বৃহস্পতিবার ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ৮ দফা প্রস্তাব ডিবিএর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অস্থিরতা পুরো ব্যাংক খাতে প্রভাব ফেলতে পারে : মাসরুর আরেফিন বিদেশি বিনিয়োগ আনলে ১.৫ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি : বাণিজ্যমন্ত্রী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্পটে বড় পর্দায় দেখানো হবে বিশ্বকাপ ফুটবল: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ভ্যাট ট্যাক্সসহ ৬৩ কোটি টাকায় বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছে বিটিভি : তথ্য প্রতিমন্ত্রী অনার্স কোর্স থেকে বাংলা ও ইতিহাস বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই: শিক্ষামন্ত্রী আগামী বাজেটে স্টার্ট-আপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাশিয়ায় এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব সাউথইস্ট ব্যাংকের মতিঝিল শাখা (ইসলামিক ব্যাংকিং) নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত
Advertise with us

স্বাধীনতা # বর্ণালী মিত্র’র গল্প

  |   বৃহস্পতিবার, ২৭ মে ২০২১   |   প্রিন্ট   |   ৮৯১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

Default Image

স্বাধীনতা
বর্ণালী মিত্র

আজ ৮ই মার্চ । প্রায় তিনবছর পর এমন এক বসন্ত দুপুরে অকারনেই বাড়ি থেকে বেরোলো শিপ্রা। দীর্ঘদিন পর অনভ্যস্ত পায়ের বেয়াদবি কে পাত্তা না দিয়ে যতটা সম্ভব তৃণার পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করছে শিপ্রা । বাচ্চা মেয়ের মতো তাকে আগলে নিয়ে যেতে যেতে কখনো কখনো মৃদু বকুনি দিচ্ছে তৃণা , “আহ কি যে করো না দেখে হাঁটো , এক্ষুনি তো পড়তে মুখ থুবড়ে “। আবার কখনো নিজেই কিশোরীর চপলতায় আঙুল তুলে দেখাচ্ছে “দেখো দেখো শিমুল গাছটা কেমন ফুলে ফুলে ঢেকে আছে দেখো “। শিপ্রা অবশ্য আজ সবকিছুই ভীষন উপভোগ করছে রাস্তার ভীড়ভাট্টা , ধূলোধোঁয়া থেকে শিমুল সবই । যেন তার নবজন্ম হয়েছে । যেন এসব আগে কখনো এভাবে দেখেই নি । সব কেমন নতুন ,কেমন আনকোরা । তৃণা তার দ্বিতীয় এই জন্মের জন্মদাত্রী । তৃণার মানসিক শুশ্রূষায় , তৃণার প্রশ্রয়ে , তৃণার আগ্রহে আজ যেন শিপ্রা নিজেকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করেছে। মেয়েটার ওপর তার কৃতজ্ঞতার সীমাপরিসীমা নেই । কে বলে শাশুড়ি আর বৌমার সম্পর্কে শুধুই ঈর্ষা , শুধু ই রেষারেষির বিষ থাকে ?? তৃণা তাকে যে ভাবে চিনেছে এই ক বছরেই , শিপ্রা কি নিজেকেই নিজে সেভাবে চিনতে পেরেছে আগে কখনো ?? শুধু কি চেনাই ??তৃণা তো তার চিন্তা ভাবনার ধারাটাই পাল্টে দিয়েছে পুরোপুরি ‌ ।

এভাবে তাকে নিয়ে বেরোতে দেখে ঋভু ভারী রাগারাগি করছিলো তৃণার ওপর । বলছিলো “আরে বাবা, মাকে নিয়ে বেরোবে এ তো খুব ভালো কথা কিন্তু বাড়ির গাড়িটা কি দোষ করলো শুনি ?? যে মানুষটা দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে পা পর্যন্ত দেয় নি তাকে নিয়ে এভাবে বেরিয়ে তুমি কিন্তু ভীষন রিস্ক নিচ্ছো তৃণা । মার কি তোমার মতো ট্রামে বাসে অফিস যাওয়ার অভ্যাস আছে নাকি ??এখন তো খুব উৎসাহ নিয়ে বেরোচ্ছেন কিন্তু এখুনি ক্লান্ত হয়ে যাবেন । পায়েও তো বেশ ব্যথা । নামেই তো বসন্ত , বেশ গরম পড়েছে দিন কয়েক ধরে । একেবারে ইনটলারেবল্” । তৃণা হেসে বলেছিলো “আরে বস্ আমার ওপর ভরসা রাখো ।না পারলে আ্যপ ক্যাব তো আছেই এতো টেন্সড হও কেনো বলতো তুমি সবসময় । আরে মানুষ টার ইচ্ছে অনিচ্ছে টার কথা তোমরা তো একবারও ভাবো না । সবসময় তোমাদের ইচ্ছে অনিচ্ছে ওঁর ওপর চাপিয়ে দিয়ে জোর করে এতোদিন ধরে দেবী বানিয়ে রেখে দিয়েছো । একটু মানুষ টাকে মানুষের মতো বাঁচতে তো দাও বাকি কয়েকটা দিন ।”

