অর্থনীতি ডেস্ক | বুধবার, ২০ জুলাই ২০২২ | প্রিন্ট | ১০৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহিত ছবি
বাংলা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সর্বশেষ কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতিও ছিলেন তিনি। জাহাঙ্গীর হোসেন ‘পণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান’ রাখায় গত ২০ জানুয়ারি ‘বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি’ কার্ড পান।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে জাহাঙ্গীর হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের রপ্তানি পণ্যের একটি চালান খুলে কাস্টমস কর্মকর্তারা দেখতে পান, কনটেইনারের সামনের দিকে মুড়ি, বিস্কুট ও মসলার কিছু প্যাকেট। ভেতরটা ফাঁকা। নথিপত্রে ১ লাখ ৩ হাজার ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানির কথা বলা হলেও পণ্য পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ হাজার ডলারের।
বাংলা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের মতো এ রকম বহু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুয়া কৃষিপণ্য রপ্তানি করে প্রণোদনা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন রপ্তানিপণ্যে ৩৭টি খাতে নগদ প্রণোদনা প্রদান করছে।
গত পাঁচ বছরে অন্তত ২০টি কোম্পানি সরকারের দেওয়া ২০ শতাংশ রপ্তানি প্রণোদনা পকেটে পুরেছে। এ জন্য তারা প্রায় ৪৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ৯৬৫টি ভুয়া চালান দেখিয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা ব্যাংকের তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখেছেন, কাস্টমস কর্মকর্তাদের ইউজার আইডি ব্যবহার করে এসব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করেছে অন্তত ২০টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এসব চালান চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ না করলেও তা এনবিআরের সার্ভারে রপ্তানি দেখানো হয়েছে। এসব ব্যবহার করে পরে প্রণোদনা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। অস্তিত্বহীন চালানগুলোকে কৃষিপণ্য বা প্রক্রিয়াজাত খাবার, যেমন- আলু, তিল বীজ, লাল মরিচ, হলুদ, টমেটো, ধনে গুঁড়া এবং বিরিয়ানি মসলা দেখানো হয়েছে। এমন পণ্য রপ্তানির ওপর ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পেয়ে থাকে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৯ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধ সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও পণ্য রপ্তানিতে যথাযথ পদ্ধতি না মানার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এতে আরও বলা হয়, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ও তাঁর চক্র বিভিন্নভাবে মেমো দেখিয়ে প্রণোদনার টাকা তুলছে।
কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করার কথা বলে প্রতি শিপমেন্টে টনপ্রতি রপ্তানিকারকের কাছ থেকে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা করে আদায় করা করছে অ্যাসোসিয়েশন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের গোপনীয় তথ্য চক্রের হাতে চলে যায়। সঠিকভাবে পণ্য যাচাই-বাছাই না হওয়ায় নিম্নমানের পণ্য দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট ও রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ২০০৫ সাল থেকে সংগঠনটির সভাপতি। তাঁর নিজস্ব ছয়টি কোম্পানির একটিরও হদিস নেই।
টেকনোভিশন ও এগ্রোভিশনের স্বত্বাধিকারী রাজীব দেব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক আবেদনে বলেন, বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ও মহাসচিব মনসুর আহমেদ সাধারণ সদস্যপদের জন্য বছরে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন। কোনো রসিদ ছাড়াই চার হাজার টাকা করে নবায়নের জন্য আদায় করা হয়। সাধারণ সদস্যদের প্রতি শিপমেন্টে টনপ্রতি রপ্তানির বিপরীতে কোনো রসিদ ছাড়াই এক হাজার টাকা আদায় করা হয়। বর্তমান সদস্য সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। ফলে সদস্যদের কাছ থেকে বছরে নেওয়া হয় প্রায় দুই কোটি টাকা। সদস্যপদ নবায়ন বাবদ আদায় ৮০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। দৈনিক গড়ে পাঁচ হাজার টন রপ্তানি হলে রসিদ ছাড়া আদায় করা হয় ৫০ লাখ টাকা। বছরে এই অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদ আদায় করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু এস এম জাহাঙ্গীর বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে এস এম জাহাঙ্গীরের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করে ও খুদে বার্তা পাঠিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।
কাস্টমস চিহ্নিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি ঢাকার মামুন এন্টারপ্রাইজ। কোম্পানিটি ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কৃষি রপ্তানির বিপরীতে ৬ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি প্রণোদনা নিয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কোম্পানিটি ১৪২টি চালানের বিপরীতে এই প্রণোদনা নিলেও একটিও পাঠায়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। আর অভিযুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. শরফুদ্দিন।