অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | প্রিন্ট | ১৬০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ছবি: সংগৃহীত
মাতৃভাষা বাংলা অর্জনের ৬৮ বছর কেটে গেলেও এখনো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতারা নিতে পারেননি বাংলাভাষা অর্জনের ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বাদ। সাত দশক ছুঁই ছুঁই করা এ সময়েও রক্তক্ষয়ী এ ইতিহাস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে এগিয়ে আসেননি কেউ। এর কারণ কী? প্রতিবন্ধকতা নাকি সদিচ্ছার অভাব? কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা? এসব নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন –
‘যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ/সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন’- মধ্য যুগের বিখ্যাত কবি আবদুল হাকিম আনুমানিক ১৬৪০/৪৫ সনে ‘নূরনামা’ কাব্য গ্রন্থে ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় এসব চরণ লিখেন। ভাষার প্রতি তার ভালোবাসা কি যে মধুর ছিল তা ফুটে উঠেছে এ কবিতায়। তার প্রমাণ আরও কয়েক লাইন পড়লে বোঝা যায়- ‘আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ/দেশি ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ’।
১৯৫২ সালের আগেও বাংলাভাষার প্রতি বাঙালিদের যে আবেগ আর আকর্ষণ ছিল তার অনেকাংশ বর্তমানে কম তো দেখা যায়-ই, হিতে বাংলাভাষাকে শব্দ দূষণের দিকে ধাবিত করছে প্রযুক্তিগত প্রজন্মের বিদেশি ভাষা প্রেমে। তবে ভাষা শিক্ষা নয় বরং ভাষার ইতিহাস, বাংলাভাষা অর্জনের সূত্রপাত কিংবা বাংলাভাষার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে চলচ্চিত্র। অথচ, বাংলাভাষা মুক্তভাবে পাওয়ার ৬৮ বছর এবং স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরে এসেও বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে নেই একটিও বাংলাভাষার ইতিহাস সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ কোনো চলচ্চিত্র। কেন নির্মিত হলো না? মূল কারণ কী? এমনটি জানতে চাওয়া হয়েছিল দেশি চলচ্চিত্রের কয়েকজন বিজ্ঞজনের কাছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা বলেন, ‘আসলে চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল কারিগর তৈরি করেন প্রযোজক। প্রযোজকরা কোন গল্পে টাকা লগ্নি করবেন সেটিও নিয়ন্ত্রণ করেন তারা। শিল্পীরা অভিনয় করেন। পরিচালক নির্মাণ করেন মাত্র। কেবল অর্থ সংগ্রহ হলেই পরিচালক এবং শিল্পী তাদের বাকি কাজ সম্পাদন করতে পারেন। এতদিন প্রযোজকরা হয়তো বাংলাভাষা নিয়ে ছবি প্রযোজনায় আগ্রহী হননি। তবে চলচ্চিত্র যে একেবারই হয়নি তা কিন্তু নয়। জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছবিতে তো ভাষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়ছে।’
অভিনেত্রী ববিতার সঙ্গে একমত হলেও গুনী নির্মাতা মতিন রহমান কিছু বিষয় যোগ করেন। এ নির্মাতা বলেন, ‘পরিবেশগত একটি বিষয় আছে। ভাষা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ আছে কিন্তু গল্প নেই। গল্প তৈরি আছে কিন্তু অভিনয় করার লোকবলের অভাব। অন্য দিকে সবই আছে কিন্তু নির্মাণের অর্থ নেই। তবে কীভাবে ভাষানির্ভর পূর্ণাঙ্গ ছবি হবে?’
ববিতা ও মতিন রহমান অর্থের বিষয়টি প্রাধান্য দিলেও এটি মানতে একবারেই রাজি নন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রযোজক ও অভিনেতা সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘আগে তো বিষয় ঠিক করতে হবে। আমরা কি বাংলাভাষার মূল বিষয় ঠিক করতে পেরেছি? বাংলাভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা উপচে পড়ে ফেব্রুয়ারি মাস, বিশেষত ২১ ফেব্রুয়ারিতে। ‘২১’ এবং ‘ফেব্রুয়ারি’ এ দুটিই ইংরেজি। বাংলাভাষার গুণগান করছি ইংরেজি তারিখ ও মাস দিয়ে! এ বিষয়টিই তো এখনো আমরা ঠিক করতে পারিনি। চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে কী। বাংলাভাষা নিয়ে বিখ্যাত গান, আমারও প্রিয় বটে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’। খেয়াল করে দেখুন, অনিচ্ছাকৃত হলেও ভাষাপ্রেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদেশি প্রেম ঢুকে গেছে। অন্যদিকে বাংলাভাষা অর্জনের মূল তথ্য ও ইতিহাস লেখা ও জানার বিষয়টিও তো গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় ঠিক না করলে তো বাংলা ভাষানির্ভর পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ সহজতর হবে না। হ্যাঁ, অর্থ অবশ্যই লাগবে কিন্তু কী নির্মাণ করব কী দেখাব এটি হচ্ছে মূল বিষয়। তা ঠিক না হলে তো পূর্ণাঙ্গ ছবি নির্মাণ কঠিন, অনেকাংশে অসম্ভব।
এ প্রসঙ্গে একেবারই ভিন্নমত প্রকাশ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ অভিনেতা আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অবশ্যই একুশে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ভাষা দিবস কিংবা এর ইতিহাস সম্পর্কিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব। এক হাজার পরিচালক আছেন বটে কিন্তু এর মধ্যে কজন আছেন এ বিষয় চলচ্চিত্র নির্মাণে দক্ষতা এমনকি সাহস দেখাতে পারবেন? পরিচালক না হয় নির্ণয় করা যাবে কিন্তু মাতৃভাষা সংক্রান্ত চলচ্চিত্রের মূল ইতিহাস ও গল্প বলবেন কিংবা লিখবেন কে? কয়েকজন হয়তো বেঁচে আছেন তারাও হয়তো বেশি দিন থাকবে না। তবে এ বিষয়ে সরকার যদি উদ্যোগ না নেয় তবে অতীতে যেমন বাংলাভাষার ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র হয়নি ভবিষ্যতে তা না হওয়ার বিষয়টি আরও কঠিন হবে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়ক আমিন খান এ বিষয়ে বলেন, ‘এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ কম হচ্ছে। এ সময়ে বাংলাভাষার তথ্যবিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণ কতটা সহজ হবে, এ বিষয়টি নির্মাতা বলতে পারেন। তবে আমরা যে ভাষায় কথা বলি সে ভাষার ইতিহাস সম্পর্কিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা অবশ্যই দরকার। অতীতে কেন হয়নি সেটি আমার বলার বিষয় নয়, যেহেতু আমি নির্মাণের কেউ নই। তবে এ বিষয়ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’