তৃণার কথা বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিলো যে হেসে ফেললো ঋভু । শুধুই কি হাসলো ?? ভেতরে ভেতরে একটু কুঁকড়ে কি গেলো না ?? ছোট থেকেই তো ঋভু দেখে এসেছে সবাইকে খুশি করতে গিয়ে মা কি অবলীলায় নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে গুলো বিসর্জন দিয়েছে । না কি জোর করে ইচ্ছে অনিচ্ছে গুলোর গলা টিপে মারা হয়েছে ?? ঠাকুমা , জেঠিমা , জেঠু , বাবা আত্মীয় স্বজন সবার কাছে মা ভীষন ভালো বউ , লক্ষ্মীবউ । সাতচড়ে রা না কাড়া , অপরকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে গুলোকে গলাটিপে মেরে সবার বাধ্য , অনুগত একটা মেয়ে । তবে শুধুইকি সুনাম ই পেত মা নিজেকে এভাবে বঞ্চিত করে করে ?ছোট বেলার কিছু কিছু ছবি তো আজ ও মনে আছে ঋভুর । হয়তো কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে যখন বাড়ি ভর্তি লোকজন তখন পিসিরা বা অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও তো অনেককেই মায়ের পিছনে মুখ বেঁকিয়ে বলতে শুনেছে ছোট বৌয়ের খুব নাম কেনার শখ । তাই সবসময় মুখে হাসি ঝুলিয়ে যত না কাজ করে তার থেকেও বেশি দেখনদারী করে বেড়ায় । জেঠিমা মুখে একটা পান ঠেসে বড় বড় চোখ করে বলেছিলেন ” ওর ওই দৌড়াদৌড়িই সার । কোনকিছু ডিসিশন নেবার ক্ষমতা তো নেই । শুধুই ওই আসছি দিদি , যাচ্ছি মার ব্যস্ততা । “জেঠিমার বলার ধরনে সেই আসরে হাসির একটা হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল । সেদিন ঋভুর ভীষন কষ্ট হয়েছিলো মার জন্য ‌, আর ভীষন রাগ ওদের ওপর । মনে হয়েছিলো খেলনা ওই বন্দুকটা দিয়ে জেঠিমাকে গুলি করে দেয় ।

আস্তে আস্তে ওখান থেকে সরে গিয়ে ঋভু রান্না ঘরে জড়িয়ে ধরেছিলো মা কে । মার ফরসা সুন্দর মুখটা তখন ঘামে ভেজা , ধেবড়ে গেছে সিঁদুরের টিপ । মায়ের শাড়ির আঁচলে হলুদের ছোপ । মা ব্যস্ত , মা পরিশ্রান্ত । ঋভু মাকে জোর করে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল ওই ঘরে যেখানে জেঠিমা ,পিসি ও আরো সবাই বসে গল্প করছিলো সেখানে । ছোট্ট ঋভুর পৌরুষ সেদিন গর্জে উঠেছিলো বাঘের মতো , বলেছিলো ” কেনো তুমি এখানে একাএকা কাজ করছো রান্না ঘরে ?? চলো ওদের সাথে বসে তুমিও গল্প করবে। চলো না ।” মার ওই ঘামে ভেজা মুখটা সেদিন ঋভুর ওই পাগলামী তে খুশিখুশি গর্জন তেল মাখা দেবী প্রতিমার মতো হয়ে গিয়েছিলো । ঋভুকে আদর করে বলেছিলো “পাগল ছেলে কোথাকার । সবাই বসে বসে গল্প করলে কাজ গুলো কে করবে শুনি ?? কাউকে না কাউকে তো করতেই হবে । আর ওরা তো আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে ওরা আমাদের অতিথি । ওদের যত্ন করা তো আমাদের কর্তব্য ঋভু । “কিন্তু ওই মন ভোলানো কথায় ঋভুর আট বছরের পৌরুষ হার মানেনি ।পাল্টা যুক্তি সাজিয়ে বলেছিলো , জেঠিমা তো এই বাড়িতেই থাকে ।তবে জেঠিমা কেনো ওখানে বসে গল্প করছে ?? তুমি বোকা , তুমি বোকা তুমি কিচ্ছু জানো না , তোমাকে নিয়ে ওরা হাসাহাসি করছে । আমি ওদের গুলি করে দেবো ।

