নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ২৭৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ৬নং আলীনগর ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের মো. আব্দুল গণী ও রুমা বেগমের একমাত্র ছেলে মো. ফাহিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিজের প্রকৃত পিতা-মাতার পরিবর্তে চাচা-চাচিকে পিতা-মাতা পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট তৈরিসহ একাধিক প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ফাহিমুলের চাচা মো. আমিনুল ইসলাম কমলগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফাহিমুল ইসলাম তার প্রকৃত পিতা মো. আব্দুল গণী ও মাতা রুমা বেগমের পরিচয়ের পরিবর্তে চাচা মো. আমিনুল ইসলাম ও চাচি শামসুন নাহারের নাম ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরি করেন। পরবর্তীতে ওই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি ইতালিতে যান এবং সেখানে চাচার পরিচয় ও নাম ব্যবহার করে সম্পদের ওপর দাবির চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, রাজনগর উপজেলার তারাপাশা ইউনিয়নের পন্ডিতনগর গ্রামের মৃত আব্দুল গাফুর মিয়ার মেয়ে সুমি বেগমের সঙ্গে ফাহিমুল ইসলামের বিয়েকে কেন্দ্র করেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সুমি বেগমের সঙ্গে ফাহিমুলের বিয়েতে ৭ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কাবিননামার তথ্য ও বিয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাবিননামার ১১ নম্বর কলামে বিয়ের সাক্ষী হিসেবে ফাহিমুলের চাচা মো. আমিনুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেখানে তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। আমিনুল ইসলামের দাবি, তিনি ওই বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন না এবং কাবিননামায় ব্যবহৃত স্বাক্ষর তার নয়। দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে চিৎলিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল হকের নাম উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিয়ের ঘটনাটি স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বরের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হলেও পরবর্তীতে কাবিননামায় ব্যবহৃত পরিচয় ও স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা ও অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্টরা তখন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ফাহিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে গত ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দৈনিক আজকের সংলাপ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ ঘটনায় তার পাসপোর্টে ব্যবহৃত পরিচয় ও তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে, রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের কাজী মো. জালালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফাহিমুল ইসলাম ও সুমি বেগমের মধ্যে বর্তমান কাবিনের আগেও আরেকটি কাবিন হয়েছিল বলে তিনি অবগত। পরে গত ১৫ আগস্ট সামাজিকভাবে দ্বিতীয়বার কাবিন করেন তিনি নিজে। তবে সরকারি ফি পরিশোধের বিষয়েও জটিলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব কাবিনের বৈধতা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চাচার সম্পত্তি নিয়েও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
এদিকে ফাহিমুল ইসলামের পারিবারিক বিষয়কে কেন্দ্র করে তার বাবা আব্দুল গণী ও চাচা ইতালি প্রবাসী মো. আমিনুল ইসলামের মধ্যেও অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আমিনুল ইসলামের পক্ষের অভিযোগ, আব্দুল গণী বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন এবং দেশে থাকা আমিনুল ইসলামের জায়গা-জমির দলিলও তার দখলে নেওয়া বা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন। পরবর্তীতে ওই সম্পত্তির কোনো কোনো অংশকে নিজের বা নিজের ছেলের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে চাপ সৃষ্টি ও চাঁদা দাবির মতো আচরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ফাহিমুল ইসলামকে চাচা আমিনুল ইসলামের ছেলে হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা এবং চাচার সম্পত্তিতে তার অধিকার রয়েছে—এমন দাবি তোলার ঘটনাগুলোর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টিও সম্পৃক্ত। অর্থ লেনদেন, দলিল আত্মসাৎ, সম্পত্তির মালিকানা ও চাঁদা দাবির এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় ফাহিমুল ইসলামের চাচা মো. আমিনুল ইসলাম কমলগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, তার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কোনো ধরনের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড, প্রতারণা বা আর্থিক/সম্পত্তিগত দাবি করলে তার দায়ভার তিনি বহন করবেন না। তিনি প্রশাসনের কাছে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া ফাহিমুলের কথিত প্রতারণায় তার সৎবোন রাহেলা আক্তার ও স্ত্রী সুমি বেগম সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। রাহেলা আক্তার আত্মীয়স্বজনের কাছে ফাহিমুলকে আমিনুল ইসলামের ছেলে হিসেবে দাবি করে চাচার সম্পত্তিতে তার অধিকার রয়েছে বলে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দিয়েছেন—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত পিতা-মাতার পরিচয় গোপন করে অন্য ব্যক্তিকে পিতা-মাতা হিসেবে ব্যবহার, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে ভুল তথ্য প্রদান, কাবিননামায় কথিত জাল স্বাক্ষর ব্যবহার এবং ওই পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদেশে অবস্থান ও সম্পত্তির দাবি—এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, এনআইডি, পাসপোর্ট, কাবিননামা, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ফাহিমুল ইসলাম, রাহেলা আক্তার, সুমি বেগম ও আব্দুল গণীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।