয় না, তার চাইতে তুমি আসাদকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষনা চালিয়ে যাও। কোন সমস্যা থাকলে, তা আমি দেখবো। মনে রাখবে, কোন কারনে তোমার গবেষনা যেন বন্ধ না হয়।’
তিনদিন পরে ডাক্তার রিপোর্ট দিল যে, হেমন্তবাবুর পেটে টিউমার হয়েছে’ অপারেশন করা লাগবে। দিবা, রাত্রি, সূর্য ফাগুনী, মুনমুন , আসাদ সবাই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। হেমন্তবাবুকে কোম্পানী হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সারাবাগান প্রচার হয়ে গেল, হেমন্ত বাবু অসুস্থ। প্রতিদিন তাঁকে দেখার জন্য দলে দলে বাগানের লোকজন হাসপাতালে ভিড় করছে। মুনমুন ও আসাদ প্রতিদিন হাসপাতালে তাঁকে এসে দেখে যায়। হেমন্তবাবু মুনমুনের গবেষনা কাজের খবরাখবর নেয়।
মুনমুন বললো,‘কাকাবাবু আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আপনার আশীর্বাদে আমাদের কাজ ভালোই চলছে।’

এখন প্রতিদিন সকাল বেলায় মুনমুন আসাদকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে যায়। দিবা প্রায়ই এই দৃশ্য দেখে। অজানা ভয়ে মনটা তার শংকিত হয়ে উঠে। ইদানিং আসাদ তাকে তেমন ফোনও করে না। যদি সে করে তাহলে উত্তর দেয়। দুটো কারনে প্রায়ই তার মনটা খারাপ থাকে। এক বাবার কারনে, দ্বিতীয়ত: আসাদের কারনে। সেদিন সে রিকশা যোগে শমশেরনগর থেকে বাসায় ফিরছিলো। পথিমধ্যে দেখল আসাদ ও মুনমুন গাড়ী করে পাশাপাশি সীটে বসে বাগানের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। তারা খুব হাসাহাসি করছে। দিবা বাসায় এসে মন খারাপ করে বিছানায় শুয়ে রইলো। অবশ্য আজ কয়েকদিন থেকে বাসার সবার মন খারাপ। সবাই হেমন্ত বাবুর জন্য চিন্তিত। রাতের খাবারও খেলনা । ফাগুনী এসে ডাকাডাকি করছে খাওয়ার জন্য।
‘এই দিবা খেয়ে যা।’
‘খাবো না।’
‘কেন?’
‘শরীরটা ভালো লাগছে না।’
হেমন্তবাবুর অসুখের কারনে, একটা হাসিখুশি সুখী পরিবার কেমন যেন হয়ে গেছে।সুরিসর্দারকেও আগের মত কারো সাথে কথা বলতে দেখা যায় না। দিবা ও রাত্রি এক রুমে এক বিছানায় শোয়। পিঠে-পিঠি দুই বোন। একে অপরের কথা শেয়ার করে। কিছু¶ন পর রাত্রি এসে ডাকলো। দিবা কোন উত্তর দিল না। রাত্রি দেখলো, দিবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
এবার রাত্রি দিবার মাথায় হাত দিয়ে বললো, ‘এই দিদিভাই কি হয়েছে রে? আব্বুর জন্য মন খারাপ করছে?’
রাত্রির কথা শেষ হতে না হতেই দিবা শোয়া থেকে উঠে রাত্রিকে ধরে আঝোরে কেঁদে ফেললো।
দিবা বললো,‘আব্বুর জন্যতো খারাপ লাগছেই, তার চেয়ে আসাদের অবস্থা দেখে আরও খারাপ লাগছে।’
রাত্রি বললো, ‘কেন কি হয়েছে? আসাদ ভাই আবার কি করেছে? আজকে যখন রাতের খাওয়া খেতে এসেছিল তখনতো তাকে ¯^াভাবিক দেখা গেছে। তবে তার মনটা একটু খারাপ মনে হলো, হয়তো আব্বুর জন্যে।’
দিবা নিজ হাতে চোখের পানি মুছে বললো,‘আব্বুর জন্য না ছাই ,সে একটা মেকী শয়তান।’
‘কি বল্ছিস দিদি ভাই?’
‘আমি ঠিকই বলছি, ও একটা ভন্ড, প্রতারক, বেইমান, লোভী।’
রাত্রি এবার দিবার মুখোমুখি হয়ে বললো, ‘দিদিভাই, অকারনে আসাদ ভাই সম্বন্ধে তোর এসব বলা ঠিক হচ্ছে না।’
‘আমি অকারনে কোন কথা বলছি না, নিজ চোখে যা দেখেছি, তা বলছি।’
‘তা-কি-দেখেছিস?’
‘কি আর দেখবো, মুনমুন ম্যাডামকে নিয়ে সারা বাগান গাড়ী চক্কর দেওয়া, হাসাহাসি, গবেষনার নামে টিলায় টিলায় ঘুরা।’
‘সেটা তো আব্বু তাকে বলেছে, ম্যাডামকে গবেষনার কাজে অপাতত: সহযোগিতা করতে।’
‘গবেষনা না ছাই?’
‘ও একটা প্রতারক, লোভী। সুন্দরী গোলাপী-রঙের লন্ডনী কন্যা পেয়ে সে সব ভুলে গেছে। ম্যাডামের সাথে কোনরকমে গাঁটছড়া বাঁধতে পারলে, লন্ডন যেতে পারবে, লন্ডন সির্টিজেন শীপ পাবে। একাধারে রাজকন্যা ও রাজত্ব দুটোই পাবে।’ বলে দিবা কেঁদে ফেললো।
রাত্রি তাকে বললো,‘আসাদ ভাই তোকে এ ব্যাপারে কোন কিছু বলেছে।’
‘না তবে আগের মত ফোনে তেমন কথাবার্তা বলে না, ফোন দিলে হাই হ্যালো বলে এড়িয়ে যায়।’
‘আচ্ছা আমার সামনে তাকে ফোন দে।’
‘দিবা বলল,‘দে মোবাইলটা দে।’
রাত্রি টেবিলের উপর রাখা মোবাইলটা দিবার হাতে দিল,দিবা আসাদকে ফোন দিল।
‘হ্যালো, হ্যাঁ কেমন আছো?’
‘ভালো। ’
‘ভালোই তো থাকবে।’
‘কি?’
‘ কি আবার কি? ভালোই তো থাকবে।’
‘মানে?’
‘মানে আর কি, নতুন সুন্দরী গোলাপী রঙের লন্ডনী কন্যা সঙ্গীঁ পেলে কে-না ভালো থাকে।’
কি আবোল তাবোল বলছ?’