শিউড়ে উঠেছিল শিপ্রা ঋভুর কথায় । বলেছিলো ছি ছি ঋভু তোমাকে আমি এই শিক্ষা দিয়েছি ? বড়দের সম্পর্কে এভাবে কথা‌ বলতে হয় ?? আর আমার কাজ আমি বুঝবো । তুমি যাও খেলা করো গিয়ে । কিন্তু সেই ছোট্ট ঋভু ও কি বড় হবার সাথে সাথে মাকে সত্যিই স্বাধীনতার স্বাদ দিতে পেরেছে ? না দিতে চেয়েছে ? তখন তো মা দু একদিনের জন্যও কোথাও যেতে চাইলেও বাবা ঠাকুমার গতে মা কে কি বলে নি তুমি চলে গেলে কি করে হবে মা ?? আমার তো পরশু থেকে এক্সাম। মা ফ্যাকাসে হেসে বলতো বাড়িতে থাকলে তো তোর মা’র কথা মনেই পড়ে না ঋভু । কোথাও দুদিনের জন্য যাবো বললেই এভাবে বাধা দিস কেনো ?? তখন ঋভু মাকে জড়িয়ে ধরে বলতো তুমি না থাকলে ভালো লাগে না । দাঁড়াও না আগে একটা ভালো চাকরি পেয়ে নিই তখন তোমাকে নিয়ে তুমি যেখানে বলবে সেখানেই যাবো । মার সুন্দর বড় বড় চোখগুলো তখন চকচক করতো অলীক সেই ভবিষ্যত খুশিতে । আর বাবা তো কখনো কোনদিন মা কে আলাদা করে মানুষের মর্যাদাই দেয় নি । বাবার কাছে মা ছিলো ঘর সংসারের ই একটা পার্ট ।মার যে আলাদা কোন অস্বিত্ব আছে ,মার ও যে কিছু চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে বাবা সেটা কখনোই স্বীকার করতো না ।

ঠাকুমা মারা যাবার পর যখন জেঠিমা সংসারের কর্ত্রী । তিনি তাঁর ভালোলাগা মন্দলাগা , ইচ্ছে,অনিচ্ছে সদর্পে ঘোষণা করলেও মার বেলায় নির্দ্বিধায় বলতেন আমার বয়স হচ্ছে আর শখ আহ্লাদ পুরনের সময় কখোন পাবো এখন না করলে ? তোদের তো এখন ই বয়স সংসার করার । মা তাতেই রাজি , মা তাই মেনে নিতো । কখনো কোনদিন পাল্টা প্রশ্ন করে নি তোমার সাথে আমার বয়সের কত ডিফারেন্স দিদিভাই ? আমার কবে বয়স হবে ?কবে আমিও আমার শখ আহ্লাদ গুলো পুরন করতে পারবো ??

তারপর তো বাবা হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন । নাহ তার আগে অবশ্য ঋভু চাকরি পেয়ে‌ গেছে । তৃণার সাথে আলাপ তো ওই অফিসেই ।তৃণা ওর সহকর্মী ছিলো , বছর খানেকের ছোট ওর থেকে । দুজনের আলাপের বছর দুয়েক গড়াতে না গড়াতেই দুজনে সেটল হবার কথা ভেবেছে । চাকরি পেয়ে ঋভু অন্তত বার পাঁচেক কাছে ,দূরে বেড়াতে গেছে ।সবই অবশ্য বন্ধু বান্ধব দের সঙ্গে । শেষবার তৃণার সাথেই । বিয়ে যখন করবেই তখন আর আপত্তি কোথায় ?? বাড়িতে অবশ্য বলেনি সে কথা । বলেছিলো অফিস ট্যুরে যেতে হচ্ছে হঠাৎ । তবে যেবার ঋভু বন্ধুদের সাথে ঋষিকেশ লঞ্ছ্মনঝোলা গেলো সেবার মার চোখ চকচক করে উঠেছিলো ।বলেছিলো আমাকে একবার নিয়ে যাবি ঋভু ?? ঋভু মায়ের হাতে তৈরি গরম মাংসের ঝোলে রুটি ডোবাতে ডোবাতে বলেছিলো ঠিক আছে দেখছি পরের বার । ঋভুর বাবা তপন নিবিষ্টমনে খাবার খেতে খেতে মা কে ঠেস দিয়ে বাঁকা হেসে ঋভুকে বলেছিলেন কেনো নিয়ে যা তোদের সাথে ।যেতে যখন চাইছে । শিপ্রা মাথা নিচু করে শুধু বলেছিলো কি করি যার নিয়ে যাবার কথা সে তো কখনো কোথাও নিয়ে যায় নি তাই ছেলেকে বলা । ফুঁসে উঠেছিলেন তপন ।বলেছিলেন কেনো পুরী আর দার্জিলিং কে নিয়ে গিয়েছিল শুনি ?? তারপর সেইবার তারাপীঠ ??শিপ্রা মাথা নিচু করে শ্লেষ মিশিয়ে শুধু একটু হেসে বলেছিলো হ্যাঁ তা বটে ।আসলে ভুলে গিয়েছিলুম ।ঋভুর তখন মাত্র আট বছর বয়স ছিলো ,আর এখন আঠাশ তো তাই । তপনের মুখ টা রাগে গনগনে লাল হয়ে গিয়েছিলো। খাবারের প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে উঠে গিয়েছিলেন হাত ধুতে । কঠিন হয়ে গিয়েছিলো শিপ্রার চোয়াল ও ।তবে আবার খেতে বসার জন্য অনুরোধ করে নি । ঋভু বিরক্ত হয়েছিলো মার ওপরেই ।বলেছিলো জানো তো রগচটা মানুষ ।ঘাঁটাও কেনো ,তাও আবার খেতে বসার সময় ?? তোমাকে তো বলেছি ঠিক নিয়ে যাবো । অপেক্ষা করো না একটু । চিরকালের মুখ বুজে সব সহ্য করা শিপ্রাও সেদিন কান্না ভেজা গলায় বলেছিলো আমার ঘাট হয়েছে তোদের বলা । আমি মরলে শশ্মানে নিয়ে যাবি তো ?? নাকি তখন ও বলবি থাক ঘরেই থাকুক পচে গলে মাংস হাড় আলাদা আলাদা হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াক । তবু ঘর থেকে বেরোতে যেন না পারে মানুষটা । ঋভু এই প্রথম মাকে এভাবে রিঅ্যাক্ট করতে দেখলো । খাওয়া থামিয়ে ,হাতে ঝোলে ভেজানো রুটি নিয়ে বসেই থাকলো চুপ করে । ঠিক তখন ই কোথা থেকে জেঠিমা এসে হাজির হয়েছিলো । মাকে বলেছিলো ওদের খাবার সময় কি নাটক শুরু করলি ছোট ?? ছেলেটাকে ও খেতে দিলি না ঠিক করে ?? তোর বাপু বড্ড আক্কেলের অভাব । শিপ্রা চলে গিয়েছিলো মাথা নীচু করে । কারুর মুখে মুখে কথা তো কখনো বলেনি ।এতো বছরেও প্রতিবাদ করতে শেখে নি শিপ্রা ।

