অনলাইন ডেস্ক: | মঙ্গলবার, ০৫ এপ্রিল ২০২২ | প্রিন্ট | ৩২৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঠাকুরগাঁও শহরের শহীদ তিতুমীর সড়কের পাশে ‘সহায়’ নামে বাজারে সুলভ মূল্যে মিলছে নিত্যপণ্য।
নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে যেখানে গরিব–অসহায় মানুষের দিন কাটছে কায়ক্লেশে, সেখানে ঠাকুরগাঁও শহরের ওই সব মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি বয়ে এনেছে তরুণদের একটি উদ্যোগ। ‘সহায়’ নামে একটি সুলভ মূল্যের বাজার স্থাপন করেছেন তাঁরা। সামর্থ্যবানদের সহায়তায় সেখানে প্রত্যাশার চেয়ে কম মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে। বাজারটির স্লোগান, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা দেবেন আর দুস্থরা নেবেন’।
পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ‘সহায়’ নামের বাজারটি খোলা হয়েছে। বাজারদরের চেয়ে এই দোকানে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ছাড়ে নিত্যপণ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই বাজারে রোজাদাররা ইফতারও পাচ্ছেন। ইফতারের জন্য কোনো দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, শহীদ তিতুমীর সড়কের পাশে কাঠের টেবিল ফেলে চলছে ভর্তুকির দোকান। টেবিলে সাজানো চাল, ডাল, চিনি, লবণ, আলু, ডিম, সয়াবিন তেল, সাবান, তরকারিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য। মানুষ সেখানে সারি বেঁধে পছন্দের পণ্য কিনে বাড়িতে ফিরছেন।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুনে মাসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ফেসবুকে একটি গ্রুপ গড়ে তোলেন। কোনো কিছু না ভেবেই তাঁরা এই গ্রুপের নাম দেন ‘জুলুম বস্তি’। শুরুতে রক্তদান কর্মসূচির মধ্যে এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে এর পরিধি বাড়ে। দুর্যোগে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, শীতবস্ত্র বিতরণ, অসহায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের গৃহশিক্ষকতার কাজ সংগ্রহ করে দেওয়া, বই কেনায় সহায়তাসহ নানা সামাজিক কার্যক্রমেও তাঁরা যুক্ত হন।
করোনাকালে ওই তরুণ-যুবকেরাই দুস্থ-অসহায়দের জন্য ভর্তুকির দোকান খুলে বসেন। দোকান থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ চাল, ডাল, চিনি, লবণ, আলু, ডিম, সয়াবিন তেল, মসলা, সাবান, তরকারিসহ বিভিন্ন পণ্য কিনে নেন। যাঁদের সেই সামর্থ্যও নেই, তাঁরা সেখানে বিনা পয়সায় পেতেন তরকারি। আর ঈদের সময় সংগঠনটি আয়োজন করে ‘পাঁচ টাকায় ঈদ বাজার’ নামে একটি উদ্যোগ।
পরে ফেসবুকের ওই গ্রুপ সংগঠন হিসেবে রূপ নেয়। এর নাম দেওয়া হয় ‘সহায়’। রমজান মাস উপলক্ষে নিজেদের তহবিল দিয়ে সুলভ মূল্যের যে দোকান স্থাপন করা হয়েছে, সেটির নামও দেওয়া হয়েছে সংগঠনটির নামে। দোকানটিকে তাঁরা বলছে ‘সহায় বাজার’।
সামান্য কিছু টাকা নিয়ে চাল-ডাল কিনতে বাজারে এসেছিলেন টিকিয়াপাড়া মহল্লার এক নারী। ভর্তুকির দোকান থেকে কিছু পণ্য কিনে নেন তিনি। ওই নারী বললেন, ‘বাজারে সব জিনিসের দামই চড়া। ভর্তুকির এমন দোকান পেয়ে আমার উপকার হলো।’
ওই নারী আরও বলেন, বাজারে ৫০০ মিলিলিটার সয়াবিন তেলের দাম ৮০ টাকা, আর এখানে পাওয়া যাচ্ছে ৫৬ টাকায়। ৪০ টাকার চাল পাওয়া যায় ২৮ টাকায়, ৬০ টাকার ডাল পাওয়া যায় ৪২ টাকায়। এ ছাড়া ৫০০ গ্রাম চিনি ৩২ টাকায়, পেঁয়াজ ১৭ টাকায়, লবণ ১০ টাকায়, প্রতি হালি ডিম ২৫ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়।
ভর্তুকির বাজার থেকে পণ্য কিনে বাড়িতে ফেরার পথে উম্মে হাবিবা নামের এক নারী বলেন, ‘বাজারে যাচ্ছিলাম। পথে এই দোকান পেয়ে কম দামে ডাল, তেল, চিনি, ডিম কিনলাম। সঙ্গে টাকা ছাড়া সবজিও পেলাম। বাজার থেকে এসব জিনিস কিনতে গেলে ৯০ থেকে ১০০ টাকা বেশি লাগত। খুব খুশি হয়েছি। যাঁরা আমার মতো গরিবদের কথা ভেবে এই দোকান খুলেছেন, তাঁদের জন্য দোয়া করি।’
সহায়ের সভাপতি সুজন খান বলেন, সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা দেবেন আর দুস্থরা নেবেন—এই ভাবনা নিয়েই তাঁদের উদ্যোগ চলছে। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন এখান থেকে পণ্য কিনছেন। এতে পাঁচ হাজার টাকার ওপরে ভর্তুকি যাচ্ছে। সহায়তা পেলে শুধু রমজান পর্যন্ত নয়, বছরব্যাপী এই উদ্যোগ চালু রাখা যাবে।
এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এই মানবিক বাজার আমরা চালু রাখতে চাই। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ ভীষণ উপকৃত হবে। আমরা এই উদ্যোগের পাশে আছি। পাশাপাশি অসহায় মানুষের জন্য সহায় বাজারের পাশে এসে দাঁড়াতে সামর্থ্যবানদের আহ্বান জানাই।’