রীতা আক্তার |
বৃহস্পতিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ |
প্রিন্ট
|
৩৩৬ বার পঠিত
|
পড়ুন মিনিটে
জীবনে প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে আটকে রাখা যায় না—এ কথার জীবন্ত উদাহরণ বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুহাম্মাদ মহসীন। ছোটবেলায় পোলিও আক্রান্ত হয়ে হাঁটার শক্তি হারালেও তিনি হার মানেননি। বরং শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আজ দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনছেন হুইলচেয়ারে বসেই ক্রিকেট খেলে।
শুরুর সংগ্রাম
মাত্র ছয় মাস বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে শরীর অবশ হয়ে যায় মহসীনের। শৈশবে অন্যরা মাঠে খেলায় মেতে উঠলেও তিনি ছিলেন একাকিত্বে। সেই সময়েই ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয় তার মনে। ২০১০ সালে তিনি প্রতিবন্ধী ক্রিকেটে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে হুইলচেয়ার ক্রিকেটে পথচলা শুরু করেন।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো ক্রিকেট দল আছে কিনা জানতে গিয়ে তিনি সিআরপি-র প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি টেইলরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার পরামর্শে গড়ে তোলেন একটি হুইলচেয়ার ক্রিকেট দল।
দলের যাত্রা
২০১৩ সালে ভারতীয় কোচ হারুনুর রশীদের সহায়তায় এবং ভ্যালেরি টেইলরের সহযোগিতায় ১৬ জন খেলোয়াড় নিয়ে বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রথম একাদশে সুযোগ না পেলেও মহসীন হাল ছাড়েননি। পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে তিনি হয়ে ওঠেন দলের মূল ভরসা।
২০১৬ সালে দলটি পূর্ণাঙ্গভাবে যাত্রা শুরু করে। এরপর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হুইলচেয়ার ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দল দারুণ পারফরম্যান্স দেখায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য
মহসীনের নেতৃত্বে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ দল ভারতের তাজমহল সিরিজে অংশ নেয় এবং ২-১ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস রচনা করে। এই সাফল্যের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে তাদের সংবর্ধনা দেন। এরপর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি মহসীনকে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন মহসীন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি পেয়েছেন জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড, সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল চেঞ্জমেকার্স অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক পুরস্কার। সর্বশেষ ২০২৩ সালে তিনি “সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি” হিসেবে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মহসীনের স্বপ্ন শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান হুইলচেয়ার ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যেতে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দল এখন শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
অনুপ্রেরণার প্রতীক
মুহাম্মাদ মহসীনের সংগ্রামী জীবন আমাদের দেখিয়ে দেয়—অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই স্বপ্নকে থামাতে পারে না। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দল প্রতিদিন নতুন স্বপ্ন বুনছে, নতুন অধ্যায় লিখছে।
বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের এই সাফল্য শুধু দেশের জন্য নয়, বিশ্বমঞ্চের জন্যও এক অনন্য অনুপ্রেরণা। জয় হোক মহসীন ও তার দলের।