নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলাকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিয়ের কাবিননামার সাক্ষীর নাম পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়েরের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের পণ্ডিতনগর গ্রামের মৃত আব্দুল গাফুরের কন্যা সুমি বেগম (জন্ম: ১০ সেপ্টেম্বর ২০০০) এবং কমলগঞ্জ উপজেলার ৬নং আলীনগর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের চিতলিয়া গ্রামের আব্দুল গণীর একমাত্র সন্তান ফাহিমুল ইসলাম (জন্ম: ১৩ আগস্ট ২০০২) এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ফাহিমুল ইসলাম তাঁর চাচা আমিনুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে তাঁকে নিজের বাবা পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরি করেন। পরবর্তীতে চাচা আমিনুল ইসলামের আর্থিক সহায়তায় ইতালিতে পাড়ি জমান। সেখানে চাচার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ নিয়ে ধাপে ধাপে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে নিজের চেয়ে বয়সে প্রায় দুই বছর বড় প্রেমিকা সুমির কাছে টাকা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
একপর্যায়ে বিষয়টি চাচা আমিনুল ইসলামের নজরে এলে তিনি ফাহিমুল ইসলামকে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফাহিমুল ইসলাম দেশে ফিরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গত ১৪ জুলাই ২০২৬ ইং তারিখে নিজ খরছে রাজনগরের একটি কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
তবে বিয়ের কাবিননামার বরপক্ষের সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। অভিযোগ অনুযায়ী, কাবিননামায় বরপক্ষের প্রথম সাক্ষী হিসেবে চাচা আমিনুল ইসলামের নাম ব্যবহার করে তাঁর স্বাক্ষর জাল করা হয়। দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন চিতলিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি জামাত নেতা মাওলানা আব্দুল হক।
বিষয়টি জানতে পেরে আমিনুল ইসলাম দেশে ফিরেন এবং আইনজীবীর মাধ্যমে মৌলভীবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩-এ গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং তারিখে পাঁচজনকে আসামি করে একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৩৮৫/৩৮৭/৪৬৭/৪৭১/৩৪/৫০৬(২) ধারার উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, এই প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে দৈনিক আজকের সংলাপ পত্রিকার কমলগঞ্জের ক্রাইম রিপোর্টার মাসুদ পারভেছ কাইয়ুম একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এরপর থেকে ফাহিমুল ইসলামের স্ত্রী সুমি বেগম, তাঁর ভাই দুবাইপ্রবাসী মুজাহিদ বাবু এবং ইতালি প্রবাসী রাসেল এই সাংবাদিককে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকের পক্ষ থেকে আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
কাবিননামার সাক্ষী পরিবর্তন নিয়ে নতুন রহস্য
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের আগেই কাবিননামায় থাকা আমিনুল ইসলামের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে কুলাউড়া উপজেলার চুন ঘর এলাকার মুজাহিদ নামের এক ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে বিয়ের তারা পাশা ইউনিয়নের কাজি মো. জালাল এই পরিবর্তনের বিষয়ে অবগত ছিলেন বলে অভিযোগে জানা যায়।
এখন জনমনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—বিয়ের সময় যাঁর নাম প্রথম সাক্ষী হিসেবে কাবিননামায় উল্লেখ ছিল, তাঁর নাম পরবর্তীতে কীভাবে বাদ দেওয়া হলো? নতুন করে অন্তর্ভুক্ত মুজাহিদ নামের ব্যক্তিটি কে? তিনি কি বিয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন? তাঁর স্বাক্ষর ও পরিচয় যাচাই করা হয়েছে কি? বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর কাবিননামার সাক্ষীর নাম ও স্বাক্ষর পরিবর্তনের আইনগত বৈধতা কী?
প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এ ঘটনায় মামলাটির তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর ওপর ন্যস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ইমিগ্রেশন পুলিশ ও কমলগঞ্জ থানা পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ফাহিমুল ইসলামের পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র, NID, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ইতালিতে যাতায়াতের নথি, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং মূল কাবিননামা ও পরিবর্তিত কাবিননামা—সবকিছু যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কাবিননামার সাক্ষীর নাম ও স্বাক্ষর পরিবর্তনের বিষয়টি কে, কখন, কীভাবে এবং কোন কর্তৃত্বে করেছেন, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশের জেরে একজন সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন দেখার বিষয়, পিবিআইয়ের নিরপেক্ষ তদন্তে পরিচয় জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, কাবিননামার সাক্ষী পরিবর্তন এবং সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের প্রকৃত রহস্য কতটুকু উন্মোচিত হয়।