অনলাইন ডেস্ক | সোমবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | প্রিন্ট | ১৮০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
প্রতীকী ছবি
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এসএএফ শাখার ছয় পুলিশ কনস্টেবলকে চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আদালতে পাঠিয়েছে চট্টগ্রামের একটি আদালত। গতকাল রবিবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিপলু কমার দে এই আদেশ দেন। এরপর আসামিদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার ৫০০ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন্স থেকে ছয় কনস্টেবলকে আনোয়ারা থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে মহানগর পুলিশ। চাঁদাবাজির ঘটনার অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর এই বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। অনুসন্ধান পর্যায়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় ছয় পুলিশ কনস্টেবল জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত হওয়ায় সিএমপি কমিশনার অভিযুক্ত ছয়জনকে আনোয়ারা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনার পর আনোয়ারা থানা পুলিশের একটি দল দামপাড়ায় আসে। কড়া নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে ওই ছয়জনকে নিজদের হেফাজতে নেয় আনোয়ারা পুলিশ।
কারাগারে যাওয়া পুলিশ কনস্টেবলরা হলেন মো. মাসুদ, মো. আব্দুল নবী, এসকান্দর হোসেন, মো. মনিরুল ইসলাম, মো. শাকিল খান ও মোর্শেদ বিল্লাহ। তাদের মধ্যে মোর্শেদ বিল্লাহ সিএমপি কমিশনারের বডিগার্ড।
চাঁদাবাজির মামলায় ছয় পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তারের পর কারাগারে গেলেও এই সংক্রান্ত তথ্য দিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ও জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা ‘আত্মলজ্জায়’ ভুগেছেন। ধারাবাহিকভাবে ফোন করা হলেও কর্মকর্তারা অপরপ্রান্ত থেকে সাড়া দেননি। আবার যারা সাড়া দিয়েছেন, তারাও কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। অথচ, সাধারণত পুলিশ এক-দুজন পতিতা কিংবা ছিঁচকে চোর গ্রেপ্তারের পর সেই ‘অর্জনের’ তথ্য প্রচরের জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালান।
মহানগর পুলিশের ছয় পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং আদালতের পাঠানোর তথ্য নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সুপার এস এম রাশিদুল হককে একাধিক দফা ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি অপরপ্রান্ত থেকে সাড়া দেননি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউদ্দৌল্লা রেজা জানান, ‘পুলিশ সুপার ছুটিতে আছেন।’ তিনি আনোয়ারা থানার ঘটনার বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) আফরুজুল হক টুটুল বলেন, ‘এই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জের কাছে পাবেন।’ শেষে আনোয়ারা থানার ওসি দিদারুল আলমকে একাধিক দফা ফোন করা হলেও অপরপ্রান্ত থেকে তিনি ‘লজ্জাবোধের কারণে’ সাড়া দেননি।
চাঁদাবাজির ঘটনার অভিযোগকারী আনোয়ারা উপজেলার পূর্ব বৈরাগ এলাকার বাসিন্দা আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত ২ ফেব্রুয়রি দিনগত রাত আনুমানিক দেড়টার সময় পাঁচ-ছয়জন লোক আমার বাড়ির দরজায় টোকা দেয়। আমি ও পরিবারের সদস্যরা ঘুম থেকে জেগে উঠি। এই সময় আমাকে ঘর থেকে বের করে আগন্তুকরা আনুমানিক ১০০ গজ দূরে নিয়ে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা নিজদের গোয়েন্দা পুলিশ দাবি করে জানায়, আমার ভাই নাকি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত। সেখানে কথা বলার একপর্যায়ে আমার স্বজনরা কাছে চলে আসায় আমাকে আনোয়ারা থানার চাতরী এলাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে পুনরায় ভেল্লাপাড়া এলাকায় নিয়ে যায়। ভেল্লাপাড়া পৌঁছে দাবি করে, আমার নামে গোয়েন্দা পুলিশে অনেক অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেতে হলে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। না হলে আমার ক্ষতি হবে। গ্রেপ্তার হতে হবে।
এরপর দর কষাকষি করে আমি স্বজনদের মাধ্যমে রাতেই এক লাখ ৮০০ হাজার ৫০০ টাকা জোগাড় করে গোয়েন্দা পুলিশ সদস্য দাবিদার ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিই। শেষে ভোররাতে আমাকে ছেড়ে দিলে আমি বাড়িতে ফিরে যায়। আর ৩ ফেব্রুয়ারি আনোয়ারা থানায় গিয়ে একটি অভিযোগ দিই। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ছয় কনস্টেবলকে আনোয়ারা পুলিশ থানায় আনা হয়। আমি তাদের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত করি।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ও জেলা পুলিশ এবং আদালত সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৩ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ পাওয়ার পর জেলা পুলিশ সুপার এবং রেঞ্জ ডিআইজি এই বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেন। তদন্ত পর্যায়ে মোটরসাইকেল আরোহী ছয়জন মহানগর পুলিশের কনস্টেবল বলে তথ্য পাওয়া যায়। এই ছয়জনের মধ্যে একজনের গায়ে ‘ডিবি’ লেখা জ্যাকেট ছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি জানানো হয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর।
ছয় কনস্টেবল চাঁদাবাজি করেছেন-এমন অভিযোগ পাওয়ার পরপরই উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশনা দেন পুলিশ কমিশনার। ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরের আগেই পুলিশ কমিশনারকে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার তথ্য জানানো হয়। এরপর পুলিশ কমিশনার অভিযুক্ত ছয়জনকে লাইনে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখার নির্দেশনা দেন এবং আনোয়ারা থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত দেন। এই নির্দেশনার পরপরই বিকেলে আনোয়ারা থানার একদল পুলিশ দামপাড়াস্থ পুলিশ লাইন্সে এসে ছয় কনস্টেবলকে নিয়ে আনোয়ারা যাত্রা করে।
সর্বশেষ রবিবার সকালে ছয়জনকে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট শিপলু কুমার দে আসামীদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ছয় কনস্টেবল সিএমপিতে কর্মরত ছিলেন এমন তথ্য নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর) আমির জাফর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের আনোয়ারা থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে এবং তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
মামলার আগেই আসামিদের হস্তান্তর করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ছয়জন জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ায় তাদের আনোয়ারা থানা পুলিশকে সোপর্দ করা হয়েছে।