অর্থনীতি ডেস্ক | শনিবার, ০৪ জুন ২০২২ | প্রিন্ট | ১১১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সংগৃহিত ছবি
দেশে হার্ড লোন এড়াতে এবং বিলাসবহুল পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি যে সুপারিশ দিয়েছে, তা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ। তারা মনে করে, এ সিদ্ধান্ত দেশের হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে পারে।
এছাড়া সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এ সংশ্লিষ্ট যেসব কঠোরতা জারি করেছে, সেসবেও সমর্থন করে আইসিসি বাংলাদেশ। শনিবার আইসিসিবির বার্ষিক সাধারণ সভায় এ সমর্থন দেওয়া হয়। এতে সংশ্লিষ্টরা বলেন, অপ্রয়োজনীয় আমদানি রোধ, উচ্চ আমদানির প্রকল্প বাস্তবায়ন স্থগিত করা বাজার ও অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক সংকেত পাঠাবে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি রোধ করবে বলে আমরা মনে করি।
আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান নির্বাহী বোর্ডের এ সভায় বলেন, আসন্ন বাজেটে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম, জ্বালানির দাম না বাড়ানোর পাশাপাশি করপোরেট ট্যাক্স রেট কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের যে দাবি, তাতেও সমর্থন করে আইসিসিবি।
সভায় তিনি এক প্রতিবেদনে বলেন, গত দুই বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামো গঠনে বড় বাধা ছিল করোনাভাইরাস মহামারি। অনেক সেক্টর অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেছে এবং এখনও সংগ্রাম করছে। এসব সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো আবার ট্র্যাকে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। ২০২১ সালে শক্তিশালী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও আর্থিক অসুবিধাগুলো এখনও শেষ হয়নি এবং এখনও অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি রয়ে গেছে। এছাড়া অনেক দেশ ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্মুখীন হয়েছে। এগুলোর সবকিছুই অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরেকটি অনিশ্চয়তার পথে যেতে পারে। এই যুদ্ধ একটি বড় ধরনের মানবিক সংকট, যা লাখ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে এবং অনিশ্চিত সময়কাল এবং অনিশ্চিত মাত্রার একটি গুরুতর অর্থনৈতিক ধাক্কায় ফেলতে পারে গোটা বিশ্বকে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের মাত্রা একেবারেই অনিশ্চিত এবং এটা আংশিকভাবে যুদ্ধের ব্যাপ্তিকাল এবং নীতিগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। তবে এটা স্পষ্ট যে যথেষ্ট কাছাকাছি মেয়াদি সময়ে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি এবং উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী মুদ্রাস্ফীতি চাপের ওপর যুদ্ধের প্রভাব পড়বে।’
নির্বাহী বোর্ডের প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন উন্নয়নশীল এশিয়ার অর্থনীতিকে সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। যুদ্ধ ইতোমধ্যে তেলের মতো পণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে এবং বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়েছে। এদিকে কভিড-১৯ উন্নয়নশীল এশিয়ার অনেক অংশকে প্রভাবিত করে চলেছে, আবার কিছু কিছু অঞ্চলে নতুন শনাক্ত সংখ্যা বাড়ছে।
আইসিসিবি সভাপতি বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ৫০ বছরের যাত্রা অসাধারণ এবং অনেকের কাছে এটি একটি ‘অসম্ভব অর্জনের দেশ’। বাংলাদেশের প্রভাবশালী আখ্যানটি একটি অর্থনৈতিক অলৌকিক ঘটনা। বাংলাদেশের চিত্তাকর্ষক স্কোর কার্ডটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চ গতি অর্জন এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDGs) সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকের চিত্তাকর্ষক কর্মক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সফলতা বাংলাদেশকে দ্বৈত গ্র্যাজুয়েশন এনে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মাপকাঠি অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এবং জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে, যাকে ২০২০ সালে ‘দারিদ্র্য নিরসনের মডেল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ ক্রমবর্ধমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং এখন ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও কভিড-১৯ মহামারি থেকে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং গত দশকে অর্জিত কিছু অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার, বৈদেশিক মুদ্রার হারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং ব্যাংকিং খাতে গভীরতর তারল্য সংকট।
এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ নানাভাবে অনুভব করছে। যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে এর প্রভাব আরও তীব্র হবে। রপ্তানি হ্রাস এবং আমদানি বিল বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই উচ্চ আমদানি পরিশোধের মাধ্যমে চাপ অনুভব করছে।
এদিকে নির্বাহী বোর্ড ২০২১ সালের অডিটর রিপোর্ট অনুমোদন করেছে এবং ২০২২ সালের জন্য অডিটর নিয়োগ দিয়েছে।
সভায় আইসিসি বাংলাদেশের সহ সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ. কে. আজাদ, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, ডিসিসিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আরমান হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।