তার দিনকয়েক পরেই হঠাৎ তপন একদিন স্নান করতে ঢুকে বুকে ব্যথা নিয়ে পড়ে গেলেন বাথরুমে ।‌ স্ট্রোক । দিন কয়েক যমে মানুষে টানাটানি করে ফিরে এলো বটে মানুষ টা কিন্তু জড়ানো কথা আর শরীরের বাঁ দিকটার সাড় চলে গিয়ে জবুথবু একটা আধা জড় পদার্থের মতো । শিপ্রার নাওয়া খাওয়া টুকুও ঘুচে গেল । রুগীর সেবা , পথ্য , সংসারের কাজ , সামলে কখোন দিন কখোন রাত কিছুই যেন টের পেত না শিপ্রা । ততদিনে অবশ্য ঋভু বিয়ে করে ফেলেছে তৃণাকে ‌ ।তৃণাকে বিয়ের আগে ঋভু ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ও কিনে ফেলেছিলো অফিস পাড়ার কাছাকাছি । এবাড়িতে ঘর কোথায় ?? শিপ্রা আপত্তি করে নি । তপন দিন কয়েক মুখ গোমড়া করে ছিলেন কিন্তু পরে মেনে ও নিয়েছিলেন । অবশ্য প্রায় প্রতিদিনই তো সন্ধ্যেবেলায় ঋভু আর তৃণা আসতো অফিস ফেরত । ছুটির দিনে দুপুরে এখানেই খাওয়ার জন্য বলতো শিপ্রা । তৃণা বড্ড ভালো ।বড্ড মিশুকে । শিপ্রার এই বদ্ধ জলাশয়ের জীবনে তৃণা যেনো সমুদ্রের কোলাহল নিয়ে এসেছিলো ‌ । কারুর কোন কথা গ্রাহ্য না করে শিপ্রাকে মাঝেমাঝে বাইরে বার করতে চেষ্টা করতো তৃণা । শিপ্রা এতো বছরের ওই আনুগত্যের আর সংসারের ঊনকোটি কাজের শিকল ছিঁড়ে বেরোতে পারতো না ঠিকই কিন্তু তৃণার এই প্রচেষ্টা টুকু বড্ড মন ছুঁয়ে যেতো ।বড্ড আপনার মনে হতো মেয়েটাকে । যেন নিজের মা । মনের গোপন ইচ্ছে অনিচ্ছে সব না বলতেও বুঝে ফেলে মেয়েটা ।