‘আমি আবোল তাবোল বলছি না, ঠিকই বলছি।’
দিবা এবার উত্তেজিত হয়ে বললো,‘প্রতারক, ভন্ড, ধোকাভাজ, লোভী, বেইমান।’
‘দিবা, তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ,আমি কাকাবাবুর নির্দেশে তার পরিবর্তে মুনমুন ম্যাডামকে তার গবেষনার কাজে সহযোগিতা করছি এর থেকে আর কিছু না।’
‘গবেষনা না ছাই, যা হউক, তোমাদের গল্প কতদূর এগিয়েছে। আবার সুটিং শুরু করতে হবে, দুজনের রসায়নটা ভালোই জমবে। গল্পের শেষটা এভাবে দিও যে, লোভী এক বাঙালী ছেলে লন্ডন সিটিজেন শীপের আশায় লন্ডনী কন্যাকে বিয়ে করে লন্ডন পাড়ি জমিয়েছে।’
দিবার কথায় এবার আসাদ ¶েপে গেল। সে উচ্চ¯^রে বলতে লাগলো, ‘ হ্যাঁ-হ্যাঁ আমি মুনমুনকে ভালোবাসি। তাকে জীবন সঙ্গী করলে লন্ডন সিটিজেন শীপ পাবো। কে না চায় উন্নত জীবনের ¯^প্ন?’
রাগত¯^রে দিবা বললো, ‘ভন্ড, প্রতারক, আর কোনদিন আমার সাথে কথা বলবে না।’ বলে হাত থেকে মোবাইল ছুঁড়ে মারলো।

আজ সকাল থেকে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই আজ মুনমুন বাংলো থেকে বের হয়নি। মুনমুন তার গবেষনার কাজ নিয়ে বাংলোয় সময় পার করছে। হেমন্তবাবুর কাছ থেকে পাওয়া চা বিষয়ক বইগুলো পড়ছে। একা একা ভালোও লাগছে না। হেমন্তবাবুর জন্য মনটা খুব খারপ করছে। প্রতিদিন সে ও আসাদ হাসপাতালে যেয়ে তাকে দেখে আসে। আজ বৃষ্টির জন্য বের হতে পারছেনা। প্রায় দেড় বৎসর হয়ে গেল। এদেশে এসেছে, অনেক কিছু সে শিখেছে। এদেশ তার পূর্ব পূরুষের বাস। খুব ছোট বেলায় মা বাবাসহ সে একবার এদেশে এসেছিলো। তা একটু একটু মনে আছে। এখানে এসে বাগানের মানুষগুলো তার কেমন যেন আপন হয়ে গেছে। বিশেষ করে হেমন্ত বাবুর মত একজন মানুষ পাওয়া। আসাদের মত একজন কর্মোদ্দেমী মানুষ পাওয়া। আচ্ছা, আসাদ মানুষটা কেমন? এই কয়দিনে তার সাথে যতটুকু চলাফেরা করেছে তাতে মনে হয় মানুষটা বেশ রোমান্টিক, সুন্দর মনের মানুষ। আচার আচরনে খুব ভদ্র। এরকম মানুষকে বিশ্বাস করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়। ইউরোপ-আমেরিকার ছেলেগুলোকে বিশ্বাস করা যায় না। তারা আজ আছে তো কাল নেই। সে অভিজ্ঞতাও তার আছে। মনের মধ্যে নানা ভাবনা উঁকিঝুকি মারে। বেলা তিনটে বাজে, আসাদ নিশ্চয় বাসায়। বাইরে এখনও বৃষ্টি ঝরছে। বর্ষনমুখর এই দিনে আসাদ পাশে থাকলে গল্প করে সময় কাটানো যেতো। মুনমুন আসাদকে ফোন দিল ‘হ্যালো। ’
‘ইয়েস ম্যাডাম। ’
‘কি করছেন?’
‘একটু আগে খেয়ে শুয়েছি।’
‘একটু বাংলোর দিকে আসবেন।’
‘অবশ্যই।’
‘আমি নির্মল ভাই ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
একটু পরে গাড়ী এসে আসাদের বাসার সামনে থামলো।
গাড়ী থেকে নেমে নির্মল বললো, ছোটবাবু ম্যাডাম সালাম দিছেন।’
‘নির্মল তুমি বসো,‘ আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নেই।’
একটু পরে আসাদ ফ্রেশ হয়ে গাড়ীতে উঠলো। নির্মল আসাদকে নিয়ে বাংলোর দিকে গাড়ী ছাড়লো।
বাংলোর সামনে এসে গাড়ী দাঁড়ালো। আসাদ গাড়ী থেকে নেমে বারান্দায় উঠলো। এবং মুনমুনের ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো। মুনমুনের বিশাল ড্রয়িং রুমটা বড় বড় তৈল চিত্র, তার ছবি ও পৃথিবীর বড় বড় শহরের ছবি দিয়ে সাজানো। মুনমুন এখনও আসেনি। আসাদ ঘুরে ঘুরে তৈলচিত্র ও ছবিগুলো দেখছে। একটু পরেই মুনমুন ড্রয়িং রুমে ঢুকলো। আজ সে অপূর্ব সাজে সেজেছে, প্রায়ই সে স্কাট, সেলোয়ার কামিজ পরে। কিন্তু আজকে সে শাড়ী পরেছে। হালকা মেকআপে সোনালী চুল, নীল চোখ, গোলাপী মুখের মুনমুনকে দেখতে আজ অপূর্ব লাগছে।
আসাদ মুনমুনের দিকে তাকালো। শাড়ী পরিহিতা মুনমুনকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।
মুনমুন বললো, ‘কি দেখছেন?’
‘দেখছি, দেওয়ালে টাঙ্গানো আপনার ছবি আর পৃথিবীর সুন্দর সিটিগুলোর ছবি।’
‘এখানে যে সিটিগুলো দেখছেন, এই সব সিটিগুলো আমি ভ্রমণ করেছি।’
‘কার সাথে গিয়েছিলেন?’
‘কখনও বাবার সাথে, কখন ও বন্ধু বান্ধবের সাথে।’
‘কোন সিটি আপনার কাছে বেশী সুন্দর মনে হয়েছে?’
‘প্যারিস সিটি।’
‘শুনেছি লন্ডন সিটি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সিটি। এখানে টেমস নদীর নীচে নাকি সুন্দর এক সুড়ঙ্গ আছে। এই নদীর পাড় ঘেষে লন্ডন শহর গড়ে উঠেছে।’
‘যাবেন লন্ডন শহরে, টেমসের তীরে হাত ধরে দুজন পাশাপশি হাঁটবো।’
‘কী বলেন ম্যাডাম, আমি কী করে লন্ডন যাবো, পাসপোর্ট ভিসা ছাড়া কী লন্ডন যাওয়া যায়।’
‘সে আমি ব্যবস্থা আমি করবো। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো।’
‘না ম্যাডাম ,আমি আমার দেশ, মাটি, জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যাবো না।’
তারপর মুনমুন আসাদের সামনে মুখোমুখি হয়ে বললো,
‘আমাকে দেখতে কেমন লাগছে?’
