| বুধবার, ১৩ এপ্রিল ২০২২ | প্রিন্ট | ১৫৩৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
হাওরবাসীর কান্না , একবিংশ শতাব্দীর এক বড় ট্র্যাজেডি
একদিকে উন্নয়নের ঢামাঢোল যখন চারপাশে বেজে চলছে, অর্থনীতির গতি প্রকৃতি এগিয়ে চলছে, ঠিক তখনই হাওর পারের মানুষেরা কতটুকু ভাল আছেন । তা সরেজমিনে না দেখলে বলা বাতুলতা মাত্র।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা বৃহত্তর সিলেটে অঞ্চলের কয়েকটি জেলা নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ নিয়েই মূলত হাওর এলাকা। প্রাকৃতিকভাবে নিচু হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষের দুখের শেষ নেই। এই অঞ্চলের মানুষ মূলত কৃষি নির্ভর । বোরো ধান একমাত্র অর্থকরী ফসল। পৌস -মাঘে এই ফসল রোপন করা হয়, চৈত্রের শেষে ও বৈশাখের শুরুতে ফসল তোলা হয়। যা দিয়ে সারা বছরের আয় ব্যায় মেঠানো হয় , সেই সাথে দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুষ্পষ্ট। আর সেই ফসল না তুলতে পারলে কৃষকের দুর্গতির শেষ নেই।
যেহেতু হাওর এলাকা প্রাকৃতিক ভাবেই নীচু, ভারতের মেঘালয়ে ও পাহাড়ী এলাকায় বৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টি হলেই,উজানের পানি নেমে আসে নিম্নাঞ্চলে, ফলে সহজেই দেখা দেয় অকাল বন্যা। খেসারত দিতে হয় এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া নীরিহ কৃষকদের। নদী খনন ও সময়মতো ডেইজিং না করার কারণে, যথেষ্ট পানি ধারণ করার ক্ষমতা নদীর না থাকায়, খুব সহজেই নদীর পার অতিক্রম করে কিংবা বাঁধ ভেংগে পানি ঢুকে পড়ে হাওরে। পানির অতল গভীরে হারিয়ে যায় কৃষকের স্বপ্ন।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য ” বাংলাদেশ হাওর ও জলাভুমি উন্নয়ন অধিদপ্তর ২০০০” গঠন করেছে। তার সুফল প্রন্তিক কৃষক কতটুকু পাচ্ছেন তাই আজকের দিনের বড় প্রশ্ন। আর দুর্নীতির কথা বলতে গেলে তো লংকা কান্ডকে ও হার মানাবে। এ যেন মহরা চলছে দুর্বৃত্তায়নের। দুর্নীতিবাজরা ইদুর ও কাকড়া তত্তের বেশ প্রচার করেন জোরে সোরে। অর্থাত ইদুর ও কাকড়া নাকী ছিদ্র করে , যার ফলে পানি ঢুকে পরে। কতটা অবাস্তব ও হাস্যকর।
জানা যায়, এই বছর সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। ছোট বড় মিলিয়ে মোট ১৫৪ টি হাওর রয়েছে ঐ জেলায়। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষায় ৭২৭ টি প্রকল্পে ৫৩০ কিমি বাঁধ সংস্কার ও নির্মানের টার্গেট করা হয়েছিল। যার মূল্য ১২১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে শেষ করার কথা থাকলে ও অর্ধেকের বেশী কাজ বাকী রয়ে যায়। অনিয়ম ও দুর্নীতির যাতাকলে আটকে যায় কৃষকের ভাগ্য। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে হাওর অঞ্চলে এ রকম বিপর্যয় দেখা দেয়। পরবর্তীতে গঠন করা পিআইসি যেখানে স্থানীয় পর্যায়ে থাকে ইউপি সদস্য ও শীর্ষে আছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ।আর সব দেখ ভাল করার দায়িত্তে আছেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে,রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে কতটুকু রক্ষা পেয়েছে, তা অনেকের মনেই প্রশ্ন । ইতিমধ্যে জানা যায়, জেলার দিরাই, জামালগঞ্জ, শাল্লা সহ অন্যান্য উপজেলার ১১ টি হাওরের প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। এ যেন মরার উপর খরার গা।
কর্তৃপক্ষের গাফিলাতি , দুর্নীতি ও সময়মত বাঁধ এর কাজ শেষ না করা, এ রকম নানা অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা আর ধান চাষ করবে না, এটাই সত্য। অর্থনীতিতে এর কি প্রভাব পরবে, তা সকলেরই বোধগম্য। বিভিন্নভাবে খোজ নিয়ে জানা যায়, দিশেহারা কৃষক দিশা না পেয়ে নাম লেখায় গার্মেন্টস কারখানায়, ঠাই হয় শহুরে নোংরা বস্তিতে, সে আরেক গল্প নাইবা বললাম। খুব আনন্দের সাথে শহুরে বাবুরা হয়তো আসছে ১লা বৈশাখ উদযাপন করবেন, ঐতিহ্য রক্ষায় মঙ্গল শোভাযাত্রা ও করবেন, অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষকেরা অস্তিত্ত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকবেন। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে বসে আমরা এই দৃশ্য দেখব, তা ভাবতেই অবাক লাগে। হাওরবাসী কৃষকের কান্না, এ যেন শতাব্দীর এক বড় ট্র্যাজেডি।
লেখক: সুমন পুরকায়স্থ, আইনজীবী ও গবেষক ।