দীর্ঘ সাতমাস শয্যাশায়ী থাকার পর তপন চলে গেলেন হঠাৎ ই সেদিন । ঘুমের মধ্যেই আবার স্ট্রোক । শিপ্রা নিজের হাতে রাতের খাবার খাইয়ে ,মুখ মুছিয়ে , মশারীর ধার গুঁজে , নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিয়ে একটু ছাদে গিয়েছিল । প্রতিদিনই যেমন যায় ওই মিনিট কুড়ি অথবা আধঘন্টার জন্য ।ওই সময় টুকু একান্তই শিপ্রা র নিজের । কিছুই না শুধু ই রাতের তারা ভরা আকাশের দিকে চেয়ে চুপ করে থাকা ।তাতেই কি অপরিসীম শান্তি । দিদিভাই অবশ্য বলতো তোর সবই অদ্ভুত , সারাদিন রুগীর সেবা করে পারিস বাপু ঠেঙিয়ে ওই খাঁড়া সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠতে । কেনো রুগী ঘুমিয়েছে তো তুই ও শুয়ে পড় না । একটু বাদেই তো আবার বেডপ্যান দিতে হবে । তখন সকালে উঠে প্যানপ্যান করবি রাতে ঘুম হয় না বলে । কিন্তু শিপ্রার একবার ছাদে গিয়ে খোলা হাওয়ায় প্রাণ ভরে শ্বাস না নিলে ঘুম আসতো না কিছুতেই । সারাদিন রোগীর ঘরের ওই ওষুধের আর আ্যন্টিসেপ্টিকের গন্ধ থেকে বেরিয়ে একটু প্রাণ ভরে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে শিপ্রা প্রকৃতির ঘ্রাণ নিতো । এইটুকুই বিনোদন, এইটুকুই বিলাসিতা , এইটুকুই মুক্তি ।

তপন একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে যাবার পর সদ্য বিয়ে হয়ে আসা তৃণা অবশ্য শিপ্রা রোগীর সব সেবা করবে শুনে খরখর করে উঠেছিলো । বলেছিলো সে আবার কেমন কথা ??মার কি বয়েস হচ্ছে না ?? সারাদিন সংসারের কাজ কর্মই কি কিছু কম থাকে যে মানুষ টা রাতেও রোগীর সাথে রাত জাগবে ??তারপর মা অসুস্থ হয়ে পড়লে কে দেখবে শুনি ?? একটা আয়া রাখা হোক না রাতের জন্য অন্তত । দিনের বেলা তবু একরকম । সবাই আছে যখন , তখন না হয় হাতে হাতে____।ঋভু আমতা আমতা করে তৃণাকেই সমর্থন জানাতে চেয়েছিলো ।জেঠিমা তৃণার কথায় জ্বলে উঠে বলেছিলেন শোন মেয়ে তুমি তো এই সেদিন এসেছো এই বাড়িতে ।তারপর তো স্বামীটিকে বগল দাবা করে ফ্ল্যাটে উঠে গেছো দিব্যি , তুমি কি জানো এই বাড়ির নিয়ম কানুন ?? আমাদের বাড়িতে না কোনদিন আয়া ঢুকেছে । না ঢুকবে । আমি যখন এ বাড়ির বৌ হয়ে এলাম তখন সবে সতেরো ।এসে ইস্তক পক্ষাঘাত গ্রস্থ শ্বশুর মশাইয়ের সেবা করেছি । ওই অবস্থায় ছিলেন পাক্কা দেড়টি বছর । বেডসোর হয়ে গিয়েছিলো। রোগীর ঘরে ঢুকলে আঁশটে গন্ধে পেটের ভাত গুলিয়ে উঠতো । কচি নতুন বৌ রাতে স্বামীর কাছে শুতে পর্যন্ত পারতাম না । শ্বাশুড়ি মায়ের আবার রাতে না ঘুমোতে পারলে মাথা ধরতো ।তাই রাতের সব ডিউটি ছিলো আমার । আর এখন তুমি দুদিন এসে আয়া দেখাচ্ছো ?? তবু তৃণা শেষ চেষ্টা করেছিলো বৈকি শিপ্রার জন্য । বেপরোয়া গলায় বলেছিলো এখন দিনকাল পাল্টে গেছে জেঠিমা । এখন আর এসব চলে না । এই জবরদস্তি স্যাক্রিফাইসের কি অর্থ বলতে পারেন ?? একটা অসুস্থ মানুষের জন্য অন্য একটা সুস্থ মানুষ কে জোর করে অসুস্থ করে দেওয়া নয় কি ?? গর্জে উঠেছিলো যমুনা । বলেছিলো বাহ রে মেয়ে লেখাপড়া শিখে এই বিদ্যে হয়েছে বুঝি ?? মানবিকতা বলেও কিছু হয় না নাকি ? স্বামী অসুস্থ হলে স্ত্রী সেবা করবে না তো করবে কে ? আলোচনা টা একটা বিতন্ডায় পরিনত হতো হয়তো কিন্তু তপন একটা অদ্ভুত কাজ করেছিলেন সেই মুহূর্তে । শরীরের একপাশ অসাড় , নিজে কিছুই করতে পারেন না , ঘোলাটে দৃষ্টি আর জড়ানো অস্পষ্ট কথার অর্ধেক ই বোঝা যায় না , কিন্তু তপন যে এখনো নিজের সৈরাচারী অস্তিত্ব টা নিয়ে বেঁচে আছেন এটা বুঝিয়ে দিতে আঁ আঁ করে বিভৎস চিৎকার করতে করতে মুঠো পাকিয়ে সচল হাতটা দিয়ে বিছানায় দুমদুম করে মেরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন । যমুনা তপনের এই আচরণের সুযোগ টা পুরোপুরি গ্রহণ করে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠেছিলেন মেরে ফেল ,মেরে ফেল সবাই মিলে লোকটাকে । এমন একটা রোগীর সামনেই কি নৃশংস আলোচনা বাবা । আর ছোট বলিহারি তোর বিবেচনা বাবা । বলি তোর লেখাপড়া জানা বিদ্যেধরী বৌ তো তোর হয়ে খুব লড়ছে রে , কিন্তু তুই কি তোর নিজের আখেরটাও বুঝিস না বাপু ?? এতো নিরেট কেনো বলতো তুই ?? আরে মানুষ টা আছে বলেই এখনো তোর দুবেলা মাছ খাওয়া ,ওই বাহারে শাড়ি পরাটা জারি আছে রে । তোর মতো বেয়াক্কেল মেয়েমানুষ আমি বাপের জন্মে দেখিনি বাপু । অসুস্থ মানুষটার আরেকটা স্ট্রোক করিয়ে পরপারে না পাঠিয়ে তোরা আর ছাড়বি না দেখছি !”

