বদরুল আলম নাবিল | রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থায় সূচিত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত। তবে পদ্মা সেতুর পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল কাজে লাগাতে হলে এর সঙ্গে সমন্বিত ও আধুনিক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। অথচ ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক (এন–৮)-এর বড় একটি অংশ এখনো দুই লেনের। ফলে যানজট, দুর্ঘটনা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ের অপচয় দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় অর্থনীতির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এ বাস্তবতায় ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা কেবল একটি অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ করিডোর। ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এ সড়ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, শিল্পায়ন ও সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশেও এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই মহাসড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি মানে শুধু যান চলাচল সহজ করা নয়; বরং দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক উৎপাদন ও বাণিজ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
পদ্মা সেতু চালুর ফলে ঢাকা থেকে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু ভাঙ্গার পর দুই লেনের সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ায় প্রত্যাশিত গতিশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঈদ, পূজা ও পর্যটন মৌসুমে যানজটের তীব্রতা বেড়ে যায়। একই সড়কে ভারী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায় এবং যাত্রার সময় অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সড়কের সীমিত সক্ষমতার কারণে তার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এই বাধা দূর করতে ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়কের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
কুয়াকাটা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অনন্য সুযোগ এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রা, যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার উদ্বেগ অনেকের ভ্রমণ–পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলে যাতায়াত আরও দ্রুত, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে। এতে দেশি–বিদেশি পর্যটকের আগমন বৃদ্ধির পাশাপাশি হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পর্যটন খাতের সম্প্রসারণের সুফল স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এই মহাসড়কের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চারের ক্ষেত্রে পায়রা বন্দরের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একটি সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা শুধু বন্দরের নিজস্ব অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল ও বাজারের দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগও অপরিহার্য। ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলে পায়রা বন্দরের সঙ্গে রাজধানী ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর হতে পারে। এতে সরবরাহব্যবস্থার সময় ও ব্যয় কমবে, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প ও লজিস্টিকস খাতের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এই সুফল নিশ্চিত করতে মহাসড়ক, বন্দর এবং সংযোগকারী সড়কগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাতের সমৃদ্ধির সঙ্গেও এই মহাসড়কের সম্পর্ক গভীর। বরিশালসহ উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপাদিত ধান, শাকসবজি, ফলমূল এবং নদী ও সাগর থেকে আহরিত মাছ প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ যানজট ও ধীরগতির কারণে পচনশীল পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারে না। এতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং উৎপাদকরা ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। উন্নত মহাসড়ক পণ্য পরিবহনে গতি ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়িয়ে এসব সমস্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে কাঁচামাল সংগ্রহ, পণ্য পরিবহন, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ও প্রশস্ত মহাসড়ক এসব ক্ষেত্রে সুবিধা সৃষ্টি করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। এই করিডোরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিকস হাব, কোল্ড স্টোরেজ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তরুণদের নিজ অঞ্চলে কাজের সুযোগ বাড়বে এবং জীবিকার সন্ধানে বড় শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। এভাবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি আরও বহুমুখী ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবিদার। দুই লেনের সড়কে বিপজ্জনক ওভারটেকিং, মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহনের সংঘাত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। যথাযথ সড়ক বিভাজক, নিরাপদ প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থা, উন্নত সংযোগস্থল এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ পরিকল্পিত ছয় লেনের মহাসড়ক এসব ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু লেনের সংখ্যা বাড়ালেই সড়ক নিরাপদ হবে না; নকশাগত মান বজায় রাখা, পথচারী ও স্থানীয় যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও সমান জরুরি। উন্নয়ন পরিকল্পনায় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আরও নিরাপদ হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির বিবেচনায়ও দক্ষিণাঞ্চলে উন্নত সড়ক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো দুর্যোগের সময় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা, ত্রাণ ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পরিবহন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়কের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ুসহিষ্ণু নকশা, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, উঁচু ও টেকসই সড়ক অবকাঠামো এবং জরুরি চলাচলের সক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে মহাসড়কটি শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাহন নয়, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জননিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ যখন সমুদ্র অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জনকল্যাণে রূপান্তর করা। ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা হলে পদ্মা সেতুর সুফল আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি পায়রা বন্দর, কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র, কৃষি ও মৎস্য খাত এবং সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে কার্যকর অর্থনৈতিক সংযোগ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অতএব, ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক কোনো বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর মাধ্যমে পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কৃষি ও মৎস্য খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যটনের বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থানের পথ সুগম হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত অর্থায়ন, পরিবেশবান্ধব নকশা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন।
সময়ের দাবি তাই স্পষ্ট—ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, এই মহাসড়কের উন্নয়ন মানে শুধু দ্রুত যাতায়াত নয়; এর অর্থ দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদনশীলতার বিকাশ, বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত, কর্মসংস্থানের বিস্তার এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের পথে অগ্রযাত্রা। যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক।
লেখক : বদরুল আলম নাবিল
সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক
সভাপতি, ঢাকাস্থ পটুয়াখালী জার্নালিস্টস ফোরাম (পিজেএফ)