সারাদেশ ডেস্ক | মঙ্গলবার, ৩০ অগাস্ট ২০২২ | প্রিন্ট | ১০২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহিত ছবি
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের নির্মাণকাজ শেষের পথে রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালু করতে চায় সরকার। এ অবস্থায় টানেলের উভয় প্রান্তের ট্রাফিক ত্রুটি নিয়ে শঙ্কায় আছেন সংশ্নিষ্টরা। এ সংকট কাটাতে গঠিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কমিটি ২৮ সুপারিশ করেছে। পতেঙ্গা প্রান্তে ১৪ সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এগুলো বাস্তবায়নে তারা সরকারের কাছে ৫২৪ কোটি টাকা চেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পতেঙ্গা প্রান্তে তিনটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সিডিএ ও সেতু বিভাগ। শুরুতে সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এ ত্রুটি দেখা দেয়। এ জন্য এখন সরকারকে বাড়তি টাকা ব্যয় করতে হবে। এর পরও যানজট নিরসন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টানেল চালু হলে বছরে প্রায় ৭৬ লাখ গাড়ি চলাচল করবে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ ১ কোটি ৩৯ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, টানেলের যানবাহনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে এরই মধ্যে পতেঙ্গা প্রান্তের জংশান ডিজাইন করে প্রকল্প প্রস্তাবনা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে পাস হলে কাজ শুরু করা হবে। এর মধ্যে টানেল চালু হলে যানজট নিরসনে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
সিডিএ সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তে সাগরিকা পর্যন্ত আউটার রিং রোড নির্মাণ করা হয়েছে। আবার লালখানবাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছেন তারা। এ ছাড়া কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ (বিচ রোড), বিমানবন্দর সড়ক ও পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতগামী সড়ক মিলিত হয়েছে টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তে। ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সেতু বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় সভায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানায়, টানেল চালু হলে যানজট সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি আছে। সভায় সিএমপি কমিশনারকে সভাপতি করে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ওই মাসের ২০ তারিখ টানেলের উভয় প্রান্তে ট্রাফিক রুট নির্মাণ সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত মার্চে ওই কমিটি ২৮ দফা সুপারিশ করে। পতেঙ্গা প্রান্তের জন্য করা হয় ১৪টি সুপারিশ।
এর মধ্যে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে আউটার রিং রোডের সংযোগ করে তিনটি ইউলুপ নির্মাণ ও আউটার রিং রোডে একটি আন্ডারপাস নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়, যাতে গাড়ি বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারে। এ ছাড়া ফৌজদারহাটে ওভারপাস, বাইপাস ও ইউলুপ নির্মাণ, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে আসা পর্যটকদের জন্য গাড়ি পার্কিং সুবিধা, ওয়ে স্কেল স্থাপন, সার্ভিস রোড নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। এসব কাজ সিডিএকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় কমিটি।
সিডিএ চলমান আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তের জাংশন ডিজাইন করে মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এ জন্য ৫২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে তারা। চিটাগং সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী, ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৬৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির আওতায় টানেলের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ৫২৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে তিন হাজার ২০০ কোটি ১৯ লাখ টাকা করে চতুর্থ সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সমীক্ষায় যে বিষয়গুলো আসেনি :বঙ্গবন্ধু টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তে শাহ আমানত বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, সিইপিজেড, কেইপিজেড, নির্মাণাধীন বে টার্মিনাল, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, চট্টগ্রাম নগর, উত্তর চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যান চলাচলে এ টানেল ব্যবহার হবে। এ ছাড়া আনোয়ারা প্রান্তে সিইউএফএল, কাফকো, কেইপিজেড, চায়না ইপিজেড, পার্কি বিচ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল, কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকসহ পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করবে। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ২০১৩ সালের করা সমীক্ষায় এসব বিষয় উঠে আসেনি বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, প্রত্যেক প্রকল্প নেওয়ার সময় বলা হয়, এটা হলে যানজট দূর হয়ে যাবে; কিন্তু হয় না। বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের সমীক্ষার সময় চট্টগ্রাম শহরের দিকে থেকে বা দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের পর ওই অঞ্চল থেকে টানেলে কী পরিমাণ গাড়ির চাপ হতে পারে- এসব কিছুই আনা হয়নি। তিনি বলেন, এত বিনিয়োগ করে সরকার নদী পার হওয়ার সমাধান দিল। কিন্তু সরকারের যে উন্নয়ন দর্শন, সেটা সমীক্ষায় আনা হলো না। তিনি বলেন, যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও বড় যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির সময় সেটাকে ওই অঞ্চলের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুষ্ঠু ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে পরিকল্পনা করতে হয়, যা বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পে করা হয়নি।
তবে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ভবিষ্যতে টানেলে নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত ও যানজট নিরসনে দুই ভাগে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে জংশন ব্যবস্থাপনা করা হবে। প্রকল্প পাস হলেই এ কাজ শুরু হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হবে। এটিতে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত সার্ভিস রোডসহ বাকি কাজ করা হবে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে আর যানজট হবে না।