‘অপূর্ব, খুব সুন্দর লাগছে, আপনাকে শাড়ী পরলে খুব সুন্দর মানায়।’
তাদের এই কথোপকথনের মাঝে দিবা বাংলোয় এলো। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। দিবাকে দেখে মুনমুন কাছে এসে বললো, ‘এসো দিবা, কেমন আছ?’
দিবা বললো,‘ভালো।’
দিবাকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে। হাতে একটা কাগজ মুনমুনের দিকে বাড়িয়ে দিল। মুনমুন কাগজ খানা হাতে নিয়ে দেখলো, অব্যাহতিপত্র।
মুনমুন বলল্,ে ‘দিবা কোনো সমস্যা?’
‘ম্যাডাম সামনে আমার পরী¶া, তাছাড়া আব্বু অসুস্থ। আপনার গবেষনার কাজে সময় দিতে পারছি না। তাই অব্যাহতি চাচ্ছি।’
‘দেখ দিবা, কাকাবাবু অসুস্থ এজন্য আমারও মনখারাপ। আল্লহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। এইটুুকু প্রার্থনা করি।’ তাদের কথার মাঝে আসাদ বললো, ‘ম্যাডাম আমি এখন আসি, আমার একটু কাজ আছে।’
‘আচ্ছা, আপনি এখন আসুন।’
আসাদ যাওয়ার সময় আড়চোখে দিবার দিকে একবার তাকোলো। দিবা ও তাকালো। একটু পরে দিবাও চলে গেল। মুনমুন একা একা ভাবছে, কাকাবাবু অসুস্থ, দিবা অব্যাহতি দিয়েছে। মেয়েদের মধ্যে দিবা খুব ট্যালেন্ট। সে গবেষনার কাজে তাকে ভালো সহায়তা করতো। এমন সময় মালতী তার প্রতিদিনের রিপোর্ট দেওয়ার জন্য এলো। সুরি সর্দারের মেয়ে চলাফেরা ও কথাবার্তায় খুব ছট্ফটে। ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। বাগানের সব খবরাখবর রাখে। মুনমুনকে বাগানের সব কথা বলে । মুনমুন তাকে বসতে বললো।
তারপর তার পাশের সিটে বসে তাকে বললো,
‘মালতী দিবাতো আজ অব্যাহতি দিয়েছে, কাল থেকে সে আর কাজ করবে না। তুমি আপাতত: তার কাজটা চালিয়ে নিয়ে যাও। কাকাবাবু সুস্থ হলে, তার পরামর্শে তখন নতুন কাউকে নিয়ে নেবো।’
মালতী চারিদিকে একবার তাকালো।
তারপর বললো, ‘ম্যাডাম, সে যে অব্যাহতি দেবে তা আমি জানি।’
‘তুমি জান?’
‘হ্যাঁ সব জানি।’
‘কি জানো?’
‘ম্যাডাম, আমি প্রতিদিন তাদের বাসায় যাই। তার ছোট বোন রাত্রি আমার সই। সে আমাকে তাদের বাসার সব কথা বলে। দিবাদির অব্যাহতির কথাও বলেছে।’
‘কি বলেছে?’
দিবাদির সাথে ছোট বাবুর (আসাদ) সম্পর্ক। ইদানিং ছোট বাবু আপনার সাথে ঘুরে বেড়ায়। বাগানে হাঁটা হাঁটি করে। এ নিয়ে দিবাদির সাথে ফোনে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়াঝাটি পর্যন্ত হয়েছে। সে জন্য দিবাদি রাগ করে কাজে অব্যাহতি দিয়েছে।’
মালতী আরও বললো, ‘ম্যাডাম আমি যে আপনাকে একথা বলেছি, তা আপনি কাউকে বলবেন না।’
‘ঠিক আছে, বলব না।’
তারপর মুনমুন মালতীর মুখোমুখি হয়ে বললো, ‘আচ্ছা মালতী, তুমি কাউকে ভালোবাসো।’
মুনমুনের এ কথায় লজ্জায় মালতীর মুখ লাল হয়ে গেল। মালতী মাথা নীঁচু করে রইলো।
মুনমুন মালতীর মাথায় হাত দিয়ে সাহস দিয়ে বললো,‘দেখ মালতী তোমাদের সব বিষয় আমার গবেষনার বিষয়। তাই কোন বিষয়ে সংকোচ না করে আমার সাথে ফ্রি হওয়ার চেষ্টা করবে।’
মুনমুনের কথায় সাহস পেয়ে মালতী বললো, ‘জী ম্যাডাম, ভালোবাসি।’
‘কাকে?’
‘সূর্য্যবাবুকে।’
‘ও আচ্ছা।’
মালতী বললো, ‘ম্যাডাম আমি এখন আসি।’
মালতী যাওয়ার পর মুনমুন মহা চিন্তায় পড়লো। সন্ধ্যা তখন ঘনিয়ে এসেছে। মুনমুন ভাবছে, আসাদ দিবাকে ভালোবাসে, তা সে জানে না, জানলে কখনও সে আসাদের এত কাছাকাছি হতো না। হয়তো এই জন্যেই আসাদ তার কাছ থেকে দূরুত্ব বজায় রেখে চলে এবং তার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।

গত দুইদিন যাবৎ হেমন্তবাবুর রক্তের গ্রæপের ডোনার খোজা হচ্ছে। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। হেমন্তবাবুর ব্লাড গ্রæপ হলো ও’ নেগেটিভ। আন্কমন এই ব্লাড গ্রæপের লোক পাওয়া দুষ্কর। আসাদও তার রক্তের গ্রæপ পরীক্ষা করালো। রিপোর্ট এলো ‘ও’নেগেটিভ।
ডাক্তার আসাদকে বললেন, ‘বাবু আপনি এখনই ব্লাড দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হউন।’ আসাদ ব্লাড দেওয়ার জন্য ডাক্তারের রুমে ঢুকলো।
ওদিকে হেমন্ত বাবুকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। হাসপাতালের বারান্দায় দিবা রাত্রি, যতীনবাবু সোমা ফাগুনি, সুরি সর্দার ওলিবাবু আসাদ, সূর্যবাবু, ¯^পনবাবু সহ বাগানের আরও অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ হেমন্ত বাবুর অপারেশন চললো। আরও ১ ঘন্টা পরে তাঁর হুঁশ এলো। তাকে বেডে আনা হল। ডাক্তার বললেন,‘ তিনি এখন ভালো আছেন। তবে কেউ যেন তার সাথে দেখা না করে।’
প্রায় ১০ দিন পর হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে হেমন্তবাবু বাসায় ফিরলেন। তবে শরীরটা এখনও দূর্বল। মুনমুন প্রায় সময় বাসায় এসে হেমন্তবাবুকে দেখে যায়। তার গবেষনার কাজ এখন প্রায় বন্ধ। বাংলোয় একা একা সময় কাটায়।
আজ বিকেলের দিকে মুনমুন আসাদ ও দিবাকে বাংলোয় ডাকলো। ড্রাইভার নির্মল এসে গাড়ী করে তাদেরকে বাংলোয় নিয়ে গেল। মুনমুন তাদেরকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসলো। তারপর দিবার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘দিবা কেমন আছ?’
