নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সদস্য ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এ সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, ব্যতিক্রমী একটি সিদ্ধান্ত এসেছে বাংলাদেশের জন্য। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে। এতদিন যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে এখন কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এটাকে আমরা ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছি। কিন্তু, একইসঙ্গে আমরা মনে করিয়ে দিচ্ছি, মসৃণ উত্তরণের জন্য সরকার যে কাজগুলো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো ঠিকঠাকভাবে করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সময়কাল দেশের রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে, আগামী দিনে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছে, সেগুলো থেকে কীভাবে ক্রমান্বয়ে বেরিয়ে আসা হবে, তার একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা প্রয়োজন। আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে এসব সুবিধা বা সহায়তা কতটা কমানো হবে এবং পরবর্তীতে কোন কোন খাতে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিষ্কার করতে হবে। আমরা যে সংস্কারের কর্মসূচি নিয়েছি, সেটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে মানুষের কাছে আনতে হবে।
পরিকল্পনার সমন্বয় জরুরি
এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, একদিকে সরকারের অ্যাকশন প্ল্যান রয়েছে, অন্যদিকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ত্রিবার্ষিক বাজেটারি কাঠামো এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনাও দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় হওয়া দরকার।
এসব পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে এবং পরবর্তী সময়ে এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, এলডিসি উত্তরণের এই পুরো প্রক্রিয়ার মালিকানা শুধু কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি পুরো সরকারের এবং পুরো দেশের। এ কাজে বেসরকারি খাত, বিদেশি সহযোগী গোষ্ঠী, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, এই জিনিসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগুলোকে যুক্ত করার মতো একটি জাতীয় কর্তব্য আমাদের সামনে এসেছে।
কথার চেয়ে কাজে গুরুত্ব
এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বলেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।
আগামী তিন বছরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাবে-এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা আগামী তিন বছর এই ভরসা করতে চাই। এর সঙ্গে জনমানুষের স্বার্থ যেমন যুক্ত, তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, এটা শুধু কারিগরি সিদ্ধান্ত নয়, শুধু প্রশাসনিকও নয়, এটা শুধু জনমানুষের ব্যাপারও নয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এই পর্যায়ে নিতে হবে যে এটা তারা অনুধাবন করেন।
এদিকে এলডিসি গ্রাজুয়েশন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ইআরডি এত বড় বিষয় এখন যথাযথভাবে পালন করতে হিমসিম খাবে।
তার মতে, জাতিসংঘ ভবিষ্যতে আবার সময় বাড়ানোর কোনো নজির তৈরি করবে না। ফলে আগামী তিন বছরে উল্লেখযোগ্য সংস্কার অগ্রগতি দেখাতে হবে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা এবং অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।