শিরোনাম
শাহ আমানতে ৪২৭ গ্রাম সোনাসহ ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে চিকিৎসকদের : ভূমিমন্ত্রী চক্রান্ত না করে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন : তথ্যমন্ত্রী বিজিএমইএ’র নতুন মহাসচিব হিসেবে যোগ দিলেন ড. সাহেদুল ইসলাম ব্যাংকারের প্রধান দায়িত্ব আমানতের নিরাপত্তা দেওয়া: বিকেবি চেয়ারম্যান জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে কামরুল-জসিম প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয় শুধু ওষুধ দিয়ে জাতিকে রোগ থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুলাইয়ের আত্মত্যাগের চেতনাকে লাভজনক চেতনা বানাবেন না : তথ্যমন্ত্রী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে কমবে মামলার জট : আইনমন্ত্রী মানবপাচার-অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে সরকার কঠোর অবস্থানে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মুল্লুক চলো- ইতিহাসের এক আলেখ্য উপাখ্যান

সুমন পুরকায়স্থ   |   শুক্রবার, ২০ মে ২০২২   |   প্রিন্ট   |   ৫০৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

Default Image

মুল্লুক চলো শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো নিজ নিজ ভুমিতে ফিরে চলা বা নিজ জন্ম স্থানে ফিরে চলা। আর এই ‡¯øvMvb‡K সামনে রেখেই ১৯২১ সালের ২০ মে সিলেট অঞ্চলের হাজার হাজার চা শ্রমিক নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বৃটিশদের সমস্ত অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে ইহাই ছিল প্রথম গণবিদ্রোহ।

প্রশ্ন হলো কেন চা বাগানের শ্রমিকেরা নিজ এলাকায় ফিরে যেতে চাইছিল। বিভিন্ন তথ্য সুত্রে জানা যায়, বৃটিশদের শোষণ নির্যাতন ছাড়া ও তখনকার সময়ে সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় নানা ধরণের বন্য প্রাণীর উৎপাত ছিল ভয়ংকর রকমের। এমনকি বিষধর সাপের কামড়ে অনেক শ্রমিক অকালে প্রাণ হারান । পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিকুল পরিবেশে শ্রমিকদের জন্য বাস করা ছিল অতিশয় দুস্কর।

মূলতঃউনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে চা শিল্পের গোড়াপত্তন করে। আর তখন বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয়। যা সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় শ্রমিকদের দ্বারা পুরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এই শ্রমিক সংগ্রহের জন্য বৃটিশরা নানা ধরণের ফন্দি আটে এবং অবশেষে সফল ও হয়। স্থানীয় দালালদের (আরকাট্টা) সহযোগীতায় ভারতবর্ষের বিহার, উরিষ্যা ও অন্ধ্র প্রদেশ তথা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে wb¤œ শ্রেণীর কৃষকদের প্রলোভন দেখিয়ে চা বাগান গুলোতে নিয়ে আসে।

যেহেতু শ্রমিকরা ছিল wb¤œ বর্গীয় এবং কৃষি উৎপাদনের সাথে জড়িত। শিক্ষা দীক্ষা থেকে অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন ছিল এই মানুষদের। তাই খুব সহজেই দালালদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে সিলেট এর বিভিন্ন অঞ্চলে আসতে শুরু করল । সেই সাথে দালালরা প্রচার করতে শুরু করলো-“গাছ হিলেগা, রূপিয়া মিলেগা“ , “ মাটি খুড়লে সোনা পাওয়া যায়।” ইত্যাদি ধরনের আপ্তবাক্যে শ্রমিকেরা অনেকটাই লোভে পড়ে সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে আসতে শুরু করলো। যদিও তারা তা পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছিল, সবই ছিল শুভংকরের ফাঁকি, তখন আর করার কিছুই ছিল না বিদ্রোহ ঘোষনা করা ছাড়া।

চা শিল্পের শুরুটাই হয়েছিল ঐ শিল্পের কারিগরদের ধোঁকা দিয়ে। দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চলের জন্তু -জানোয়ার, বিষধর সর্প, প্রাকৃতিক প্রতিকুলতা , মালিকদের শোষণ ও নির্যাতন হয়ে উঠল শ্রমিকদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। সারাদিন হার ভাঙ্গা খাটুনী খেটে মিলত নামমাত্র মজুরী। যা দিয়ে তিনবেলা খাওয়াটাই কষ্টসাধ্য ছিল , আর অন্যকিছু তো কল্পনার ও অতীত। ক্রমশই শ্রমিকদের জীবন ও জীবীকা হয়ে উঠল হুমকির সন্মুখ্খীন ।