‘ভালো ম্যাডাম।’
‘কাকাবাবু কেমন আছেন?’
‘ভালো।’
আসাদ বললো, ‘ম্যাডাম, হঠাৎ করে ডাকলেন, কোন কাজ?’
‘না, এমনিতে ডাকলাম, গল্পগুজব করার জন্য।’
তারপর মুনমুন দুজনের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমরা তিনজনই প্রায় সমবয়সী। তাই আমাদের মধ্যে গল্পগুজব জমবে ভালো। তাছাড়া আমরা একে অপরের কথা শেয়ার করতে পারি। এভাবে আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হতে পারে। আর ভালো বন্ধু হতে গেলে একে অপরকে জানতে হয়। বুঝতে হয়। দিবা, তুমি-তোমাকে দিয়ে শুরু করো।
‘সে কি রকম?’
‘এই ধরো তোমার জন্ম, জীবন কাহিনী, এই আর কি।’
‘না ম্যাডাম আমার সংকোচ হচ্ছে। তার চাইতে আপনাকে দিয়ে আপনি শুরু করুন।’
মুনমুন হেসে বললো, ‘আমাকে দিয়ে শুরু করবো, ঠিকইতো বলেছ। আমি যখন প্রস্তাবক। তখন আমাকে দিয়েই আমি আমার জীবন কাহিনী শুরু করি।’
মুনমুন তার জীবন কাহিনী শুরু করলো, মুনমুন বললো, ‘আমার নাম জেসমিন গুলবাহার মুনমুন। জন্ম বৃটেনের স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায়। বাবার নাম আলী আহমেদ চৌধুরী। মায়ের নাম ইভা ব্রাউন। দাদা ও পূর্বপূরুষের বাড়ী এই বাংলাদেশের সিলেটে। আমি একাধারে বাংলা, সিলেটী-ইংরেজী ও স্কটিশ ভাষায় কথা বলতে পারি। যেদিন আমি জন্মগ্রহন করি সেদিন ছিল ভরা পূর্নিমা। রাত ১২টা। সেদিন নাকি চাঁদ পৃথিবীর এত কাছাকাছি এসেছিল যে চাঁদকে অন্যন্য দিন থেকে বেশ বড় বা দ্বিগুন দেখা গেছে। তাই আমার গ্য্রান্ড মাদার(নানী), আমার নাম রেখেছিল মুনমুন । দাদার লন্ডনে রেষ্টুরেন্টের ব্যবসা ছিল। এখনও রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা আছে। কিন্তু দাদা নেই। লন্ডনে আমাদের নিজ¯^ বাড়ী আছে। দাদার প্রচন্ড ইচ্ছা তার একমাত্র ছেলেকে রেষ্টুরেন্ট ব্যবসার দিকে না জড়িয়ে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করাবেন। সেই ল¶্যে তিনি তাঁর ছেলেকে আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করালেন। বাবার ব্যাচমেইট আমার মা ইভা ব্রাউন। ব্যাচম্যাটের সুবাদে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব। তার থেকে প্রেম এবং পরে বিয়ে। খুব সাজানো গোছানো সুখী সুন্দর আমাদের ফ্যামিলি ছিল। আমার বয়স যখন ১০ বৎসর, তখন আমার মা, আমি ও আমার বাবাকে ছেড়ে তার নতুন বয়ফ্রেন্ড এর সাথে চলে যায়। আমার এখনও মনে আছে, মা যেদিন বাবা ও আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেদিন আমিও বাবা খুব কান্নাকাটি করছিলাম। বাবা বারবার তাকে ফেরাতে চেয়েছিল। কিন্তু ¯^ার্থপরের মতো মা তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে চলে যায়। তখন আমি কিছু বুঝতাম না। মাঝে মাঝে মা আসতেন, আমাকে দেখতে। আমি তার সাথে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতাম। কিন্তু সে আমাকে সাথে নিত না। পরে একটু বড় হলে যখন বুঝতে পারি তখন তাকে আসতে নিষেধ করতাম। তখন তার প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে যায়। ভাগ্যিস আমার দাদা-দাদী ও ফুফুরা ছিল। যৌথ ফ্যামেলিতে তারা আমকে মায়ের অভাব বুঝতে দেন নি। তারা আমাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। বাবা আর বিয়ে করেন নি। মায়ের এমন কান্ডে বাবা স্ট্রোক করে মারা যায়। আমার ভার্সিটি লাইফের শেষ দিকে একটি ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়। তার নাম ছিল এরিকসন। তার সাথে প্রথমে বন্ধুত্ব তারপর প্রেম। তাকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিলাম। প্রায় ২ বৎসর আমাদের সম্পর্ক ছিল। তাকে নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছি। অনেক ¯^প্ন তাকে নিয়ে ঘর বাঁধবো। কিন্তু একদিন দেখলাম সেও অন্য একটি মেয়ের হাত ধরে পার্কে ঘুরছে এবং মুখোমুখি হতেই সে তার নতুন বন্ধু বলে আমকে পরিচয় করিয়ে দিল। মনটা ভেঙে গেল। ইউরোপীয় কালচারের প্রতি ঘৃণা জন্মালো। সিদ্ধান্ত নিলাম যে, ইউরোপীয় কোন ছেলেকে জীবন সঙ্গী হিসেবে নেবো না। যদি কাউকে নেই, তাহলে বাঙালী বা ভারতবর্ষের কোন ছেলেকে নেবো। কারণ ভারতবর্ষের সমাজ সংসার বন্ধন খুব দৃঢ়। এখানে মানুষের শত কষ্ট দারিদ্র থাকা সত্তে¡ও স্ত্রী-¯^ামীকে ফেলে যায় না। ¯^ামী-স্ত্রীকে ফেলে যায় না। আর ইউরোপীয় সমাজ সংসার ঠুন্কো। এরপর যখন এদেশে এলাম, তখন আসাদের সাথে পরিচয়। শুরু হলো তাকে নিয়ে ¯^প্ন