শিরোনাম
শাহ আমানতে ৪২৭ গ্রাম সোনাসহ ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে চিকিৎসকদের : ভূমিমন্ত্রী চক্রান্ত না করে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন : তথ্যমন্ত্রী বিজিএমইএ’র নতুন মহাসচিব হিসেবে যোগ দিলেন ড. সাহেদুল ইসলাম ব্যাংকারের প্রধান দায়িত্ব আমানতের নিরাপত্তা দেওয়া: বিকেবি চেয়ারম্যান জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে কামরুল-জসিম প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয় শুধু ওষুধ দিয়ে জাতিকে রোগ থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুলাইয়ের আত্মত্যাগের চেতনাকে লাভজনক চেতনা বানাবেন না : তথ্যমন্ত্রী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে কমবে মামলার জট : আইনমন্ত্রী মানবপাচার-অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে সরকার কঠোর অবস্থানে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

একাত্তরের কালো আকাশ লাল জমিন : সাঈদা নাঈম

  |   বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল ২০২২   |   প্রিন্ট   |   ১২৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

Default Image

একাত্তরের কালো আকাশ লাল জমিন : সাঈদা নাঈম

গতকাল যা ঘটে গেল, তা আজকের জন্য ইতিহাস। ইতিহাস কোনো চলচিত্র নয়, ঘটনার বিবরণীও নয়। তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং সন জাতির জন্য ১৯৭১ সাল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস যা ২৬শে মার্চ হিসেবেও পরিচিত। ২২ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় এবং সরকারীভাবে এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়।১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করে। এই দিনে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণের ডাক দেন। বিভিন্ন বই-পুস্তকে এই তথ্য থাকলেও এই তথ্যের ব্যাপারে মতবিরোধও দেখা যায়।

ইতিহাস কারো ইচ্ছা বা আবেগের অধীন নয়। কিন্তু আমাদের দেশে ইতিহাসের নামে খেয়াল চর্চা চলছে। তবে সেদিকে আমাদের দৃষ্টিতে না দেয়াই ভালো।
আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করেছি। শত্রুকে পরাজিত করে নিজ ভূ খন্ড পেয়েছি। স্বাধীনতা সংগ্রাম বলতে গেলে জামায়াত, রাজাকার, মুসলিমলীগ বাদে সমগ্র বাঙ্গালীই সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তবে এর মূল যোদ্ধা ছাত্রলীগের অবদান সকলের উর্ধ্বে এবং পুলিশ, ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ, বিমান ও নৌবাহিনী, বেঙ্গল রেজিমেনযটের যোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু হলে সরাসরি তারা যুদ্ধে যোগ দেয়।

যুদ্ধের ঘটনা আমরা সবাই জানি। সেই একাত্তরের মার্চ মাসে কি ঘটেছিল সেটি শুনে এখনও যুদ্ধ অনুভব করি। এ নিয়ে তৈরী হয়েছে অনেক প্রামাণ্যচিত্র যা দেখে গা শিওরে ওঠে এখনও। পঁচিশে মার্চ অমানবিক ঘটনা ঘটেছিল বাঙালিদের সাথে, সে কথা ছখনও কেউ ভুলেনি। ভুলে যেতে পারেনি পঁচিশের সেই কালো রাত্রির কথা। কারণ বাতাসে এখনও লাশের পঁচা গন্ধ ভাসে। দেশ যতদিন থাকবে, এ পৃথিবী যতদিন থাকবে, বাতাসে লাশের পঁচা গন্ধ ভেসে বেড়াবে। হয় এখানে না হয় ওখানে। এর প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা আমি পুনরাবৃত্তি করতে চাচ্ছি না। এর পরবর্তী কিছু ধারনার কথা লিখি।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ না হলে হয়তো এ দেশ কোনোদিনই স্বাধীন হতো না। এর প্রমাণ, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিনবছেরর মাথায় বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন, তাদের হত্যা করা হলো। যে বঙ্গবন্ধুর মুখের কথার আশ্বাসে এ দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশকে স্বাধীন করতে। সেই মানুষটিকে তাঁর পরিবারের সামনে হত্য করা হয়, সাথে পুরো পরিবার।