থমথমে হয়ে গিয়েছিলো বাড়ির পরিবেশ টা তক্ষুনি । শিপ্রাই কাঁপা গলায় ঋভুকে বলেছিলো তোরা চলে যা ঋভু । আমার ভালো মন্দ ,কষ্ট ,পরিশ্রমের কথা তোদের ভাবতে হবে না রে ।তারপর কেমন এক উদাসীন হেসে বলেছিলো আমার জন্য কাউকে চিন্তা করতে হবে না রে , শুধু অশান্তি আর বাড়াস না । ওটা আমি সহ্য করতে পারি না রে । চলে গিয়েছিলো ঋভু , চলে গিয়েছিলো তৃণাও । কিন্তু যেতে যেতে গজগজ করে ঋভু কে বলেছিলো এই সব মান্ধাতা আমলের নিয়মনীতি এতোদিন নির্বিচারে মেনে এসেছো কি করে তুমি ?? ওরা না হয় সেকালের ধ্যান ধারণা নিয়ে একটা অন্ধকূপের মধ্যে বেঁচে আছে । কিন্তু তুমি ?? মাকে দেখলে আমার ভীষন মনখারাপ হয়ে যায় জানো । একটা মানুষের ইচ্ছে অনিচ্ছার পরোয়া না করে তাকে জোর করে দেবী বানিয়ে দেওয়া । মার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছো কখনো ?? যেন দুটো খাঁচায় বন্দী পাখি । একটু খোলা আকাশের জন্য ছটফট করছে ।

তপনের মৃত্যুর পর অবশ্য শিপ্রা কে দেখে একটু আশ্চর্যই হয়েছিলো সকলে । শিপ্রার মতো নরম সরম ব্যক্তিত্বহীন মানুষ টার এতো নির্বিকার আচরনে যেন সকলেই একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলো । সকালের ওষুধ টা দিতে গিয়ে শিপ্রাই প্রথম দেখেছিলো তপনের শরীর বরফের মতো ঠান্ডা । তারপর তো নিয়ম মাফিক ডাক্তার ডাকা , ঋভু , তৃণা আত্মীয় স্বজন কে খবর দেওয়া । দাহ , অশৌচ , শ্রাদ্ধ , নিয়মভঙ্গ সব । শিপ্রা তখন ও অবিচল দায়িত্বে , কর্তব্যে , এই মৃত্যু সংবাদে সংসারে আগত সবার সুবিধা অসুবিধা দেখতে । বরং যমুনা বসে বসে সাতকাহন করে সবার কাছে শোকের ফুলঝুরি ছুটিয়ে চোখের জল বইয়েছিলেন । তৃণা আর ঋভু প্রথমে ভেবেছিলো শিপ্রার মতো নরম সরম মানুষটাকে সামলানো একটা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে । শিপ্রা যে লতানো গাছের মতোই এই সংসার আঁকড়েই কাটিয়ে দিয়েছেন এতোগুলো বছর । তপন স্বৈরাচারী , তপন ডমিনেটিং ,তবু তো তপনের অস্বিত্বের ছায়ায়ই তো শিপ্রা র অবস্থান ছিলো এই সংসারে । অতএব এই শোকের সাথে সাথে শিপ্রার নিরাপত্তা হীনতার বোধ‌ আসাটাই স্বাভাবিক ।