দেখা। কিন্তু আমি বোধ হয় অপয়া। যাকে ধরি সে আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আমি কখনও জানতাম না যে, আসাদ তোমাকে ভালোবাসে। আমি অনেক ইঙ্গিতে তাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে চেয়েছিলাম, লন্ডনে যাওয়ার লোভও দেখিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে তোমার কাছ থেকে সরাতে পারিনি। আসলে দিবা তুমি খুব ভাগ্যবান। তুমি এমন একটা মানুষকে ভালোবেসেছ, যার মধ্যে কোন লোভ-লালসা নেই। প্রকৃত প¶ে আসাদ একজন সুন্দর মনের মানুষ। এই সব মানুষকে বিশ্বাস করে ঘর বাঁধা যায়। তারপর মুনমুন উঠে গিয়ে দিবার হাতে ধরে বললো,‘দিবা আইম সরি, আমি তোমাদের সম্পর্কের কথা কিছুই জানি না। আসাদ তোমার ছিল। তোমারই থাকবে। আমি তোমাদের মধ্যে শুধু বন্ধু হয়ে থাকতে চাই।’
দিবা বললো,‘ম্যাডাম আমি দু:খিত, আমি আপনার উপর খুব রেগে গিয়ে ছিলাম।’ তারপর মুনমুন একটু নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললো, ‘আমিতো আমার জীবন কাহিনী বললাম, এবার তোমার কথা বলো।’
‘দিবা বললো,‘আমার কথা কি বলবো? আমিতো আপনার থেকে আরও অপয়া। যেখানে যাই। তা শেষ হয়ে যায়। আমি যখন ফাষ্ট ইয়ারের ছাত্রী, তখন আমার এক মামা আমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব আনে, ছেলেটি জাফলং ‘টী গার্ডেন’ এর অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার ছিল। ছেলেটি আমাকে দেখলো। পছন্দ হলো। ধূমধাম করে বিয়ে শেষে, বিয়ের দিন কার যোগে শ্বশুর বাড়ী যাচ্ছি। সাথে আমার নতুন ¯^ামী। কুলাউড়ার কাছে রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফেরে, তখন আমি সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমার ¯^ামী আর ড্রাইভার ঘটনারস্থলে মারা গেল। আমি ভগবানের কৃপায়, ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলাম। কপালের সিথি, হাতের মেহেদীর রং না মুঁছতেই, বাসর না করে, অকালে বিধাবা হলাম।’
মুনমুন দু:খ প্রকাশ করে বললো, ‘বড়ই ট্র্যাজেডি তোমার জীবন।’
মুনমুন তারপর আসাদকে বললো,‘আপনার জীবন কাহিনী শুরু করুন।’
আমার জীবন কাহিনী আর ও ট্র্যাজেডি,‘আমার বাবা ছিল ডাক্তার। হাতিয়া দ্বীপের ¯^াস্থ্য কর্মকর্তা। মা বাবা ৬ বৎসরের ছোট বোন নিয়ে আমাদের পরিবার ছিল। সেদিন ছিল আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সকাল থেকেই দমকা হাওয়া বইছে। চারিদিকে সাগর বেষ্ঠিত হাতিয়া দ্বীপ। রেডিও টিভিতে ৮নং মহা বিপদ সংকেত দিচ্ছিল। আমাদের বাসাটা ছিলো দোতালা। দোতালা হলেও উচ্চতা কম ছিল। ভবনটি ছিল পুরানো। আশ্রয় কেন্দ্রে ভিড় ছিল, তাছাড়া আমাদের এখানে কখনো পানি উঠতো না। তাই আমরা বাসায় ছিলাম। রাত বারোটার দিকে ঝড়ের বেগ বাড়তে লাগলো। সমুদ্র থেকে প্রায় ১০/১৫ ফুট উঁচু পানির জলোচ্ছাস ও বাতাস এসে আমাদের দ্বিতল ভবনকে আঘাত করলো। পানি উপছিয়ে দোতালার উপর দিয়ে বইতে লাগলো। ঝড়ের বেগে আমরা বিভিন্ন দিকে ছিটকে পড়লাম। পুরাতন ভবন বিধায় দেওয়াল ভেঙ্গে চূর্ণবিচ্ছুর্ন হয়ে পড়লো। ছাদ ধসে আমাদের সকলের উপর পড়লো। ঘটনাস্থলে মা, বাবা, বোন সকলে মৃত্যুবরণ করলো। আমি আহত হলাম এবং কোনরকমে বেঁচে গেলাম। পরে খালার আশ্রয়ে বড় হলাম।
‘মুনমুন বললো,‘বড়ই মর্মান্তিক, আসলে পৃথিবীতে আমার কেউ সুখী না, সবার জীবনে কিছু না কিছু ট্র্যাজেডি আছে।’

মাস খানেক বিশ্রামের পর হেমন্তবাবু পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। মুনমুন প্রায় সময় তাকে দেখতে আসে। সাথে ফলমূল নিয়ে আসে।আজও এসেছেন তাকে দেখতে।
হেমন্তবাবু বললো,‘মা আমাদের আর বসে থাকা উচিত হবে না।’
মুনমুন বললো,‘সে কি করে হয়? আপনি আরও কয়েকদিন বিশ্রাম নিন।’
‘না মুনমুন, আমি এখন পরিপূর্ণ সুস্থ। আমি চাই আজকে থেকে কাজ শুরু করতে।’
‘আজকে থেকেই শুরু করবেন?’
‘হ্যাঁ মা, আজকে থেকেই শুরু করবো। কারণ তোমার অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে।’

বিকেল বেলায় ড্রাইভার নির্মল এসে হেমন্তবাবুকে বাংলোয় নিয়ে গেল। সেখানে প্রথম থেকে এ পর্যন্ত যে, গবেষনার কাজ হয়েছে, তার সং¶িপ্ত একটা নোট মুনমুন হেমন্তবাবুর হাতে দিল। হেমন্ত বাবু দেখে বললেন, ‘সবই ঠিক আছে, তবে চায়ের যে ট্র্যাজেডির ইতিহাস, তা-তো আলোচনা করা হয়নি। তাছাড়া ওসমাননগর চা বাগান সম্বন্ধে কিছুই আলোচনা হয় নি।’
‘ঠিক বলছেন কাকাবাবু, এগুলো কি করে বাদ গেল?’