ইতোমধ্যে বৃটিশ সরকার শ্রমিক সংগ্রহের ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করার জন্য আইনী রূপ দিল । ১৮৬৩ সালে “ লেবার ইমিগ্রেশন এ্যাক্ট প্রণয়ন করলো । পরবর্তীতে তাদের সুবিধামতো তা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করলো। শ্রমিকদের উপর বে আইনী আচরণকে আইনী রূপ দিয়ে বৃটিশ সরকার শোষন নির্যাতন ব্যবস্থাকে স্থায়ী করে দিল। পক্ষান্তরে উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিক শোষণ। আসামের লেবার এনকোয়ারি কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত ( ১৯২১- ১৯২৯ সালের) প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯১৭ -১৯২০ সালের সময়টিতে লক্ষাধিক শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন, যাদের অধিকাংশই ছিল অপুষ্টিজনিত ও সংক্রামক ব্যধিতে আক্রান্ত।

অস্তিত্ব যেখানে হুমকির মুখে, সেখানে হয় বিদ্রোহ না হয় পালানো দুটির একটিকেই বেচে নিতে হয়। এক পর্যায়ে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ তৈরী হতে থাকে। চারদিকে আন্দোলন দানা বাধতে থাকে। চা শ্রমিকরা নিজ এলাকায় যাওয়ার জন্য বিদ্রোহ ঘোষনা শুরু করে। ১৯২০ সালের শুরুর দিকে সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা বিশেষ করে করিমগঞ্জ, ধলই, ব্রহ্মপুত্র ভ্যালী, সিলেট ভ্যালী ও কাছাড় ভ্যালীতে শ্রমিকদের অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। এরই ঝেড় ধরে শ্রমিকরা মে মাসের শুরুর দিকে বিদ্রোহের ডাক দেয় এবং মুল্লুক চলো’‡¯øvগান দিয়ে সিলেটে অঞ্চলের বিভিন্ন চা বাগান থেকে বের হয়ে আসতে থাকে এবং নিজ জন্মভুমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য স্লোগান দিতে থাকে । জানা যায়, প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক রেল লাইনের রাস্তা ধরে চাঁদপুর অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেছিল। যেহেতু শ্রমিকদের অন্য কোন রাস্তা জানা ছিল না, তাই তারা গন্তব্যে পৌছানোর জন্য রেলপথ বেচে নেন এবং তারা মনে করতেন চাঁদপুর থেকে ষ্টিমারযোগে কলকাতায় যাওয়া যায়। তাদের এই গণবিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন পণ্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত ও পন্ডিত দেওসরণ মল্লিক।

কিন্তু বিধি বাম, এরই মধ্যে বাগান মালিকেরা অন্য ফন্দি আটতে থাকেন , কিভাবে শ্রমিকদের আটকানো যায়। আর তারা তাই করলেন এবং সফল হলেন। সেদিন ছিল ১৯২১ সালের ২০ মে , যেদিন শ্রমিকরা চাঁদপুরে মেঘনা ঘাটে পৌঁছালেন। শ্রমিকরা ছিলেন অনেকটাই ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত, সেই সাথে না খাওয়া। আর এই অসহায় শ্রমিকদেও উপর গোর্খা সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। অসহায় শ্রমিকদের রক্তে লাল হয়ে যায় মেঘনার ঘাট। সেই রক্ত মিশে যায় মেঘনার মোহনায়। গুলিতে অকালে প্রাণ হারায় বেশ কয়েকশ নিরীহ শ্রমিক। বাংলার বুকে ঘটে গেল আরেকটি মে দিবস ট্র্যাজেডি।বলাবাহুল্য, সারা বিশ্ব মে দিবস ট্র্যাজেডি নিয়ে জানলেও বাংলার বুকে ঘটে যাওয়া কয়জন ই বা জানি। আর সেই নিরীহ শ্রমিকদের মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হলো মেঘনার জলে। অথৈ জলে ভেসে গেল নিরীহ শ্রমিকের জীবন প্রদীপ। বাগান মালিকদের নগ্ন পৈশাচিক চরিত্র হার মানালো মানব সভ্যতার আধুনিক রূপকে। এই হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে সেই সময় ২৩শে মে আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়- “ An incident which in brutality and cruelty may only be eclipsed by the Jallianwallabagh tragedy.” একশত বছর পরে ও কি ওদের জীবন মান উন্নতি হয়েছে? প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০০৮ সাল থেকে ২০ মে দিনটিকে “ চা শ্রমিক দিবস” ঘোষণার জন্য দাবী জানিয়ে নানা ধরনের কর্মসূচী পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠিত হোক শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, এগিয়ে যাক সমাজ ও সভ্যতা।

লেখক পরিচিতি : আইনজীবী ও লেখক
তথ্য সূত্র: উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল , চা শ্রমিকের কথা- ফিলিপ গাইন

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন ajkersanglap.com-এর খবর

Editor and Publisher
Muhammad Abdus Salam (Salam Mahmud)
Office