অপারেশন সার্চলাইট ১৯৭১সালে ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যা, যার মধ্যমে তারা ১৯৭১ এর মার্চ ও এর পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল। এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকদের আদেশে পরিচালিত,যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত অপারেশন ব্লিটজ্‌ এর পরবর্তি অনুষঙ্গ। অপারেশনটির আসল উদ্দেশ্য ছিল ২৬ মার্চ এর মধ্যে সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার গভীর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) নিরীহ জনগণের উপর হামলা চালায়। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গোলাবর্ষণ করা হয়, অনেক স্থানে নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং অনেক স্থানে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকান্ড চালানো হয়। এমতাবস্থায় বাঙালিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং অনেক স্থানেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা না করেই অনেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। পরবর্তিতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাবার পর আপামর বাঙালি জনতা পশ্চিম পাকিস্তানী জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।
কি অমানবিক ঘটনা! কালো পঁচিশের আগে ও পরের ঘটনা জাতিকে ভীত করে তোলে।কালো পঁচিশের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র দুটো বিবৃতির সন্ধান আমরা পাই। এগুলো আলোচনা করতে গেলে আমাদের একাত্তর সাল পুরোটাই তুলে ধরতে হবে। এ ইতিহাস আমরা সবাই জানি।পঁচিশের পরে আসে ছাব্বিশ।যা ঘটার পঁচিশে মার্চেই ঘটে যায়।

স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। কথিত আছে, গ্রেপ্তার হবার একটু আগে ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর (অর্থাৎ, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিত তৎকালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে করে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়। ঘোষণাটি নিম্নরুপ:(ঘোষণাটি ইংরেজিতে ছিল। এখানে বাংলায় অনুবাদটি তুলে ধরছি।)

অনুবাদ: এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।

২৬শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক’জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ.হান্নান প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি মাইকিং করে প্রচার করেন। পরে ২৬শে মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঘোষণাপত্রটির ভাষ্য নিম্নরুপ: (এটি ও ইংরেজিতে ছিল, আমি বাংলাটা দিচ্ছি।)
অনুবাদ: আমি,মেজর জিয়া, বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রাদেশিক কমাণ্ডার-ইন-চিফ, শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।

আমি আরো ঘোষণা করছি যে, আমরা শেখ মুজিবর রহমানের অধীনে একটি সার্বভৌম ও আইনসিদ্ধ সরকার গঠন করেছি যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকার জোট-নিরপেক্ষ নীতি মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। এ রাষ্ট্র সকল জাতীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং বিশ্বশান্তির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। আমি সকল দেশের সরকারকে তাদের নিজ নিজ দেশে বাংলাদেশের নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কারো অজানা নয়।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, দেশের মানুষকে সাহসী আর প্রতিবাদী করে তোলা। তিনি খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতেন। আন্দোলনের প্রকৃতির দেখে তিনি তাঁর কৌশল পরিবর্তন করতেন। বজ্রের মতো বলিষ্ঠ কন্ঠ ছিল তাঁর।
সেইদিনের ছিপছিপে কালো বর্ণের ছেলেটি যে একদিন এত সাহসী হবে এটি তাঁর পরিবারের কেউ ভাবেও নি। তিনি বাঙালিদের সাহস দিয়েছিলেন সবসময়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য ছিল প্রদেশগুলো বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বিধিগত ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিরূপণ করা। তিনি ১৯৬৯ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন যখন ইয়াহিয়া ও আইয়ুব তাঁকে অফার দিয়েছিলেন। কিন্ত্ত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা ও মর্যাদা নির্দিষ্ট না করে তাঁর কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া অর্থহীন এবং এটি বাঙালির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।

তিনি সবাইকে বুঝিয়ে ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্ট করলেন।তিনি জানতেন কি করলে কি হবে। অত্যন্ত বুদ্ধি আর নিষ্ঠার সাথে তিনি তাঁর কর্মকান্ড চালিয়েছিলেন।
শেখ মুজিবর রহমানের সরকার একটি সার্বভৌম ও আইনসম্মত সরকার এৰং বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবার দাবিদার।

১৯৭১ সালে ২৭ মার্চের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে যা নয় মাস স্থায়ী হয়। একাত্তের কালো আকাশ নীল আর সাদার শুভ্রতার নিয়ে নতুন পতাকা নিয়ে নতুন প্রভাত দেখে। রক্তে রন্জিত সবুজ ঘাস তার নিজের রঙ ফিরে পায়।
আমরা পাই আমাদের নিজস্ব একটি ভূ খন্ড।
পাই স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office