‘আসলে আমার মাথায় এটা ছিল। কিন্তু অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় তা আর বলা সম্ভব হয়ে উঠে নি।’
‘তাহলে কাকাবাবু চায়ের ট্র্যাজিডির ইতিহাস বলুন।’
‘তাহলে, শোন চায়ের ট্র্যাজিড়ির ইতিহাস। ইংরেজ সাহেব হার্ডসন ১৮৪৯-১৮৫৫ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান। তারপর ব্রিটিশ কোম্পানীগুলো একর পর এক পাহাড় কেটে, জঙ্গল সাফ করে বাগান তৈরী করার উদ্যোগ নেয়। জঙ্গলে তখন ছিল বাঘ ও বন্য হিং¯্র প্রানীর বিচরণ । স্থানীয় লোকজন কাজ করতে সম্মত না হওয়ায় উদ্যোগ নেয়া হয়, দূরদূরান্ত হতে শ্রমিক আনা। দালাল লাগিয়ে বোঝানো হয়, ‘গাছ হিলায়ে তো পয়সা মিলেগা’। অর্থাৎ গাছে ঝাকুনি দিলে পয়সা পড়ে। এমুনি জায়গা, এভাবে চল চাতুরি ও মিথ্যা ¯^প্ন ও উন্নত জীবনের আশ্বাস দিয়ে, আসাম, নাগাল্যোন্ড মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, বিহার,মহারাষ্ট, তামিল নাডু প্রভৃতি অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে এখানে নিয়ে আসে। এখানে এসে চিত্রপট দেখে সম্পূর্ন ভিন্ন। কোম্পানি মালিকরা সকল শ্রমিকদের গহীন জঙ্গল কেটে বাগান তৈরী করার কাজে নিয়োজিত করে। নাম মাত্র মুজুরীতে সারাদিনের হাড় ভাঙ্গা খাটুনিতে একবেলা খাবারও জুটত না অনেক সময়। যার ফলে অনাহারে অর্ধাহরে জীবন পার করতো শ্রমিকরা। একদিকে খাবার সংকট, বাসস্থানের সংকট অন্য দিকে বাগান মালিকের নির্যাতন নিপীড়নে অতীষ্ঠ হয়ে ওঠতে থাকে চা শ্রমিকরা। অনেকে পালাতে চেয়েছিল। তাই কোম্পানির মালিকপ¶ পালাতে যাতে না পারে, সে জন্য চালু করে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রথার। মুজুরী দেওয়া হতো টোকেন-এ। এই টোকেন দিয়ে কেনা বেচা চলতো, শুধু বাগান এলাকায়। নগদ অর্থ তারা চোখেও দেখতো না। পালানো সম্ভব ছিল না। পথ খরচের টাকা না থাকায় সম্পূর্ন অপরিচিত এদেশে প্রথমদিকে তারা রাস্তাঘাট কিছুই চিনতো না। এক পর্যায়ে তারা সংগঠিত হয়। অতি সঙ্গোপনে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য তাদের ¯েøাগান ছিল, ‘মুল্লুক চলো’ ইংরেজদের অধীনে এই দাসত্ব নয়। নিজ মুল্লুকে ফিরে চল। সিলেট ও তার আশে পাশের প্রায় ত্রিশ হাজার চা শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজ মুল্লুকে ফিরে যাওয়ার আন্দোলোন শুরু করে। সময়টা ছিল ১৯২১ সালের ৩রা মার্চ। কোনরুপ চিন্তা ভাবনা না করেই মাথা গোজার ঠাঁই ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় কী খাবে? কীভাবে যাবে? এসব চিন্তা একটি বারের জন্যও তাদের সিদ্ধান্ত থেকে দুরে সরাতে পারে নি। দলে দলে শ্রমিকরা বলতে থাকে বার বার মরার থেকে একেবারেই মরবো। তবুও নিজ নিজ ভুমির দিকে যাত্রা এগিয়ে যাবো।তারা কেবল জানে চাদঁপুর জাহাজ ঘাট। সেখানে যেতে পারলেই জাহাজে চড়ে কলকাতায় ফিরে যাবে। সেখানে থেকে ¯^দেশে। কিন্তু ঘাটে যাবে কি করে? সবাই তখন জড়ো হতে থাকে রেল স্টেশনে।
এদিকে চা বাগান মালিকপক্ষ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রেল কর্তৃপক্ষের রেলের টিকেট চা শ্রমিকদের না দিতে নির্দেশ দেয়। অন্য কোন উপায় না দেখে স্ত্রী, পুত্র পরিজন নিয়ে রেলপথ ধরে হাঁটতে থাকে চাঁদপুরের জাহাজ ঘাটের উদ্দেশ্যে। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন স্থানীয় কংগ্রেস, ও ¯^দেশী কর্মীরা। শ্রমিকদের সাথে একত্মতা ঘোষনা করেন এবং শ্রমিকদের খাদ্য সরবারহ, রাত্রি যাপন, মানসিক শক্তি ও সাহস যোগান। ক্লান্তি ও রোগ ব্যাধিতে পথে পথে মৃত্যু হয় অনেক শ্রমিকের। তবুও থেমে থাকেনি তাদের মুল্লুকে যাওয়ার সংগ্রাম। ১৯২০ সালের ২০ মে শ্রমিকেরা গিয়ে পৌঁছে চাঁদপুর ঘাটে। অন্যদিকে বাগান মালিকরা সরকারের সহযোগিতায় চা শ্রমিকদের প্রতিরোধ করতে চাঁদপুর মেঘনা ঘাটে আসাম রাইফেলস্ এর গুর্খা সৈন্য মোতয়েন করে। ঘাটে জাহাজ যখন ভিড়লো, শ্রমিকরা তখন পাগল হয়ে জাহাজে উঠতে গেলে, সৈন্যরা বাধা দিতে থাকে এবং তাদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে শত শত শ্রমিক মৃত্যবরণ করে। শ্রমিকের রক্তে লাল হয়ে উঠে মেঘনার জল। নিজ মূল্লূকে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শ্রমিকরা আবার বাগানের দিকে ফিরে আসে। মালিকপক্ষের ষড়যন্ত্র কিন্তু থেমে থাকে নি। তারা সুকৌশলে প্রতিটি বাগানের শ্রমিকদের হাতে মদের বোতল তুলে দেয়। যাতে তারা আন্দোলনমুখী ও সচেতন না হয়। তাদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া না করে। দিনে কাজ করবে। রাত্রে মদের নেশায় বুঁধ হয়ে থাকবে’।
এক সঙ্গে অনেক কথা বলে হেমন্তবাবু তার কথা শেষ করলো। মুনমুন এর মনটা দু:খে ভরাক্রান্ত হয়ে গেল। একটা দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলে মুনমুন বললো,‘ ভেরি ট্রেজেডি হিস্ট্রি’

আসাদ ও দিবার মাঝে তখনও সম্পর্ক ¯^াভাবিক হয়নি। মান-অভিমানে একে অপরের সাথে এখনও কথা বলে না।
রাত্রি বললো,‘এই দিদি ভাই, তুই শুধু শুধু আসাদ ভাইকে সন্দেহ ও দোষারপ করেছিস।’
দিবা বললো,‘আসলে তুই ঠিকই বলেছিস।’
রাত্রি বললো,‘শোন, যেহেতু দোষ তুই করেছিস, তুই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।’
‘কিভাবে?’
রাত্রি তার মোবাইলটা দিবার হাতে দিয়ে বললো, ‘নে এখন আসাদ ভাইকে ফোন দে।’
দিবা বললো, ‘রাত ১১ টা বাজে আসাদ কি এখন জেগে আছে?’
রাত্রি বললো,‘আছে’
দিবা বললো,‘তাহলে আগে তুই দে, একটু কথা বল, তারপর আমি বলবো।’
রাত্রি ফোন দিল।
আসাদ মোবাইল ধরে বললো,‘হ্যাঁ রাত্রি কেমন আছো?’
‘ভালো।’
‘আপনি এখনও ঘুমোননি?’
‘না একটা বই পড়ছি।’
‘ও আচ্ছা, আসাদ ভাই, আপনি আমার উপর রাগ করেছেন।’
‘না, তোমার উপর রাগ করতে যাবো কেন?’
‘তাহলে আমার সাথে কথা বলেন না কেন?’
‘কী তোমার সাথে কথা বলিনা!’
