সারাদেশ ডেস্ক | শনিবার, ১২ নভেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট | ৮১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহীত ছবি
সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় মাসে ১৫ টাকা দরে ৩০ কেজি চাল পান আব্দুল হাকিম। যা দিয়ে ১০ দিন চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। বাকি ২০ দিনের অনেক সময় চুলাই জ্বলে না পেশায় দিনমজুর হাকিমের ঘরে। কষ্টেসৃষ্টে বছরের পাঁচ মাস এমন করে চললেও বাকি সাত মাস আরও দুর্বিষহ যায় তাঁর।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের মক্কেল মণ্ডলের ছেলে হাকিম। দিনে প্রায় তিন কেজি চাল লাগে তাঁর ঘরে। ন্যায্যমূল্যে (ফেয়ার প্রাইস কার্ড) ১৫ টাকা কেজি করে এখন চাল কিনতে হচ্ছে তাঁকে, যা কিছুদিন আগেও ছিল ১০ টাকা করে। এক ছেলে, দুই মেয়ে আর স্বামী-স্ত্রীর সংসার চালাতে দিনে ৩০০-৩৫০ টাকা দরকার। অথচ অন্যের জমিতে কাজ করে জোটে দৈনিক ২০০-২৫০ টাকা। তাও পুরো মাস কাজ থাকে না।
আব্দুল হাকিম বলেন, ‘পরের ক্ষেতে কাম করে যা রোজগার হয়, তা দিয়ে বউ আর পোলা-মাইয়া নিয়া খুব কষ্টে দিন চলে। পোলা-মাইয়া নিয়া দিনকে দিন না খায়্যাই থাকতে হয়। এই চালও আবার ভর বছর কপালে জোটে না। বছরে পাঁচ মাস দেওয়া হয়। বাকি সাত মাস ক্যামনে চলুম?’
একই অবস্থা শহরের আদিবাসী পাড়ার বাসনা রানীর। সোমবার সকালে খোলাবাজারে ওএমএসের চাল নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেখানে বাসনা রানী বলেন, স্বামী অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। তিনি গ্রামের খাল-বিল থেকে মাছ ধরে, ধান কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ৯ সদস্যের সংসারে দিনে প্রায় পাঁচ কেজি চাল লাগে। বাজারে চালের দাম বেশি। তা কেনার সামর্থ্য নেই। তাই ওএমএসের লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
বছরের এক মাসই এই চাল পান বাসনা। যে কারণে ওই সময় প্রতিদিন ভোরে এসে পাঁচ কেজি করে চাল কেনেন। যা জমিয়ে যত বেশি দিন সম্ভব খান। নানা সময় মানুষের সাহায্যও নিতে হয়। ভোরে এসে লাইনে না দাঁড়ালে এই চালও কপালে জোটে না বলে জানান তিনি।
উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে ১০ টাকা কেজি দরের চাল দেওয়া হয় হতদরিদ্রদের। উপজেলার আটটি ইউনিয়নে ১৬ জন ডিলারের মাধ্যমে ৪ হাজার ৮৭০ জনকে দেওয়া হয় এ চাল। এ ছাড়া খোলাবাজারে পৌরসভা এলাকার পাঁচটি পয়েন্টে আরও ৬০০ জনকে দেওয়া হয় ৩০ টাকা দরের পাঁচ কেজি করে চাল।
ফেয়ার প্রাইস কার্ডের চাল দেওয়া হয় মার্চ ও এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে। খোলাবাজারে ওএমএসের মাধ্যমে দু-তিন মাস চাল বিক্রি করা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, অর্থনীতিতে কৃষির ওপর নির্ভরশীল ঝিনাইদহ জেলা। এখানে দারিদ্র্যের হার ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। উপজেলাভিত্তিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর সঠিক তথ্য নেই। তবে জেলার হারের সমান হতে পারে বলে পরিসংখ্যান দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
২২৭ দশমিক ১৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় শিক্ষার হার ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ। জনসংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৪৯১ জন। সে হিসাবে উপজেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ৭১০। অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ১৯০।
শহরের একতাঁরা মোড় এলাকার ওএমএস ডিলার তারিকুজ্জামান বলেন, আগে ডিলাররা দিনে ২৪০ জনের কাছে পাঁচ কেজি করে চাল বিক্রি করতেন। এখন অর্ধেক কমিয়ে দেওয়ায় ভোর থেকেই মানুষ চাল কিনতে ভিড় করে।
তারিক আরও বলেন, ‘প্রতিদিন আমার এখানে ৪০০-৫০০ মানুষ চাল নিতে আসে। কিন্তু বরাদ্দ কম হওয়ায় যারা আগে আসে, তাদের চাল দিই। বাকিরা চাল না পেয়ে ফিরে যায়।’
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইসরাত জাহান বলেন, ফেয়ার প্রাইস কার্ডে চাল দেওয়া ছাড়াও পৌরসভার পাঁচটি স্থানে প্রতিদিন ৬০০ মানুষকে পাঁচ কেজি করে খোলাবাজারে ৩০ টাকা দরে চাল দেওয়া হয়। সপ্তাহখানেক আগে অধিদপ্তর থেকে এই সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেকে আনা হয়েছে।
দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, এসব কর্মসূচির ফলে কিছু মানুষ উপকৃত হচ্ছে। তবে তা একবারেই কম। আরও বেশি মানুষকে এর আওতায় আনা উচিত।
ইউএনও সুস্মিতা সাহা বলেন, ‘এসব কর্মসূচিতে আরও বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’