সারাদেশ ডেস্ক | রবিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২২ | প্রিন্ট | ৯৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহিত ছবি
তিনশ’ টাকা মজুরির দাবিতে টানা ১৫ দিন কর্মবিরতিতে ছিলেন চা-শ্রমিকরা। এরপর আরও চারদিন চা-শ্রমিকরা অনিয়মিত কাজ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে অচল হয়ে পড়েছিল চা বাগান। কিন্তু শনিবার প্রধানমন্ত্রী ১২০ টাকার স্থলে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭০ টাকা দৈনিক মজুরি ঘোষণা করায় চা-শ্রমিকরা গতকাল রাতেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন। রোববার বন্ধের দিনেও উৎসব আমেজে নতুন মজুরিতে মৌলভীবাজারের ৯২টিসহ সারাদেশের ১৬৭টি চা-বাগানে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। এতে সরব হয়ে ওঠেছে চা-বাগানের পরিবেশ।
জানা যায়, সারাদেশের প্রায় দেড় লাখ চা-শ্রমিক তিনশ’ টাকা মজুরি দাবিতে গত ৯-১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি বাগানে দু’ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন। এতে চা বাগান মালিকপক্ষের টনক না নড়লে ১৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিকরা। এর মধ্যে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ১৬-২১ আগস্ট পর্যন্ত ৪ দফা চা-বাগান মালিকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বৈঠক হয়েছে। তাতে চা বাগানের অচলাবস্থা কাটেনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসানের উদ্যোগে চা-শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে ২১ আগস্ট রাতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ডাকা হয়। সেখানে বৈঠকের একটি সিদ্ধান্ত ছিল- খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মজুরি সংক্রান্ত বিষয়ে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলবেন। এরপর শনিবার বিকেল সোয়া ৪টায় গণভবনে চা-বাগান মালিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। চা-বাগান মালিক অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহ আল আলম এর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি টিম ওই বৈঠকে যোগ দেন। এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী চা-শ্রমিকদের মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করেন। একই সঙ্গে বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।
এ দিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গল মৌলভীবাজার জেলার সব ক’টি চা বাগানে আনন্দ উৎসব শুরু হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ কন্দ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরাসহ শ্রমিক নেতারা বাগানের প্রত্যেক পঞ্চায়েত ও ভ্যালি কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোববার বন্ধের দিনেও কাজে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী মৌলভীবাজারের রাজনগর, লুয়াইউনি-হলিছড়া, ইটা, উদনা, উত্তরভাগ, করিমপুরসহ বেশিরভাগ চা বাগানে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন।
রোববার সকাল থেকে রাজনগর চা বাগানে কাজে যোগ দেওয়া রিপা পাশি (৩৫) স্কুলে পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে চাপাতা তুলছেন। তিনি বলেন, ‘১২০ টাকার সঙ্গে ৫০ টাকা যোগ করে ১৭০ টাকা মজুরি করা হয়েছে। বর্তমানে তেল, চাল, কেরোসিন, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারমূল্য অনুযায়ী এ মজুরি একেবারে নগণ্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমাদের মজুরি ঠিক করে দেওয়ায় আমরা মেনে নিয়েছি।’
একই বাগানের চা-শ্রমিক বিদ্যাবতী পাশী (৬৫) বলেন, ‘চা-শ্রমিকদের চেহারার দিকে তাকালে যে কেউ বলতে পারে আমরা কতটুকু ভালা আছি।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবদার জানিয়ে বলেন, ‘আগামীতে আমাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে মজুরি নির্ধারণের দাবি জানাই।’ তিনি আরও বলেন, ১৫-১৬ দিন ধরে ধর্মঘটের কারণে পাতা না তোলায় একবারে অনেক পাতা তুলতে করতে পারছেন তারা।
আরও কয়েকজন চা-শ্রমিক বলেন, বাগানে পাতা বেশি থাকায় তারা প্রত্যেকে এক থেকে সর্বোচ্চ দেড়শ কেজি পাতা তুলতে পারবেন। শ্রম আইন অনুযায়ী- তাদের প্রত্যেককে ২৩ কেজি পাতা তুলতে হবে। এরপর অতিরিক্ত যা পাতা তুলবেন তার প্রতি কেজি ৪.১০ টাকা করে পাবেন।
শ্রীমঙ্গল ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৭০ টাকা নয়, ১২০ টাকা মজুরি ঠিক রাখলেও আমরা কাজে যোগ দিতাম। আমরা শুধু অপেক্ষায় ছিলাম প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে মজুরি শুনব বলে। শনিবার তিনি ঘোষণা দেওয়ার পর আমরা কাজে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সব বাগানে জানিয়ে দিয়েছি।’
চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী চা-বাগান মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ১৭০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এতে আমরা খুশি। আমরা দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ৫০ টাকা বাড়াতে পারতাম না। ইতোপূর্বে দুই বছর পরপর ৫-১৮-২০ টাকার বেশি বাড়ানো যায়নি। এখন প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণে সম্ভব হয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’