‘আজকেও তো বলেছি।’
‘কখন বললেন? আমি তো ভুলে গেছি।’
‘এই মেয়ে ফাজলামি হচ্ছে।’
রাত্রি হেসে উঠলো।তারপর দিবার হাতে মোবাইল দিল।
দিবা হ্যাঁলো বললো, দিবার কন্ঠ শুনতেই আসাদ মোবাইল ছেড়ে দিল। দিবা আবার রিং দিল, আসাদ এবার ধরলো।
দিবা বললো, ‘আমার ফোন ছেড়ে দিলে কেন?’
‘আসাদ বললো,‘দিলাম, আমি অত্যন্ত খারাপ মানুষ। আমার সাথে কোন ভালো মানুষের সম্পর্ক থাকতে পারে না।’
‘না, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ও সুন্দর মনের মানুষ।’
‘মুনমুন ম্যাডাম সার্টিফিকেট দেওয়ার পর এবার তুমিও সার্টিফিকেট দিচ্ছ।’
‘হ্যাঁ দিচ্ছি, আসলে আসাদ আমি ভুল করেছি।আই এম সরি, আমাকে ক্ষমা করে দাও।’আসাদ কোন কথা বললো না।
তারপর দিবা আবার বললো, ‘কি ক্ষমা করেছ? যদি না করো, তাহলে-
‘আচ্ছা বাবা দিচ্ছি, সব সময় আমাকে ফোন দেবে।’
দিবা খুশিতে বললো,‘আমি দেবো কেন? তুমি দেবে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমিই প্রতিদিন ফোন দেবো, এখন অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো।’
মোবাইল রেখে দিবা খুশিতে রাত্রিকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো,
‘মাই ডিয়ার সুইট সিস্টার।’ বলে রাত্রির মুখে একটা চুমু খেল এবং বললো,‘তোকে অনেক ধন্যবাদ।’

আজকে হেমন্ত বাবু মুনমুনকে নিয়ে আবার বাংলোয় বসলো। মুনমুন বললো,‘কাকাবাবু আজ আমাদের ওসমান নগর চা বাগান সম্বন্ধে কিছু বলুন, হেমন্তবাবু ওসমান নগর চা বাগান সম্বন্ধে আলোচনা শুরু করলেন, ‘প্রথম চা বাগান মালনিছড়ার পরপর এই বাগান সৃজন করা হয়। এর আয়তন ২০০০ হেক্টর। এর মধ্যে ১০০০ হেক্টর চা বাগান, বাকীটুকু রাবার বাগান, গলফ্ মাঠ, ফরেষ্ট বাংলো, লেবার কোয়াটার, স্টাফ কোয়াটার, হাসপাতাল ফ্যাক্টরী গুদাম ও অফিস, আর এই বাগানের পারমেনেন্ট শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ এবং অস্থায়ী শ্রমিক আরও দুই হাজার। মোট ১৫,০০০ হাজার লোকের বসবাস। বাগান পরিচালার সুবিধার্থে এই ওসমাননগর চা বাগানকে চারটি ডিভিশনে ভাগ করা হয়েছে। ওসমাননগর মেইন গার্ডেন, ফুলছড়ি, জাগহাটি, ডাবছড়া। এই চারটি ডিভিশনে চারজন ছোট সাহেব আছে। আর সব মিলিয়ে একজন বড় সাহেব আছেন। তাছাড়া ডাক্তার সাহেব, ইজ্ঞিনিয়ার সাহেবতো আছেন। সপ্তাহিক বৃহস্পতিবার লেবার পেমেন্ট দেওয়া হয়। সব ডিভিশনে সাহেব বাবু ও শ্রমিক আছে। এই নিয়ে ওসমান নগর চা বাগান।’
মুুনমুন সব নোট করলো।
হেমন্তবাবু বললো,‘মা আমি এখন আসি।’
‘হ্যাঁ, কাকাবাবু আপনি এখন আসুন।’ বলে সে নির্মল ড্রাইভারকে ডাকলো। তারপর হেমন্তবাবুর হাতে ধরে বললো,‘কাকাবাবু আপনি যখন আমাকে মা বলে ডাকেন তখন আমার বাবার কথা মনে পড়ে যায়। ঠিক এমনিভাবে বাবা আমাকে মা বলে ডাকতেন, আসলে আপনি আমার কাকাবাবু না, আপনি আমার বাবা।’
এই কথা বলে মুনমুন হেমন্তবাবুকে ধরে কাঁদতে লাগলো। তারপর হেমন্তবাবু মুনমুনের মাথায় হাত দিয়ে বললো,‘হ্যাঁ মা আমি তোমার বাবা, তুমি আমার মেয়ে।’
দেখতে দেখতে দুই বৎসর কেটে গেল। মুনমুনের বিদায়ের সময় হল, যাওয়ার আগে মুনমুন দিবা ও আসাদকে বললো, ‘আমি আগামী মাসের ১৫ তারিখে চলে যাচ্ছি। যাওয়ার আগে আমার একটু ইচ্ছা তোমাদেরকে নিয়ে পুরো সিলেট ডিস্ট্রিক ঘুরবো। দর্শনীয় স্থানগুলো দেখবো।’
পরদিন মুনমুন আসাদ ও দিবাকে নিয়ে সিলেট ড্রিস্ট্রিক ভ্রমনে বের হলো। প্রথমে তারা মাজার জিয়ারত দিয়ে ভ্রমন শুরু করলো। এরপর একে একে মাধবকুন্ডের ঝরনা, হাকালুকি হাওর, হাম্হাম্ ঝরনা, সিলেট শহর, হাসান রাজার বাড়ী, বিছানা কান্দি, মুনমুনের পৈত্রিক নিবাস, শ্রীমঙ্গল ফরেষ্ট প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ করলো। এতে প্রায় সপ্তাহ খানেক কেটে গেল।
শেষ মূহুর্তে হেমন্তবাবুকে নিয়ে গবেষনার কাজ নিয়ে আবার বসলেন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আবার পর্যালোচনা করলো।

আজ মুনমুনের বিদায়ের দিন। সিলেট এয়ারপোর্টে দিবা ও আসাদ তাকে বিদায় জানাতে এসেছে। গতকাল বড় সাহেব, ছোট সাহেব, সব বাবু, হেমন্তবাবু ও বাগানের শ্রমিকরা তাকে বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছে। তার ব্যাক্তিগত গাড়ীখানা কোম্পানীর হাসপাতালে দান করলো। রোগী বহনের জন্য। মুনমুন, দিবা ও আসাদ থেকে বিদায় নিয়ে ইমিগ্রেশনে ঢুকলো। সবাই একে অপরকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। মুনমুনকে বিদায় দেওয়ার পর আসাদÑদিবা গাড়ী করে বাগানে ফিরছে।
দিবা বললো, ‘এই যে মিষ্টার, এভাবে আর কতদিন?’