কিন্তু তৃণা অবাক হয়ে গিয়েছিলো শিপ্রার ঠান্ডা , স্থিতিশীল ব্যবহার দেখে । যেন জানতেনই সব । কখনো কখনো কোন আত্মীয় স্বজনের বিলাপ স্মৃতিচারণে চোখে আঁচল চাপা দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কেমন যেনো যান্ত্রিক ভঙ্গিতে । যেন দু ফোঁটা চোখের জল না ফেললে লোকে বলবে কি , তাই এইটুকু সৌজন্য বজায় রাখা । পরমুহূর্তেই উঠে গিয়ে দেখা করতে আসা লোকজনের নিয়ে আসা গাদাগাদা ফলমূল মিষ্টি প্লেটে করে এনে ধরেছেন সকলের সামনে সামনে । কখনো সব গুছিয়ে তুলে রাখছেন ফ্রিজে । কখনো তপনের শ্রাদ্ধের জন্য আনা দশকর্মার জিনিসপত্র কোনটা কোথায় রাখতে হবে তাই নিয়ে ব্যস্ত । তৃণার যেনো মনে হয়েছিলো শিপ্রা যেন ভেতরে ভেতরে কোথাও বাঁধন ছেঁড়া একটা গোপন স্বাধীনতার সুখ অনুভব করছেন ।

অবাক কি শিপ্রাও কম হয়েছিলো ?? নিজের কাছে নিজের গোপন অনুভূতি গুলো যে এতোটাই অচেনা ছিলো সেটা কি শিপ্রাও জানতো ?? সেদিন সকালে যখন তপন কে ওষুধ খাওয়াতে গিয়ে দেখলো শরীর টা বরফের মতো ঠান্ডা তখন ছ্যাঁত করে উঠেছিলো বুকের মধ্যেটা হঠাৎ । আস্তে আস্তে হাতটা নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখেছিলো নিঃশ্বাস প্রশ্বাস পড়ছে কি না ?? তারপর ধীরে সুস্থে দিদিভাইয়ের ঘরে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ডেকেছিলো যমুনা কে । তার মধ্যেই তো ফোন করে ফেলেছে ডাক্তার বাবুকে ,ঋভু তৃণাকে । সব ঠান্ডা মাথায় ,সব স্বাভাবিক ম্যানেজমেন্টের গুনে । শোক ,আবেগের থেকে বেশি যেনো কর্তব্যের দায় । মনের ভেতর হাতড়ে দেখে নিজেই অবাক হয়ে ভেবেছিলো সদ্য স্বামী হারা হয়েছে সে কিন্তু যতটা দুঃখ ,যতটা অসহায়ত্ব বোধ হবার কথা ততটা হচ্ছে না কেনো ?? নাকি দিদিভাই যেমন বলে শিপ্রার সবই বড় ধীরেসুস্থে , সময় নিয়ে , ।তেমন ই হচ্ছে এখন ?? তবে কি শিপ্রা পরে অনুভব করবে শোক ?? না কি পাগল হয়ে যাচ্ছে শিপ্রা ?? কোন অনুভূতি স্পর্শ করছে না আর ওকে ?? না কি এই গতানুগতিকতার কার্বন কপি করা প্রতিটা দিন থেকে এই ঘটনাটা সাময়িক মুক্তি দিয়েছে শিপ্রাকে বলে এই অভিনবত্ব টুকুই এনজয় করছে শিপ্রা ?? কিন্তু আর যাই হোক আপাতত শিপ্রা শোকের ছিঁটেফোঁটা ও যে অনুভব করছেন না হৃদয়ের গভীরে এটুকু সিওর । বরং সব ছাপিয়ে কেমন এক অবাধ স্বাধীনতার স্বাদ হৃদয় জুড়ে । যেনো এক অবাধ মুক্তি র গোপন আনন্দে ভরপুর হৃদয় । তবে কি যে সব বাঁধা ধরা সম্পর্ক গুলোকে কেন্দ্র করে মানুষ বাঁচতে চায় ,বাঁচার অবলম্বন বলে জড়িয়ে ধরে ‌নিজেকে প্রবোধ দেয় সেগুলো নিছকই মায়া ?? আসলে মানুষের কাছে নিজের স্বাধীনতার থেকে প্রিয় কিছুই নয় ?? তাহলে ?তাহলে এতো বছর ধরে শিপ্রা কি করেছে ?? নিজেকে প্রতারণা ? না নিজেকে ভুলিয়ে রেখে নিজের স্বত্ত্বাটা গুলিয়ে মিলিয়ে দিয়ে শুধুই গতানুগতিক নিরাপদ , নিশ্চিন্ত স্রোতে গা ভাসিয়ে শুধুই বেঁচে থাকার রসদ টুকু সংগ্রহ করে চলা ?? তপনকে কি সত্যিই শিপ্রা কখনো ভালোবাসতো ?? তপনের নামটার সাথে শিপ্রার অনুভব জুড়ে যে অনুভূতি টা প্রথমেই আসে সেটা হলো একটা বদরাগী , আপোষ না করা মানুষ । তার প্রয়োজন ,তার পছন্দ অপছন্দ অনুযায়ী শিপ্রা তো শুধু ই পঁয়ত্রিশটা বছর তালে তাল মিলিয়ে চলেছে অশান্তির ভয়ে । অথবা ভীষন নগ্ন ভাবে বললে নিজের জীবন ধারনের জন্য । শিপ্রার যে তিনকূলে কেউ ছিলো না । কাকার কাছে মানুষ । বিয়ের পর এই সংসারে এসে শিপ্রা শুধুই সবকিছু মানিয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টাই করে গেছে । কখনো কোনদিন নিজেকে পাল্টা প্রশ্ন করেনি কোনটা ঠিক কোনটা ভুল ,কোনটা উচিত কোনটাই বা অনুচিত ?? শুধুই আপোষ , শুধুই আনুগত্য ।

আজ ও প্রতিদিনের মতো সব কাজ চোকার পর চুপিচুপি ছাদে উঠে এলো শিপ্রা । ঋভু আর তৃণা এখন এখানেই আছে । পরশুই নিয়ম ভঙ্গের কাজ শেষ হয়ে গেছে । আত্মীয় স্বজন বেশীরভাগই চলে গেছে । এখন অনেকটাই অবসর শিপ্রার ।তবু সারাদিন কাজ খুঁজে খুঁজে বের করে করে । ওটাই অভ্যাস ওটার মধ্যেই শিপ্রা নিরাপত্তা অনুভব করে যেনো । শুধু এক অনন্য স্বাধীনতা অনুভব করে রাতে এই ছাদ সফরের সময়টুকুতে । এখন আর কোন তাড়া নেই । কোন বাধ্যবাধকতা নেই । এখন পুরো রাত এখানে থাকলেও কারুর কিছু বলার নেই । আজ ছাদে এসে দেখলো চারদিক ধুয়ে যাচ্ছে জোছনায় । কি সুন্দর ফুরফুরে একটা হাওয়া দিচ্ছে । শিপ্রার অন্তঃকরণ ছেয়ে যাচ্ছে এক অপরিসীম মুক্তি র আনন্দে । শিপ্রা ছোট্ট মেয়ের মতো দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে চাঁদ থেকে চুঁইয়ে পড়া জোছনায় ঘুরে ঘুরে উদযাপন করতে লাগলো মুক্তির আনন্দে । এভাবে কতক্ষন কেটে গেছে কি জানি । হঠাৎ খুট করে একটা আওয়াজ পেয়ে চমকে দেখলে চিলেকোঠার দরজায় দাঁড়িয়ে তৃণা । অবাক হয়ে দেখছে শিপ্রা কে । লজ্জা পেল শিপ্রা । বলে উঠলো কি রে তুই হঠাৎ এখানে ?? তৃণার চোখে কেমন স্নেহ মাখা খুশি । ঠিক যেনো মায়ের মতো । পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো শিপ্রার কাছে । শিপ্রার মাথাটা জোর করে টেনে নিলো কাঁধে ।তারপর ফিসফিস করে বললো স্বাধীনতার থেকে প্রিয় কিছুই নেই এই পৃথিবীতে । আমি জানি তুমি নতুন করে আবার নিজেকেই নিজে চিনতে পারছো , আবার ভীষন এক দ্বিধায় ও ভুগছো ভেতরে ভেতরে তাই না ??

শিউরে উঠলো শিপ্রা ভেতরে ভেতরে। মেয়েটা কি অন্তর্যামী ?? এমন করে কি করে পড়ে ফেললো তাকে ?? আস্তে করে ওর কাঁধের ওপর মাথাটা আরো গভীর করে হেলিয়ে দিয়ে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন হ্যাঁ রে ঠিক তাই । তুই বল আমি কি ভুল ?? জানিস মাঝেমাঝে মনে হচ্ছে আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি ?? কিন্তু আমার কোন দুঃখ হচ্ছে না রে । সত্যিই হচ্ছে না । বরং না পুরন হওয়া অনেক ইচ্ছে গুলো কে একটু ছুঁয়ে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করছে রে । বল না আমি কি ভুল ?? জানিস অনেক দিন বাড়ির বাইরে যাই নি । আমাকে কাল একটু কোথাও নিয়ে যাবি ? তৃণা কোন কথা বললো না শুধু গভীর করে চাপ দিলো শিপ্রার হাতের ওপর । তারপর বললো এখন নীচে চলো অনেক রাত হলো ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office