আসাদ হেসে বললো,‘যতদিন চলে আর কি।’
‘না- তা হবে না।’
বলতে বলতে দিবা আসাদের বুকে মাথা রাখলো এবং ঘুমিয়ে পড়লো।

অনেকদিন পর আসাদ আবার টিলার কাজে ভালো করে মনোযোগ দিল। আগের মত রুটিন মাফিক টিলার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো। বছর খানেক কেটে গেল একদিন কাজ সেরে সন্ধ্যা বেলায় যখন বাসায় এলো, তার কাজের লোক সীতারাম তাকে একটা খাম দিল, আসাদ খাম খুলে দেখলো, মাল্টিন্যাশনাল টী কোম্পানি
“হাডসন ব্রাদার্সের” চট্রগ্রামের চা বাগানে ডেপুটি ম্যানেজার ইনচার্জ হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য সে এর আগে ইন্টারভিউ দিয়েছিল। আসাদ আনন্দে আতœহারা হয়ে গেল। সাথে সাথে দিবাকে ফোন করলো। শুনে দিবা তার বাসায় ছুটে এলো। আনন্দে আসাদ দিবাকে জড়িয়ে ধরলো। দিবা বললো,
‘কবে আমাকে বাংলোয় উঠাবে?’
‘আগে সব গোছগাছ করি নেই, তারপর।’
‘চা বাগানের বড় সাহেব হয়ে আমাকে ভুলে যাবে না তো?’
‘না দিবা তোমাকে কখনও ভুলবো না।’
পরক্ষনে দিবা মন খারাপ করে বললো,‘চট্রগ্রাম চলে গেলে তোমাকে তো আর দেখতে পারবো না।’
আসাদ বললো,‘পারবে, পারবে।’
‘কিভাবে?’
‘ভিডিও কল দেবো, তাতেই আমরা একে অপরকে দেখতে পারবো।’
আসাদ দিবাসহ হেমন্তবাবুর কাছে এলো এবং হেমন্তবাবু ও ফাগুনীকে পায়ে ধরে সালাম করে, নতুন চাকুরীর খবরটা জানালো। শুনে হেমন্তবাবু খুশিতে আসাদকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
হেমন্তবাবু বললো,‘আমি জানতাম তুমি একদিন বড় হবে। তোমার মধ্যে সে প্রতিভা আছে।’ তারপর হেমন্তবাবু সুরিসর্দারকে বললো, ‘সুরি, তুমি এখনই বাগানের সকলকে খবরটা জানিয়ে দাও।’
সুরি সর্দার বাসা থেকে বের হয়ে সবাইকে জানিয়ে দিল।
এদিকে হেমন্তবাবু নিজেই ফোন করে যতীন বাবু, ওলিবাবু ও বড় সাহেবকে আসাদের এই খবর জানিয়ে দিল। বড় সাহেব শুনে খুব খুশি হলো । আসাদকে ফোনে বারবার ধন্যবাদ জানালো এবং বললো, তাড়াতাড়ি জয়েন্ট করার জন্য।
আসাদ ও হেমন্তবাবুকে তাঁর বাংলোয় আমন্ত্রন জানালেন। এদিকে খবর পেয়ে ওলিবাবু, যতীনবাবুুসহ বাগানের সবাই তার বাসায় এলো।
আজ ওসমান নগরে আসাদের শেষ দিন। অবশ্য কয়েকদিন আগে সে রিজিক্নেশন সাবমিট করেছে। বড় সাহেব তাকে তাড়াতাড়ি জয়েন্ট করতে বলেছেন এবং বলেছেন যে, “হাডসন ব্রাদার্স গ্রæপ” কোম্পানীতে তার অনেক ফ্রেন্ড আছে। তাদেরকে আসাদের কথা বলে দেবেন, যেন বিভিন্ন কাজে তাকে সহায়তা করে।

রাত দশটায় ট্রেন। দিবা, রাত্রি,ফাগুনি, সোমা, সুরি সর্দার তার ব্যাগ কাপড় চোপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। রাতের খাওয়া শেষে রাত ৯টার দিকে মাইক্রোবাস নিয়ে হেমন্তবাবু, দিবা,রাত্রি,ওলিবাবু আসাদকে বিদায় জানাতে রেল ষ্টেশনে এলো। ট্রেন আসতে এখনও আধঘন্টা বাকী আছে। দিবার মনটা খুব খারাপ।
সে আসাদকে বলছে,‘সব সময় ফোন দিও।’
হেমন্ত বাবু, ওলিবাবু, আসাদকে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। একটু পরেই ট্রেন এলো। আসাদ ট্রেনে উঠলো এবং জানালার পাশের সীটে বসলো। দিবা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আসাদের সাথে কথা বলছে। ট্রেন ছাড়লো এবং আস্তে আস্তে চলতে লাগলো। দিবা বললো,‘বাৎসরিক ছুটিতে এসে আমাকে নিয়ে যাবে, আমি তোমার প্রতীক্ষায় রইলাম।’
আসাদ বললো,‘ছুটিতে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো’।
আসাদ হাত নেড়ে সবাইকে বিদায় জানালো।
দিবা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।

প্রতিদিন সূর্য উঠে। সূর্যের আলোয় আলোকিত হয় দিন। শ্রমিকরা কাজ করে বাগানে। চলে পূজা পার্বন, আনন্দ উৎসব, দূরদূরান্ত থেকে কেউ আসে কাজের সন্ধানে, কেউ আসে ব্যবসার খোঁজে। সূর্য্যরে আলো পড়ে ছায়াবৃক্ষের উপর। ছায়াবৃক্ষ তার ছায়া দিয়ে, পরমযতেœ আগলিয়ে রাখে ছোট চা গাছগুলোকে। এই ধারা চলে, গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, শীত বসন্ত এবং অনন্তকাল ধরে। এই নিয়ে ‘ছায়া বৃক্ষের দিবারাত্রি’।

ছায়া বৃক্ষের দিবা রাত্রি-২ এর কাহিনী সংক্ষেপ
এই সিরিজে মুভিজ নায়ক, রাত্রি নায়িকা, মুভিজ সবে মাত্র নৌ ক্যাডেট অফিসার হিসাবে চট্টগ্রামে যোগ দিয়েছে। রাত্রি চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে পড়ে। আসাদ চা বাগানে নতুন চাকুরী পেয়ে, চট্টগ্রামের উদানিয়া চা বাগানে বড় সাহেব হিসাবে জয়েন্ট করেছে। আর দিবা,- থাক দিবার কথা অসামাপ্ত রাখলাম। তার কথা জানতে পরবর্তী বই ছায়া বৃক্ষের দিবা রাত্রি-২ বইটি পড়ার অনুরোথ রইলো। হ্যাঁ পাঠকবৃন্দ, আমাদের পরবর্তী স্পট, চা বাগান, পাহাড়, নদী, সাগর পরিবেশষ্টিত সমুদ্র কন্যা চট্টগ্রামকে নিয়ে। পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।

 

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office